আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৬

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৬
———————————————————- রমিত আজাদ

আফগান তরুণীদের যে কয়জনকে আমি দেখেছি, তারা সকলেই চোখ ধাঁধানো রূপসী ছিলো।
১৯৯০ সাল হবে। খারকোভ শহরের কোন এক ডরমিটরিতে আমাদের বাংলাদেশী এক ছোটবোন থাকতো। কোন এক প্রয়োজনে ওর কাছে গিয়েছিলাম। তিনতলায় ওঠার পরে সহসাই করিডোরে আমার পাশ দিয়ে চলে গেলো একটা ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানী!’ আমি রীতিমত বজ্রাহত হলাম! অপরূপ রূপবতী এক তরুণী প্রায় ছুটে চলে গেলো আমার পাশ দিয়ে। ওর পিছনে পিছনে এলো আমাদের সেই ছোটবোন। আমি তার দিকে তাকালাম।

ছোটবোন: কি ভাইয়া, কি দেখছেন? (কৌতুক করে বললো সে)
আমি: কে এই মেয়েটি?
ছোটবোন: আমার রুমমেইট। আফগানী মেয়ে।
আমি: আফগানী মেয়ে! বাহ!
ছোটবোন: কি পছন্দ হয়েছে? (মুচকি হেসে)
আমি: তা, পছন্দ হওয়ার মতনই তো!
ছোটবোন: লাভ নাই ভাইয়া। আপনি যত স্মার্ট-ই হন না কেন, লাভ নাই। ও এনগেজড!
আমি: তাহলে তো হতাশ হলাম! ঐ লাইনে তবে তো আর যাওয়া যাচ্ছে না। তা, কে সেই ভাগ্যবান?
ছোটবোন: একটা ইন্ডিয়ান ছেলে।
আমি: ইন্ডিয়ান?
ছোটবোন: হুম।

তারপর ছোটবোনের রুমে গিয়ে বসলাম।

ছোটবোন: মেয়েটার অনেক কষ্ট ভাইয়া।
আমি: কেন? কি কষ্ট? তরুনী মেয়ে, বয়ফ্রেন্ড আছে, আনন্দেই তো থাকার কথা।
ছোটবোন: আর ওখানেই তো সমস্যা!
আমি: বুঝলাম না?
ছোটবোন: ওর দেশী আফগান ছেলেরা ওকে খুব কষ্ট দেয়!
আমি: কিভাবে?
ছোটবোন: ওকে এসে বকাঝকা করে, কেন ও একটা ইন্ডিয়ান ছেলের সাথে ফ্রেন্ডশীপ করলো? আবার যারা বয়ষ্ক, তারা মেয়েটাকে চড়-থাপ্পরও দেয়!
আমি: চড়-থাপ্পরও দেয় মানে?! মেয়েটা কি ওদের আপন বোন নাকি? যে ইচ্ছামত শাসন করবে?
ছোটবোন: ওদের দেশে এটাই কালচার হয়তো!

একদিন এক বাংলাদেশী ছোটভাই এসে আমাকে বলে, “ভাইজান, আজ সিটি সেন্টারে একটা আফগানী মেয়েকে দেখলাম। এক্কেবারে আপনার মতন দেখতে!”
আমি: কি?
ছোটভাই: হ্যাঁ, ভাইজান। আপনার মতন দেখতে।
আমি: কেমন দেখতে?
ছোটভাই: খুব সুন্দরী!
আমি: কি কইলি রে তুই! আমি কি মাইয়া মানুষের মতন দেখতে?!
সবাই হেসে গড়িয়ে পড়লো!

আমার হোস্টেলে কয়েকটা পরিবার দেখতাম। ওরা দোতলায় কয়েকটা রুম নিয়ে থাকতো। ওরা দেখতে অনেকটা আমাদের দেশীয়দের মত ছিলো। একজন বৃদ্ধ দাদা ছিলেন, অবিকল বাংলাদেশীদের মতন দেখতে, মুখে লম্বা সাদা দাঁড়ি, মাথায় গোল টুপি। আমি উনাকে দেখলে সালাম দিতাম। তিনি হাসিমুখে লম্বা করে সালামের উত্তর দিতেন। তারপর বুকের উপরে হাত রেখে, মাথা ঝুঁকাতেন। আমার মনে হতো আমি যেন আমার ঢাকার কোন মুরুব্বীর সালাম নেয়া দেখছি। মাঝে মাঝে উনাদের রুমের পাশ দিয়ে গেলে আমি নামাজ পড়ার আওয়াজ শুনতে পেতাম। আমি প্রথমদিকে ভাবতাম, স্টুডেন্টস ডরমিটরিতে ওরা কি করে? পরে জেনেছিলাম যে ওরা আফগানী। নিজ দেশ ছেড়ে চলে এসেছে। এখন এখানেই থাকে। এই হোস্টেলেই স্থায়ীভাবে থাকে। ওরা ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে রুম পেল কি করে? নাকি ভাড়া দিয়ে থাকে তা আমি বুঝতে পারতাম না! তবে পরবর্তিতে এরকম অগনিত বাস্তুহারা আফগান পরিবারদেরকে আমি ঐ দেশে দেখেছি!

এদের মধ্যে একজনার নাম ছিলো শাহ। তিনি খারকোভেই লেখাপড়া শেষ করে ওখানেই রয়ে গেছেন। লম্বা-চওড়া সুদর্শন শাহ একদিন আমার রুমে এলেন। আমি একা একটা রুমে থাকতাম। সাজানো গোছানো আমার রুমে, অতিথি আপ্যায়নে কোন সমস্যা হত না। তিনি মোহনীয় হাসি দিয়ে বললেন, “তোমার সাথে গল্প করতে এলাম।” আমি বললাম, “এতো আমার সৌভাগ্য। বসুন।”
শাহ্‌: দেশে যাওয়া হয় মাঝেসাঝে?
আমি: জ্বী, যাই সুবিধামত।
শাহ: এখান থেকে কিছু নিয়ে গিয়ে দেশে বিক্রি করলে লাভ হয়?
আমি: জ্বী, কিছুটা হয়।
শাহ: আর ওখান থেকে কি কি এনে এখানে বিক্রি করলে লাভ হয়?
আমি: আছে কিছু আইটেম।

উনাকে মানুষ ভালো-ই মনে হলো। কিন্তু উনার ঐ বেনিয়া আলাপ ঐ বয়সে আমার পছন্দ হলো না। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম, যে তিনি বয়স্ক মানুষ। সংসার চালান, উনাকে তো অর্থ উপার্জন নিয়ে ভাবতেই হবে!

অপর পরিবারটি মিশুক ও সাদাসিধা ছিলো। তারা ছিলো পাঁচজন। ঐ বৃদ্ধ দাদা, তার মাঝবয়সী ছেলে, ছেলের স্ত্রী, আর দুইটি ছেলেমেয়ে। ছেলেটি কিশোর ছিলো। আর মেয়েটি তখন সদ্য কৈশোর পেরুনো একটি প্রস্ফুটিত গোলাপ। বয়স আঠারো ছুঁইছুই হতে পারে। সেই সময়ে অনেক চোখেরই ওর দিকে নজর পড়েছিলো! ওর নাম ফারজানা (ছদ্মনাম)। মাঝে মাঝে ফারজানার বাবা-মায়ের সাথে আমার কথা হতো করিডোরে। এই সামান্য হাই-হ্যালো-সালাম। ফারজানার বাবা ভালো রুশ বলতেন। ফারজানার মায়ের সাথে সালাম বিনিময়ের বেশী কিছু হত না। একদিন তিনি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। আমি পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও, মর্মার্থ বুঝলাম যে, তিনি জানতে চাইছেন, আমি পশতু ভাষা জানি কিনা? আমি অপারগতা প্রকাশ করে, বিনিময়ে জানতে চাইলাম যে তিনি ঊর্দু ভাষা জানেন কিনা? এবার তিনিও অপারগতা প্রকাশ করলেন। বুঝলাম যে, তিনি পশতু ভাষা ছাড়া আর কোন ভাষা জানেন না। ফলে আমাদের আর কথাবার্তা বলার কোন সুযোগ ছিলো না।

ফারজানা যেহেতু লোকাল স্কুলে পড়তো, অতএব সে ভালো রুশ বলতে পারতো। তার সাথেও আমার হাই-হ্যালো টাইপ কথা হতো। তবে মাঝে মাঝে “কেমন আছো?”, “কেমন চলছে?” “আজ আবহাওয়া কেমন?” এই জাতীয় কিছু কথাও হতো। পfহকরা হয়তো জানতে চাইতে পারেন যে মেয়েটির রূপ-সৌন্দর্য্য কেমন ছিলো? ধৈর্য্য ধরেন, সে আলোচনায় আসছি।

হোস্টেলের নিচে সদর দরজা থেকে বের হলে, একটা ছোট খেলার জায়গা ছিলো। সামার টাইমে, সেখানে শিশুরা খেলা করতো। মাঝে মাঝে মেয়েরা সেখানে ব্যাডমিন্টন খেলতো। আমরা ছেলেরা মাঝে মাঝে সদর দরজার সামনে সিঁড়িতে বসে গপ্পো-গুজব করতাম। একদিন বাইরে থেকে হোস্টেলে ঢোকার মুখে দেখি, ফারজানা সিঁড়িতে চুপচাপ বসে আছে। কয়েকটা লাতিন আমেরিকান ছেলে ওর সাথে ফান করে বলছে, “আরে মন খারাপ করে বসে আছো কেন?” লাতিন আমেরিকান ছেলেরা আমাদের মত অত হেজিটেট করে না! মেয়েদেরকে দুমদাম কথা বলে বসে। এদিকে ওরা আমারই ক্লাসমেইট ছিলো। আমি হেসে ওদেরকে বললাম, “কি ব্যাপার?” ওরা বলে, “না মানে মেয়েটা একা একা বোর ফীল করছে, তাই আমরা একটু ফান করছিলাম। যাতে ওর মন চাঙা হয়!” ফারজানা দেখলাম একটুও বিচলিত হলো না। বললো, “আমি কোনই বোর ফীল করছি না। আমি ভালো-ই আছি।” তারপর ও উঠে সামনে বাচ্চাদের সাথে খেলতে লেগে গেলো। লাতিন ছেলেগুলাও হোস্টেলের ভিতরে ঢুকে গেলো। শুধু পেরুর খুয়ান (আমার সিনিয়র) আর আমি সিঁড়িতে বসলাম।

খুয়ান: কেমন ঐ আফগানী মেয়েটা?
আমি: হুম!
খুয়ান: হুম কি? খুব রূপসী না?
আমি: হুম!
খুয়ান: ছিপছিপে গড়ন। সুন্দর স্লিম ফিগার। কালো লম্বা চুল। টানাটানা কালো চোখ। গায়ের রঙ রুশীদের মতন মাত্রাতিরিক্ত ধবধবে নয়, আবার শ্যামবর্ণ নয়, মাঝামাঝি রঙ একেবারে এক্সোটিক (আমি মনে মনে ভাবলাম এই রঙকে আমাদের দেশে দুধে-আলতা রঙ বলে)! খুব লম্বাও নয় আবার খাটোও নয়। চমৎকার মাঝারি গড়ন! সুন্দরী না বলে উপায় আছে?
আমি: হুম!
খুয়ান: শুধু হুম হুম কি? আগে বাড়ো।
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে খুয়ানের দিকে তাকালাম।
আমি: মানে?
খুয়ান: মানে আবার কি? তোমার সাথে এই মেয়েকে ভালো মানাবে!
ওর কথায় আমি মোটামুটি লজ্জ্বা পেয়ে গেলাম।

দিনটা সম্ভবত কোরবানী ঈদের দিন ছিলো। ছাত্রজীবনে আমি সাধারণত ফর্মাল ড্রেস পড়তাম না। সকালে উঠে ভাবলাম, ঈদের দিন যেহেতু তাই একটু সেঁজেগুজে স্যুট-টাই পড়েই ক্লাসে যাই। ওমা, ক্লাসে যাওয়ার পর আমার বন্ধু-বান্ধব তো আমাকে ঘিরে ধরলো। বলে, “বাব্বা! এত সুন্দর আজকের ড্রেস-আপ! কি ব্যাপার? অনুষ্ঠান নাকি অভিসার? আমি বললাম, অভিসার করার কেউ নাই, আজ আমাদের উৎসব।” ওরা জানতে চাইলো, কি উৎসব এটা? আমি ওদেরকে বিস্তারিত বললাম। ক্লাস-ট্লাস শেষ করে বিকালের দিকে হোস্টেলে ফিরলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় কার রুমে যেন ঢুঁ দিতে গেলাম। করিডোরে ঢুকতেই ফারজানার সামনে পড়লাম! কিছু বলার আগেই দেখলাম ওর চোখ বড় বড় হয়ে গেলো, আর দুইচোখে একটা ঝলকানী! আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না এই এক্সপ্রেশনের মানে। আমি ওকে বললাম, “ঈদ মুবারক!” ফারজানা উত্তর দিলো। তারপর দ্রুত ওদের রুমে/ঘরে ঢুকে গেলো।

সন্ধ্যার দিকে হোস্টেলেই কার যেন রুমে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি ফারজানার ছোটভাই বসা। উপস্থিত রুশদেরকে কোরবানী ঈদের বর্ণনা দিচ্ছে। আমি ওর কাছে জানতে চাইলাম, তারা মানে তাদের পরিবার আজ কোন কোরবাণী করেছে কিনা? সে বললো, “আমাদের ধর্মেই তো বলে যে, যাদের কোরবাণী করার সামর্থ্য আছে, তারা যেন অবশ্যই কোরবাণী করে। আমার আব্বা কোরবানী করেছেন।” আমি বললাম, “বাহ! ভালো তো!” ছেলেটি আবার বললো, “ওদিকে শাহ্‌, কিছুই কোরবানী করে নাই। শাহ তো ধনী ব্যবসায়ী, তার তো একটা না দুইটা গরু কোরবানী করা উচিৎ ছিলো!” আমি আর কিছু বললাম, না। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি উঠে চলে গেলো। আমি রুশ বন্ধুদের সাথে কথা বলছিলাম। একটু পর ছেলেটি আবার এসে আমাকে বললো, “আপনাকে আম্মা ডেকেছেন।” আমি অবাক হয়ে বললাম, “আমাকে?” ছেলেটি বললো, “হ্যাঁ, আপনাকেই।” আমি ওর সাথে গেলাম।

বাইরে বেরিয়ে ছেলেটি বললো, “আজ ঈদ না? আপনিও তো মুসলমান। আম্মা আপনাকে দাওয়াত দিয়েছেন।” আমি ওর পিছনে পিছনে গেলাম। আমাদের হোস্টেলে দুইটা রুম আর একটা টয়লেট-বাথরুম নিয়ে এক একটা ব্লক হতো। এরকম দুইটা ব্লক নিয়ে বোধহয় ওদের পরিবার থাকতো, মানে একটা এ্যাপার্টমেন্টে থাকার মতই অবস্থা ছিলো ওদের। আমি ছেলেটির পিছনে পিছনে ওদের ব্লকটিতে ঢুকলাম। এই প্রথম আমি ওদের ঘরে ঢুকলাম। ভিতরে যে রুমটায় আমি বসলাম, সেটা বেশ সুন্দর আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো একটা ড্রয়িংরুমের মত। মেঝেতে ভারী কার্পেট বিছানো। দেখলাম, সোফা ও গদি দুইরকমের ব্যবস্থাই আছে। আমি ভনিতা না করে গদিতে আসন পেতে বসলাম। আপাতত আমি একাই ছিলাম। ভাবলাম ছেলেটির মা হয়তো আসবেন, ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে। কিন্তু না, মিনিট দশেক পরে যে এলো সে ফারজানা। লাল রঙের সুন্দর পোশাকে সজ্জিত ফারজানাকে সেদিন আরো বেশি সুন্দর লাগছিলো! তার হাতে ছিলো একটি ট্রে। সেখানে কিছু মিস্টান্ন ও বাহারী কাপে সুগন্ধী চা ছিলো। ট্রেটা রেখে ফারজানা বসলো না। আমি বললাম, “কেমন আছো ফারজানা?” ও মাথা নিচূ করে নীরবে কিছু বললো। মনে হলো লজ্জ্বা পাচ্ছে। তারপর চলে গেলো। আমি একা একাই মিষ্টান্ন খেলাম, চা খেলাম। বিদেশে থাকি, অনেকদিন পরে দেশী ঈদের একটা আমেজ পেলাম। মনে হলো বাংলাদেশের কোন বাড়ীতে যেন ঈদের দাওয়াতে গিয়েছি। কিছুক্ষণ পরে ফারজানা আবার এলো। মনে হলো যেন ট্রেটা নিতে এসেছে। আমি বললাম, “খাবার খুব সুস্বাদু হয়েছে ফারজানা। চাটাও মজার!” ফারজানা মাথা নীচু করে রইলো। মনে হলো লজ্জ্বায় যেন কথাই বলতে পারছে না! আমি ভাবলাম, একি! এই মেয়ে তো দুদিন আগেও কেমন স্মার্টলি কথা বললো। আজ ওর হলো টা কি? এমন সুন্দর একটা উৎসবের দিনে, ও এত লজ্জ্বা পাচ্ছে কেন?

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২১শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১২ টা ৪০ মিনিট

Afghan War: My memories – 6
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.