আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৮

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৮
———————————————————- রমিত আজাদ

কম্যুনিস্ট সমাজব্যবস্থটা শুরু থেকেই আমার পছন্দ হয়নি। তখন আমার বয়স খুবই কম ছিলো, একটা রাষ্ট্রীয় আর্থ-রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিচার করার মত অত জ্ঞান আমার ছিলো না। তারপরেও আমার মনে হতো যে, কম্যুনিস্ট সমাজব্যবস্থার মধ্যে প্রতারণ রয়েছে। তারা সমগ্র বিশ্ববাসীকে যেমন প্রতারণা করছে, নিজেরাই তেমনি প্রতারিত হচ্ছে। আমার মনে হতো যে, কোন একদিন তারা তাদের এই প্রতারণা টের পাবে। শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। ১৯৯০ সালের সামার পর্যন্ত মোটামুটি একরকম দেখলাম। তারপর কেমন যেন উসখুস অবস্থা শুরু হলো চতুর্দিকে। মনে হচ্ছে, চাপা কিছু একটা হচ্ছে, যে কোন সময় বিষ্ফোরণ ঘটবে। এর আগেই অবশ্য জর্জিয়া থেকে শুরু করে লাটভিয়া পর্যন্ত বেশ কিছু জাতীয়তাবাদী বিক্ষোভ ও সরকারী বাহিনী কর্তৃক তার নির্মম দমন-এর ঘটনা ঘটেছিলো। পূর্বে সোভিয়েতে রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান। কিন্তু ১৯৯০ সালের মার্চে সোভিয়েত রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি করা হলো। তারপর সারাদেশে যেকোন ক্ষুদ্র-বৃহৎ কেনাকাটায় রাস্ট্রপতি ট্যাক্স আরোপ করা হলো। এরপর হঠাৎ করেই ঘটলো ১৯৯১-এর আগষ্টের ব্যার্থ অভ্যুত্থান। সেখানেই পয়লা দফা পরাজয় ঘটেছিলো কট্টরপন্থী কম্যুনিস্টদের।
জয়ের আনন্দ নিয়ে বীরের বেশে পার্লামেন্টে প্রবেশ করেছিলেন দুই প্রেসিডেন্ট, সোভিয়েতের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভ ও রুশ ফেডারেশন-এর প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন। এই ঘটনা, এখানে আর বিস্তারিত লিখছি না। তারপর কেন জানি মনে হচ্ছিলো, সোভিয়েতের সবগুলো রিপাবলিক স্বাধীন হতে চাচ্ছে। এখানে একটা কথা বলে রাখি যে, বাংলাদেশে থাকতেই কম্যুনিস্টদের মিঠা কথার বইয়ে পড়েছিলাম যে, ইউএসএসআর-এর ১৫টি রিপাবলিকের সবগুলাই স্বাধীন-সার্বভৌম, তারা মন চাইলেই যেকোন সময়ে পরিপূর্ণ স্বাধীন হয়ে ইউনিয়ন ত্যাগ করতে পারবে। তবে কিনা, ইউএসএসআর এমন ভালোর ভালো যে, কোন রিপাবলিকই সেখান থেকে পৃথক হতে চায়না! পরে অবশ্য বুঝেছিলাম যে, জোর যার মুল্লুক তার। সোভিয়েত আর্মীর প্যাদানি দিয়েই ঐ পনেরোটি রিপাবলিক-কে একত্রিত করা হয়েছিলো, এবং এখনো ঐ ঠ্যাঙানিতেই তাদেরকে এক করে রাখা হয়েছে। আর সমগ্র দেশের মানুষকে বদ্ধ বা বন্দী করে রাখা হয়েছে ঐ টেরিটোরির মধ্যে, যাতে তারা বহির্জগত দেখতে না পারে। সেই মধ্যেযুগীয় ইউরোপের ডার্ক এইজ-এর মতন। অথবা ব্রাহ্মণশাসিত ভারতের মতন, যেখানে সাগর পাড়ি দেয়া ছিলো পাপ! কোন দেশ ও জাতির মানুষগুলোকে যখন জোর করে বা নানা কৌশলে (সেটা ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অনুশাসন হতে পারে) কোথাও বন্দী করে রাখা হয়, তাতে ঐ জাতির আত্মার টুটি চেপে ধরা হয়! বরং যখন কোন দেশ বা জাতিকে উন্মুক্ত করা হয়, তখনই সেই দেশে উন্নয়নের সুবাতাস বইতে শুরু করে, মানুষের আত্মিক ও মানসিক প্রসস্ততাও তৈরী হয়। যেমনটা আমাদের উপমহাদেশে ঘটেছিলো মোগল ও সুলতানী আমলে।

সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের অন্যতম ফলাফল হলো কম্যুনিস্ট সরকার আরোপিত লৌহ-যবনিকার উত্তোলন। যারা আফগানিস্তান গিয়েছিলো, তা সে সৈনিক হোক অথবা অন্য দায়িত্বে বা চাকুরীতে হোক; তারা সকলেই দেখেছিলো যে, সোভিয়েতের গতানুগতিক জীবনের বাইরে অন্যরকম জীবনও আছে! এতে করে তাদের মধ্যে একটা বোধের জন্ম হয়েছিলো! তারাই আবার সোভিয়েতে ফিরে এসে নিজ আত্মীয়-স্বজনদেরকে সেইসব কথা চুপিচুপি হলেও বলেছিলো! সারা দেশেই চাপা স্বরে শোনা যেত সেইসব গল্প।

‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে, কেমন করে ঘুরছে মানুষ, যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে! -‘কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী এই কবিতাটা আমাদের জাতির অন্যতম পথিকৃৎ। আমি আমার ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকে এই কবিতাটি পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। এখনকার পাঠ্যপুস্তকেও এই কবিতাটি আছে। সাধুবাদ জানাই আমাদের পলিসি মেকারদের। যুগযুগ যেন কারিকুলামে থাকে এই কবিতা! আমাদের জাতীয় কবি নিজে যেমন কোনদিন বদ্ধ ঘরে থাকেননি, আমাদের জাতিও যেন কোনদিন বদ্ধ ঘরে বন্দী হয়ে না যায়!

যাহোক, যা বলছিলাম, ১৯৯১ সালের কোন এক সামারে গিয়েছিলাম মস্কোতে। প্লেন থেকে নেমে এয়ারপোর্টে একটা ট্যাক্সিতে উঠলাম। একই গাড়ীতে উঠলেন একটি আর্মেনীয় দম্পতি। গাড়ীচালক ছিলেন একজন বৃদ্ধ রুশ। তিনি ঐ আর্মেনীয় দম্পতিকে রাজধানী ইয়েরেভানের বিষয়ে কোন একটা প্রশ্ন করলেন। আমি তাদেরকে প্রশ্ন করলাম, “কি বলেন, আপনাদের আর্মেনিয়া কি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আলাদা হতে যাচ্ছে?” আমার প্রশ্নটা শুনে আর্মেনীয় পুরুষটি বিব্রত হলেন। উনার ভাব দেখে মনে হলো, প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে চাচ্ছেন না। সম্ভবত খোদ মস্কোর বুকে দাঁড়িয়ে এমন প্রশ্নের জবাব দিতে তিনি দ্বিধা বোধ করছিলেন। কিন্তু উনার স্ত্রী কোন দ্বিধা না করেই হাসতে হাসতে বললেন, ” অবশ্যই। আমাদের আর্মেনিয়া আলাদা হয়ে স্বাধীন হবেই।” গাড়ীচালক রুশ বৃদ্ধটি চুপ হয়ে রইলেন। এবার আর্মেনীয় পুরুষটি মুখ খুললেন, বললেন, “আর্মেনীয়ার মানুষ পরিশ্রমী। আমরা স্বাধীন হলে নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারবো।”

শুনেছিলাম যে, ১৯৮৯ সালের জানুয়ারী মাসে ইরানের ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনী সোভিয়েত প্রধান মিখাইল গর্বাচভ-কে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মিখাইল গর্বাচভের সাহসি পদক্ষেপ ও সংস্কারের প্রসংশা করেন। পাশাপাশি তিনি এই ভবিষ্যদ্বানী ব্যাক্ত করেন যে, মার্ক্সিজম ও কম্যুনিজমের দিন ঘনিয়ে আসছে এবং তার পতন অবশ্যম্ভাবী। তিনি আরো বলেন যে, কিছুকাল পরে কম্যুনিজম-কে কেবল রাজনীতির মিউজিয়ামেই খুঁজে পাওয়া যাবে। (উল্লেখ্য যে আমাদের ভাষানী হুজুরও ১৯৭৬ সালে ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন যে কম্যুনিজম টিকবে আর বড় জোর পনেরো বৎসর)

এদিকে জন অসন্তোষ ক্রমশঃ বেড়েই চলছিলো। সর্বত্র একটা হাহাকার, একটা আস্ফালন, সবাই যেন চিৎকার করে বলছে, “মুক্তি চাই, মুক্তি চাই, এই বদ্ধতা থেকে পরিত্রাণ চাই।” এরপর আরো কিছু ঘটনা ঘটলো সোভিয়েতের রাজনৈতিক আকাশে। বোঝা যাচ্ছিলো যে, সোভিয়েত-কে আর টিকানো যাবে না। অবশেষে একদিন শুনলাম, সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পরিসমাপ্তি হয়েছে। জানলাম যে আজ রাতে মিখাইল গর্বাচভ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন, এটাই হবে সোভিয়েতের রাষ্ট্রপতি হিসাবে উনার শেষ ভাষন। এমন একটি ক্ষণ আমার জন্য ছিলো প্রতিক্ষিত। আমি মনেপ্রাণে এটাই চেয়েছিলাম যে, এই ভ্রান্ত ও প্রতারণামূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসান হোক। বিশ্ববাসী সত্যটা জানুক। আমি প্রবল আগ্রহ নিয়ে টেলিভিশনসেটের সামনে বসেছিলাম সেই রাতে, ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন বাগ্মী গর্বাচভের প্রাঞ্জল রুশ ভাষার বক্তৃতাটি আমার আজও মনে পড়ে। ১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর রাতে (ক্যাথলিক ক্রিসমাসের রাত্রী) জাতির উদ্দেশ্যে এক আনুষ্ঠানিক ভাষণ দিয়ে মিখাইল গর্বাচভ পদত্যাগ করেন, ও সেই সাথে মৃত্যু হয় প্রবল প্রতাপশালী সুপার পাওয়ার কম্যুনিস্ট ইউএসএসআর-এর।

সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ যে, এত বড় একটি ঘটনায় নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছিলো, সেটা আর নতুন করে বলার কিছু নাই।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৩শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১২ টা ৩৪ মিনিট

Afghan War: My memories – 8
—————————- Ramit Azad


মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.