আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১
———————————————————- রমিত আজাদ

“রাশিয়ান-রা আফগানিস্তান আক্রমণ করেছে।” আমার শ্রদ্ধেয় বড় বোন বলেছিলেন কথাগুলো, ১৯৭৯ সালে। এই ছিলো আফগানিস্তান যুদ্ধ সম্পর্কে আমার শোনা, জীবনে প্রথম কথা। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ের মেধাবী ছাত্রী। উনার এই বিষয়ে এ্যাকাডেমিক আগ্রহও ছিলো। তবে কি ঐ সময়ে মাত্র নয় বৎসর বয়সে আমি উনাদের কথার কিছুই বুঝতাম না।

ছাড়া ছাড়াভাবে কিছু পরিভাষা শুনতাম, সোভিয়েত, কম্যুনিস্ট, রাশিয়া, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, আমেরিকা, আফগানিস্তান, মুজাহিদ, ইত্যাদি। মুরুব্বীরা কখনো বলতেন রাশিয়ার সাথে আফগানিস্তানের যুদ্ধ হচ্ছে, আবার কখনো বলতেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আফগানিস্তানের যুদ্ধ হচ্ছে। রাশিয়া কি? আর সোভিয়েত ইউনিয়ন কি? এই প্যাঁচটা তখন বুঝতাম না।

সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাংলাদেশের ছাত্রসমাজে সমাজতান্ত্রীক ভাবধারার একটা প্রভাব ছিলো। বুঝে অথবা না-বুঝে বেশীরভাগ বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রিই মনে করতো যে দেশে সমাজতান্ত্রীক সরকার কায়েম হলে খুব মজা হবে। এর পিছনে দেশের বুদ্ধিজীবিদের একাংশের প্রবল দৌড়ঝাঁপ ছিলো!

তবে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের বিষয়ে আবার এই ছাত্রসমাজ এমনকি ঐ সকল বুদ্ধিজীবিদেরকেও বেশ বিব্রত দেখতাম! দু’একজনকে বলতে শুনেছি যে, “সোভিয়েতের মত মহান দেশ এই কাজটা ভালো করে নাই।”

অল্প বয়সে যেগুলো মনে গাঁথে সেগুলো খুব সহজে মন থেকে দূর হয় না! ঘটনাক্রমে নানা সময়ে কিছু বড় ভাইদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিলো আমার কিশোর বয়সে। তারা প্রায় সকলেই ছিলেন বামপন্থী। বাংলাদেশে ‘৭২ সাল থেকেই বামপন্থী বনাম অ-বামপন্থী একটা কনফ্লিক্ট লেগেই ছিলো। একটা শাসনকালে দেশের বামপন্থীরা খুব নির্যাতিত ছিলো। সেই বড় ভাইয়েরা খুব দুঃখের সাথে সেই সময়টা স্মরণ করতেন।

আমার এক বড়ভাই কট্টরভাবে কম্যুনিস্ট মতাদর্শের সমর্থক ছিলেন। অবশ্য উনার বয়সও তখন কম ছিলো, এইচএসসি পাশ করেছিলেন মাত্র। তিনি আমাকে সমাজতন্ত্রের উপকারীতা বোঝাতেন। অতীব ভালোমানুষ এই ভাইটির আমি বিশেষ ভক্ত ছিলাম, তাই উনার কথা বিশ্বাস করতাম। তিনি আমাকে কিছু সোভিয়েত বই পড়তে দিয়েছিলেন। তার মধ্যে সাহিত্যের বইগুলো আমি মনযোগ দিয়ে পড়তাম। সেই প্রথম পরিচিত হয়েছিলাম ম্যাক্সিম গোর্কী ও অন্যান্য লেখকদের সাথে। সবচাইতে চমৎকৃত হয়েছিলাম ‘রুশ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়ে! (বাংলাদেশে তখনও সাহিত্যাঙ্গনে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখা শুরু হয়নি)। তবে পারিবারিক লাইব্রেরীতে রাখা ‘রুশদেশের উপকথা’ ও লেভ তলস্তয়-এর ছোটগল্প অনেক আগেই পড়েছিলাম। আমার সেই বড়ভাইকেও দেখতাম যে, আফগান যুদ্ধ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনিও বিব্রত হতেন।

একবার দৈনিক পত্রিকায় একটা সংবাদ পড়লাম যে, গতকাল মাঝরাতে ঢাকার রাস্তায় দুই বিদেশীর মধ্যে মারামারি হয়েছিলো। তাদের একজন পুলিশ ও জনতার কাছে নিজেকে আফগানী বলে পরিচয় দিয়েছিলো। বড়ভাই-এর কাছে জানতে চাইলাম, তিনি নিজেকে আফগানী বলে পরিচয় দিলেন কেন? উত্তরে বড় ভাই বললেন, “বাংলাদেশে আফগানীদের প্রতি সিমপ্যাথী রয়েছে, তাই সে নিজের জাতিগত পরিচয়টা আগে দিলো!”

তারপর কিশোর বয়সে (১৯৮৩/৮৪ সাল) কোন এক বাংলা উপন্যাস পড়লাম যেখানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার কয়েক বছর পরের সময়কাল চিত্রিত হয়েছে। সেখানে দেখানো হচ্ছে যে বিদেশের মাটিতে কোথাও কোন এক আফগানী-র সাথে একজন বাঙালীর দেখা হয়েছে। সেই বাঙালী, উক্ত আফগানী-কে বলছেন, “আমাদের ভারত উপমহাদেশকে রুশ-দের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য রয়েছেন আপনারা। রুশীরা ভারত উপমহাদেশ দখল করতে চাইলে, আফগানিস্তানের উপর দিয়েই আসতে হবে। তাই প্রথম তারা আপনাদের বাধার মুখে পড়বে। আপনারা দুর্ধর্ষ জাতি, আপনাদের সাথে পেরে উঠবে না! রুশীদের ঠেকানোর জন্য আপনারা আমাদের সেইফগার্ড! রুশীদের ঠেকানোর জন্য আপনারা আছেন। তাই এই ধরনের যেকোন কনফ্লিক্টে আমরা সবসময়ই আপনাদের সাহায্য করে যাবো।”

উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে বলা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সেদিন আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিলো। আমার মাথায় স্ট্রাইক করেছিলো, রাজনৈতিক মতাদর্শের পপুলারিটি, প্রভাব, ক্ষমতার রদবদল, ইত্যাদির পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু ভূগোলতো কখনো পাল্টাবে না! রুশ সাম্রাজ্য ও ভারত উপমহাদেশ এই দুইয়ের মাঝখানে, আফগানিস্তান তো চিরকালই থাকবে!

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১৭ই আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: সকাল ১১টা ৩০ মিনিট

Afghan War: My memories – 1
———————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.