ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব -ঙ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
———————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব -ঙ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ইন্না কি ইউক্রেণীয় রূপসী? ইন্না কি ককেশিয়ান পাহাড়িকা? নাকি ইন্না রুশী তরুণী? হবে এইসব কিছুর সংমিশ্রণে কিছু একটা। আপাতত ওর রূপের বর্ণনা করছি। না শ্বেতাঙ্গিনী, না শ্যাম বর্ণাঙ্গী, না কবি নজরুল-এর সেই দুধে-আলতা রঙ! ওর জাতীয়তার মতই ওর গায়ের রঙটাও একটা সংমিশ্রণ। আমি যেই রঙটিকে কেবল আনার রঙের সাথেই তুলনা করতে পেরেছিলাম। মাথা ভর্তি রেশমি চুলের রঙ কুচকুচে কালো; যাকে বলা হয় মেঘবরণ কেশ। আর সবকিছুর মতই অপরূপ সুন্দর ওর দু’টি কাজল-কালো আঁখি। সেই আঁখির দৃষ্টিতে ঝরে পড়ে কোন সে মায়া! পাঠকগণ, আপাতত ওর কায়ার কোন বাঁকের বর্ণনা আমি করবো না, ঐ বর্ণনা কেন যেন অমন অনাবিল স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যের সাথে খাপ খায় না!

পরবর্তি দুই-একদিন ইন্না আর একা আমার রুমে আসেনি। স্ভেতা একা আসেনি, তানিয়াও একা আসেনি। ওরা তিনজন একত্রেই এসেছিলো, ঐ মেক্সিকান টিভি সিরিয়ালটি দেখতে। ওরা তিনজন একত্রে বসে নাটকটি দেখতো। আর আমি একপাশে একা বসে কখনো নাটক দেখতাম, কখনো ওদেরকে দেখতাম। মনে হতো যেন তিনজন পৌরাণিক অপ্সরী বসে আছে আমার ঘরে। সেই ছেলেবেলায় পড়া ইলিয়াড-এর মিথ-এর জগতের মত।

সেই এক-দেড় ঘন্টা আমি সেবক হতাম ঐ তিন অপ্সরার। কখনো চা, কখনো কফি বানিয়ে দিতাম। ওরা গরম কাপে চুমুক দিতে দিতে, নানান রকম মন্তব্য করতো নাটকের কাহিনী নিয়ে। কখনো তারা বলতো যে, নায়িকা যা করছে তা ঠিক করছে না, আবার বলতো যে নায়কেরও দোষ আছে। তারপর ঐ নিয়ে নিজেদের মধ্যে কখনো বিরোধ, আবার কখনো মতের মিল হতো! আমি ওদের কথা শুনে মিটি মিটি হাসতাম। স্ভেতা বলতো, “তুমি আমাদের কথা বুঝবে না নয়ন। তুমি তো আর মেয়ে নও!” ঐ শুনে আমি আরো হাসতাম।

নাটকের নায়িকার অপূর্ব সুন্দর রূপ দেখে আমি বললাম, “তোমরা নায়িকার কার্যক্রমকে সঠিক বলছো না। নায়িকা ওরকম করছে কেন জানো?” ওরা বলতো, “কেন, বলতো?” আমি বলতাম, ” অনেকে সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে ট্রল করে যে তাদের মাথায় মগজ বলে কিছু নাই।” আমার ঐ কথা শুনে স্ভেতা আর ইন্না তো রেগেই অস্থির। এদিকে তানিয়া বলতো, “নয়নের কথার মধ্যে, কিছুটা হলেও সত্যতা রয়েছে।” আমি আরো বলতাম, “সুন্দরী মেয়েদের রুচি বলতেও তো কিছু নাই।”
তাই শুনে ইন্না বললো, “মানে মানে? কি বলছো?”
আমি: সুন্দরী মেয়েদের রুচি যে জঘন্য সেটা তাদের প্রেমিকের দিকে তাকালেই বোঝা যায়!
ঐ শুনে তারা, এই হাসে তো এই রাগে!
তানিয়া হেসে বলে, “নয়ন, তুমি রুশীদের মত দীর্ঘদেহী, চওড়া কাঁধের না হলেও, সুন্দর পুরুষ কিন্তু। তা তোমার লজিক অনুযায়ী, তোমার কপালে কিন্তু একটা অসুন্দরী মেয়েই জুটবে।”
আমি হাসতে হাসতে স্ভেতার দিকে তাকালাম। স্ভেতা সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেললো। মুখের হাসিটাও মিলিয়ে গেলো!
আমি: তানিয়া, আমি মোটেও সুন্দর কোন পুরুষ নই। আমি কি জানো?
তানিয়া: কি”
আমি: আমি হলাম গ্রামের ‘আন্ডা-ভাজা’ শহরে এসে হয়েছি ‘ওমলেট’।
এই শুনে ওরা তিনজনাই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো।
ইন্না: আরে আমরাও কেউই কিন্তু এই বড় শহরের বাসিন্দা নই। সবাই-ই ছোট ছোট শহরের বসবাসকারী।
স্ভেতা: ‘আন্ডা-ভাজা’ আর ‘ওমলেট’ যেটাই হোক না কেন। আমাদের নয়ন কিন্তু খুবই রেসপন্সিবল। অনেকটা এই নাটকের নায়ক-এর মতন।
আমি: তাহলে তোমাদের আসল কথাটি বলি শোন।
ইন্না: বলো।
আমি: পুরুষ মানুষের রেন্সপনসিবিলিটি আসলে অসম।
তানিয়া: সে কি রকম?
আমি: পুরুষ মানুষের যাবতীয় রেন্সপনসিবিলিটি আসলে শুধুই তার বাবা-মায়ের জন্য।
স্ভেতা: কেন কেন? বৌয়ের প্রতি কি তার কোনই রেন্সপনসিবিলিটি নাই?
আমি: আছে অবশ্যই তবে, পুরুষ মানুষের বৌয়ের প্রতি রেন্সপনসিবিলিটির কথা মনে পড়েই তো রাত এগারোটার পরে!

এবার ওরা সবাই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো! সবাই সমস্বরে বললো, “নয়ন-কে দেখলে যতটা ভিজা বিড়াল মনে হয়, আসলে ও ততটা সাদাসিদা নয়!”

ইন্না: আমি কিন্তু বিয়ে-শাদির মধ্যে যাবো না। ( ওর কন্ঠে একটা বিদ্রোহী সুর পেলাম!)
আমি: মানে? কেন?
ইন্না: তুমি তো আমাদের দেশ চেনো না। এই হতভাগা দেশে বৌদের সম্মান বলতে কিছু নাই!
আমি: কি বলো?
ইন্না: অবশ্যই। আমাদের দেশের পুরুষ মানুষগুলা মহা বজ্জাত! তারা বৌদের জন্য রেখেছে কিল-গুতা; আর প্রেমিকাদের জন্য হীরা-জহরৎ।
আমি: কি বলছো এসব? মানে কি?
ইন্না: মানে খুব সহজ। আমাদের দেশের পুরুষরা পটিয়ে-পাটিয়ে একজনকে বিয়ে করে। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই বৌয়ের আকর্ষণ চলে যায়। এরপর ইয়াং দেখে একটা প্রেমিকা জোগাড় করে। তা, ইয়াং মেয়ে এম্নি-এম্নিই কি আর থাকবে? টাকা-পয়সার জন্যই তো ‘সুগার ড্যাডি’ খোঁজে। তাই পুরুষগুলা সব ধন-দৌলত ঢেলে দেয় ঐ ইয়াং প্রেমিকাটিকে। এদিকে বৌ বেচারী ঘরে বসে বসে কাঁদে!
আমি: এটা তো জানতাম না! ভেরী স্যাড!
ইন্না: এই কারণে আমি সারাজীবন প্রেমিকা থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারো স্থায়ী বৌ হয়ে কিল-গুতা খেতে আমি রাজি না।
আমি: তাহলে, প্রেম-ভালোবাসা-আবেগ-অনুভূতি এগুলার কি হবে?
আমার কথা শুনে বিদ্রোহী ইন্না দপ করে নিভে গেলো!
তারপর আমার দিকে অদ্ভুত একটা দৃষ্টিতে তাকালো। আবারো সেই অর্থভেদ করতে না পারা দৃষ্টি!

“হাম ভি মিলে থি কই যমুনা কিনারে,
রাধা কিষাণ পে কাভি নাম হামারে,
ফির উও মুরালিয়া, ফির উও পায়েলিয়া, ফির ওহি সঙ্গিত রে;
আযা তুঝকে পুকারে মেরে গীত রে, মেরে গীত রে,
ও মেরে মিতাভা, মেরে মিত রে!”

(বিখ্যাত হিন্দি গান)

(চলবে)

রচনাতারিখ: ০৪ঠা আগস্ট (বৃহস্পতিবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৪টা ১৬মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.