ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ঝ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ঝ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মিখাইল গর্বাচেভ:
ইন্না, স্ভেতা ও তানিয়া তিনজনই বসে ছিলো আমার রুমে তিভিতে তখন ‘টক শো’ চলছিলো। ‘টক শো’-র ভিতর কয়েকবার মিখাইল গর্বাচেভ-এর ছবি দেখানো হলো। এই দেশের এই একটি লক্ষ্যণীয় বিষয়। কম্যুনিস্টদের থিওরী অনুযায়ী দেশের মালিক হলো দেশের কৃষক-শ্রমিক-আমজনতা। অথচ কম্যুনিস্টরা দেশের সিংহাসনে আরোহন করার পর থেকে সবচাইতে বেশী নিগৃহিত হতে থাকে এই সাধারণ মানুষরাই। থিওরেটিকাল দেশের মালিকরা কথা বলার সাহসটুকু পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে! সবার টুটি চেপে ধরে কম্যুনিস্ট সরকার। তারপর ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সবাই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। যেখানে সকলের দমবন্ধ হয়ে আসছিলো, সেই দেশেই মানুষ মুক্ত নিশ্বাস নিতে শুরু করে। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় শুরু হয় টক শো। খোলাখুলিভাবে সবাই সবার মত প্রকাশ করতে শুরু করে। একই আলোচনায় বসে ডিসকাস করতে থাকে কম্যুনিস্ট, ডেমোক্রেট, কনজারভেটিভ, মৌলবাদী, শোভিনিস্ট, সকলেই। এই বিশাল সোভিয়েত দেশের মানুষদের যিনি মুক্তি দিয়েছিলেন তাঁর নাম মিখাইল সেরগেইভিচ গর্বাচভ। উনার ডাক নাম মিখাইল বা মিশা; আর সারা বিশ্বে তিনি পরিচিত তার সারনেইম বা পদবী ‘গর্বাচেভ’ নামে।

উনার নাম প্রথম পড়েছিলাম বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকায় সেই ১৯৮৫ সালে। হঠাৎ করেই দৈনিক সংবাদপত্র মারফত জানতে পারলাম যে সোভিয়েত নেতা চেরনেনকো মৃত্যুবরণ করেছেন। স্বভাবতই আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছিলো যে, এর পরে কে হবেন সোভিয়েত নেতা? লিওনিদ ব্রেজনেভ ক্ষমতায় ছিলেন দীর্ঘ একটা সময়। সোভিয়েত দেশে জাতীয় নির্বাচন-টির্বাচনের কোন বালাই ছিলো না। একদলীয় শাসনতন্ত্রের পলিটব্যুরোর সদস্যরা নিজেরা নিজেরাই ঠিক করে নিতেন কে কি হবেন। তা সবারই ধারনা ছিলো যে লিওনিদ ব্রেজনেভ-এর মৃত্যুর পরে সোভিয়েত প্রধান হবেন জনাব চেরনেনকো। কিন্তু সেটা না হয়ে দেখা গেলো যে সোভিয়েত প্রধান হলেন ইউরি আন্দ্রোপভ। এতে সারা বিশ্বের মানুষের মনেই একটা খটকা লেগেছিলো! তাহলে কি সোভিয়েত দেশে তলে তলে কিছু একটা ঘটছে? মনে হয় কিছু একটা ঘটে চলেছে, যা বোঝা গেলো যখন আন্দ্রোপভ এক ধরনের নড়াচড়া শুরু করলেন, এবং যার অংশ হিসাবে তিনি দুর্নীতি মামলায় জেলে ঢুকালেন জনাব ব্রেজনেভ-এর জামাতা ইউরি চুরবানোভ-কে। ব্রেজনেভ-এর কন্যার সাথে বিবাহের পূর্বে এই চুরবানোভ ছিলেন একজন সাধারণ পুলিশ অফিসার, অথচ সোভিয়েত প্রধানের মেয়ের সাথে বিয়ের পরপরই তিনি এক্সিলারেটেড প্রমোশন পেয়ে চার বছরের মাথায়ই হয়ে যান First Deputy Minister of the Ministry of Internal Affairs, এমনকি তিনি জেনারেল র‍্যাংকও পেয়ে যান; অবিকল সেই রাজা-বাদশাদের সামন্ততান্ত্রিক শাসনামলের মতন। যাহোক, পরবর্তি সোভিয়েত প্রধান আন্দ্রোপভ ক্ষমতায় থাকতে পারলেন খুবই অল্প সময়, মাত্র এক বৎসর তিনমাস। তারপর ঠিকই সোভিয়েত নেতা হলেন জনাব চেরনেনকো, কিন্তু তিনিও এক বৎসরের বেশি সময় বাঁচলেন না। ১০ মার্চ ১৯৮৫ আলে Chernenko মারা যান। এই পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে একটা শূণ্যতার সৃষ্টি হয়। অনেকের মনেই ভাবনা ছিলো যে পরবর্তি সোভিয়েত নেতা কে হবেন।

সোভিয়েত পলিটব্যুরো যখন এই নিয়ে সভায় বসলো, তখন বর্ষিয়ান নেতা আন্দ্রেই গ্রোমিকো পলিটব্যুরোর অপেক্ষাকৃত ইয়াং সদস্য
মিখাইল গর্বাচেভকে পরবর্তী সোভিয়েত নেতা (সাধারণ সম্পাদক) হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন; বর্ষিয়ান পার্টি সদস্য হিসাবে, Gromyko এর সুপারিশ কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে অনেক গুরুত্ব বহন করেছিলো। গর্বাচেভ ভেবেছিলেন যে, সাধারণ সম্পাদক হিসাবে তার মনোনয়নের অনেক বিরোধিতা হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পলিটব্যুরোর বাকি অংশ তাকে সমর্থন করেছিল। চেরনেঙ্কোর মৃত্যুর পরপরই, পলিটব্যুরো সর্বসম্মতিক্রমে গর্বাচেভকে তার উত্তরসূরি নির্বাচিত করে; তারা তাকে অন্য কোন বয়স্ক নেতার চেয়ে
বেশি চেয়েছিলেন। এভাবে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের অষ্টম নেতা হন। সরকারের মধ্যে খুব কম সদস্যরাই কল্পনা করেছিলেন যে তিনি একজন বড় সংস্কারক হতে পারবেন। যদিও সোভিয়েত জনসাধারণের কাছে তিনি তখনও সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, তবে অন্যদিকে ব্যাপক স্বস্তি ছিল যে নতুন নেতা বয়স্ক এবং অসুস্থ ছিলেন না। নেতা হিসাবে গর্বাচেভের প্রথম জনসাধারণের উপস্থিতি ছিল চেরনেঙ্কোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে, যা ১৪ই মার্চ ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্বাচিত হওয়ার দুই মাস পর, তিনি প্রথমবারের মতো মস্কোর বাইরে, লেনিনগ্রাদ শহরে ভ্রমণ করেন, যেখানে তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন। জুন মাসে তিনি ইউক্রেন ভ্রমণ করেন, জুলাই মাসে বেলারুশে এবং সেপ্টেম্বরে টিউমেন ওব্লাস্টে যান, স্থানীয় সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য এই এলাকার পার্টি সদস্যদের আরও দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।

অল্প কিছুকাল পরে আমরা বিশ্ববাসীরা নতুন দুইটি শব্দের সাথে পরিচিত হলাম, ‘পেরেস্ত্রোইকা’ এবং ‘গ্লাস্তনস্ত’। আমরা বাংলাদেশের যেসব ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনীতিতে ইন্টারেস্টেড ছিলাম, তারা বেশ উৎসুক হয়ে এই নিয়ে লেখাপড়া করতে শুরু করলাম। আমি মিখাইল গর্বাচভ কর্তৃক গৃহীত এই দুই কালজয়ী ও ইতিহাসখ্যাত নীতি নিয়ে পরবর্তি পর্বে বিস্তারিত লিখবো।

আপাতত আরেকটি বড় ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে লিখছি। এতকাল আমরা দুই রাজনৈতিক মতাদর্শ ‘কম্যুনিজম’ ও ‘ক্যাপিটালিজম’-এর দুই পালের গোদা ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ ও ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র’ শক্তিদ্বয়ের মধ্যে কেবল রেষারেষিই দেখেছি। তারা বলতে গেলে একে অপরের মুখই দর্শন করতো না। ব্রেজনেভ, চেরনেনকো বা আন্দ্রোপভের মৃত্যুর পর তাদের অন্তোস্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে মস্কোতে যাননি কোন মার্কিন রাষ্ট্রপতি। কার্টেসী হিসাবে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন মার্কিন উপ-রাষ্ট্রপতিগণ। অপরদিকে কোন সোভিয়েত নেতাও কখনো ওয়াশিংটনে যেতেন না। ঐ যে আড়ি নেয়া যাকে বলে।

কিন্তু মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মনে হলো, বরফ যেন গলতে শুরু করেছে! তাই হলো, জাঁদরেল মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগ্যান সম্মত হলেন মস্কো বা ওয়াশিংটনের বাইরে কোথাও সোভিয়েত নেতার সাথে সামিটে বসতে। পত্রিকা মারফত আমরা জানতে পারলাম যে দিনক্ষণও ঠিক হলো। যতদূর জানি যে ১৯৮৫ সালের ১৯শে নভেম্বরে তারা দু’জন (রোনাল্ড রিগ্যান ও মিখাইল গর্বাচেভ) জেনেভায় সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দুই শক্তিধরের মধ্যে আলোচনা হবে নানাবিধ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমস্যাদি নিয়ে। ও হ্যাঁ ‘স্টার ওয়ার’ নিয়েও আলোচনা হবে।

সেইদিন রাতে আমরা সবাই বিটিভির সামনে অপেক্ষা করছিলাম ঐ ঐতিহাসিক সামিটের সংবাদ দেখার জন্য। দৃশ্যটা এখনও মনে পড়ে। দুইদিক থেকে দুইটি গাড়ী থেকে নামলেন উনারা দু’জন। জনাব রিগান-কে দেখে হাত তুলে সালাম জানালেন জনাব গর্বাচেভ। সেই প্রথম মুখোমুখী দেখা হলো শক্তিধর দুই নেতার।

(গতকাল ৩০শে আগস্ট, ২০২২ সালে মিখাইল গর্বাচভ এই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। তিনি পৃথিবী ছেড়ে গেলেও পৃথিবী উনাকে বিদায় জানাবে না। গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ এবং কম্যুনিস্ট নির্যাতন থেকে কোটি কোটি মানুষকে মুক্তি দেয়া এই মহানুভব নেতাকে পৃথিবীর ইতিহাস মনে রাখবে। চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে উনাকে স্মরণ করবে গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষেরা।

আমি অতি ক্ষুদ্র একজন মানব। তবুও উনাকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে আমি আমার এই গল্পটি মিখাইল গর্বাচভ-কে উৎসর্গ করলাম)

(চলবে)

Flow of the Moskva
Down to Gorky Park
Listening to the wind of change
An August summer night
Soldiers passed by
Listening to the wind of change.

The world is closing in
Did you ever think
That we could be so close, like brothers
The future’s in the air
Can feel it everywhere
Blowing with the wind of change.

Take me to the magic of the moment
On a glory night
Where the children of tomorrow dream away
In the wind of change.

Walking down the street
Distant memories
Are buried in the past, forever
I follow the Moskva
Down to Gorky Park
Listening to the wind of change.

Take me to the magic of the moment
On a glory night
Where the children of tomorrow share their dreams
With you and me
Take me to the magic of the moment
On a glory night
Where the children of tomorrow dream away
In the wind of change.

The wind of change
Blows straight into the face of time
Like a storm wind that will ring the freedom bell
For peace of mind
Let your balalaika sing
What my guitar wants to say.

Take me to the magic of the moment
On a glory night
Where the children of tomorrow share their dreams.

With you and me
Take me to the magic of the moment
On a glory night
Where the children of tomorrow dream away

In the wind of change.

গল্পের রচনাতারিখ: ৩১শে আগস্ট (বুধবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: দুপুর ০২টা ৫৪মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:
https://www.facebook.com/ramit.azad/posts/pfbid02w4Rm4csRyyzpMeQozCMgktC8gDjYPYYq7CUyBSBYuim8YnKfYoGtQcoicuLedHpwl

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.