ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ছ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ছ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে স্ভেতা বললো, “চমৎকার স্বাদ এই চায়ের! কোথাকার প্রোডাকশন?”
আমি: আমাদের দেশের।
স্ভেতা: (একটু অবাক হয়ে) বাংলাদেশী চা?!
আমি: হ্যাঁ।
স্ভেতা: বাংলাদেশে চা হয়?
আমি: অবশ্যই হয়।
স্ভেতা: আমিতো এতদিন জানতাম যে, ইন্ডিয়ান চা-ই দুনিয়ার সেরা। এখন তো দেখছি তোমাদের দেশের চাও কম না।
আমি: যেই শহরে আমি লেখাপড়া করতাম ওটাও বাংলাদেশে চায়ের জন্মভূমি! আমার জীবনের একটা সময় কেটেছে চা বাগানের পাশে।
স্ভেতা: চা বাগান খুব সুন্দর হয় তাই না? আমি টেলিভিশনে দেখেছি।
আমি: হু। খুব সুন্দর হয় চা বাগান! একেবারে স্বর্গের মতন। তবে ঐ সৌন্দর্য্যের ভিতরেই অনেক কান্না লুকিয়ে আছে!
সভেতা: সে কি রকম?
আমি: আমরা যখন স্কুলে পড়ি। তখন বার কয়েক চা বাগানে গিয়েছিলাম এক্সকারশনে। তা প্রথমবার এক্সকারশনে গিয়ে আমরা যখন চা বাগান দেখে বিমোহিত, চা বাগানের কর্মকর্তাদের বিলাসবহুল ঘরবাড়ী, অফিস, ক্লাব দেখে মুগ্ধ; তখনই আমাদেরকে বাগানের আভ্যন্তরীন কান্নার গল্প শুনিয়েছিলেন একজন।
স্ভেতা: কি রকম?
আমি: চা বাগানের শ্রমিকদেরকে দেখলাম কেমন যেন আমাদের থেকে ভিন্ন। ক্ষুদ্রকায় ঐ শ্রমিকরা বাহ্যিক গড়নে ও কথাবার্তায় আমাদের বাঙালীদের থেকে ভিন্ন। আমরা তখন জানতে চাইলাম যে ওরা কারা? যা শুনলাম তা শুনে তো আমাদের চোখ উঠলো, কপালে। ভীষণ বিমর্ষও হলাম!
স্ভেতা: কেন? কি হয়েছে?! (বিস্ময় ঝরে পড়ছে ওর কন্ঠে!)
আমি: ছোট বেলায় একটা আমেরিকান টিভি সিরিয়াল দেখেছিলাম। কালজয়ী লেখক আলেক্স হ্যালি-র ‘রুটস’ নামক উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় সিরিয়াল-টি।
স্ভেতা: হ্যাঁ। ‘রুটস’ ইদানিং দেখানো হচ্ছে আমাদের এখানকার টেলিভিশনে। আমেরিকান নিগ্রো স্লেভারির উপরে সিরিয়ালটি।
আমি: আমাদের দেশে ঐ টিভি সিরিয়াল আশির দশকেই দেখানো হয়েছে। দেশে বাক-স্বাধীনতা থাকার এই একটা মজা রয়েছে। যা আজ তোমরা বলতে ও দেখতে পারছো, আমরা তা অনেক আগেই পেয়েছি।
স্ভেতা: হ্যাঁ, তাই হবে। যাই হোক, তা তোমাদের দেশের চা বাগানের শ্রমিকদের বিষয়ে বলো।
আমি: কি যে বলবো! বলতে নিজেরই লজ্জ্বা ও দুঃখ লাগছে! আমি একসময় ভেবেছিলাম যে ঐ আমেরিকা ইউরোপে স্লেভারি আছে, আমাদের দেশে তা নেই। অথচ যখন চা-বাগানের শ্রমিকদের কথা জানলাম, তখন আমার মাথা হেট হয়ে এলো!
স্ভেতা: বলতো বিষয়টা কি?
আমি: শুরুটা অবশ্য ইংরেজ উপনিবেশিকরা করেছিলো।
স্ভেতা: ইংরেজ এ’ যুগের সব শয়তানীর মূলে এটা আমি জানি। বলো তারপর
আমি: চায়ের জন্মভূমি চীন। চীনা ভাষায় চা কে ‘ছা’ ও ‘ট্যা’ বলে। ঐ থেকেই চা-য়ের নাম কোথাও ‘চা’, কোথাও ‘টী’। তা ইংরেজরা বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলটা দেখে বুঝলো যে, এই জায়গাটা চা উৎপাদনের জন্য পারফেক্ট। (মনযোগ দিয়ে শুনছে স্ভেতা) সিলেট পাহাড় ও টিলাময়, আবার সেখানে প্রচুর পরিমানে বৃষ্টি হয়। এই দুই-ই চা উৎপাদনের জন্য সবচাইতে বেশি প্রয়োজনীয়। তখন তারা সিলেট শহরের অদূরে ‘মালিনীছড়া’ নামক জায়গায় একটা চায়ের বাগান করার সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু সমস্যা দেখা গেলো শ্রমিক পাওয়া নিয়ে।
স্ভেতা: কেন তোমাদের দেশে তো অনেক বড় জনসংখ্যা, শ্রমিক পাওয়া নিয়ে সমস্যা হবে কেন? এটা রাশিয়ায় হতে পারে, যেখানে দেশ বড় জনসংখ্যা কম।
আমি: হ্যাঁ, এক হিসাবে তাই, কিন্তু অন্য হিসাবে ভিন্ন। আমাদের জনসংখ্যা বড় হলেও দেশটা সুজলা-সুফলা। তাই গ্রামে-গঞ্জে কাজের ও মিনিমাম খাদ্যের কোন অভাব তখন ছিলো না। তাই ঐ চা-বাগানের হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে রাজী হলোনা আমাদের দেশের শ্রমিকরা। তখন ইংরেজরা একটা ব্রুটাল বুদ্ধি আটলো!
স্ভেতা: কি সেই বুদ্ধি?
আমি: ঐ যে স্লেভারী!
স্ভেতা: মানে?
আমি: মানে, আফ্রিকা থেকে দাস ধরে এনে যেমন, মহাসাগরের অপর তীরে নিয়ে জোর করে তাদেরকে দাস বানানো হতো। অনেকটা ওরকমই করা হলো। তখন উপমহাদেশের আসাম ও কিছু পাহাড়ী প্রদেশে চলছিলো খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ! ইংরেজরা সেখানে গিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষদেরকে বললো, “চলো আমাদের সাথে চলো। আমরা তোমাদেরকে নিয়ে যাবো, খুব সুন্দর এক দেশে, সেখানে কোন ক্ষুধার কষ্ট নেই। সুজলা-সুফলা ঐ দেশে শুধু খাবার আর খাবার! ওখানে গেলে তোমরা ভালো থাকবে।” ইংরেজদের দূরভীসন্ধী তারা জানতো না, বুঝতেও পারেনি। খাবারের কথা শুনে তারা রাজী হয়ে গেলো, ব্যাস দল বেধে বেধে তাদেরকে নিয়ে এলো সিলেটের ঐ চা-বাগানগুলোতে। তারপর ইংরেজদের হাতের মুঠোয় এসে তারা সবাই-ই হয়ে গেলো ভূমিদাস বা বাগান-দাস।
স্ভেতা: বলো কি? তারা কোন বিদ্রোহ করেনি?
আমি: কি বিদ্রোহ করবে? দারিদ্র ও ক্ষুধা-পীড়িত হাড়জিড়জিড়ে মানুষ! আর নিজ মুল্লুক ছেড়ে এত দূরে এসে তারা তো সবাই বন্দি খরগোশ হয়ে গেলো! আর সেই থেকেই শুরু হলো তাদের দাস জীবন। তাদেরকে পারিশ্রমিক দেয়া হয় নামমাত্র! অনেকটা না দেয়ার মতই, যা দেয়া হয় তাতে শুধু কোনভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব!
স্ভেতা: চা-বাগানের কোন শ্রমিকের সাথে কথা হয়েছে তোমার?
আমি: হ্যাঁ, হয়েছে। আমি তখন ছোট ছিলাম বারো বৎসর বয়স ছিলো আমার। কিন্তু, আমি তখন সাহস করে শ্রমিকদের সাথে কথা বলে সত্যটা জানতে চেয়েছিলাম।
স্ভেতা: কি বললো?
আমি: একজন শ্রমিককে বললাম, “আপনি কি ভীন দেশ থেকে এই দেশে এসেছেন?” শ্রমিকটি আমাকে বললো, “না, আমি না, আমার দাদা এসেছিলেন ঐ দেশ থেকে। জাহাজে করে এসেছিলেন, সাত সাতদিন সময় লেগেছিলো এখানে আসতে! দাদা বলেছে আমাদেরকে সেই গল্প!” আমার আরেক বন্ধু প্রশ্ন করেছিলো, “আপনার দাদা-দেরকে নাকি মিথ্যে কথা বলে, প্রতারণা করে এই দেশে আনা হয়েছিলো?” বন্ধুর এই প্রশ্নে শ্রমিকটির মুখ কালো হয়ে, প্রায় কান্না কান্না হয়ে গেলো। কিন্তু সে এই প্রশ্নের কোন জবাব দিলো না। কেন যেন মনে হলো যে, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে সে ভয় পাচ্ছে!
স্ভেতা: ইংরেজ তো চলে গেছে অনেক আগে। তা তোমাদের দেশে কি এখনো এই বাগান-দাস প্রথা চালু আছে?
আমি: সেটাই তো বিস্ময়ের ব্যাপার! এই বিংশ শতাব্দীতেও একটি স্বাধীন দেশে প্রচলিত রয়েছে, বাগান-দাস প্রথা। যারা অসুস্থততায় ভালো চিকিৎসাও পায় না। যাদের জীবনযাত্রা মানবেতর। লাইভ-স্টকের মত আচরণ করা হয় যাদের সাথে।
স্ভেতা: এটা যে অমানবিক!
আমি: এক সময় ইংরেজ ও ব্রাহ্মণরা আমাদের পূর্ব বাংলার বাঙালীদের সাথেও ঐ লাইভস্টকের মতই আচরণ করতো। কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রাম যুদ্ধ করে আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদেরকে মুক্ত করেছিলেন ঐ দাসত্ব থেকে।
স্ভেতা: আর আজ? চা-বাগান শ্রমিকদের মুক্তির জন্য তোমাদের নেতৃস্থানীয়রা কিছু করে না?
আমি: সেই প্রশ্ন তো আমারও! হতে পারে যে এই এক্সপ্লয়টেশন তাদের পক্ষে যায়, তাই তারা সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করে!

ব্যাথিত নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো স্ভেতা।

(চলবে)

আরো একটিবার সাজাও পানপাত্র, ও সাকী
(La Phir Aik Bar Wohi Badah-o-Jaam Ae Saqi)
——————– —————- আল্লামা ইকবাল

অনুবাদ: ড. রমিত আজাদ

আরো একটিবার সাজাও ঐ সুরা ও পানপাত্র ও সাকী,
আমার সাচ্চা আবাস আসুক আমার হাতে, ও সাকী!

হিন্দ-এর সুরা-খানা নিরূদ্ধ ছিলো তিন তিনটি শতাব্দী
এই ক্ষণে আমরা আপনার ঔদার্যের কাঙাল ও সাকী;

আমার গজলের শোণিতশিরা শুকিয়ে নীরস হয়ে কয়েক ফোঁটা ছিলো বাকি,
শেইখ ফরমান জারি করলো, “এমনকি এটাও হারাম” ও সাকী!

ন্যায়বিচারের বনানী হারিয়ে গেছে কবে, কোন সিংহ-হৃদয় পুরুষও নেই বাকি,
রয়ে গেছে কেবল সুফী ও মোল্লার খোশামুদেরা, ও সাকী।

কে ছিনিয়ে নিলো অনুরাগের শৌর্যপূর্ণ অসি?
প্রজ্ঞার খালি খাপ পড়ে আছে একাকী, ও সাকী!

পদ্য-দু্যতি ভাস্বর করে জিন্দিগী, যখন হৃদয় ছড়ায় দীপ্তি,
কিন্তু ম্লান হয় চিরতরে যখন ঐ প্রভাগুলো যায় সরে, ও সাকী;

তোমার ভরা পানপাত্রে ঝলকে ওঠে গুলজার পূর্ণিমার রাতি,

এই চন্দ্রসুধা থেকে তৃষ্ণার্ত আমাকে বঞ্চিত করোনা, ও সাকী!

(০৯ ই মে, ২০১৬ দুপুর ০১:১৩)


গল্পের রচনাতারিখ: ২৬শে আগস্ট (মঙ্গলবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: রাত ১২টা ৫২মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.