আবীরে অভিসার মম – ১

আবীরে অভিসার মম – ১
———————————– রমিত আজাদ

শারমিন-কে প্রথম দেখেছিলাম বিদেশের মাটিতে।
ইউনিভার্সিটির ক্যাফেতে। এই ক্যাফেতে দিনের একটা সময় বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের আড্ডা বসে। আড্ডা হয় জমজমাট, কখনো রাজনীতি, কখনো সাহিত্য, কখনো বা সায়েন্স-এর সিরিয়াস আলাপ। যদি কোন বাংলাদেশী ছাত্রী আসরে না থাকে, তখন আশেপাশে থাকা ঐ দেশীয় স্বল্পবসনা রূপসী তরুণীদের দৈহিক রূপ-সৌন্দর্য্য নিয়েও আলাপ-সালাপ হয়। আদতে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইভেন বিদেশেই বাংলাদেশী ছাত্রীদের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল! পার্সেন্টেজের হিসাবে টেনেটুনে তিন পার্সেন্ট হতে পারে। প্রগতিশীল পিতামাতার খুব সাহসী কন্যারাই কেবল বিদেশে পড়তে যায়। আবার আমাদের এক বন্ধু খেদ-কৌতুক করে বলতো, “আরে ধুর কিসের প্রগতিশীল! মাইয়া অসুন্দর হইলে বাপ-মায় এই দেশে পড়তে পাঠাইয়া দেয়, যাতে এইখান থেইকা একটা কোয়ালিফাইড জামাই জোগাড় করতে পারে!” ওর কথা শুনে আমরা মাথা নেড়ে হাসতাম। আসলে, এই দেশীয় মেয়েদের সাথে তুলনা করা যাবে না, ওরা সব আগুন সুন্দরী! আর এই রূপসী বিদেশিনীরা বান্ধবী হিসাবে সহজলভ্য বলে, বাঙালী ছেলেরা তাদের নিয়েই ব্যাস্ত থাকতো বেশি। স্বদেশী ললনাদের চুজ করে ধন্য হওয়ার প্রবণতা খুব একটা ছিলো না।

কোন এক সামারের বিকালে ক্যাফেতে ঢুকে দেখলাম, বাংলাদেশী ছাত্রদের প্রায় কেউই নাই। শুধু খালেক ভাই বসা, উনার সাথে একটা অপরিচিত বাংলাদেশী মেয়ে বসে আছে। আমি একটু সংকোচ নিয়ে ওখানে গিয়ে বসলাম। খালেক ভাই একগাল হেসে বললেন, “এই যে আসিফ এসো। পরিচয় করিয়ে দেই। এই হলো শারমিন, আর এই হলো আসিফ।”

আমি: ঠিক চিনতে পারলাম না তো?
খালেক ভাই: আমার কাজিন। এই ইউনিভার্সিটিতে ফিফথ ইয়ারে পড়ে।
আমি: জ্বী, কি বললেন? এই ইউনিভার্সিটিতে? ফিফথ ইয়ারে পড়ে? আর আমি এতকাল দেখলামই না!
খালেক ভাই রহস্য করে হাসলেন।
খালেক ভাই: জানতাম তুমি এই প্রশ্ন করবা। সায়েন্টিস্ট মানুষ, মাথা ভরা শুধু প্রশ্ন!
আমি: না, মানে। উনাকে তো কখনো দেখি নাই আগে।
খালেক ভাই: আরে ‘উনাকে’ না ‘ওকে’। তোমার ছোট তো।
আমি: হুম!
আমরা কথাই বলে যাচ্ছি। মেয়েটি কিন্তু চুপ করেই আছে।
খালেক ভাই: আসলে ও ছিলো অন্য শহরে। ব্যাচেলর ডিগ্রী কমপ্লিট করলো সেখানে। ব্যাস, মাস্টার্স-এ ওকে এখানে নিয়ে এলাম।
আমি: স্কলারশীপ না কি সেলফ ফাইনান্স?
খালেক ভাই: আপাতত সেলফ ফাইনান্স-এই ভর্তি করিয়েছি। দেখি, স্কলারশীপ করানো যায় কিনা!

এরপর, খালেক ভাই উঠে কাউন্টারে কফি আনতে গেলেন।

এবার আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। সংকোচ না করেই বলছি। শারমিনকে আমার পছন্দ হয় নি। একেবারেই আটপৌরে একটা বাঙালী মেয়ের মত দেখতে-শুনতে। এতগুলো বছর বিদেশে আছে, কোন জৌলুস-ই নেই! গায়ের রঙ ফর্সা নয়, শ্যামলা বলা যাবে হয়তো। গড়নে ছোট-খাট, হাইট কম, পাঁচ ফুটের একটু বেশি হবে। স্লিম ফিগার। দেহের বিশেষ ঢেউগুলোতে স্ফিতি নাই কোন! মেকআপ ভালো করতে পারে না। উচ্ছল নয়, চুপচাপ মনে হলো। এটাকে আনস্মার্টও বলা যেতে পারে। সন্দেহ হলো, খুব সম্ভবত ঢাকার নয়, মফস্বলের মেয়ে।

আমি: কি নাম যেন?
শারমিন: শারমিন শিকদার।
আমি: ও, আমি আসিফ।
শারমিন: জ্বী।
আমি: তুমি বাংলাদেশে কোথায় থাকো?
শারমিন: নাটোরে।
আমি যা সন্দেহ করেছিলাম ঠিক তাই। মফস্বলের মেয়ে। নাটোর শুনলেই ‘বনলতা সেন’ কবিতার কথা মনে পড়ে। শারমিন-কে মোটেও কল্পনার ‘বনলতা সেন’-এর সাথে তুলনা করা যাবে না। মুখ তার মোটেও শ্রাবস্তির কারুকার্য নয়! একেবারেই সাদা-মাটা! মেয়েটা মাঝে মাঝে নীচ দিকে তাকাচ্ছে। তাতে তাকে মুখচোরা বলে মনে হলো।
আমি: আমি এখানে পিএইচডি করছি।
শারমিন: কোন সাবজেক্ট?
আমি: ফিজিক্স।
শারমিন: ও।

অন্য কেউ হলে হৈ চৈ করে বলতো, “ও বাবা, এত কঠিন সাবজেক্ট! পড়েন কিভাবে?” ইত্যাদি, ইত্যাদি। শারমিন শুধু আস্তে করে ‘ও’ বললো। বুঝলাম, মেয়েটা একেবারেই মুখচোরা!

আমি: তুমি কোন সাবজেক্টে পড়ছো?
শারমিন: পলিটোলজি।

এটাও আমার পছন্দ হলো না। আর্টস-এর ছাত্রী। তার মানে মাথায় ঘিলু কম! তাছাড়া ‘পলিটোলজি’ পড়তে বিদেশে আসার দরকার কি? তার মানে ঐ-ই হয়তো, বাবা-মা বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে, যাতে এখানে কোয়ালিফাইড একটা জামাই যোগাড় করতে পারে। ওর প্রতি আমি আর কোন আগ্রহ অনুভব করলাম না।

খালেক ভাই তিনকাপ কফি নিয়ে এসে টেবিলে বসলেন।


এরপর শারমিনকে ক্যাম্পাসে এখানে ওখানে অনেকবার দেখেছি। কিন্তু তেমন আলাপ-সালাপ করি নাই কখনো। আসলে কোন আকর্ষণ-ই অনুভব করি নাই। এদিকে খালেক ভাইকে দেখতাম আমাকে দেখলেই বারবার শারমিন-এর প্রসঙ্গ টেনে কথা বলতেন, “বুঝলে, ওর বাবা-মা আমাকে বলেছিলো, শারমিন-এর বিদেশে লেখাপড়া করার খুবই সখ। ওকে একটু বাইরে পড়ার ব্যবস্থা করে দাও।” তা নিজের কাজিন ব্যবস্থা না করি কিভাবে। তখন অন্য শহরে ভর্তির ব্যবস্থা হলো। যাহোক, সফলভাবে ব্যাচেলর ডিগ্রীটাতো পাশ করেছে, এরপর এখন রাজধানীতে নিয়ে এলাম। আশা করি ভালো করবে। তারপর দেশে ফিরে একটা চাকরি-বাকরির ব্যবস্থা তো হবেই।” আমি এই প্রসঙ্গে উনার সাথে কথা না বাড়িয়ে হু হা করতাম শুধু।

মাস দুইয়েক পরে, একটা বাংলাদেশী অনুষ্ঠানের আয়োজন হলো। বেশ সরগরম অবস্থা ক্যাম্পাসে। সবাই অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যাস্ত। আয়োজক-রা আমাকে এসে ধরলো, “আপনাকে কিন্তু অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেই হবে।” আমি বললাম, “ওকে, করবো। তা সাথে কে থাকবে?” সেলিম বলে, “কে আবার, মিতা থাকবে। সব সময় তো ও-ই আপনার সাথে উপস্থাপনা করে।” আমি বললাম, “ওকে। মিতা ইজ ওকে।”

অনুষ্ঠানের দু’দিন আগে খালেক ভাই আমার রুমে আসলেন। বলেন,
খালেক ভাই: এই তুমি নাকি এই অনুষ্ঠানে একটা স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করবে?
আমি: জ্বী, সেরকমই প্লান আছে।
খালেক ভাই: দাও তোমার কবিতাটার কপি দাও।
আমি: (বিস্মিত হয়ে) কপি দিয়ে আপনি কি করবেন?
খালেক ভাই: আরে দাওনা। মনে করো, তোমার বাংলা কবিতাটার যদি একটা এই দেশীয় ভাষার অনুবাদ সাথে হয়, দারুণ হবে না?
আমি: জ্বী, ঠিক বুঝলাম না।
খালেক ভাই: আরে। তুমি বাংলায় কবিতাটা আবৃত্তি করলা। তারপর কেউ একজন সেটা স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে দিলো। বেশ হবে না?
আমি: (একটু চিন্তা করে) ডিপেন্ডস! অনুবাদ-টা যদি ভালো হয়। আর যে অনুবাদ পড়বে, সে যদি ভালোভাবে পাঠ করতে পারে। তাহলে তো ভালোই হয়। কিন্তু, যদি অনুবাদ ও পাঠ ভালো না হয়, তাহলে কিন্তু ফ্লপ যাবে!
খালেক ভাই: আরে সেই নিয়ে ভেবো না। আমি ব্যবস্থা করেছি। সে জন্যই তো কবিতাটা চাইছি।
আমি: কি ব্যবস্থা?
খালেক ভাই: অভিজিৎ-কে তো চেনো? ঐ যে কোলকাতার অভিজিৎ।
আমি: হু দেখেছি। ফাজিল একটা! আমাকে প্রথম দেখায়-ই তুমি করে বললো, অথচ আমি ওর সিনিয়র!
খালেক ভাই: আরে না। ও ভাব দেখিয়ে ওরকম করে নাই। কোলকাতাওয়ালারা, একে-ওকে এম্নিতেই তুমি করে বলে।
আমি: সে যাক! তারপর?
খালেক ভাই: অভিজিৎ-তো লিঙ্গুয়েস্টিকস-এর উপর লেখাপড়া করে। ও ভালো অনুবাদ করতে পারবে।
আমি: বুঝলাম। তা পাঠ কে করবে?
খালেক ভাই: কে আবার? শারমিন পাঠ করবে।
নাম শুনেই আমি ঘাবড়ে গেলাম।
খালেক ভাই: ওকে বলে রেখেছি। একটু পরেই তোমার রুমে আসবে। তুমি একটু চা বসাও।
আমি এখন পড়লাম ফাঁপড়ে! শারমিন-কে আমার রুমেই নিয়ে আসছে!
এরই মধ্যে দরজায় নক করার শব্দ পেলাম। খালেক ভাই-ই উঠে দরজা খুলে দিলো, “আরে আসো শারমিন আসো। তোমার জন্যই তো আমরা অপেক্ষা করছি।”
শারমিন ধীর ও লাজুক পায়ে ভিতরে ঢুকলো।
শারমিন: (মৃদু কন্ঠে) স্লামালাইকুম।
আমি: ওয়ালাইকুম সালাম। বসো।

ও একটা চেয়ারে চুপচাপ বসলো।
আমি তিনকাপ চা ও বিস্কুট ফোল্ডিং টেবিলের উপর রাখলাম।

খালেক ভাই: কি শারমিন পারবে না, পাঠ করতে?
আমি শারমিন-এর দিকে তাকালাম। শারমিন, কোন কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ালো।

আমি একটু ভালো করে ওকে দেখলাম। বাঙালী পোষাক সালোয়ার-কামিজ পড়েছে। তেমন ফ্যাশনেবল না। শ্যামলা আটপৌরে মুখে মেকআপ খুব হালকা। ঠোটে লাল রঙ মেখেছে খুব কড়া করে! এটা মফস্বলি সাজ! আমার ওকে আবারো ভালো লাগলো না। মনে মনে ভাবলাম, খালেক ভাইয়ের মতলব-টা কি?

রচনাতারিখ: ২৮শে জুলাই, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১২টা ৪৭ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.