আবীরে অভিসার মম – ৪

আবীরে অভিসার মম – ৪
———————————– রমিত আজাদ

সাঁজগোজ একটা মেয়েকে পাল্টে ফেলে। রাশিয়ান একটা সিনেমায় দেখেছিলাম যে, এক নারী সে কোন সাঁজগোজ না করে আটপৌরে পোশাক পড়ে চলাফেরা করতো। তখন তাকে দেখতে অনেকটা পুরুষালী লাগতো; আকর্ষণীয়া দেখানোর তো প্রশ্নই ওঠেনা। আবার সেই একই নারী যখন সাঁজগোজ করতে শুরু করলো, মানানসই পোশাক-আশাক পড়তে শুরু করলো, তখন তাকেই ভীষণ আকর্ষণীয়া মনে হতে লাগলো। আমি মাঝে মাঝে ভাবি শারমিনের সাথে কি এরকম কিছু ঘটেছে? প্রথমদিকে যখন আমি ওকে দেখেছিলাম, তখন হয়তো ও নিজেকে গুটিয়ে রাখতো; মানানসই সাঁজপোশাক করতে জানতো না, বা পারতো না। আবার ভাবি, নাকি এটা আমার চোখ? আমার চোখ দু’টি হয়তো আগে তাকে একভাবে দেখেছে, এখন তাকে আরেকভাবে দেখছে! যেমন ছোটবেলায় কচুরীপানার ফুলকে আমার তেমন সুন্দর কিছু মনে হয় নাই। পরবর্তি জীবনে একবার ময়মনসিংহের এক গ্রামে দেখলাম পুকুর ভরা কচুরীপানার ফুল। ঠিক ঐ মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিলো যে, এ এক অবর্ণনীয় স্বর্গীয় সৌন্দর্য্য!

আগস্ট মাসের কোন এক বিকালে শারমিন ও খালেক ভাই আমার রুমে আসলেন।
খালেক ভাই: বিদায় নিতে আসলাম ভাই।
আমি: কবে দেশে যাচ্ছেন?
খালেক ভাই: আগামী পরশু দিনের ফ্লাইটে।
আমি: ও আচ্ছা। বসেন একসাথে একটু চা-নাস্তা খাই।
খালেক ভাই: বানাও চা। এটাই হয়তো তোমার হাতে বানানো শেষ চা খাওয়া হবে।
শারমিন: এটা কি বলছেন ভাইয়া? শেষ চা খাওয়া হবে কেন?
আমি: তাই তো! আমাদের কি এই জীবনে আর দেখা হবে না নাকি?
খালেক ভাই: না মানে, আমি এই দেশের কথা বলছিলাম, আরকি।
আমি: ও আচ্ছা। আমিও তো সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ফিরবো। ওখানে গেলে দেখা হবে আশা করি।
শারমিন: জ্বী, নিশ্চয়ই হবে।
আমি: বাই দ্যা ওয়ে। আপনার ঢাকার ঠিকানাটা দিন তো।
এবার খালেক ভাইয়ের মুখটা কালো হলো।
খালেক ভাই: ভাইরে আমরা তো আর তোমার মত ঢাকার বাসিন্দা নই। মফস্বলের মানুষ। এখন ঢাকায় গেলে বাড়ী-টাড়ী ভাড়া করতে হবে। তুমিই বরং তোমার বাসার ঠিকানা দাও। আমি যোগাযোগ করবো নে।
আমি উনাদেরকে আমার বাসার ঠিকানা ও টেলিফোন নাম্বার দিলাম।

খালেক ভাই: আমি অবশ্যই যোগাযোগ করবো।

সেপ্টেম্বরের কোন এক বিকালে আমার দেশে যাওয়ার ফ্লাইট ঠিক হয়ে গেলো। আমি সবকিছু গোছগাছ করে নিলাম। এরমধ্যে পরিচিতরা মাঝে মাঝে আসতো বিদায় নিতে। ফ্লাইটের আগের দিনে ব্যবসায়ী আলম এলেন আমার রুমে। তিনি বয়সে আমার চাইতে কিছু ছোট হবেন। এই দেশী মেয়ে বিয়ে করে এখানেই থেকে গেছেন। ব্যবসা করছেন।

আলম: ভাইজান, দেশে চলে যাচ্ছেন? কাল আপনার ফ্লাইট?
আমি: জ্বী, আপনি কি করে জানলেন?
আলম: শুনলাম, বাঙালীদের কাছ থেকে।
আমি: ও আচ্ছা।
আলম: এখান থেকে এয়ারপোর্ট যাবেন কি করে?
আমি: একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে নিবো।
আলম: ট্যাক্সি ভাড়া করা লাগবে না। আমি দিবো গাড়ী।
আমি: জ্বী, মানে?
আলম: মানে, আমি আমার গাড়ীতে করে আপনাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেব।
আমি: জ্বী, আমি এতটা আশা করি নাই। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

পরদিন আলম সত্যি সত্যিই এলেন। নিজে গাড়ী চালিয়ে আমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিলেন। শুধু পৌঁছে দেয়াই নয়, শেষ পর্যন্ত আমার সাথে ছিলেন। ইমিগ্রেশনে প্রবেশের আগে আমি উনাকে প্রশ্ন করলাম, “এই শেষ দিনে আপনি আমার জন্য অনেক কিছু করলেন! এতটা কেন করলেন?” তিনি উত্তরে বললেন, “আমি বোকা নই। কিছুটা বুদ্ধি মাথায় আছে। আমার মন বলে আপনি এক সময় নামী-দামী মানুষ হবেন। সেদিন যদি কোন প্রয়োজনে আপনার কাছে যাই, ফিরিয়ে দেবেন না যেন!”
উনার কথা শুনে আমি হেসে ফেললাম। উনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিলাম।

প্লেনটি যখন মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে গেলো, তখন আমি উপর থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এতগুলি বছর যেই দেশটিতে কাটলো, সেই দেশের মাটির সাথে সম্পর্ক আপাততঃ শেষ।”


দেশে ফিরলাম অনেকগুলো বছর পরে। তাই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, এর-ওর সাথে দেখা সাক্ষাৎ ও দাওয়াত খেতে খেতে বাতাসের মত কেটে গেলো বেশ কিছুদিন। বিদেশের কথা একেবারে ভুলেই গেলাম। সেটা আবার মনে করিয়ে দিলো, একটা টেলিফোন কল।

আমি: হ্যালো, কে বলছেন?
: আরে চিনতে পারছো না?
আমি: একটু নামটা বলতে হবে, কাইন্ডলি।
: আমি তোমার খালেক ভাই।
আমি: কোন খালেক ভাই?

পরিবেশ পাল্টে গেলে অনেক সময় চেনা মানুষকেও অচেনা মনে হয়!
: ওমা! দেশে এসে আমাদেরকে ভুলেই গেলে? আরে আমি আমি খালেএএএক ভাই। তোমার আগের মাসে দেশে ফিরলাম।
আমি এবার বুঝতে পারলাম কে। একটু লজ্জ্বাই পেলাম!
আমি: সরি খালেক ভাই। পরিবেশ পাল্টে গেছে তো, হঠাৎ রিকোগনাইজ করতে সমস্যা হয়েছে। রিয়েলী সরি। তারপর বলেন।
খালেক ভাই: বলাবলির কিছু নাই। বাসায় চলে আসো সরাসরি। ওখানেই কথা হবে।
আমি: গুড। ঠিকানা দেন।
খালেক ভাই: লেখো, ককক, মহাখালী, ঢাকা। আমার বাসায় কোন টেলিফোন নাই। অফিসের ফোন নাম্বারটা লেখ।
আমি: মহাখালীতে বাসা ভাড়া নিয়েছেন? বেশ তো ভালো-ই হলো। আমি গুলশানে থাকি। আমার বাসা থেকে কাছেই হলো।
খালেক ভাই: হ্যাঁ, ফিজিকালি পাশাপাশি এলাকা। তবে মেন্টালি বহুদূর!

এই নিয়ে আমি আর খালেক ভাইয়ের সাথে কথা বাড়ালাম না। ঠিক হলো আগামীকাল বিকালে আমি উনার বাসায় যাবো।

পরদিন খুঁজেপেতে গেলাম খালেক ভাইয়ের বাসায়। মহাখালীর একটু ভিতরের দিকে একটা গলির ভিতরে একটা বিল্ডিং। চারতলা হবে বোধহয়। কোন লিফট নাই। সরু সিঁড়ি দিয়ে হেটে আমি তিনতলায় উঠলাম। একটা দরজায় কলিংবেল টিপলাম। দরজা খোলার পর যাকে দেখলাম, সে শারমিন। ঘরের সাদাসিদা পোষাকে দাঁড়িয়ে থাকা শারমিন, আমাকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। আমিও ওকে দেখে হাসলাম। পড়নের কাপড় আটপৌরে, তবে সামান্য প্রসাধন করেছে হয়তো! তারপর দেখলাম না, কিছুই করে নাই। সেই শ্যামবর্ণ শারমিন! জাস্ট চোখে কাজল দেয়া।

শারমিন: আসুন। ভিতরে আসুন।
আমি ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললাম, “খালেক ভাই কোথায়?”
শারমিন: আছে। জাস্ট বাইরে গেলো। এক্ষুনি চলে আসবে। ভাবী ভিতরে আছেন।
আমি ভিতরে বাচ্চার কান্নার শব্দ পেলাম। শারমিন বললো, “জ্বী, খালেক ভাইয়ের ছেলে।”
আমি: ও আচ্ছা।
শারমিন: বসেন।
আমি রুমটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছু নাই। কোন সোফাসেট, টি-টেবল কিছুই নাই, জাস্ট কয়েকটা চেয়ার পাতা। আমি তার একটায় বসলাম। শারমিন আমার উল্টা দিকে একটা চেয়ারে বসলো।
আমি: কেমন আছো?
শারমিন: ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

আমি জবাব দেয়ার আগেই কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রবল হাসি দিয়ে হুল্লোড় করে উঠলেন খালেক ভাই, “ওরে বাব্বা ডক্টর সাহেব এসেছেন আমাদের বাড়ীতে, তাও আবার গুলশান থেকে! ফাহমিদা, আসো দেখে যাও, কে এসেছে।”

আমি: আরে অত ব্যস্ত হবেন না, খালেক ভাই। তাছাড়া ভাবী তো বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত আছেন।
খালেক ভাই: আরে কোন ব্যস্ত না। তুমি আমাদের ঘরের মানুষ। আসতো।
আমাকে হাত টানতে টানতে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেলেন। বুঝলাম ঘরটা খুব ছোট, সম্ভবত দুই বেডের একটা ফ্লাট।
আমি একটু সংকোচেই ভিতরের রুমটায় গেলাম। ততক্ষণে ভাবী উঠে দাঁড়িয়েছেন। কোলে একটা বাচ্চা। আমি উনাকে সালাম দিলাম। ভাবী সালামের উত্তর দিলেন।

ভাবী: আপনার কথা অনেক শুনেছি। আসলে গল্প শুনে আমি আপনাকে কয়েক বছর যাবৎই চিনি।
আমি: আপনাদের বিয়ে হলো তো বছর দেড়েক বা দুই বছর হতে পারে, আমার কথা অনেক বছর ধরে কি করে শুনবেন?
ভাবী লাজুক হেসে বললেন। আমরা আসলে কাজিন। দুজন দুজনাকে আগে থেকেই চিনতাম।
আমি: ও আচ্ছা। তা খালেক ভাই, আপনি তাহলে প্রেম করেই বিয়ে করেছেন।
আমার কথা শুনে খালেক ভাই হেসে উঠলো, ভাবী লাজুক হলেন।
ভাবী: আপনাদের ঢাকা শহরে ব্যাপার-স্যাপার একরকম, আমাদের মফস্বল-গ্রামে আত্মীয়দের মধ্যেই বিয়ে-শাদি হয় বেশি। প্রেম-ট্রেম কিছু না। গার্জিয়ান লেভেলেই আলাপ চলে।
খালেক ভাই: কথা কম। এখন চা বানাও। ছোটভাইকে আপ্যায়ন করতে হবে।
এই বলে হাতের ব্যাগগুলো এগিয়ে দিলেন শারমিন-এর দিকে। বুঝলাম, এগুলো কিনতেই খালেক ভাই বাইরে গিয়েছিলেন। আমি হাতের মিষ্টির বাক্সটি ভাবীর হাতে তুলে দিলাম।

এই রুমেও দেখলাম আসবাবপত্র কম। একটা বিছানা, একটা আলমারী, দুটা চেয়ার, আর একটা ড্রেসিং টেবিল। হুম, আর কিছু না হোক, ড্রেসিং টেবিল থাকাটা জরুরী, যে বাড়ীতে দুইজন রমনী আছে!

ভাবী আর শারমিন, রান্নাঘরে চলে গেলো। আমি আর খালেক ভাই বসলাম।

আমি: ভাবীকে আর বাচ্চা নিয়ে কষ্ট দিচ্ছেন কেন? চা তো আমরাই বানাতে পারি।
খালেক ভাই: আরে চা বানানো তো আর কষ্টের কিছু না। বাকি সব আমি রেডিমেড কিনে এনেছি। চা শারমিন-ই বানাবে। ফাহমিদা বলেটলে দেবে আরকি। আমার বাড়ীতে তুমি চা বানাবা কেন?
আমি: বারে, এই না বললেন, আমি ঘরের ছেলে। এখন আবার ফর্মালিটিজ করছেন কেন?
খালেক ভাই হাসলেন।
আমি: ডোন্ট মাইন্ড। শারমিন কি আপনাদের সাথেই থাকে?
খালেক ভাই: আমরা তিন ভাই। আমাদের কোন বোন নাই। শারমিন আমাদের আপন বোনের মতই। তাছাড়া বাড়ীতে ওদের আর আমাদের বাসা পাশাপাশিই। ফাহমিদা আমাদের একটু দূরের কাজিন। তবে ওদের বাড়ীও আমাদের বাড়ী থেকে খুব বেশী দূরে নয়।
আমি: ও আচ্ছা।
খালেক ভাই: শারমিন-এর এখন ঢাকা থাকাটা জরুরী। ওর জন্য চাকরী-বাকরী খুঁজছি। তোমার চাকরীর কি খবর?
আমি: আব্বার ব্যবসায় বসার ইচ্ছা নাই আমার। আপাতত: আমিও চাকুরী খুঁজছি।

সেদিনকার বিকালটা সুন্দর কেটেছিলো, খালেক ভাইয়ের বাসায়।

মাসখানেক পর আমি একটি চাকুরীতে জয়েন করলাম।
আমার মা ধরে বসলেন, “এতদিন তো চাকুরীর দোহাই দিয়েছিস। এখন তো চাকরীও হলো, তুই বিয়ে করবি না?”
আমি: মা, আরো কিছুদিন যাক না।
মা: তোর এই আরো কিছুদিন কবে শেষ হবে বল তো?
আমি: বলবো।
মা: কানাডা-য় গিয়ে নওরীন-এর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। না হলে হয়তো ওর সাথেই কিছু একটা হতো।
আমি মায়ের দিকে তাকাতেই মা চুপ করে গেলেন।
অনেকেরই ধারনা যে, আমার খালাতো বোন নওরীন-এর সাথে আমার প্রেম ছিলো। যেটা আসলে ঠিক কথা নয়। আমরা দু’জন কাজিন, সেই সুবাদে আমাদের কত জায়গায়ই তো কত দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। কিন্তু কোনদিনই দু’জনা বসে একবারের জন্যও মন খুলে কথা বলা হয়নি। প্রেম তো অনেক পরের কথা! কিছু কিছু ভুল ধারনা সমাজের মধ্যে কি করে যে গড়ে ওঠে, আমি জানি না।

মা: আচ্ছা। ঐ বিদেশে তোর সাথে কারো প্রেম হয়নি তো? যাকে তুই বিয়ে করতে চাস, কিন্তু আমাদের বলছিস না?
আমি: না মা, এমন কোন বিদেশী মেয়ে নাই। থাকলে আমি বলতাম।
মা: বাংলাদেশী কোন মেয়ে? ওখানে পড়তো?

আমি মায়ের দিকে তাকালাম। কি উত্তর দিবো ঠিক বুঝতে পারলাম না। আপাতত: হ্যাঁ বা না, কোন উত্তরই আমার কাছে নেই।
মা আবার বললেন, “যদি, এমন কেউ থেকে থাকে বলে ফেল। যেই হোক, আমরা আপত্তি করবো। জানিস তো আমাদের কোন অহংকার নাই। আমরা লিবারাল। জাস্ট মেয়েটা যেন পড়ালেখা জানা হয়, আর কিছু না।

আমি এবারও চুপ থাকলাম।

আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। ইতিমধ্যে একটা মোবাইল কিনে ফেলেছি। বাবা অনেক আগেই একটা দিতে চেয়েছিলো, আমি নেই নি। চাকুরীতে প্রথম মাসের বেতন পেয়ে কিনলাম। বাকি টাকা দিয়ে মা আর বাবা-র জন্য উপহার কিনলাম। বড় বোন বিদেশে থাকেন, উনার জন্য উপহার কিনে রেখে দিলাম। দেশে আসলে দিবো। আরো একটা উপহার কিনে রেখে দিলাম, তবে যার জন্য কিনলাম তাকে আমি চিনি না। যেদিন চেনা হবে, সেদিন দেবো। আমাকে হয়তো রোমান্টিক ভাবতে পারেন। হ্যাঁ, আমি রোমান্টিক-ই!

একদিন মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো।
আমি: হ্যালো কে বলছেন?
খালেক ভাই: আমি খালেক।
আমি: ও আচ্ছা খালেক ভাই। কেমন আছেন?
খালেক ভাই: ভালো। চাকুরীতে জয়েন করেছো শুনলাম।
আমি: জ্বী। আমার মোবাইল নাম্বার কোথায় পেলেন?
খালেক ভাই: তোমার বাসায় ফোন করেছিলাম। তোমার আম্মা দিলেন।
আমি: ও আচ্ছা।

আরো কিছু কথার পর আমি বললাম।
আমি: সেদিন আপনার বাড়ীতে খুব সুন্দর সময় কেটেছে। আপনাকে আর ভাবীকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। এবার আপনারা আসুন না আমাদের বাড়ীতে।
খালেক ভাই: ছোট বাচ্চা নিয়ে আমাদের বেশ অসুবিধা হয়। কোথাও গেলেও বেশি সময় থাকতে পারি না।
আমি: ঠিকআছে, বিকাল টাইমে আসেন, অল্প কিছু সময় কাটালেন। তাছাড়া আপনাদের বাড়ী তো আমাদের বাড়ী থেকে খুব দূরে নয়!
খালেক ভাই: ঠিক আছে। নেক্সট শুক্রবার হলে কেমন হয়?
আমি: পারফেক্ট!
খালেক ভাই: তোমার বাসার ঠিকানা তো আমার কাছে আছেই।
আমি: আমি এসে নিয়ে যাবো নে, আপনাদেরকে। আপনাদের সাথে ছোট্ট বাচ্চা আছে। আমি আসলে হেল্প হবে, আর চিনে চিনে আমার বাড়ীতে আসতে হবে না।
খালেক ভাই: আচ্ছা, তাহলে তুমি বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে এসো।

আমি: ওকে।

আমি পরবর্তি শুক্রবার খালেক ভাইদের বাড়ীতে গেলাম। চাইলে বাবার গাড়ীটা নিয়ে আসতে পারতাম, তাহলে সুবিধাই হতো। কিন্তু আমার সেটা ভালো লাগে না। নিজের গাড়ী হলে তখন দেখা যাবে। আমি একটা তিনচাকার সিএনজি নিয়ে গেলাম। আবারো গলির ভিতরের সেই বাড়ীটার তিনতলায় উঠে কলিংবেল টিপলাম। এবারও শারমিন দরজা খুললো। বাহ্‌! মনোরম সাঁজগোজ করে সুন্দর দাঁড়িয়ে আছে শারমিন।
“আসুন, ভিতরে আসুন।” বললো শারমিন। তবে কন্ঠস্বর মলিন মনে হলো।
আমি ভিতরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসলাম। বললাম, “তাড়াতাড়ি চলো।”
বেডরুম থেকে খালেক ভাই আসলেন। কিছুটা বিধ্বস্ত মনে হলো উনাকে। আমি বললাম, “চলেন, খালেক ভাই। ভাবী কোথায়? ভিতরে?”
খালেক ভাই: (মনমরা স্বরে) নারে ভাই, আমরা আজ যেতে পারবো না। বাচ্চাটার হঠাৎ জ্বর উঠেছে!
আমি: কি বলেন?
খালেক ভাই: ডাক্তারের কাছে যেতে হবে এখন।
আমি: ও তাহলে আমি আজ যাই।
খালেক ভাই: এত আশা করে এসেছিলে। আমারই ভুল হয়ে গিয়েছে। তোমাকে একটা ফোন করা উচিৎ ছিলো। তা আমার বাসায় তো কোন ফোন নাই। আশেপাশের ফোনফ্যাক্সের দোকান থেকে ফোন করা যেত। টেনশনে আমার আসলে মাথা কাজ করে নাই।
আমি: আচ্ছা। থাক তাহলে আজকে। আপনারা ডাক্তারের কাছে যান।
খালেক ভাই: আচ্ছা শোন, আমি আর ফাহমিদা বাচ্চা নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই। তুমি শারমিনকে নিয়ে তোমার বাসায় যাও। বেচারী বেড়াতে যাওয়ার আশা করে ছিলো।
আমি: জ্বী, এটাও করা যায়। আপনারা সবাই একসাথে গেলেই ভালো হতো। ঠিকআছে তাহলে আপাততঃ আমি আজ শুধু শারমিনকে নিয়েই যাই, আরেকদিন আপনারাও আসবেন।

শারমিন আমার দিকে তাকালো।

বাইরে নেমে আমি শারমিনকে বললাম। এখান থেকে একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে যাওয়া যায়, আবার রিকশায়ও যাওয়া যায়। তুমি কোনটা প্রেফার করো? শারমিন ক্ষীনকন্ঠে বললো, “আপনি যেটা ভালো মনে করেন।”
আমি: আমার কাছে গাড়ীর চাইতেও রিকশাটাই বেশি ভালো লাগে। খোলামেলা বাহন, আস্তে ধীরে বাতাস কেটে কেটে যায়।
শারমিন: চলেন তাহলে রিকশায়।

আমরা দু’জন একটা রিকশায় উঠলাম। অপ্রশস্ত রিকশায় দু’জনে গা ঘেষে বসলাম। শারমিনের সাথে এই প্রথম আমি এত ক্লোজলি বসেছি। মহাখালী টু গুলশান বাতাস কেটে কেটে হালকা গতিতে যেতে লাগলো রিকশা। সেই বাতাসে শারমিন-এর প্রসাধনীর সুবাস আমার নাকে এসে লাগলো। মাঝে মাঝে তার চুল উড়ে এসে আমার গায়ে পড়ছে। শারমিন খুব একটা কথা বলছে না। বোধহয় জড়তা অনুভব করছে। মাঝে মাঝে দু’পাশে তাকাচ্ছে। রিকশাটা মহাখালী ছেড়ে গুলশানের রাস্তায় উঠলো। শারমিন বললো, “এটা কোন রাস্তা?” আমি বললাম, “এটা গুলশান এ্যাভিনিউ। আগে কখনো এই রাস্তায় আসোনি?” শারমিন বললো, “না।” বুঝলাম ঢাকা নগরী ও ভালো চেনে না।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ৩১শে জুলাই, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ০২টা ৫৯ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.