ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – জ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
———————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – জ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

অচেনা, অজানা, প্রেমহীন একটা শরীর ঘেটেঘুটে মজা লোটা জিনিসটা এই সোভিয়েত দেশে আছে প্রচুর পরিমানে। পশ্চিম ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায়ও আছে শুনেছি; তবে সেখানে নাকি বিনোদনের আরো অনেক ব্যবস্থা রয়েছে, যেমন জুয়া খেলা, শেয়ার বাজার, নাইট ক্লাব, বোলিং, বাইকিং, স্কাই ডাইভিং, গ্লাইডিং, কার্নিভাল, ইত্যাদি। এর অনেক কিছুই এখানে কম্যুনিস্ট আমলে আইনতঃ নিষিদ্ধ অথবা অঘোষিত নিষিদ্ধ ছিলো। তাহলে বাকি থাকলো কি? ধনী পেশাজীবিদের কথা আলাদা রাখলে, সাধারণ মানুষ আর ছাত্র-ছাত্রীদের রিক্রিয়েশন ছিলো মূলত দুইটা: ডিসকো নাচ, আর রতিক্রিয়া। শোনা যায় যে, রাষ্ট্রপতি কেনেডির হত্যাকারী ‘লি হার্ভে অসওয়াল্ড’ বড় আশা করে সোভিয়েতে থেকে গিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন এই সেই দেশ যেখানে শ্রমিকদের পূর্ণ মর্যাদা দেয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন থাকার পর সে টের পেয়েছিলো যে, এখানে বিনোদনের কিছুই নাই, ট্রেড ইউনিয়নের নাচের অনুষ্ঠান ছাড়া। এটা ধীরে ধীরে তার কাছে ভীষণ বোরিং মনে হতে শুরু করে! এখন ব্যাপারটা যদি তাই হয় যে, দেশে বিনোদনের তেমন কিছুই নাই, তাহলে রতিক্রিয়া পরিমানে কিছু বেশি হবে এটাই তো স্বাভাবিক! তাছাড়া এখানকার স্টুডেন্ট’স হোস্টেলগুলো যৌথ; মানে নারী-পুরুষ একই হোস্টেলে থাকে, তাই দূরত্বজনিত অথবা বস্তুগত কোন বাধাও নাই!

ছেলেমেয়ে কিছুদিন আলাপ-পরিচয়ের পর ভালো লাগলো তারপর চলে গেলো শারিরীক সম্পর্কে; এটা সোভিয়েত দেশে খুবই স্বাভাবিক ছিলো। আরো ছিলো ‘ইনসিডেন্টাল সেক্স’; যেমন, কোন পার্কে অথবা ডিসকো নাচে গিয়ে কারো সাথে পরিচয় হলো তারপর তারা ওখান থেকেই সোজা চলে গেলো পালঙ্কে। আরো ছিলো মাতাল অবস্থায় সেক্স। মানে, তেমন কোন ইচ্ছা হয়তোবা কারোই ছিলো না; কিন্তু শরাব পানে নেশার ঘোরে চলে গেলো শারীরিক বিনোদনে। মুসলিম পাঠকগণ, এমন বর্ণনা শুনে মনে করতে পারেন যে, এতটাই বেসামাল অবস্থা ছিলো! কোন ধর্মীয় অনুশাসন বা টাবু কি ছিলো না?! নারে ভাই, কম্যুনিস্ট-রা ধর্ম মানে না। সে দেশে তখন নাস্তিকরা ছিলো ক্ষমতায়, তাদের কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো ছিলো মিনিংলেস মৌলবাদ। প্যারালালী, পরকালের কোন ভয়ই তো নাই, তাই বাঙালী ‘চারবাক দার্শনিক’-দের মতন তারাও মনে করতো যে, জীবন যেহেতু একটাই, অতএব এটাকে পূর্ণমাত্রায় ভোগ করে যাও। ভোগবাদী দর্শন বলে একে।

আমি একসময় ভাবতাম যে, কম্যুনিস্টদের দেশে আইনের শাসন খুব কড়াকড়ি, তাই এখানে ক্রাইম কম। পরে অবশ্য সত্য জানতে পেরেছিলাম যে, ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়। বরং একদলীয় শাসনতন্ত্রের স্বৈরাচারী দেশে আইন হলো কাঁচকলা! এখানে কালো টাকাই আইন চালায়! গণতন্ত্র বা বাকস্বাধীনতা যেহেতু নাই, এ্যাকর্ডিংলী ফেয়ার জার্নালিজমও নাই; তাই কে কোথায় কিই বা বলবে? কম্যুনিস্ট দেশের আইনের কড়াকড়ি ও প্রয়োগ ছিলো শুধু বিরোধী মতাবলম্বীদের জন্য। কেউ শাসকদের বিরুদ্ধে কিছু বলেছে তো শেষ! সেই মধ্যযুগীয় ক্যাথলিক চার্চের কায়দায় ইনকুইজিশন! গুম, খুন, জেল, জুলুম, পরিবারের সদস্যদেরকে হয়রানী, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করণ, ইত্যাদি।

যেসব দেশে কখনো কম্যুনিস্ট শাসন ছিলো না, তারা হয়তো বলতে পারে যে, “কই কম্যুনিস্টরা তো কত মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে! শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা, মৌলিক চাহিদা পূরণ, শ্রমের মর্যাদা, মানবাধিকার, ইত্যাদি কত যে কি!” আমি বলি, “রাইট। তবে দুষ্ট লোকের মিষ্ট কথায় কখনো ভুলিও না।” ইয়েস, কম্যুনিস্ট বা এই টাইপরা ক্ষমতায় আসার আগে অবিরাম মিষ্ট কথাই বলে যায়, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারা তাদের স্বরূপে আবির্ভুত হয়। যেই গণতন্ত্রের আঁতুর ঘরে, গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে কম্যুনিস্টদের জন্ম, ক্ষমতায় আরোহিত হওয়ার পর, প্রথম সুযোগেই তারা সেই গণতন্ত্রকে হত্যা করে। তারপর শুরু করে নিজ দেশে গণহত্যা।

যাহোক, আমার গল্প ইউক্রেণের ইন্না, স্ভেতা, তানিয়াদেরকে নিয়ে। এই গল্প বিশেষত ইউক্রেণের ইন্নাকে নিয়ে। পরবর্তি এক সন্ধ্যায় ইন্না ও তানিয়া দু’জনে এলো আমার রূমে। টিভি দেখতে দেখতে ও কফি খেতে খেতে আমাদের আলাপ চলছিলো।

তানিয়া: এই ইন্নাটা ভীষণ দুষ্টু।
আমি: কি রকম?
তানিয়া: কি রকম? হুহ্‌! ওর বয়ফ্রেন্ডদের জিজ্ঞাসা করে দেখো!
আমি: বয়ফ্রেন্ডদের? প্লুরাল নাম্বার!
আমার কথা শুনে ওরা দুজনাই চুপ মেরে গেলো।
আমি: ইন্নাকে দেখলে কিন্তু ভীষণ সরল ও ইন্নোসেন্ট মনে হয়।
তানিয়া: ইন্নোসেন্ট-ই ছিলো ও। ভীষণ ইন্নোসেন্ট ছিলো। তারপর একটা ঘটনার পর পাল্টে গেলো! (তানিয়ার গলার স্বরটা একটু ভার ভার মনে হলো।)
আমি: কি সেই ঘটনা?
ইন্না: থাক। বলার দরকার নেই। (বলতে বাধা দিলো সে তানিয়াকে)
আমি আর কথা বাড়ালাম না। মানুষের জীবনে কত কিছুই তো ঘটে। তার উপর ইন্না ইতিমধ্যে তার পরিবারের জটিলতার কথাও আমাকে জানিয়েছে! দুঃখের কথাগুলো বেশি আলোচনা না করাই ভালো। অনেকেই আমাকে বলে যে, “আপনি যখন কোন আড্ডায় বসেন এত এত জোক করেন কেন?” আমি বলি, “আড্ডাটাকে প্রাণবন্ত রাখতে চাই। কোন জটিল অথবা দুঃখের কথা টেনে পরিবেশ ভারী করতে চাই না। অমন হালকা সুন্দর পরিবেশে সবাই খুব রিলাক্সড হয়! এই দেখুন আমার চারদিকে আপনারা ভীড় জমান কেন? ঐ পরিবেশের টানেই নয় কি?” তারা এক বাক্যে মেনে নেয় যে, হ্যাঁ তাই-ই। আমি বলি যে, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ছিলেন এমন একজন হাসিখুশী মানুষ। তিনি তার জীবনের সব দুঃখ লুকিয়ে রেখে মানুষদের আনন্দ দিতেন। শোনা যায় যে, যেই আসরে নজরুল থাকতেন, সেই আসরে কেউ ঘড়ির দিকে তাকাতো না!

আমরা আলাপ করতে করতে স্ভেতা এসে পড়লো। বললো, “তোমরা সবাই, এখানে? আর আমি তোমাদের খুঁজছিলাম।”
আমি: বসো। টিভি দেখি, গল্প করি। কি খাবে চা নাকি কফি?
স্ভেতা: চা, কফি, কিছুই এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।
আমি: তাহলে খাবে কি? ঠান্ডার দিনে তো আর ঠান্ডা কিছু অফার করতে পারিনা।
স্ভেতা: ঠান্ডা কিছু আছে?
আমি: লিমোনেড আছে।
স্ভেতা: আছে? তাহলে তাই-ই দাও। আমার এখন লিমোনেড-ই খেতে ইচ্ছে করছে।
ফ্রীজ খুলে লিমোনেড বের করে দিলাম ওকে।
ইন্না: জানো, আজ বিকালে কে এসেছিলো?
আমি: না জানিনা। কে এসেছিলো?
ইন্না: ভ্লাদিমির।
আমি: কোন ভ্লাদিমির?
ইন্না: ঐ যে, ঐদিন তানিয়াদের রুমে একজনকে দেখলে না?
আমি: ও হ্যাঁ। বেশ ভদ্র একটা ছেলে। দেখতেও সুন্দর!
ইন্না: আমরা ঠিক করেছি যে, ওর সাথে আমাদের তানিয়াকে বিয়ে দিয়ে দেব।
আমি এবার কৌতুকের হাসি হাসলাম। বললাম, “তানিয়া কি রাজী?” এই শুনে তানিয়া লাজুক হাসলো। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, “আর ভ্লাদিমির কি বলে?”
তানিয়া: ভ্লাদিমির বলে যে, এখন দেশে দুর্দিন চলছে। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। ওর বিয়ে করার সাধ থাকলেও, সাধ্য নাই কোন।
আমি: কেন কেন? ভ্লাদিমির তো চাকরী করে, তাহলে?
তানিয়া: ভ্লাদিমির বলে যে, চাকরীতে যে বেতন পায় সেটা ঘোড়ার ডিম! তার নিজেরই চলে না, বৌকে কি খাওয়াবে?!
বিষয়টা সেন্সেটিভ! আমি জানি যে, ইকোনমিক ক্রাইসিস-এর জন্য এদেশে এখন অনেকেই সংসার টানতে পারছে না। বিয়ে করতে পারছে না মনের মেয়েটাকে। তাই পরিবেশ হালকা করার জন্য আমি কৌতুক করে বললাম, “বিয়ে না করাই ভালো।”
ইন্না: কেন কেন?
আমি: বিয়ে সম্পর্কে বেশ কিছু মজার মজার কথা রয়েছে, শুনবে?
ইন্না: হুম। বলো বলো।
আমি: ১. বিয়ে না করলে ছেলেরা সারাজীবন ধরে ভাবত, তাদের জীবনে কোন ভুল নেই। ২. এটা সত্যি যে ভালোবাসা অন্ধ, তবে বিয়ে চোখ খুলে দেয়। ৩. ছেলেটি বলেছিল মেয়েটির জন্য সে নরক পর্যন্ত যেতে রাজী। সৃষ্টিকর্তা তাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন। তাদের বিয়ে হয়েছে।
এইসব শুনে ইন্না, স্ভেতা, তানিয়া, সবাই হি হি করে হাসতে থাকলো।
আমি: এবার মণিষীরা কি বলেছেন শুনবে?
ইন্না: (হাসতে হাসতে) হ্যাঁ বলো।
আমি: ১. বিয়ে করার অর্থ হচ্ছে নিজের অধিকারকে অর্ধেক করে নেওয়া এবং কর্তব্যকে দ্বিগুণ করা। -শুপেনহাওয়ার । ২. বিয়েটা একটা রোমাঞ্চকর উপন্যাস, যার প্রথম পরিচ্ছেদেই নায়কের মৃত্যু হয়ে থাকে। -উইলিয়াম সেক্সপিয়র।

এবার ওরা সবাই সমস্বরে হেসে উঠলো, “হা, হা, হা!!!”

(চলবে)

‘তোমারি আঁখির মত আকাশের দুটি তারা
চেয়ে থাকে মোর পানে নিশীথে তন্দ্রাহারা।
সে কি তুমি? সে কি তুমি?

ক্ষীণ আঁখি-দীপ জ্বালি বাতায়নে জাগি একা,
অসীম অন্ধকারে খুঁজি তব পথ-রেখা,
সহসা দখিনবায়ে চাঁপাবনে জাগে সাড়া।
সে কি তুমি? সে কি তুমি?

তব স্মৃতি যদি ভুলি ক্ষণতরে আন-কাজে,
কে যেন কাঁদিয়া ওঠে আমার বুকের মাঝে।
সে কি তুমি, সে কি তুমি?

বৈশাখী ঝড়ে রাতে চমকিয়া উঠি জেগে
বুঝি অশান্ত মম আসিলে ঝড়ের বেগে
ঝড় চলে যায় কেঁদে ঢালিয়া শ্রাবণধারা।
সে কি তুমি? সে কি তুমি?’
—————————— কাজী নজরুল ইসলাম


রচনাতারিখ: ১৪ই আগস্ট (রবিবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: রাত ০১টা ৩৫মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.