ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব -ছ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
———————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব -ছ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সন্ধ্যায় ছিলো কি দিনে ছিলো এখন আর মনে নাই। তবে ইন্না একা আমার রুমে আবারো এসেছিলো সেটা মনে আছে। মামুলি কিছু কথা বলতে বলতে, হঠাৎ সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিলো আমাদের। এই শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা আমি স্ভেতার সাথেও করেছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিলো যে, স্ভেতা লেখাপড়ায় ভালো, তাই সাহিত্যও বোঝে ভালোই। কিন্তু ইন্নার সাথে কথা বলে মনে হয়েছিলো যে, ও লেখাপড়ায় তেমন ইন্টেলিজেন্ট না। তারপরেও যেন কি প্রসঙ্গে ওর সাথে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুরু হলো।

আমি: সাহিত্য আমার খুব ভালো লাগে তবে সাহিত্যের কিছু লিমিটেশন আছে বলেও আমার মনে হয়।
ইন্না: কেমন?
আমি: সাহিত্য সংগ্রাম করে ভাষার মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ করার, যা মূলতঃ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
ইন্না: কি রকম?
আমি: মানুষের এমন কিছু আবেগ অনুভূতি আছে, যা কখনোই ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শুনেছি যে, এই কারণেই জ্ঞানী সক্রেটিস কোন বই লেখেননি। মানুষের আবেগ ছাগচর্মে খোদাই করা যায় না বলেই তিনি মনে করতেন।
ইন্না: এত গভীর আলোচনা আমি বুঝিনা।
আমি: তুমি সাহিত্য পড় না?
ইন্না: খুব একটা না। টিভি-সিনেমা দেখি।

আমরা এটা বলতে বলতেই আমার রুমের চলন্ত টিভি-তে কোন একটা আমেরিকান ম্যুভিতে এরোটিক দৃশ্য দেখানো শুরু হলো। টাকা, সেক্স, ক্রাইম, এইতো আমেরিকান সিনেমার মশলা। হয়তো ওখানকার লাইফও তাই। তা এই সিনেমার দৃশ্যে, রূপসী নায়িকা তার হ্যান্ডসাম বয়ফ্রেন্ডের সামনে বস্ত্র-বিসর্জন দিয়ে ধীরে ধীরে নগ্ন হচ্ছে। আর নায়ক পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দর দৃশ্যটা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা দৃশ্যটা দেখে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে লজ্জ্বা পেয়ে গেলাম! আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, কি করবো, টিভি চ্যানেলটা কি চেইঞ্জ করে দেব? ভূতপূর্ব সোভিয়েতে এই একটা বিষয় লক্ষ্যনীয়। কম্যুনিস্ট শাসনামলে টিভি এমনকি সিনেমাতেও কোন নগ্ন দৃশ্য ছিলো না। এটা দেখানো নিষিদ্ধ ছিলো। আর যেই না পরিবর্তনের হাওয়া লাগলো, অমনি অবারিত করে সব দেখাতে লাগলো! এ যেন মিলিটারি স্কুলের কঠোর শাসন থেকে সদ্য ছাড়া পাওয়া কোন এক উঠতি কিশোর। মুক্তির আনন্দে সে যা খুশী তাই করতে শুরু করছে!

ইন্না হঠাৎ খুব একটা এ্যাডাল্ট প্রশ্ন আমাকে করে বসলো।
ইন্না: নয়ন। একজন নগ্নিকাকে দেখতে তোমার কেমন লাগে?
আমি ওর প্রশ্নটা শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও, সাবলীলভাবে উত্তর দিলাম,
আমি: শোন ইন্না, সত্যি করে বলতে কি, আমি কখনো কোন নগ্নিকা-কে দেখিনি। আই মিন, বাস্তবে দেখিনি। টেলিভিশনে দেখেছি। ভিডিও-তে দেখেছি। সাহিত্যে ভাষায় পড়েছি নগ্নিকা-র বিবরণ। আমার স্কুল জীবনে একজন খুব উঁচু মানের সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। স্কুলে না, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করাই উনার প্রাপ্য ছিলো, জানিনা ঠিক কি কারণে তিনি স্কুল শিক্ষকতা বেছে নিয়েছিলেন! আমি বরাবরই সাহিত্যে ইন্টারেস্টেড ছিলাম। তবে আমার শেখা সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ ছিলো উনার কাছ থেকে শেখা। এনিওয়ে, একদিন ক্লাসরুমে তিনি কোন একটি সাহিত্য থেকে একজন প্রেমিকের সামনে দাঁড়ানো তার নগ্ন প্রেমিকার বিবরণ দিচ্ছিলেন। আমি সেইদিন ক্লাসরুমে কোন একটি প্রশ্ন উনাকে করেছিলাম। আমার প্রশ্নের জবাবে তিনি ঐ প্রসঙ্গটি টেনেছিলেন। আমি দাঁড়িয়েছিলাম, বাকি ছাত্ররা বসে ছিলো। স্যার যখন, সেই প্রেমিক যুগলের নগ্ন দৃশ্যের বর্ণনা দিচ্ছিলেন, আমার খুব লজ্জ্বা লাগছিলো! আমার তখন মাত্র সতেরো বৎসর বয়স ছিলো, বুঝতেই পারো।
আনার রঙের রূপসী ইন্না বললো, “এখন তো আর তুমি সতেরো বছর বয়সের ছোট্টটি নও। এখন কি কোন নগ্নিকাকে দেখতে মন চায় না?”
আমি মুখে তাকে কোন জবাব বললাম না। মনে মনে বললাম, “অবশ্যই মন চায়। তবে যাকে ভালোবাসি না, সে যতই রূপসী হোক না কেন, তাকে নগ্ন দেখতে চাই না। আমার সামনে প্রথম যে নারী নগ্ন হবে, সে যেন আমার প্রিয়তমা হয়। যাকে আমি মন উজাড় করে ভালোবাসবো। সে আমার সামনে নগ্ন হবে, কোন বুনো উন্মাদনা থেকে নয়। ধীরে ধীরে সে আমার সামনে তার বসন গুলো খুলবে, একটা আর্টের মতন। সেটা হবে আমার প্রতি তার এক পবিত্র উপহার! আমি মুগ্ধ হয়ে দেখবো একটি অনাবৃত দেহ নয়, বরং একটি সুন্দর ভূবন। যে সৌন্দর্য্যের প্রশংসায় গোটা পৃথিবী ভুলিয়ে দেয়া যায়!”

ইন্না: তোমার কি সাহিত্যিক হওয়ার কোন ইচ্ছা আছে?
আমি: আছে।
ইন্না: তাহলে সায়েন্স নিয়ে পড়ছো কেন?
আমি: ওটাও আমার ফিল্ড অব ইন্টারেস্ট।
ইন্না: তোমার তো দেখছি অনেক রকম ফিল্ড অব ইন্টারেস্ট!
আমি: হ্যাঁ। সেরকমই।
ইন্না: নারীদের প্রতিই শুধু কোন ইন্টারেস্ট নেই, তাই না? (ইন্নার কন্ঠে কোন একটা কটাক্ষ ঝরে পড়লো! আবার সেটা হতাশাও হতে পারে। ওর ইমোশনটা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না। নাকি মেয়েদের ইমোশন এমন রহস্যময়ই হয়, যা ধরা যায়না? অনেকটা মোনালিসার হাসির মতন!)
আমি: না। নারীদের প্রতিও ইন্টারেস্ট আছে। তবে সেই ইন্টারেস্টে রূপভিন্নতা থাকতে পারে, এই আর কি!

সিনেমার দৃশ্যে ইতিমধ্যে নায়ক-নায়িকা স্পর্শসুখের আনন্দে বিভোর হতে শুরু করেছে। তবে আমেরিকান নায়িকার দেহের উপরিভাগ অনাবৃত থাকলেও নীচের অংশে তখনো মোটা জিনসের প্যান্ট পড়া ছিলো। তার উপর দিয়েই নায়ক হাত বুলাচ্ছিলো।

আমি: মেয়েরা মোটা কাপড় পড়লে সেটা ইন্টারেস্টিং হয় না। যেটা তোমাদের দেশের বেশিরভাগ মেয়েই পড়ে। তোমাদের দেশে তো ফ্যাশন হিসাবে জিনসের প্যান্টের ভীষণ কদর!
ইন্না: মোটা ও পাতলা কাপড়ে কি পার্থক্য?
আমি: আছে পার্থক্য। এই ধরো কোন একটা ইমোশনাল মুহূর্তে আমি একটা মেয়েকে আদর করতে চাইলাম। সে যদি মোটা কাপড় পড়া থাকে, তাহলে ঐ আদর করা জমবে না। আমি মোটা কাপড়ের উপর দিয়ে তার শরীরের স্পর্শ খুব একটা ফীল করবো না। আমার মনে হয় সেও সেই আদর খুব একটা উপভোগ করবে না। আবার ওদিকে, মেয়েটি যদি পাতলা কাপড়ে থাকে, যেমনটা থাকে আমাদের দেশের মেয়েরা থাকে, সালোয়ার-কামিজে। তাহলে আমার হাতের তালু, দশ আঙুলের অগ্রভাগ, আর তার শরীরের মধ্যে ব্যবধান খুবই কম! সামান্য পাতলা একটা পর্দা মাত্র। ঐ ক্ষেত্রে স্পর্শ সুখটা খুব ভালোভাবে উপভোগ করা যায়!
ইন্না: এই না বললে যে, তুমি এই জীবনে কোন নগ্নিকা দেখোনি। এখন তো দেখছি, স্পর্শসুখের বেশ বর্ণনা দিচ্ছো!
আমি: না। আমি সত্যিই এই জীবনে কোন নগ্নিকা দেখিনি। কিন্তু, স্পর্শসুখের জন্য তো কোন নগ্নিকা দেখার কোন প্রয়োজন নেই।
ইন্না: তার মানে নারী দেহ স্পর্শের অভিজ্ঞতা তোমার রয়েছে।
আমি: হ্যাঁ। কিছুটা রয়েছে। তবে সেটা কাপড়ের উপর থেকে।
ইন্না: কে ছিলো সেই সৌভাগ্যবতী?
আমি: বলা যাবে না।
ইন্না: কেন?
আমি: সে এখন অনেক দূরে।
ইন্না: কোন অর্থে?
আমি: যে কোন অর্থেই।
ইন্না: মানে সে এই শহরে বা এই দেশে থাকে না, এই তো?
আমি: হ্যাঁ। প্লাস আরো কিছু।
ইন্না: সে কি এখন বিবাহিতা?
আমি: হ্যাঁ।
ইন্না: সে কি তোমার প্রেমিকা ছিলো?
আমি: নাহ্‌। সেরকম অর্থে নয়। তবে ক্ষণিকের প্রেমিকা বলতে পারো।
ইন্না: কোন এক দুর্বল মুহূর্তে এটা ঘটেছিলো, এই তো?
আমি: রাইট ইউ আর।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১২ই আগস্ট (শুক্রবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: সকাল ০৬টা ৩৪মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad


মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.