আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৩

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৩
———————————————————- রমিত আজাদ

একটি ছবি আমাকে অবাক করেছে!
এটা ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত কম্যুনিস্ট সৈন্যদের প্রত্যাহারের ছবি। সৈন্যরা ট্যাংকে চলেছে, তার একপাশে নৃত্যরত রূপসী তরুণীরা! আমি প্রথমে ভেবেছিলাম যে, এটা বোধহয় জয়ের উচ্ছাসে নৃত্যরত আফগান তরুণীদের ছবি। পরে দেখলাম যে, না, এটা কম্যুনিস্ট সৈন্যদের সোভিয়েতে ফেরত বা প্রবেশের পরে তাদের-কে সেখানে গ্রহণ করার ছবি। ছবিটা আফগান-উজবেক সীমান্তে তোলা, এবং তরুনীরা সম্ভবত উজবেক তরুনী। পরাজিত সৈন্যদের রিসিভ করার জন্য আনন্দনৃত্যের কি আছে, আমি ঠিক বুঝলাম না! অবশ্য চাইলে যে কোন কিছুর পক্ষে কত রকমের যুক্তিই তো দাঁড়া করানো যায়!

আমি সোভিয়েত ইউনিয়নের মাটিতে পা রেখেছিলাম ১৯৮৯ সালের ২২শে আগস্ট। আফগানিস্তান থেকে তখন সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহার হয়ে গেছে। প্রথম বৎসরে ভাষা শিক্ষা কোর্স যেখানে করেছি সেটা আসলে খোদ রাশিয়া ছিলো না। সেটা ছিলো সোভিয়েতের অন্যতম রিপাবলিক জর্জিয়া। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো এর রাজধানী তিবিলিসি শহরে। তখন ভাষা জানতাম কম, দেশটাকেও জানতাম কম। তাছাড়া কোন একটা দেশ বা সমাজকে জানতে গেলে ঐ দেশের ভাষা জানতে হয়। ভাষা না জানা পর্যন্ত ঐ সমাজটাকে পেনিট্রেট করা যায় না।

একদিন ট্যাক্সিতে চড়ে তিবিলিসি শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছি। হঠাৎ পুলিশ রাস্তার সব গাড়ী আটকে দিলো। কি ব্যাপার? দেখলাম একটা মিছিল আসছে। সেখানে অনেকেই সৈনিকের পুরাতন পোশাক পড়া। আমরা ভাবছিলাম, এরা কারা? আমাদের ট্যাক্সিচালক প্রৌঢ় একজন ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন, “আফগানী-রা!” আমরা আবার ওদের দিকে তাকালাম, কই ওদেরকে দেখে তো এই দেশীয় বলেই মনে হয়! ট্যাক্সিচালক আবার বললো, “ওরা আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছিলো!” এবার বুঝলাম। ভালোভাবে ওদের দিকে তাকালাম, লক্ষ্য করলাম ওদের মধ্যে কেউ কেউ পঙ্গু! বুঝলাম কোন দাবী-দাওয়া নিয়ে আজকে ওরা রাজপথে মিছিলে নেমেছে!

ভাষা শিক্ষা কোর্স করার সময় লক্ষ্য করেছিলাম, সোভিয়েত দেশের শিক্ষকরা অতীব ভালো মানুষ! দশজন সাধারণ মানুষের কাতার থেকে উনারা অনেক অনেক উপরে। এমন মাটির মানুষদেরকে দেশেও কম দেখেছি!
আমাদের এক বন্ধুর একজন শিক্ষিকা ছিলেন, তিনি তার স্বামীর সাথে বসবাস করতেন, উনাদের কোন সন্তান উনাদের সাথে বসবাস করতো না! এমন না যে, উনার কোন সন্তান ছিলো না। আসলে উনার একটিই ছেলে ছিলো, যে আফগান যুদ্ধে গিয়ে নিহত হয়েছিলো। সেই থেকে এই দম্পতি নিঃসন্তান হয়ে পড়ে! এরকম অনেক ভাগ্যাহত দম্পতিই ছিলো সারা সোভিয়েত জুড়ে!

আমাদের মনে তখন প্রশ্ন জাগলো, এত অল্পবয়সসী ছেলে আর্মীতে গেলো কেন? রাস্তাঘাটে কিছু অল্পবয়সী ছেলে দেখতাম সৈনিকের ঊর্দী পড়া। ভাবতাম এরা কারা? ওদের কাঁধের এ্যাপুলেটে লেখা থাকতো সিএ (CA)। পরে জানতে পেরেছিলাম যে, এটার মানে ‘সোভিয়েতস্কায়া আর্মীয়া’ মানে ‘সোভিয়েট আর্মী’। এখানকার নিয়ম অনুযায়ী, আঠারো বৎসর পুরা হলেই পুরুষদের ডাক পরে বাধ্যতামূলক আর্মীতে। তবে সেই সময়ে সে যদি কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত থাকে তাহলে আর সেই ডাকটা পরে না। তবে তাকে অন্যভাবে আর্মীতে সার্ভ করতে হয়। যাহোক, ঐ যাদের আর্মীতে ডাক পড়লো, তারা তখন বাধ্যতামূলক সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিলো, দুই বৎসরের জন্য। সেনাবাহিনীতে তাদের র‍্যাঙ্ক হবে অতি সাধারণ সৈনিক। আর ঐ সময়ে যদি দেশে কোন যুদ্ধ চলে, তাহলে ডাক পড়লে সেই যুদ্ধেও যেতে হতে পারে! আর ঠিক ঐভাবেই রেগুলার আর্মীর বাইরেও এমন অসংখ্য আঠারো/উনিশ বছর বয়সের যুবকও আফগান যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলো! যাদের অনেকে ফিরেছিলো পঙ্গু হয়ে; আর অনেকে ফিরেছিলো লাশ হয়ে! আবার অনেকে ফিরেও আসেনি, ভীনদেশের মাটিতে নিহত হয়ে সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছিলো!

ভাষাশিক্ষা কোর্স সমাপ্ত হওয়ার পর, আমি মূল পড়ালেখা শুরু করি ইউক্রেইণের ‘খারকোভ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে’। এই দেশটাও খোদ রাশিয়া নয়, রাশিয়ার সাথে লাগোয়া, সোভিয়েতের আরেকটি রিপাবলিক। খারকোভ থেকে রাশিয়ার সীমান্ত খুব বেশি দূরে ছিলো না অবশ্য! আর খারকোভ নিজেও ছিলো একটা রাশিয়ান সংখ্যাগরিষ্ঠের নগরী। যেই নগরীর মূল ভাষা ছিলো রুশ ভাষা। এই শহরটি ছাত্রছাত্রীতে ভরপুর ছিলো। ইউক্রেইণের সবচাইতে বড় শিক্ষানগরী ছিলো এটা! বিদেশী ছাত্রছাত্রীও ছিলো অনেক! এখানে আমার প্রচুর পরিমানে সিনিয়র-জুনিয়র বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের সাথে পরিচয় হয়!

তাদের মধ্যে একজনার নাম ছিলো রাফাত। ডরমিটরিতে আমার রুমের প্রতিবেশী রুমেই তিনি থাকতেন। তিনি মূলত: ছিলেন প্যালেস্টাইনের তবে সেখান থেকে তার পরিবার ইজ্রাইলী-দের কর্তৃক বিতাড়িত হলে তারা সিরিয়ায় থিতু হয়েছিলেন। তিনি নিজ মাতৃভূমী প্যালেস্টাইনের কথা বলে মাঝে মাঝে কাঁদতেন। বুকে আশা বেধে রাখতেন দিন বদলাবে, প্যালেস্টাইন একদিন স্বাধীন হবে, উনারা মাথা উঁচু করে নিজ বাসভূমে প্রবেশ করবেন। উনার কাছ থেকে আমি ঐ অঞ্চলের রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছিলাম। তিনি আমার সিনিয়র ছিলেন, এবং আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। মরুভূমিতে মাছ পাওয়া যায় না। তাই আরবদের জন্য মাছ একটা ডেলিকেট খাদ্য। আমার হাতের মাছ রান্না তিনি আগ্রহ ভরে খেতেন। বলতেন, “তোমরা বাংলাদেশীরা মাছ খুব মজা করে রাঁধতে পারো!”

উনার সাথে বসে আমি টেলিভিশন দেখতাম। তিনি আমার সাথে সংবাদে শোনা কারেন্ট এ্যাফেয়ার্স নিয়ে আলোচনা করতেন। ইতিমধ্যেই ইরাক বনাম ইঙ্গ-মার্কিন প্রথম যুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। ইরাকের ডিক্টেটর সাদ্দাম হোসেন তখন নায়ক/ভিলেন! একদিন আমি ও রাফাত ভাই টেলিভিশনে রাশিয়ার জাতীয় সংবাদ শুনছি, হঠাৎ একটা প্রতিবেদন দেখালো সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের উপর। কিছুক্ষণ প্রতিবেদন দেখার পর তিনি আমাকে বললেন, “দিন কিভাবে পাল্টায় দেখো, আগে রুশীরা বলতো ‘আফগানিস্তানের দুশমন’-রা আর এখন তারাই বলছে ‘আফগানিস্তানের মুজাহিদ’-রা!

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২০শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১২টা ৪০ মিনিট

Afghan War: My memories – 3
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.