আবীরে অভিসার মম -৫ (শেষ পর্ব)

আবীরে অভিসার মম -৫ (শেষ পর্ব)
——————————————- রমিত আজাদ

যে মেয়েটিকে বিদেশের মাটিতে খুব সহজেই পেতে পারতাম হয়তো। যাকে একসময় অনেক সহজলভ্যই মনে হয়েছিলো। অথচ আমি যাকে দূরে ঠেলেছিলাম, আজ সেই মেয়েটির গায়ে গা ঘেষে বসে এতটা অন্তরঙ্গতায় আমার শরীরে বারবার শিহরণ জাগছিলো! হিউম্যান সাইকোলজি এতটাই বিচিত্র!

গুলশান এক নম্বর গোল চক্কর পেরিয়ে, গুলশান দুই নম্বর গোল চক্কর ছাড়িয়ে আরো উত্তরে এগিয়ে গেলো রিকশাটি। ঢাকা শহরে যে কয়টি দীর্ঘ এ্যাভিনিউ আছে, তার সবই দক্ষিণ-উত্তর বরাবর, পূর্ব-পশ্চিম বরাবার উল্লেখযোগ্য কোন এ্যাভিনিউ নেই! তাই হয়তো যোগাযোগের বেহাল অবস্থা! চলার পথে শারমিন চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। মফস্বলের মেয়ে সরাসরি চলে গিয়েছিলো ইউরোপে, ঢাকা নগরী তার দেখা হয়নি। ইউরোপীয় গ্রান্ড নগরীগুলোর সাথে তুলনা করলে ঢাকা হয়তো তেমন কিছুই না! তবুও শারমিন-এর কাছে এটা তার মাতৃভূমির রাজধানী শহর, যাকে সে চেনে না। আমি মাঝে মাঝে তাকে দুই-একটা জায়গা চিনিয়ে দিচ্ছিলাম। আর ও শুধু মাথা নেড়ে বলছিলো, “জ্বী”, “আচ্ছা”, এই জাতীয় ছোটছোট শব্দগুলি। গুলশান এ্যাভিনিউ-এর শেষ মাথায় এসে বাম দিকে একটা পার্ক দেখে শারমিন জানতে চাইলো, “ওটা কি?”
আমি: এটা গুলশান লেক পার্ক। ভিতরে একটা লেক আছে।
শারমিন: কত বড়?
আমি: বেশি বড় নয়, তবে সুন্দর। অভিজাতদের বেড়ানোর জায়গা। বিকালে হাটার জায়গা।

একবার ভাবলাম, ওকে নিয়ে ওখানে একটু ঘুরে আসবো নাকি? তারপর ভাবলাম না থাক। আজ বাড়ীতেই যাই।

আমাদের বিল্ডিংটার প্রবেশ পথে পেল্লায় বড় গেইট আছে। সেখানে ইউনিফর্মধারী গার্ড আছে। তারা দু’জন আমাদের দেখে লম্বা সালাম দিলো। শারমিন আমার দিকে তাকালো, বোঝা গেলো যে এতটা ফর্মালিটিজে ও অভ্যস্ত নয়। গ্রাউন্ড ফ্লোরের লম্বা গ্যারেজটি পার হয়ে, এক মাথায় সিঁড়ি। শারমিন সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। আমি ডাকলাম, “শারমিন, এদিকে আসো।” শারমিন থেমে আমার দিকে তাকালো। আমি আঙুল দিয়ে দেখালাম, বললাম “লিফট আছে, আমরা লিফটে যাবো। শারমিন আরেকবার আমার দিকে তাকালো। সম্ভবত ও এতকিছু আশা করেনি।

ইতিমধ্যে আরেকজন ভদ্রলোক এসে লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলো। আমাদের দু’জনকে দেখে তিনি আর লিফটে উঠলেন না। কাপলকে লিফট ছেড়ে দেয়ার কার্টেসিটা কেউ কেউ দেখিয়ে থাকেন। লিফটের ভিতরে শুধু আমরা দু’জন। শারমিন আবারো আমার দিকে তাকালো। এই দৃষ্টিটার কোন অর্থ আমি আপাতত খুঁজতে চাইলাম না। বললাম, “টপ ফ্লোরে আমরা থাকি।”

কলিং বেল টিপলে, বুয়া এসে দরজা খুলে দিলো। আমি শারমিন-কে নিয়ে ড্রইং রুমে বসলাম। শারমিন নীরবে সুদৃশ্য সোফাসেটে বসলো। ওকে বেশ সংকুচিত মনে হচ্ছিলো। আমি বললাম, “জানালার সামনে এসো, এখান থেকে সুন্দর দৃশ্য দেখা যাবে।” ও উঠে এসে, জানালার সামনে দাঁড়ালো। জানালার বাইরের দৃশ্য দেখে শারমিন হতবাক হলো! বললো, “এত্ত সুন্দর!” ঢাকার এ পাশটা বেশ সবুজ। তাছাড়া টপ ফ্লোর হওয়াতে অনেক দূরতক দেখা যাচ্ছে। সাধারণ আবাসিক এলাকাগুলোতে, গায়ে গা লাগানো বাড়ীর জানালা দিয়ে এরকম দৃশ্য কল্পনাই করা যায় না!

এরপর ওকে আমাদের পারিবারিক লাইব্রেরীটাতে নিয়ে গেলাম। আমার বই পাগল মায়ের নিজ হাতে গড়া লাইব্রেরীটা দেখে ওর চোখ কপালে উঠে গেলো! “এত্ত এত্ত বই!”
আমি: হ্যাঁ। আমার মায়ের নিজ হাতে গড়া। আমার বোনও প্রচুর বই কিনেছেন। উনার হাত ধরে আমি ছোটবেলায় একুশের বইমেলায় যেতাম।
শারমিন: আপনার বড় বোন আছে?
আমি: হ্যাঁ, আছে। তবে এখন আর এই বাড়ীতে থাকেন না। তিনি বিদেশে থাকেন।

কাজের বুয়া এসে জানালো, নাস্তা রেডী। মা, আমাদেরকে ডাইনিং টেবিলে ডাকছেন। আমি শারমিনকে নিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। মা সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বললেন, “টেবিলে বসো তোমরা।”

মা: কি নাম তোমার, মা?
শারমিন: শারমিন।
মা: বেশ মিষ্টি নাম তো! পুরো নাম কি?
শারমিন: শারমিন শিকদার।
মা: তোমরা কি শিকদার বংশ?
শারমিন: জ্বী।
মা: কি করেন তোমার আব্বু?
শারমিন: জ্বী, ব্যবসা করেন।
মা: আর মা কি কিছু করেন?
শারমিন: জ্বী, স্থানীয় মেয়েদের স্কুলে পড়ান।
মা: ভালো ভালো। টিচারের মেয়ে, গুড। তা তুমি কি আসিফের সাথে লেখাপড়া করেছ?
শারমিন: জ্বী না। উনি আমার অনেক সিনিয়র। তবে আমরা একই ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেছি।
মা: ও আচ্ছা। কোন সাবজেক্ট?
শারমিন: পলিটোলজি।
মা: ভালো। তা, এখন কি কিছু করছো?
শারমিন: জ্বীনা, চাকরী খুঁজছি।
মা: ও আচ্ছা। দোয়া করি চাকরী হয়ে যাবে।

মা আমার দিকে তাকালেন। আমি মাথা নাড়লাম “না” জানালাম। মা কি বলতে চেয়েছেন আমি বুঝতে পেরেছি। মা চোখের ইশারায় আমাকে বলতে চেয়েছিলেন যে, “তোর বাবাকে বললেই তো ওর একটা চাকরী হয়ে যায়।” কিন্তু আমি সেটা চাইনা। শারমিন ওর মত করেই চাকরী খুঁজুক। তাছাড়া ………..।

মা: কতদিন হয় ঢাকায় এসেছ?
শারমিন: অল্প কয়েকমাস।
মা: তাহলে এতদিন আমাদের বাড়ীতে এলে না কেন?
শারমিন: বাড়ী চিনতাম না তো! তাছাড়া আমি পথঘাটও চিনি না।
মা: এটা কেমন কথা হলো মা? তুমি ইউরোপে লেখাপড়া করে পাশ করতে পারলে, আর ঢাকায় পথঘাট চিনবে না? তা কি হয়?
শারমিন: আমি সত্যিই ঢাকায় পথঘাট চিনি না।
মা: চিনতে হবে কেন? চিনে আসতে পারার কথা বলছি। তুমি কি বাংলা-ইংরেজী পড়তে পারো না?
শারমিন: লজ্জ্বা পেয়ে। জ্বী, তাতো পারিই।
মা: ব্যাস তাহলেই তো হলো। আমাদের দেশে প্রতিটি দোকানের উপর সাইনবোর্ড থাকে। সেখানে এলাকার নাম ও ঐ দোকানের ঠিকানা লেখা থাকে। তা পড়লেই তো তুমি বুঝতে পারবে তুমি কোথায় আছো। কোথায় যেতে হবে। বি স্মার্ট!
শারমিন: জ্বী। কিন্তু আমার ভয় লাগে!
মা: কিসের ভয়?
শারমিন: রাস্তাঘাটে যদি কোন অঘটন ঘটে। আমি ভয় পাই!
মা: কাম অন! আমাদের দেশের মানুষ অত খারাপ নয়। দিনের আলোয় রাস্তাঘাটে অত সমস্যা নাই। তুমি লেখাপড়া জানা মেয়ে, কদিন পরে চাকরী-বাকরী করবে। তোমাকে তো ঢাকায় চলাফেরা করতে শিখতে হবে!
শারমিন: (সুবোধ বালিকার মত বললো) জ্বী আচ্ছা!
মা: বিয়ে-শাদীর কোন কথাবার্তা চলছে?
আমি: মা। এটা তো ওদের ফ্যামিলির ব্যাপার, তুমি জানতে চাইছো কেন?
মা: তুই থামতো। আমি জানতে চাই।
শারমিন: (আরো লজ্জ্বা পেয়ে) আমি জানিনা, বাবা-মা কিছু করছেন কিনা!

মাকে মনে হলো বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওকে দেখছেন!

সন্ধ্যার আগে আগে বের হয়ে গেলাম, ওকে মহাখালী পৌঁছে দিতে। তবে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। সন্ধ্যার আবছায়া আলোয় রিকশায় চড়ে আবারো আমরা দুজন যাচ্ছি। এবার শারমিন কি আমার সাথে আরেকটু ক্লোজ হয়ে বসলো? ভাবলাম, নাও হতে পারে, হয়তো এই রিকশাটাই বেশি অপ্রসস্ত!
শারমিন: ঢাকার এই দিকটা রাতেও সুন্দর!
আমি: হ্যাঁ, অভিজাত এলাকা। অনেক ইমপর্টেন্ট অফিস-আদালত আছে।
শারমিন: খুব সুন্দর আপনাদের বাসাটা! দেয়ালের পেইন্টিংগুলা অনেক দামী তাই না?
আমি: দামী হবে নিশ্চয়ই। তাবে আমাদেরকে তো আর কিনতে হয়নি।
শারমিন: মানে?
আমি: আমার মা তো একজন চিত্রশিল্পী।
শারমিন পাশ ফিরে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকালো! বললো, “উনি চিত্রশিল্পী?”
আমি: হ্যাঁ। ঢাকার আর্ট কলেজ থেকে পাশ করেছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন-এর সরাসরি ছাত্রী ছিলেন।
শারমিন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। মনে হলো ও আজ বারবার শুধু অবাকই হচ্ছে!
আমি: কি অবাক হলে?
শারমিন: আমি আগে কখনো কোন চিত্রশিল্পী-কে দেখিনি।
আমি: এখন শুধু দেখলেই না। কথাও বললে।

শারমিন: আমার খুব ভালো লেগেছে আপনাদের ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়ার সময়টা। এত সাজানো-গোছানো ছিলো সবকিছু! একটা বাড়ীর পরিবেশ যে এত সুন্দর হতে পারে তা আমি কখনো ভাবিনি!

কিছুদিন চাকরী নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। শারমিন, খালেক ভাই, সবাইকেই ভুলে গেলাম। হঠাৎ একদিন একটা ফোন কল পেলাম। উত্তাল কল করেছে। এখন সে বাংলাদেশেই আছে। একটা সরকারী চাকুরী করছে।

উত্তাল: ভাইজান, কেমন আছেন।
আমি: ভালো আছি ভাইয়া, তুমি কেমন আছো?
উত্তাল: আমি ভালো আছি, ভাইজান।
আমি: গুড!
উত্তাল: ভাইজান, আপনাদের জন্য মন পোড়ে, তাই একটা ব্যবস্থা করলাম।
আমি: মন পোড়ে ভালো কথা। শুনে খুশী হলাম। তা কি ব্যবস্থা করলে?
উত্তাল: আগামী শুক্রবার বিকালে একটা প্রোগ্রামের আয়োজন করেছি। আমরা সবাই থাকবো, আপনিও আমন্ত্রিত।
আমি: থ্যাংক ইউ। আমিও কাজে ডুবে গিয়েছিলাম। একটু সবার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করলে ভালো লাগবে।
উত্তাল: তা ভাইজান, উচ্ছাস, সেলিম, সুমন,……….., সবাই আসবে, শুধু খালেক ভাই আসতে পারবে না, ব্যাস্ত। তবে শারমিন আসবে।
আমি: ভালো কথা। আমাকে প্রোগ্রামের ঠিকনাটা এসএমএস করে দিও।
উত্তাল: আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।
আমি: কি কাজ?
উত্তাল: অনুষ্ঠান হবে ধানমন্ডিতে। আমার বাড়ীর ছাদে। শুনেছি, আপনার বাসা থেকে এখানে আসার পথে শারমিনদের বাসা পড়বে।
আমি: হ্যাঁ, মোটামুটি তাই।
উত্তাল: তাহলে, আপনি ঐদিন আসার পথে শারমিনকে নিয়ে আসবেন। ঠিকআছে।
আমি: তুমি তো আমাকে ঝামেলায় ফেললে!
উত্তাল: আপনাকে বলতাম না। কিন্তু খালেক ভাই আসবেন না। আবার শারমিনও একা একা আসতে পারবে না। এখন কি আর করা? আপনার তো পথেই পড়বে।
আমি: ঠিকআছে। ওকে বলা আছে?
উত্তাল: আমি খালেক ভাইকে বলে দেব।

আমি” ওক্কে।

মা: শোন।
আমি: জ্বী, আম্মা।
মা: আচ্ছা ঐদিন যে মেয়েটা এসেছিলো, শারমিন না নাম?
আমি: জ্বী। কি ব্যাপার?
মা: না। কিছু না। তুই কি কিছু বলবি?
আমি: আমি কি বলবো?
মা: কিছু কি বলার আছে?
আমি: কি বলার থাকবে?
মা: মেয়েটির ব্যাপারে তোর কিছুই কি বলার নেই?
আমি: না মা, আমার কিছুই বলার নেই। তবে তুমি চিত্রশিল্পী শুনে ওর চোখ কপালে উঠে গিয়েছিলো!
মা হেসে ফেললেন।
আমি: তোমার বাড়ীটা ওর খুব পছন্দ হয়েছে।
মা: খুব বেশি পছন্দ হয়েছে?
আমি: তাই তো মনে হলো। বললো, এত সুন্দর বাড়ী নাকি ও আগে কখনো দেখেনাই।
মা: ওকি এই বাড়ীতে থেকে যেতে চায়?
মা’র কথায় কিছু একটা ইঙ্গিত আছে। আমি সেই ইঙ্গিত-টা আপাততঃ ধরতে চাই না। আমি নির্লিপ্ত রইলাম।
মা: ও! মেয়েটা দেখতে-শুনতে মোটামুটি, এভারেজ বলা যায়। তবে অতটা স্মার্ট না! একটু সংকুচিত মনে হলো। তবে লেখাপড়া জানা মেয়ে, চাকরী-বাকরী করলে চালাক-চতুর হয়ে যাবে!
আমি: হবে হয়তো।
আমার এহেন নির্লিপ্ততা দেখে মা আর কথা বাড়ালেন না।

আমিও মাকে কিছু বলতে চাইলাম না। আমি নিজেই অনেকটাই সন্দিহান!

পরবর্তি শুক্রবার। আমি মহাখালীতে শারমিনদের বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলাম। আগের দিন টেলিফোনে খালেক ভাইয়ের সাথে আলাপ হয়েছে। খালেক ভাই বললেন, “আমি যেতে পারবো না। তুমি পথে শারমিনকে বাড়ী থেকে নিয়ে যেও। ও রেডী হয়ে থাকবে।”

আমি বের হওয়ার সময় মা বললেন, “আজ গাড়ীটা একদম ফ্রী। তোর বাবা আমাজাদের গাড়ীতে চড়ে কোন একটা প্রোগ্রামে গিয়েছে ঐ গাড়ীতেই ফিরবে। তুই গাড়ীটা নিয়ে যা।”
আমি: থাক, আমি কিছু একটায় চড়ে চলে যাবো নে।
মা: বললাম না, গাড়ীটা শুধু শুধুই বসে আছে। তুই একটু আরাম করে যা তো। ফিরতে রাত হবে?
আমি: মনে হয় রাত হবে। সবাই মিলে ছাদে আড্ডা দেবে। সময় তো লাগবেই। কালও তো উইক-এন্ড।
মা: শারমিন থাকবে ঐ প্রোগ্রামে?
আমি বুঝলাম না, মাকে ঠিক কি জবাব দেব। আমি যে পথে ওকে নিয়েই ঐ অনুষ্ঠানে যাবো এটা মাকে বলিনি। শারমিনকে নিয়ে আমি সন্দিহান, তাই ওকে নিয়ে মাকে কোন ইঙ্গিত দিতে চাই না।
আমি: থাকার কথা।
মা: আচ্ছা। যা তাহলে।


ঐ গলির ভিতরে গাড়ী ঢোকে না, তাই ড্রাইভারকে মেইন রোডের উপর থাকতে বললাম। খালেক ভাইকে যেই সময় বলেছিলাম, হিসাবের চাইতে তার বেশ অনেকটা সময় আগে ওখানে পৌঁছে গেলাম। আসলে আমি তো আর ভাবিনি যে গাড়ীতে চড়ে আসবো, আমার হিসাব ছিলো রিকশার সময়ের। আমি হেটে ভিতরে ঢুকে গেলাম। গলির ভিতরে গায়ে গা লাগানো বাড়ীগুলো! শারমিনদের বিল্ডিংয়ের সরু সিঁড়ি বেয়ে আমি উপরে উঠে গেলাম। দরজায় পৌঁছে কলিং বেল টিপলাম, এক মিনিট পার না হতেই দরজা খোলার শব্দ শুনলাম। ও তাহলে শারমিন রেডি হয়েই ছিলো। ভালোই হলো, এখুনি ওকে নিয়ে নিচে নেমে যাবো।
দরজা খুলে শারমিন একগাল হাসলো। আমিও হাসলাম, তবে কিসের যেন অভাব মনে হলো!
শারমিন: আসেন ভিতরে আসেন।
আমি: তুমি রেডী?
শারমিন: ভিতরে আসেন তো।
আমি ভিতরে ঢুকলাম।
শারমিন: বসেন।
আমি বসাবসির কি আছে। নিচে গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে, তাড়াতাড়ি চলো।
শারমিন: (একটু বিব্রত হয়ে) ট্যাক্সি, নাকি আপনাদের নিজেদের গাড়ী?
আমি: আমাদের নিজেদের গাড়ী।
শারমিন: তাহলে একটু অপেক্ষা করেন।
আমি: তুমি কি রেডী না?
শারমিন: আপনার আসার কথা কখন? আর আপনি একঘন্টা আগে চলে এসেছেন।
আমি: তাই নাকি?
শারমিন” হ্যাঁ, তাই। আমি এখনও রেডীই হতে পারি নাই।
আমি এতক্ষণে বুঝলাম, কিসের অভাব। শারমিন এখনো পুরোপুরি সাঁজগোজ করেনি।
আমি হেসে ফেললাম। সরি, সময়ের হিসাব ঠিক রাখতে পারিনি। ঠিকআছে, তুমি রেডী হও, আমি বসলাম। খালেক ভাইকে এই রুমে পাঠিয়ে দাও। ভাবী নিশ্চয়ই বাচ্চা নিয়ে ব্যাস্ত?
শারমিন: ভাইয়া, ভাবী, বাচ্চা, কেউই বাসায় নেই।
আমি: মানে?
শারমিন: এই জন্যই তো। উনারা আত্মীয় বাড়ীতে গিয়েছেন। ভাবীর দিকের আত্মীয়, আগে থেকেই প্রোগ্রাম ছিলো, তাই খালেক ভাই আজকের প্রোগ্রামটাতে যেতে পারছেন না।
আমি এতক্ষণে বুঝলাম, বাড়ীটা খুব নির্জন কেন মনে হচ্ছিলো!
আমি: তাহলে বাড়ীতে তুমি এখন একা?
শারমিন: হ্যাঁ, একদম একা। আপনি বসেন। আমি ঐ রুমে সাঁজগোজটা কমপ্লিট করি।
আমি: আচ্ছা।

আমি কিছুক্ষণ এই রুমটাতে একটা চেয়ারে বসে রইলাম। এই ফ্লাটের চারদিকেই বদ্ধ। জানালাগুলোও নামকা ওয়াস্তে খুললে হয়তো পাশের দালানের জানালা দেখা যাবে। তাই সবগুলি জানালাই বন্ধ। তারউপর পর্দা টানা। অপেক্ষার সময়টায় জানালা দিয়ে যে একটু বাইরের দৃশ্য দেখবো, সেই জো-ও নেই। মোবাইল ফোনটা হাতে নিলাম, ওখানে কিছু করে সময় কাটাই। মেয়েদের তো সাঁজতে অনেক সময় লাগে! শারমিন-এর যে কতক্ষণ লাগে কে জানে? কিন্তু মোবাইলে ঘাটাঘাটি করতে আমার ভালো লাগে না। এই রুমে বইপত্র-ও কিছু নাই, যে নেড়েচেড়ে দেখবো।

আমি চুপচাপ বসে আছি। মাঝে মাঝে ঐ রুমে টুংটাং শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ড্রেসিং টেবিলে শারমিন কিছু করছে। হয়তো নেইল পালিশের শিশিটা তুলছে, হয়তো কাঁচের চুড়িগুলো পড়ছে। এখন বাড়ীটাতে কেউ নেই, শুধুই আমরা দুজন! আমি এই রুমে অপেক্ষায়, শারমিন ঐ রুমে সাঁজছে।

আমি ধীর পায়ে হেটে ঐ রুমে ঢুকলাম। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শারমিন সাঁজছে। বাইরে বেড়ানোর সালোয়ার কামিজ-টা ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছে, বেশ জমকালো, আর টাইট ড্রেসটা। আপাতত, বুকের উপরে ওড়না নেই। আয়নায় শারমিন আমাকে দেখলো। এখন দুজন দুজনকে দেখছি আয়নায়। ঠোঁটে লিপস্টিক মাখা শেষ করে, শারমিন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। আমিও মৃদু হাসলাম। তারপর চিরুনীটা নিয়ে শারমিন তার দীঘল কালো চুল আঁচড়াতে শুরু করলো। এই টাইট জমকালো পোশাকে ওর শরীরের প্রতিটি বাঁকই যেন খুব স্পষ্ট! এদিক সেদিক দুলে দুলে হাত উঠানামা করিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলো। এই প্রসাধনরত নারী ভঙ্গিমায় কি এক মাদকতা অনুভব করলাম। আমি কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে ওর প্রসাধন দেখলাম। এ সময় শারমিন আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছিলো। আমাদের কারো মুখেই কোন কথা নেই। আমি ওর দিকে আরো কিছুটা এগিয়ে গেলাম। এগুতে এগুতে ওর খুব কাছাকাছি চলে এলাম। আমাদের মধ্যেকার দূরত্ব এখন গানিতিক হিসাবে শূণ্য না হলেও, টেন্ডস টু জিরো, মানে শূণ্যের খুব কাছাকাছি। বাড়ীতে আর কেউ নেই, শুধুই আমরা দু’জন, পরিস্থিতি পুরোটাই অনুকূলে, আমি কি ওকে একটু ছুঁয়ে দেখবো?

আমি কি তোমার নগ্ন কায়ায় বুলিয়েছি কভু হাত?
স্বপ্নসুধায় মধুমাস তিথি, জারুল ঝরানো রাত!
বেগুনী শোভায় কর পরশে শিহরীত তমা নিশি,
উঠিয়াছে ঝড়, কেঁপে থরথর, উতলা নিঝুম শশী।

অপ্সরা তার নিঃশ্বাস রেখে ছেয়ে ছিলো ছায়াপথ,
স্বপ্নবিলাসী খোলসে ঢাকিয়া উড়িছে আলোর রথ।
জারুল ফুলের গন্ধসুবাসী রূপসীর দু’টি বৃন্ত,
কোমলতা ছুঁয়ে মায়াবী চূড়ার, অমানিশা অবিশ্রান্ত।

কুমারী জারুল চিত্রিত পটে বিস্মৃত নদীতট,
নিপতিত ফুল, বেগুনী জারুল, সাজিয়েছে মেঠোপথ।
দুঃখবিলাসী স্মৃতির আখরে, অবিনাশী মধুমাস,
তরু উদ্যানে, পুষ্পের সারি, নারীর ইশারা বাস।

(সমাপ্ত)

রচনাতারিখ: ০১লা আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১২টা ৩৪ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.