ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – জ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – জ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

বর্ণবাদ:

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হেটে আসছিলাম ডরমিটরি পর্যন্ত। এখানকার ফুটপাথ যেহেতু খুব চওড়া ও পরিচ্ছন্ন, আবার দুইপাশে রয়েছে উঁচু গাছের সারি, তাই হাটতে বেশ ভালো লাগে। সড়কগুলো এমনভাবে নির্মিত যে খুবই নিরাপদ। চলার পথে হঠাৎ স্ভেতাকে পেয়ে গেলাম। ভাবলাম, ভালোই হলো, চার/পাঁচ কিলোমিটার পথ একা হাটতে বোরিং লাগতো, ওর সাথে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। তাই-ই করছিলাম, দু’জনে মিলে গল্প করতে করতে পথ চলছিলাম। কিলোমিটারখানেক যাওয়ার পর, দেখলাম একজায়গায় কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। ওখানে কিছু শ্রমিক দাঁড়িয়ে ছিলো। এই দেশের শ্রমিকদের লেখাপড়া, আমাদের দেশের শ্রমিকদের চাইতে কিছুটা বেশি। আমাদের দেশে যেমন বেশিরভাগ শ্রমিকই পড়ালেখাই জানে না। এখানকার শ্রমিকরা মিনিমাম লিখতে পড়তে পারে। কেউ কেউ দশক্লাস পর্যন্ত পড়েছেও। তারপরেও দেখা যায় যে ওদের কাজ-কর্ম, চিন্তা-চেতনা, কথা-বার্তা, ইত্যাদির লেভেল খুব উঁচু না। কালচারটাও অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের। মদ্যপানের প্রবণতাও ওদের মধ্যে খুব বেশি। তা আমি আর স্ভেতা যখন ঐ পথ দিয়ে গল্প করতে করতে যাচ্ছিলাম, কয়েকজন শ্রমিক বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাদেরকে দেখতে লাগলো। ওদের চাউনি খুব একটা ভালো মনে হলো না। আমরা ওদের কাছাকাছি পৌঁছুতেই, বয়স্ক একজন শ্রমিক বলেই বসলো, “দেখছিস কাউলা শালা (চেরনোমাজ) যাচ্ছে আমাদের দেশী মেয়ের সাথে!” রুশ ভাষায় ‘চেরনোমাজ’ একটা অপমানজনক শব্দ। শ্বেতাঙ্গ নয়, এমন সব মানুষদেরকে অপমান করার উদ্দেশ্যে তারা এই পরিভাষাটা ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশে থাকতে আমি ভাবতাম যে, রাশিয়া-সোভিয়েতে বর্ণবাদ নাই। বাংলাদেশী কম্যুনিস্ট-রা এমনটাই প্রচার করতো। কিন্তু খোদ রাশিয়া-ইউক্রেণে এসে দেখলাম যে, বিষয়টা মোটেও সেরকম নয়। শেতাঙ্গদের এই দেশের বেশিরভাগ মানুষের মনে বর্ণবাদ-টা খুব ভালোভাবেই আছে!

আমার রুমে বসে কথা হচ্ছিলো। কিছুক্ষণ আগে ইন্না এসেছে আমার রুমে।

ইন্না: কি পড়ছো?
আমি: কবিতার বই
ইন্না: কার লেখা কবিতা?
আমি: আমাদের দেশের জাতীয় কবির লেখা। নাম কাজী নজরুল ইসলাম।
ইন্না: কবিতার বিষয়বস্তু?
আমি: বিরহের কবিত.
ইন্না: (কৌতুক করে বললো) আজ উনার মৃত্যুবার্ষিকী নাকি?
আমি: না উনার মৃত্যুদিবস নিয়ে গড়বড় আছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, উনার মৃত্যুদিবস ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট, দিনটা রবিবার ছিলো। আমাদের দেশের একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভিতে ‘নতুন কুঁড়ি’ নামক একটা অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছিলো। আমি দেখছিলাম সেই অনুষ্ঠান। একটা শিশু বালিকা গান গাইলো, “আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়।’ এই গানের ঠিক পরপরই অনুষ্ঠান থামিয়ে বিটিভি ঘোষিকা জানালেন যে, আমাদের জাতীয় কবি ঢাকার পিজি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
ইন্না: ওহ! তা গড়বড়-টা কি?
আমি: অথচ ইদানিং ২৭ আগস্ট উনার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে।
ইন্না: ও। তা কেন এমন গড়বড় হচ্ছে?
আমি: যা শুনেছি যে, বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী উনার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে এই তালগোল পেকেছে।
ইন্না: তোমাদের কি আলাদা জাতীয় ক্যালেন্ডার আছে?
আমি: আছে তো।
ইন্না: মুসলিম ক্যালেন্ডার? হিজরী সাল? চন্দ্রবৎসর? তোমরা তো মুসলমান।
আমি: না। ঐ ক্যালেন্ডারটা না। হিজরী ক্যালেন্ডার আমরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে থাকি। তাছাড়া, আমাদের বাংলাদেশেরই একটা আলাদা ক্যালেন্ডার আছে, ‘বাংলা সন’ বলি ওটাকে আমরা।
ইন্না: ইন্ডিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে কোন মিল আছে?
আমি: ছিলো একসময়। বিশেষত পহেলা বৈশাখ যেটা আমরা পালন করি, ভারত ও পাকিস্তানের পাঞ্জাবী-রাও বেশ ঘটা করে ওটা পালন করে। তা এখন আর সেই মিল নেই। আমাদের দেশে একটা ‘বাংলা এ্যাকাডেমি’ আছে। সেই এ্যাকাডেমির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারের সম্মতিক্রমে আমাদের বাংলাদেশেরই একটা নিজস্ব ক্যালেন্ডার বানানো হয়েছে। ঐটাকে ‘বাংলা ক্যালেন্ডার’ বলি আমরা।
ইন্না: তাহলে তো ‘বাংলা ক্যালেন্ডার’ না বলে ‘বাংলাদেশী ক্যালেন্ডার’ বললে বেশী এপ্রোপিয়েট হয়।
আমি: আমারও তাই মনে হয়। তবে বাংলা ও বাংলাদেশী নিয়ে একটা ধুম্রজালের মধ্যে আমরা আছি বহু বছর যাবৎ ।
ইন্না: ক্যালেন্ডারের বিষয়টা ইন্টারেস্টিং! আমরা তো খ্রীস্টান ক্যালেন্ডারেই চলি। সারা ইউরোপই তো ঐ ক্যালেন্ডারে চলে।
আমি: জানি। কম্যুনিস্টরা নতুন কোন ক্যালেন্ডার বানায়নি।

ইন্না জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো।
ইন্না: বাইরে অন্ধকার হয়ে এসেছে।
আমি: তোমাদের দেশে এই শীতকালে দুপুর তিনটাতেই সন্ধ্যা নেমে আসে। আবার গরমকালে সন্ধ্যা হয় রাত দশটায়!
ইন্না: তোমাদের দেশে কখন সন্ধ্যা নামে?
আমি: শীতগ্রীস্মে তেমন তারতম্য নেই আমাদের দেশে সন্ধ্যা নামার। শীতকালে সাড়ে পাঁচটার দিকে আর গরমকালে সাতটার দিকে সন্ধ্যা নামে।
ইন্না: হু। ট্রপিকাল কান্ট্রি তো, তাই। আমরা তো উত্তর গোলার্ধেরও উত্তরের মানুষ। তা তোমাদের দেশে ‘ডে লাইট সেভিং’-এর কোন নিয়ম আছে? আমাদের দেশে যেমন শীত-গ্রীস্ম-শীত ট্রানজিশনে ঘড়ির কাটা একঘন্টা এদিক-ওদিক করা হয়।
আমি: না। নেই। আমাদের দেশে যেহেতু শীতগ্রীস্মে সন্ধ্যা নামা বা সূর্যাস্তের তেমন তারতম্য নেই। তাই ‘ডে লাইট সেভিং’-এরও কোন প্রয়োজন নেই। তাছাড়া তোমাদের দেশেও তো এই ‘ডে লাইট সেভিং’ বিষয়টা অতীতে ছিলো না। এটা ‘পেরেস্ত্রইকা’-র পরের ইনক্লুশন। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে আদৌ এনার্জী সেইভ হয় কিনা, এটা কিন্তু এখনও বিতর্কিত।
ইন্না: তুমি ভালো ছাত্র, তুমি বুঝবে। আমি অত জটিল জিনিস বুঝিনা! তবে তোমার কি মনে হয় না যে, এই যুগে আমরা খুব বেশি এনার্জী ব্যবহার করছি?
আমি: আলবৎ মনে হয়।
ইন্না: তাহলে এনার্জী ইকোনমি করার জন্য কি করা উচিৎ?
আমি: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বহু বহু পথ আছে। এক নাম্বারে হইলো লাইফ স্টাইল! বাংলাদেশে সূর্যোদয় হয় ভোর ০৫টা ৩৮ মিনিটে, আর কর্মদিবস শুরু হয় ০৯ বা ১০ ঘটিকায়। তিন/চার ঘন্টা সূর্যালোকের অপচয় ( অথবা সূর্যালোক-কে ব্যবহার করতে না পারা)। এটা শিফট হয়ে যায় রাতে। তার মানে রাতে আমরা অতিরিক্ত তিন/চার ঘন্টা এনার্জি অপচয় করে থাকি। অথচ, আমাদের ধর্মে বলা আছে যে, ‘এশার নামাজের বা ওয়াক্তের পর বিনা ওযরে জেগে থাকা মাকরুহ।’ তার মানে রাত আটটা সাড়ে আটটার পর ঘুমিয়ে যাওয়াটা জরুরী। এইভাবে সূর্যালোকের যদি আমরা ম্যাক্সিমাম ইউজ করি, তাহলে এনার্জীর অপচয় অনেক কম হয়।
ইন্না: সেটা কি হচ্ছে?
আমি: আমার ছোটবেলায় সেটা ছিলো। তখন আমরা বিটিভিতে নাটক -সিনেমা দেখা শেষ করতাম রাত নয়টার দিকে। তারপর ঘুমিয়ে পড়তাম। আর খুব ভোরে উঠে স্কুলে যেতাম সকাল সাতটায়। অফিস-আদালত কাজ শুরু করতো সকাল আটটায়, বিকালের আগেই তাদের কর্মদিবস শেষ হয়ে যেত। এর ফলে তারা পরিবার-কে সময় দিতে পারতো বেশি। পারিবারিক বন্ধন ও সমাজের জন্যও এটা ভালো ছিলো।
ইন্না: হু কথা ঠিক। পারিবারিক বন্ধন খুব ইমপর্টেন্ট একটা বিষয়। এই দেখো ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে হওয়ার কারণে আমি কতই না কষ্ট করছি!

আমি সমবেদনার দৃষ্টি নিয়ে ইন্নার দিকে তাকালাম। খুব কিউট একটা রূপসী মেয়ে! ওর দেহের অপরূপ বাঁকগুলোর দিকে আমার দৃষ্টি গিয়েও যায় না। চাইলে হয়তো ওকে সিডিউস করা যায়, অথবা সিডিউসড হওয়ার জন্য ইন্না প্রস্তুতই আছে। এই দেশে এ কথাটা খুব চলে, ‘তুমি কেমন পুরুষ হে, যে একটা মেয়েকে সিডিউসড করতে পারোনা? এটা তো রিয়েল পুরুষই হলো না!’ তাহলে আমি তা করছি না কেন? হয়তো তখনও আমি ‘লোভাতুর পুরুষ’ হয়ে উঠতে পারিনি!

(চলবে)

লোভাতুর চোখ
————————– রমিত আজাদ

পুরুষালী ঝোঁক, লোভাতুর চোখ, পড়িলো তাহার অঙ্গে;
দৃষ্টি বেয়ারা, পড়ে হয় হারা, তাহার উথাল নিতম্বে।
যদিও মন্দ, কুহকী ছন্দ, কত না সর্বনাশে!
সাগরের ঢেউ, দেখেছ কি কেউ? কেমন দোলায় ত্রাসে!

শাড়ীর আঁচলে, ঢাকেনা তা বলে, উদরের পাটাতন;
লালসার চোখ, সেখানে দেখেছে, ক্ষুধিতের আয়োজন!
একফালী চাঁদ, হানিছে আঘাত, ডাকিনীর অনুনাদ;
কটিদেশে তার, মধু পারাবার, ছলনার প্রতিবাদ।

চাই বা না চাই, তবুও দেখে যাই, তাহার স্তনের স্ফিতি!
পাহাড়িকা জোড়া, ধরণী ফুঁড়িয়া, গগনে দিয়াছে উঁকি!
ওড়নার চাপ পারেনা ঢাকিতে, উৎসুক দুটি শৃঙ্গ,
ফুটেছে কুসুম, ধেয়েছে পিয়াসে, লোভাতুর এই ভৃঙ্গ!

মোহিনী রমনী, উতলা ধরণী প্লাবিয়া করিলো শেষ;
বাদলে ঝরিলো কামনার সুধা, প্রণয়ের ভাবাবেশ!
বক্রতা যত, উঠেছে ফাপিয়া, নয়নে তুলিয়া ঝড়;
শনশন ছোটে, কামনা পবনে; প্রকোপিত ক্ষ্যাপা নর!


গল্পের রচনাতারিখ: ৩০শে আগস্ট (মঙ্গলবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৫টা ০৯মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.