আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৯

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ৯
———————————————————- রমিত আজাদ

লক্ষ লক্ষ সৈনিক, হাজার হাজার ট্যাংক, শতশত যুদ্ধ বিমান, কয়েক হাজার নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড, ব্যাপক বিধ্বংসী মারনাস্ত্র, সবকিছুই নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো! এতরকম রক্ষাব্যবস্থা ছিলো, তারপরেও কোন কিছুই কোন কাজে আসলো না! একটি ভাষণের মধ্যে দিয়েই বিলুপ্ত হলো প্রবল প্রতাপশালী এক সুপার পাওয়ার! সুস্থমস্তিষ্কের মানুষদের কাছে এটা প্রত্যাশিত হলেও বিস্ময়কর ছিলো নিঃসন্দেহে! এই বৃহদাকার রাষ্ট্র সম্পর্কে ছেলেবেলায় কি পড়লাম ও শুনলাম, আর এক জীবনেই চোখের সামনে কি দেখলাম!

বাস্তবিকই বলেছিলেন মিখাইল গর্বাচভ উনার ঐতিহাসিক বিদায় ভাষণে। There is plenty of everything: land, oil and gas, other natural riches, and God gave us lots of intelligence and talent, yet we lived much worse than developed countries and keep falling behind them more and more. (“কোন কিছুরই তো কমতি ছিলো না: জমি, তেল, গ্যাস, এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ, এবং সৃষ্টিকর্তা আমাদের মাঝে প্রচুর জ্ঞান এবং প্রতিভাও দিয়েছেন, তবুও আমরা উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক খারাপ জীবন যাপন করেছি এবং ক্রমশঃই তাদের চাইতে অনেক পিছিয়ে গিয়েছি।”) The reason could already be seen: the society was suffocating in the vise of the command-bureaucratic system, doomed to serve ideology and bear the terrible burden of the arms race. It had reached the limit of its possibilities. All attempts at partial reform, and there had been many, had suffered defeat, one after another. The country was losing perspective. We could not go on living like that. Everything had to be changed radically. (“কারণটি ইতিমধ্যে দেখাই যাচ্ছে: কমান্ড-আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ছোবলে সমাজ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল, মতাদর্শের সেবা করতে গিয়ে এবং অস্ত্রের প্রতিযোগিতার ভয়ঙ্কর বোঝা বহন করতে ব্যর্থ হয়েছিল রাষ্ট্র। এটি তার সম্ভাবনার প্রান্ত সীমাতে পৌঁছেছিল। আংশিক সংস্কারের সমস্ত প্রচেষ্টা, যা ছিলো অগণিত, সবই পরাজিত হয়েছিল, একের পর এক। দেশ হারাচ্ছিল তার প্রেক্ষিত । আমরা আর এভাবে জীবনযাপন করা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারলাম না। সবকিছুরই আমূল পরিবর্তন করতে হলো।”)

ইমাম খোমেনী পতনোন্মোখ কম্যুনিজম-এর বিকল্প হিসাবে ইসলামী দর্শন-কে প্রস্তাব করেছিলেন, গর্বাচভ-এর কাছে পাঠানো চিঠিতে। গর্বাচভ ব্যাক্তিগতভাবে ঐ প্রস্তাবনা নিয়ে কি ভেবেছিলেন আমি জানি না। তবে বাস্তবে কম্যুনিজম-এর বিকল্প হিসাবে এসেছিলো জাতীয়তাবাদ। কোন একভাবে জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের কাছেই পরাজিত হয়েছিলো ‘সমাজতন্ত্র’।

জানিনা, মেইড অথবা প্ল্যানড গেইম ছিলো কিনা! না থাকার কথাও না। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের আগে আগে আমি বিভিন্ন জায়গায় জাতীয়তাবাদের নানাবিধ গন্ধ পাচ্ছিলাম। শুরুতেই জর্জিয়া প্রজাতন্ত্রে সেটা ভালোভাবে টের পেয়েছিলাম। শোনা যায় যে ১৯৮৯ সালের ৯ই মে যখন সোভিয়েত সৈন্যরা বিক্ষোভরত জর্জিয়ানদেরকে গুলি করে হত্যা করেছিলো, তখনই চতুর্দিকে শোর উঠেছিলো যে, রুশীরা আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে হত্যা করেছে! আমার একজন শিক্ষিকা বলেছিলেন, “সবাই রুশী সৈন্য, রুশী সৈন্য কেন বলছে? ওটা তো সোভিয়েত সৈন্য ছিলো। ওখানে শুধু রুশীরা নয়, এই সোভিয়েতের সব জাতির সৈন্যরাই উপস্থিত ছিলো।” ম্যাডামের কথাটির মধ্য আমি অকাট্য যুক্তি খুঁজে পেয়েছিলাম। কিন্তু লোকমুখে রুশীদের প্রতিই ঘৃণা ক্রমশঃ তীব্রতর হচ্ছিলো। ইউক্রেণে গিয়েও দেখলাম যে সর্বত্র ইউক্রেণীয় জাতীয়তাবাদের ঢেউ উঠেছে। তবে খারকোভে আমার এক রুশ বন্ধু আমাকে বোঝাচ্ছিলো যে অন্যরা যেমন যার যার জাতীয়তাবাদের কথা বলছে, তেমনি রুশদেরকেও তাদের জাতীয়তাবাদ-কে চাঙা করতে হবে। সোভিয়েত বাতিল, সোভিয়েত মতাদর্শ আর রুশ জাতীয়তাবাদ এক নয়! আমি সেদিন ওর কথা শুনে অবাক হয়েছিলাম, এই ভেবে যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বত্র তো এই রুশীরাই, সোভিয়েত সরকারও তো কার্যত তাদেরই নিয়ন্ত্রনেই। সোভিয়েতের রাজধানীও তো সেই মস্কোতেই যেটা কিনা মূলত রাশিয়ার প্রাচীন ও বর্তমান রাজধানী। রাষ্ট্রভাষাও তো রুশ ভাষা। তাহলে সোভিয়েত আর রাশিয়ায় পার্থক্য কি?

তবে আমার মধ্যে একটা ভিন্ন অনুভূতি বা পূর্বাভাস কাজ করছিলো যখন ১৯৯১ সালের সামারে আমি একটা আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলা দেখতে (সোভিয়েত বনাম সাইপ্রাস) মস্কোর অলিম্পিক স্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম। হঠাৎ ফুটবল স্টেডিয়ামে আমি ‘রাশিয়া’ ‘রাশিয়া’ ধ্বনি শুনতে শুরু করলাম। ভাবলাম, কি ব্যাপার খেলছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, অথচ এই লোকগুলো রাশিয়া, রাশিয়া করছে কেন? বোঝা যাচ্ছিলো যে রুশ জাতীয়তাবাদের উত্থান হচ্ছে! জনবহুল স্টেডিয়ামে গিয়ে রাজনৈতিক শ্লোগান দেয়াটা অনেক পুরাতন একটা রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি!

পাশাপাশি আরও একটি বিষয় ছিলো সেটা হলো ‘গণতন্ত্র’। কম্যুনিস্ট মতাদর্শে গণতন্ত্র-কে অস্বীকার করা হয়। অথবা পাশ কাটানো হয়। অথবা ‘গণতন্ত্র’-এর নিজস্ব সংজ্ঞায়ন করা হয়। যেমন, কম্যুনিস্টরা বলে, ” আমরা প্রলেটারিয়েট’স ডিক্টেটরশীপে বিশ্বাসী। ধনিক শ্রেনীর কোন স্থান আমাদের রাজ্যে নেই। তাই আমাদের ‘গণতন্ত্র’ হলো ‘শ্রমিক শ্রেণীর গণতন্ত্র” ইত্যাদি, ইত্যাদি। তবে, যাদের কম্যুনিজম ও গণতন্ত্র কোনটা সম্পর্কেই ট্রান্সপারেন্ট আইডিয়া নাই, তারা এই সকল চটকদার কথা শুনে চমৎকৃত হলেও, বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। ‘গণতন্ত্র’ ও ‘কম্যুনিজম’, এবং কিভাবে গণতান্ত্রিক মতাদর্শের কাছে কম্যুনিজম পরাজিত হয়েছিলো এই বিষয়ে আমি পরবর্তি পর্বে লিখবো।

আপাতত বলে রাখি যে, সোভিয়েত পার্লামেন্টে এমনকি ‘পলিট ব্যুরো’-ও আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্য প্রেরণের বিপক্ষে ভোট বা মত দিয়েছিলো, কিন্তু তারপরেও আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্য প্রেরণ করা হয়। কেন? কারণ হলো গণতন্ত্র-এর অভাব। একটি দেশে গণতন্ত্র না থাকলে সেই দেশের মালিক যেই জনগণ, তাদের মতামতকেই নির্লজ্জভাবে অগ্রাহ্য করা হয়। আর এর চরম মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় দেশের জনগণ-কেই।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৩শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত০৮ টা ৩৯ মিনিট

Afghan War: My memories – 9
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.