আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৫

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৫
———————————————————- রমিত আজাদ

গর্বাচেভের লেখা বইটার নাম ‘পেরেস্ত্রোইকা, নিউ থিংকিং ফর আওয়ার কান্ট্রি এ্যান্ড দ্যা ওয়ার্লড’। অনেক কিছুই লেখা আছে সেখানে। তার পঞ্চম চাপ্টারটি হলো, ‘আন্তর্জাতিক কম্যুনিটিতে তৃতীয় বিশ্ব’। সেই অধ্যায়ের একটি সাবসেকশন-এর নাম হলো, ‘প্রতিটি জাতির-ই নিজস্ব উন্নয়নের পথ বেছে নেয়ার অধিকার রয়েছে’। এই সাবসেকশনে তিনি আফগানিস্তান সম্পর্কে লিখেছিলেন, “আমরা অতি দ্রুতই আমাদের সৈন্যদেরকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে চাই। ……………………………………। সোভিয়েত ইউনিয়ন চায় যে, আফগানিস্তান স্বাধীন, সার্বভৌম ও নন-এ্যালাইনড হোক, যেমনটি ছিলো আগে। এটা আফগান জাতিরই সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, তারা কোন পথ অবলম্বন করবে, কি ধরনের সরকার পদ্ধতি বেছে নেবে এবং কি ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প তারা হাতে নেবে। তবে মার্কিনীদের অযাচিত হস্তক্ষেপে আমাদের সৈন্য প্রত্যাহারে দেরী হচ্ছে……………..।”

উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনা আসলে আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগে, সোভিয়েত কম্যুনিস্টরা যদি আফগানিস্তানে উন্নয়ন নিয়ে এতই চিন্তিত ছিলেন, তাহলে, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ এই দশ বৎসরে সোভিয়েত কম্যুনিস্ট-রা আফগানিস্তানে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলো? কয়টি মেডিকেল কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলো? কয়টি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলো? সব মিলিয়ে শিক্ষার কতটুকু উন্নয়ন সেখানে হয়েছিলো?

নারীমুক্তি নিয়ে খুব বেশী কথা বলে পশ্চিমারা-কম্যুনিস্টরা। ঠিকআছে, সেই নারীমুক্তির লক্ষ্যেই আফগানিস্তানে কি কি শিক্ষা পদক্ষেপ নিয়েছিলো সোভিয়েত কম্যুনিস্টরা?

ইউক্রেইণে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার সময় দেখেছিলাম যে, আফগানিস্তান নিয়ে খুব বেশী আলোচনা নেই সর্বসাধারণের মধ্যে। একবার একটি গাড়ী ভাড়া করেছিলাম কোথাও যাওয়ার জন্য। চালক/মালিক ছিলেন এক প্রৌঢ়। কথায় কথায় তিনি বললেন যে, তিনি একজন প্রাক্তন সৈন্য, এবং তিনি আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছিলেন। বললেন, প্রতিটি অপারেশনে সাধারণ সৈন্যদেরকে জানানো হতো না যে, আজ তাদের কোথায় কি কাজে যেতে হবে। এটা কমান্ডার ও আরো একজন কেবল জানতেন। ঐ আরো একজন ছিলেন তিনি। উনার আরো একটা কাজ ছিলো স্পাইং করা, এই নজরদারী থেকে খোদ কমান্ডার-ও বাদ পড়তো না। তারপর অপারেশন শেষে তিনি সংশ্লিষ্ট জায়গায় রিপোর্ট জমা দিতেন।

আমার এক ক্লামেইট ছিলেন ভিতালিক নামে। সে একবার গিটার নিয়ে আমার রুমে আসলো। বললো, “গান গাই?” আমি বললাম, “গাও।” সে গিটার বাজিয়ে গান শুরু করলো, “আফগানিস্তান, আফগানিস্তান, ……………।” শুনলাম আফগানে যুদ্ধরত এক সৈনিকের বেদনাসিক্ত আফসোসের গান! বুঝলাম যে, ঐ কম্যুনিস্ট বাক-স্বাধীনতাহীনতার মধ্যেও কিছু মানুষ তাদের কলজে ছেঁড়া গান রচনা করেছিলো! আর অনেকের মুখে মুখেই ফিরতো সেই গান ও বেদনার সুর!

আলেগ নামে আমার আরেক ক্লাসমেইট ছিলো। যদিও সে ইউক্রেইণের খারকোভে পড়ালেখা করতো, কিন্তু সে মূলত ছিলো রুশ জাতীয়তার। তার সাথে এই নিয়ে কথা শুরু হলো। আলেগ বললো, “আফগানিস্তানে সৈন্য প্রেরণ করা আমাদের জন্য ভুল ছিলো হয়তো, কিন্তু উপায়ও ছিলো না। কারণ আমাদের সরকার ওয়াচ করেছিলো যে আফগানের আকাশে আমেরিকার যুদ্ধবিমান উড়ছে। অর্থাৎ তারা আফগান দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে! আমরা যদি আফগানে ইমিডিয়েটলি সৈন্য না পাঠাতাম, তাহলে আমেরিকানরা সেখানে সৈন্য পাঠাতো। আর এটা হতো আমাদের জন্য বিপর্যয়! আমাদের সীমান্তে মানে ঘরের পাশেই অবস্থান নিতো মার্কিনীরা।” আলেগের কথা শুনে আমি মনে মনে বললাম, “চাপা মারার আর জায়গা খুঁজে পাওনা! সৈন্য পাঠানোর একটা অযুহাত দেয়ার জন্য ঐ গপ্পো ফেদেছে সোভিয়েত কম্যুনিস্ট সরকার! ঐ আমেরিকা থেকে এই এত দূরে পাহাড়ী দুর্গমতায় ওরা আসবে রং-তামাশা করতে!” এতকাল পরে আমার তো মনে হচ্ছে, কথা ঠিক হলেও হতে পারে। শেষতক তো মার্কিনীরা গেলো-ই আফগানে!

আমার রুশ ভাষা শিক্ষার টিচার ছিলেন কুপলিভাৎস্কায়া লুবোভ আলিক্সিয়েভনা। অসম্ভব ভদ্র ও কালচারড ছিলেন তিনি। উনার সাথে মাঝে মাঝে বিতর্ক হতো আমার। আমি উনার কম্যুনিস্ট দেশের বদ্ধতার সমালোচনা করতাম, তিনি আমার কথা কিছুটা মেনে নিতেন। তবে, রুশ সাহিত্যের অনেক কিছুই আমি উনার কাছ থেকে শিখেছিলাম। একদিন কি একটা বিষয় নিয়ে উনার সাথে মতপার্থক্য হলো। আমি বললাম, “আপনি কেন এমন ভাবছেন জানেন?” তিনি বললেন, “কেন?”
আমি বললাম, “কারণ, আপনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে কিছু দেখেন নাই!” আমার কথা শুনে উনার মন খারাপ হয়ে গেলো! তিনি বললেন, “কে বলে আমি সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে কিছু দেখি নাই? আমি কয়েক বৎসর আফগানিস্তানে চাকুরী করেছি।” উনার কথা শুনে আমি অবাক হলাম। তিনি আরো বললেন, “আসলে একটা অবজেক্ট বা দৃশ্য থাকলেই হয় না। সেটা দেখার চোখও লাগে! আফগানিস্তানে মেয়েরা যখন পড়তে আসতো, তখন খুব সুন্দর করে সেঁজেগুজে আসতো। ওখানকার মেয়েরা এম্নিতেই রূপসী, আবার সাঁজতোও খুব সুন্দর করে! আমি ওদেরকে বলতাম, ‘সুরাইয়া, তোমাকে তো আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে!” উত্তরে ওরা বলতো, “উঁহু, আমরা সুন্দরী নই! টিচার, আপনার দৃষ্টি খুব সুন্দর তো, তাই আমাদের সাধারণের মধ্যেও আপনি সৌন্দর্য্য খুঁজে পান!”

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২০শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: সন্ধ্যা ০৭টা ৪০ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.