আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ২

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ২

———————————————————- রমিত আজাদ

১৯৮৮ সালের কথা, তখন আমি এইচএসসি পাশ করেছি মাত্র। আমার দ্বিতীয় বড় বোন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিষয়ের ছাত্রী। আপা আমাকে বললেন, “এই যে রুশীরা আফগানিস্তান দখল করেছে, তার কারণ কি জানিস?” আমি বললাম, “ওরা সেখানে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চায়।” আপা হেসে বললেন, “মূল ঘটনা তা নয়। রাশিয়া এত্ত বড় একটা দেশ অথচ, তার কোন উষ্ণ সমুদ্র-বন্দর নাই। অথচ একটা দেশের জন্য এটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ! রুশীদের আল্টিমেট গোল হলো করাচী সমুদ্র-বন্দর দখল করা। তাতে ওদের অনেক ফায়দা হবে।” আবারো মাথায় স্ট্রাইক করলো, আন্তর্জাতিক জিও পলিটিক্স। ঐ প্রথম বুঝলাম সমুদ্র-বন্দর কত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়! বুঝলাম যে, আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের একটি অনেক বড় সম্পদ!

এবার আমি রুশীদের সমাজতন্ত্র নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। তাহলে সমাজতন্ত্র-ফমাজতন্ত্র ব্যাপার না! আসল কাহিনী সাম্রাজ্য বিস্তার! সেই প্রাচীন কালের মতই আছে সবকিছু! নতুন বোতলে পুরাতন মদ! রাজনীতিবিদ্যার বই খুলে পড়তে শুরু করলাম। একটি বইয়ে লেখা পেলাম, ” অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন যে, রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নে পরিণত হলেও তার আন্তর্জাতিক জিও পলিটিক্স-এর পলিসির কোন পরিবর্তন হয় নাই। বরং সমাজতন্ত্র-এর আলখাল্লায় জার আমলের আন্তর্জাতিক জিও পলিটিক্স-ই বহাল রয়েছে।” আবারো ধাক্কা খেলাম! সেই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি!

তার আগে ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে একটি ঘটনা শুনেছিলাম যে, রাশিয়ার আকাশের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি দক্ষিণ কোরিয় যাত্রীবাহী বিমান-কে মিসাইল মেরে উড়িয়ে দিয়েছে, সোভিয়েত বাহিনী। ঘটনাটা সেই সময়ে ঝড় তুলেছিলো সারা পৃথিবীতে। তবে কম্যুনিস্ট-রা বোঝাতে চেয়েছিলো যে, ঐ বিমানটি আসলে একটি গুপ্তচরবৃত্তির বিমান ছিলো। সোভিয়েতের কোন একটি সামরিক বেইজের ইনফর্মেশন নেয়ার জন্য তার আকাশসীমার কাছাকাছি হয়েছিলো। এই বিমান-কাহিনী মিখাইল গর্বাচেভ-এর কোরিয়া সফর পর্যন্ত গড়িয়েছিলো! ঐ সফরের পরে জনাব গর্বাচেভের বিষন্ন চেহারাটি টিভির পর্দায় আমার এখনো মনে পড়ে! সেই বিষয়ে পরে লিখছি।

১৯৮৪ সাল থেকেই দুটা রুশ শব্দ শুনে আসছিলাম, ‘পেরেস্ত্রইকা’ ও ‘গ্লাস্তনস্ত’। অত বুঝতাম না। শুধু জানলাম যে, সমাজতন্ত্রের পথেই থাকবে সোভিয়েত ইউনিয়ন শুধু তার ‘পুনর্গঠন’ হবে (পেরেস্ত্রইকা), আর এতকাল যেই বাক-স্বাধীনতার অভাব ছিলো সোভিয়েতে সেটা আর থাকছে না, আসবে ‘উন্মুক্ততা’ (গ্লাস্তনস্ত)। ভাবলাম, ভালোই তো!

তবে ১৯৮৮ সালের দিকে উসখুস শুরু হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। উসখুস শুরু করলো বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট গুরুরা! আরো উসখুস শুরু করলো পশ্চিম বাংলার কম্যুনিস্ট গুরুরা-ও। সেখানে তখনও সিপিএম ক্ষমতায়। জ্যোতি বসু মাথা উঁচু করে আছেন। দিল্লী সরকার কর্তৃক ‘নকশাল’ বিধ্বংস ও দমিত হলেও ফায়দা লুটতে পেরেছিলো সিপিএম! পশ্চিম বাংলার কম্যুনিস্ট গুরুরা বলেই বসলেন, ‘গর্বাচভ যা করছে, তা হজম করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।’

আরো শুনতে পেলাম সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির মতামত বিরোধী বা ভিন্নমতাবলম্বী নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আন্দ্রেই সাখারোভ-এর নাম। তিনি নির্বাসনে ছিলেন। গর্বাচভ উনাকে মুক্তি দিয়েছেন! সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রীয় সংসদ নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। কেন বিজ্ঞানী আন্দ্রেই সাখারোভ-কে নির্বাসিত করা হয়েছিলো, সেটা অবশ্য জানতাম না। পরে জেনেছিলাম যে, আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্য প্রেরণ-এর ঘোরতর বিরোধী ছিলেন তিনি। সেই কট্টর কম্যুনিস্ট সরকারের সময় তিনি দুঃসাহস দেখিয়ে উন্মুক্তভাবে বলেছিলেন যে, “আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্য প্রেরণ-এর ফলাফল মোটেও ভালো হবে না।” কিন্তু সেদিন কম্যুনিস্ট চোরারা ধর্মের কথা শোনে নাই!

১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে শুনতে পেলাম যে, আফগানিস্তানে দশ বৎসর ব্যাপী যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধে হেরে গিয়েছে। সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে আফগানিস্তান থেকে। ভাবলাম, এত বড় একটা শক্তি পুঁচকে আফগানিস্তান-এর কাছে হেরে গেল? তাহলে এই এত এত পারমানবিক এ্যাটম বোমা, হাইড্রোজেন বোমা, নিউট্রন বোমা কোনটাই কোন কাজের না? সময়মত ব্যবহারই যদি করতে না পারলো, তাহলে এগুলা বানায় কেন? বুঝলাম অস্ত্রের শক্তির চাইতেও বড় কোন শক্তি আছে, যা যুদ্ধে জয়লাভ করতে সাহায্য করে। কি সেই শক্তি?

এদিকে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের দৃশ্যটি বাংলাদেশ টিভিতে সংবাদে দেখিয়েছিলো। দেখলাম একের পর এক বিশাল বড় বড় ট্যাংক বেরিয়ে যাচ্ছে আফগানিস্তান থেকে। সর্বশেষ যে সোভিয়েত সৈন্য আফগানিস্তান ত্যাগ করেছিলেন তিনি সম্ভবত ছিলেন জেনারেল গ্রোমোভ। প্রস্থানের সময় উনার/উনাদের হাতে কিছু লিখিত পত্র ধরিয়ে দিচ্ছিলো আফগান শিশুরা।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১৮ই আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ০১টা ৩১ মিনিট

Afghan War: My memories – 2
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.