আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৪

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৪
———————————————————- রমিত আজাদ

আর্যরা মানে উত্তর ভারতীয়রা একসময় আমাদের বাঙালীদেরকে বলতো দস্যু, রাক্ষস, ইত্যাদি। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ, ঐতরেয় আরণ্যক ইত্যাদি গ্রন্থে লেখা আছে এসব কথা। কিন্তু কেন? আসল কথা হলো আর্যরা পুরো উত্তর ভারত দখল করে সেখানকার স্থানীয় মানুষদেরকে নিম্ন বর্ণের ঘোষণা দিয়ে দাসত্বের চিরস্থায়ী শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে পারলেও, ঐ অপকর্মটা বঙ্গবাসী বা বাঙালীদের সাথে পারেনি। বীর বাঙালীরা ওসব বর্ণ-ফর্ণ মানে না, তারা সামাজিক সাম্যে বিশ্বাসী। আর্যরা যতবারই অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ আক্রমণ করেছে, ততবারই পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ফিরে গিয়েছে। বাঙালী বীরদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে এই তিক্ত সত্যটা স্বীকার না করে, আর্যরা অপপ্রচার চালাতো যে “ওরা তো দস্যু, ওরা তো রাক্ষস, তাই ওদের সাথে পারা যায় না।” আর এটাই হলো কথা, বীরদেরকে বীর না বলে, দস্যু বলে নিজেদের কাপুরুষতা ধামাচাপা দেয়া!!!

আফগানিস্তানে কোন সম্পদ থাকুক বা না থাকুক, ওটা তো আর পশ্চিমা বা অপরদের বাপের তাল্লুক না, যে চাইলাম আর হানা দিলাম, আর একটা অযুহাত বাতাসে ছড়িয়ে দিলাম। যেমনটা গ্রীকরা করেছিলো ট্রয়ে হানা দেয়ার ক্ষেত্রে, ‘হেলেন’ তো ছিলো অযুহাত মাত্র! তো, দেশপ্রেমিক নাগরিক মানেই বোঝে ঐ হানা দেওয়ার অর্থ; সেখানে যদি সম্পদ নাও থাকে, দেশ দখল করতে পারলে, এ্যাট লিস্ট ঐ দেশের মানুষদেরকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা যাবে। কোন দেশপ্রেমিক ও সুস্থ চিন্তার মানুষ কি ঐ দাসত্বকে মেনে নেবে? তাই বিদেশী শক্তির হানা দেয়ার সাথে সাথেই গর্জে উঠে তা রুখে দেয় বীর দেশপ্রেমিকরা।

প্রাচীন ইতিহাসে তাকালে আমরা দেখি যে, রোমানরা যে দেশই দখল করতো, সাথে সাথেই সেই দেশের প্রতিটি নরনারীকে তাদের দাসদাসীতে পরিণত করতো। এভাবে অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষও দাসদাসীতে পরিণত হয়েছিলেন। এমনকি রাজপুত্র স্পার্টাকাসও পরিনত হয়েছিলেন দাসে। তবে ঐ যে রাজরক্ত বলে কথা! দাসত্বের শৃঙ্খল তিনি মানতে পারেননি, তাই সত্তর হাজার দাসকে সংঘবদ্ধ করে বিদ্রোহ করেছিলেন তদানিন্তন সুপার পাওয়ার রোমের বিরুদ্ধে। হয়তো সাময়িক পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের!

যারা আজ তালিবানদের-কে নিয়ে হাসাহাসি করছে। তারা হয় হানাদারদের দালাল, নতুবা বীরত্বের ‘ব’-ও বোঝে না।

আফগানিস্তানে রয়েছে বিপুল সম্পদের পাহাড়। ঐ সম্পদও হানাদেরদের লক্ষ্য! সেই সব সম্পদের বিবরণ পরে দিচ্ছি। আপাতত আমার স্মৃতিচারণে যাই।

১৯৮৮ সালের কোন এক বিকালে ঢাকাস্থ সোভিয়েত কালচারাল সেন্টারে রুশ ডিপ্লোম্যাট দের উদ্যোগে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিলো। ইংরেজী বাংলা মিলিয়ে আলোচনাসভা হচ্ছিলো। রুশ ডিপ্লোম্যাট-রা ইংরেজী ভাষাতেই আলোচনা করছিলেন, তবে মাঝে মাঝে কালচারাল সেন্টারের দোভাষী আর্কাদি তুলস্চিংস্কী তা বাংলায় অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। তিনি ভালো বাংলা জানতেন। সে সময়ে তিনি পিএইচডি-গবেষণারত ছিলেন, উনার অভিসন্দর্ভের টপিক ছিলো ‘জীবনানন্দ দাশ ও তার কবিতা’। আমার কবিতায় আগ্রহ ছিলো, তাই বাংলা কবিতা নিয়ে তিনি মাঝে মাঝে আমার সাথে আলোচনা করতেন। যাহোক, আলোচনা শেষে হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব। আমি দাঁড়িয়ে ইংরেজীতে একটা প্রশ্ন করলাম, “আপনারা মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদেরকে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন, এজন্য আপনাদেরকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। তবে আমার প্রশ্নটি হলো, প্রতিটি রাষ্ট্রেরই কিছু ফরেন পলিসি থাকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন কোন ফরেন পলিসির আন্ডারে তখন বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিলো?”

একজন রুশ ডিপ্লোম্যাট ইংরেজীতে জবাব দিলেন, “সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম ফরেন পলিসি হলো, মুক্তি আন্দোলনে সাহায্য করা। পৃথিবীর যেকোন দেশে মুক্তি আন্দোলন হলেই, আমরা সেখানে সাহায্য করে থাকি।”
উনার উত্তর শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আমি পাল্টা প্রশ্ন করে বসলাম, “তাহলে আফগানিস্তানে আপনারা উল্টা-টা করছেন কেন? সেখানে আপনারা কেন মুক্তিসংগ্রামীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন?”

পুরো হল জুড়ে হাসির শব্দ শোনা গেল! হেসে গড়িয়ে পড়লো বাংলাদেশীরা। উনাদের হাসির অর্থ হলো, মোক্ষম যুক্তিতে ধরেছে ব্যটাদেরকে! ডিপ্লোম্যাট-দের কেউ কেউ হাসলেন, কেউ কেউ বিব্রত হলেন! দোভাষী আর্কাদি হাসছিলেন। আমার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য মাইক টেনে নিলেন একজন সুদর্শন ডিপ্লোম্যাট। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সুস্পষ্ট বাংলায় প্রত্যয়ের সাথে তিনি বললেন, “এটা দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপার! কারো কারো দৃষ্টিতে আফগান মুজাহিদরা মুক্তিসংগ্রামী। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে আফগান মুজাহিদরা পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট। আমরা সোভিয়েতরা আফগান জনগণের বিরুদ্ধে কোন লড়াই করছিনা। আমরা লড়াই করছি ঐ যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্টদের বিরুদ্ধে।”

সেদিন উক্ত ডিপ্লোম্যাটের প্রশ্নের উত্তরে সন্তুষ্ট না হলেও, উনার প্রাঞ্জল বাংলা কথা শুনে আমি চমৎকৃত হয়েছিলাম। পরদিন আর্কাদি সবার সামনেই আমাকে বলেছিলেন, “চমৎকার প্রশ্ন করেছিলেন কালকে! সেমিনারের আলোচনা এমন প্রাণবন্ত হলে ভালো লাগে!”

১৯৮৯ সালে একটা বই আমার হাতে এলো। ততদিনে সম্ভবত সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে। বইটার নাম ‘পেরেস্ত্রোইকা, নিউ থিংকিং ফর আওয়ার কান্ট্রি এ্যান্ড দ্যা ওয়ার্লড’। বইটি লিখেছিলেন, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মিখাইল গর্বাচভ। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম ও শেষ রাষ্ট্রপতি ছিলেন গর্বাচভ। বইটি ছিলো সেই সময়ের বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটা ‘হট কেক’! বহু ভাষায় অনুদিত হয়েছিলো বইটি। বইটির বাংলা অনুবাদ খুব দ্রুতই হয়েছিলো। আঠারো বৎসর বয়সী আমার জ্ঞান তখন ছিলো খুবই কম। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে কতটুকুই বা জানতাম? বইটা পড়ে বুঝতে খুব কষ্ট হয়েছিলো। তবে সেখানে আফগান যুদ্ধ সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন। আফগানিস্তানে সোভিয়েতের হানা দেয়া যে ভুল ছিলো, সেই ইঙ্গিত তার বইয়ে ছিলো। কয়েকটি লাইন আমার মনে আছে – “কোন দেশ যদি ভুল রাজনীতি বা ভুল সিস্টেমে থাকে, তবে তাদের রাজনীতি বা সিস্টেমের ভুল সংশোধন করে দেয়া আমাদের দায়িত্ব না। তারা কোন রাজনীতি বা কোন সিস্টেমে থাকবে সেটা তাদের ব্যাপার।”

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২০শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: দুপুর ০১টা ২২ মিনিট

Afghan War: My memories – 4
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.