ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – চ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – চ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ক্ষমতার স্বাদ অনেকটা রূপসী নারীর স্তন ও নিতম্বের স্বাদের মতন নেশাতুর। যারা একবার এর স্বাদ পায়, তারা আর তা ছাড়তে চায় না। আবার যারা কখনোই এই স্বাদ পায়নি, তারাও এর স্বাদ পেতে উদগ্রীব! একদলীয় শাসনতন্ত্রের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে কম্যুনিস্ট পার্টির নেতারা ক্ষমতার নেশাতুর স্বাদ পেয়ে তা আর ছাড়তে চায়নি। তাই গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা, সৎ-নির্বাচন, এই বিষয়গুলোকে তারা যমের মতন ভয় পেত। যদি ঘুণাক্ষরেও কোন ব্যাক্তি গণতন্ত্রের কথা বলতো, আর তা যদি কম্যুনিস্ট নেতাদের কানে যেত তাহলে আর রক্ষা নেই, রাষ্ট্রীয় পেটোয়া বাহিনী ব্যবহার করে মধ্যযুগীয় ‘ইনকুইজিশন’-এর কায়দায় তাদেরকে গুম, খুন, জেল, নির্বাসন, ইত্যাদি দিতো।

এসকল সংবাদ বাইরে আসতো না। কেননা, সুস্থ কোন সাংবাদিকতাও সেখানে ছিলো না। যা ছিলো, তা সবই ছিলো সাজানো! পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন যাই বলেন না কেন, খুললে পরে সেখানে দেখা যেত শুধু সুখ আর সুখ। দুঃখের কোন লেশমাত্র সমাজতান্ত্রিক মিডিয়ায় পাওয়া যেত না। যেন, দেশের সকলেই ‘নির্বান’ লাভ করে বেহেশতে বসবাস করছে। কম্যুনিস্টদের ঐ কল্পিত বেহেশতে ইন্না বা স্ভেতা-দের দুঃখী জীবনের গল্প রয়ে যেত অজানা।

ইন্না: আচ্ছা নয়ন, তুমি আমাদের দেশে এসেছ কেন?
আমি: পড়তে এসেছি।
ইন্না: কেন তোমাদের দেশে কি বিশ্ববিদ্যালয় নাই?
আমি: আছে তো। কিন্তু তোমাদের দেশ তো ‘সুপার পাওয়ার’। এখানকার লেখাপড়ার মান অনেক অনেক ভালো।
ইন্না: হুম। আরো অনেক দেশের ছেলেমেয়েদেরকেই এখানে পড়তে আসতে দেখেছি।
আমি: কোথায়?
ইন্না: আমাদের শহরে কোন বিদেশী নাই। ছোট্ট শহর। ওখানে তো আর বড় কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাই। এখানে এসেই যা দেখলাম। এক্সোটিক!
আমি: বাংলাদেশ থেকে এই দেশে মূলত: পড়তেই আসে। তবে আমাদের দেশ থেকে মানুষ অন্যান্য দেশেও যায়।
ইন্না: কি করতে যায়? নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে কেন যায়?
আমি: বাংলাদেশীরা বিদেশে যায় প্যাটের টানে।
ইন্না: মানে কি? (চোখ পিটপিট করে বললো ইন্না)
আমি: (হাসতে হাসতে বললাম) আরে কাজ-কর্ম, চাকরী-বাকরী করতে যায় আর কি।
ইন্না: কেন? তোমাদের দেশে চাকরী নাই?
আমি: আছে কিছু। তবে পর্যাপ্ত নয়। তাই বেকার সমস্যা রয়েছে আমাদের দেশে। আবার অন্যদিকে ‘ওয়েজেস’ একটা বড় ব্যাপার, বিদেশে গেলে পারিশ্রমিকও বেশি পাওয়া যায়।
ইন্না: ও হ্যাঁ, শুনেছি। আজকাল তো আমাদের ইউক্রেইন থেকেও লোকজন ইউরোপ-আমেরিকায় চাকুরী করতে যায়। আমার একটা সখ আছে, কি জানো?
আমি: কি সখ?
ইন্না: ব্যবসা করে অনেক অনেক টাকা বানাবো। তারপর নিউ-ইয়র্ক যাবো!
আমি: ভালো সখ। তবে ‘নিউ-ইয়র্ক’ কেন?
ইন্না: এখন কি পৃথিবীতে ঐ শহরটাই সব চাইতে আকর্ষণীয় নয়?
আমি: হুম, তাই হবে হয়তো।
এবার আমি একটা কথা মনে করে হাসতে লাগলাম।
ইন্না: হাসছো কেন?
আমি: নাহ্‌, বলবো না। ইনডিসেন্ট কথা। স্ল্যাং!
ইন্না: (মুচকি হেসে) আরে বলোইনা।
আমি: (একটু লজ্জ্বা পেলাম) মানে ‘প্যাট’ ছাড়াও আরো একটা টানে লোকে বিদেশে যায়।
ইন্না: কি সেটা?
আমি: (বাংলায় বললাম) ‘চ্যাট’।
ইন্না আবারো চোখ পিটপিট করে বললো, “কি সেটা?”
আমি: আছে আরো একটা জিনিস! সেটাও মানুষকে তাড়িত করে! বুঝলে না, ইউরোপীয় মেয়েগুলা যে পরিমান রূপসী এক একটা! দুনিয়া চলছেই তো ঐ দুই ক্ষুধার টানে!

ইন্না এবার আমার কথা ধরতে পারলো। লক্ষ্য করলাম, মেয়েটা যতই ‘রাফ এ্যান্ড টাফ’ হোক না কেন, একেবারে লজ্জ্বায় লাল হয়ে গেলো!

একসাথে তিনজন বসে আছে আমার রুমে, ইন্না, স্ভেতা ও তানিয়া। ওরা একসাথে হলে খুনসুটি শুরু করে। আবার আমার কেন যেন মনে হয় যে, ওরা একে অপরকে হিংসাও করে!

স্ভেতা: নয়ন, তোমাদের দেশে বিয়ে নাকি এ্যারেঞ্জড-ও হয়?
আমি: হয় তো।
তানিয়া: এটা কিভাবে সম্ভব? ভালো না বেসেই একজনকে কি বিয়ে করে ফেলা যায়?
আমি: আমার কাছে ভালো লাগে না বিষয়টা। তবে জন্ম থেকেই তো আমাদের সমাজে ঐ ট্রেডিশন দেখে আসছি।
স্ভেতা: আমাদের দেশে কিন্তু ওসব নাই। এখানে নারী-পুরুষ পরস্পরকে ভালোবেসেই বিয়ে করে।
ইন্না: হাহ্‌! বলছে! আমাদের দেশেও ওসব আছে, তবে ভিন্নরূপে।
স্ভেতা: সে কি রকম? (মনে হলো স্ভেতা ইন্নার উপর একটু ক্ষেপেছে)
ইন্না: আজকাল ‘পা রাশচোতু’ বিয়ে হয় না আমাদের দেশে? ওটা কি এ্যারেঞ্জড ম্যারেজ-এর চাইতে বেটার কিছু?

‘পা রাশচোতু’ বিয়ে মানে, হিসেব-কিতেব করে বিয়ে করা। সোজাসুজি বললে, টাকার হিসেব করে বিয়ে করা। অর্থাৎ কোন একটা মেয়ে দেখলো যে, অমুক ছেলে বেশ পয়সাওয়ালা, ব্যাস ওর পিছনে ঘুরঘুর করতে শুরু করে। নানা কৌশলে ওকে আকৃষ্ট করে, বিয়ে করার জন্য। সাকসেসফুল হলে শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়। ওখানে আসলে কোন ভালোবাসাবাসির বিষয় নেই। সবই ধন-সম্পদের হিসাব-কিতাব! ধন-সম্পদের লোভে এক ধরনের ভালোবাসার অভিনয়!

এটা ইদানিং এই দেশে হর-হামেশাই হচ্ছে! আগে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিলো কম। তাই মেধার হিসাবে না হলেও টাকার হিসাবে বেশিরভাগই মোটামুটি একই স্তরে ছিলো। (সুপার এলিটদের কথা ভিন্ন, এবং সংখ্যায়ও তারা খুব কম ছিলো) কিন্তু অধুনা পরিবর্তনে এই দেশে নব্য ধনীদের জন্ম হচ্ছে, তাই সামাজিক স্তরবিন্যাস বাড়ছে; আর ফলস্বরুপ বিবাহরীতিতেও পরিবর্তন এসেছে।

আমি: সিরিয়াস আলাপ বাদ দাও। আমরা বসেছি গল্প-গুজব করতে, হালকা কিছু বলো।
এবার সবার মুখে হাসি দেখা গেলো।
তানিয়া: তুমিই শুরু করো তাহলে।
আমি: না। তোমরা শুরু করো।
ইন্না: ধরো তোমার প্রাক্তন প্রেমিকা-কে যদি দেখো যে, তার স্বামীর সাথে খুব রোমান্টিক মুডে কোন ছবিতে পোজ দিয়েছে, তখন তোমার কেমন অনুভূতি হবে?
ঝপ করে এমন একটা প্রসঙ্গের অবতারনা হবে আশা করিনি। যাই হোক, আমার যেহেতু তখনও প্রেমিকা-ট্রেমিকা কিছু ছিলোনা তাই আমিও কৌতুক করে বললাম,
আমি: ডিপেন্ডস! সেই প্রাক্তন প্রেমিকা যদি শুধুই দৈহিক আনন্দের প্রেমিকা হয়; তাহলে তো মনে মনে কৌতুক-ই অনুভব করবো। মনে মনে বলবো, “ব্যাটা, তুই তো ইতিহাস জানিস না!” আবার, ছবিটা কিছুটা উত্তেজক-ও মনে হতে পারে। আর সেই প্রেমিকা যদি হয় মনের মেয়ে, তাহলে তো ছবি দেখার সাথে সাথে মনে গভীর ব্যাথা জাগবে, তখন মনে মনে বলবো, “আমার প্রাক্তন প্রেমিকার নিজস্ব পুরুষ তুমি তো জানো না, নিজস্ব ছাড়িয়েও আরো কিছু থাকে!”

(চলবে)


গল্পের রচনাতারিখ: ২৩শে আগস্ট (মঙ্গলবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: দুপুর ০২টা ২১মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.