ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ঞ -সাবাস গর্বাচভ,)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ঞ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সাবাস গর্বাচভ, স্যালুট গর্বাচভ!:

এলোমেলো কত কথাই তো মনে পড়ে। যখন আমরা স্কুল জীবনে ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাস্তনস্ত’ শব্দ দুইটি শুনলাম, ভাবতে শুরু করলাম, কি এইটা? কেমন অদ্ভুত দুইটা শব্দ! ইতিপূর্বে রুশ বা সোভিয়েত সাহিত্য পড়েছি অনেক। লেভ তলস্তয়, ফিওদর দস্তয়ভস্কি, মাক্সিম গোর্কী, আলেকজান্ডার পুশকিন, মিখাইল শোলখভ, খুটিয়ে খুটিয়ে পড়তাম। ছোট বেলায় পড়েছিলাম ননী ভৌমিক অনুদিত ছোটদের জন্য লেখাগুলো। আমাদের সংস্কৃতিও নয়, ইংরেজ সংস্কৃতিও নয়, মাঝামাঝি একটা কিছু হবে, এরকমই ভাবতাম রুশ সংস্কৃতি সম্পর্কে তবে কেন যেন মনে হতো যে, রুশ সংস্কৃতি পশ্চিমা নয়, বরং আমাদের বাংলাদেশী সংস্কৃতির কাছাকাছি। রুশ লেখকদের নাম ও অন্যান্য পরিচিত শব্দে ‘ভ’ ধ্বনিটির প্রভাব দেখতে পেতাম বেশি। ভাবতাম, ওরা বোধহয় ‘ভ’ প্রিয়, যেমন আমরা ‘শ’ প্রিয়! তা ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাস্তনস্ত’ শব্দ দুইটির মধ্যে কোন ‘ভ’ নাই; তাই ভাবতাম অর্থ কি এদের? তারপর পত্র্পত্রিকা পড়ে জানলাম যে, ‘পেরেস্ত্রোইকা’ মানে Reconstruction (পুনর্গঠন), এবং ‘গ্লাস্তনস্ত’ মানে Openness (উন্মুক্ততা), তবে আমরা তখন ‘গ্লাস্তনস্ত’ মানে বাক-স্বাধীনতা বুঝেছিলাম।

আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করলাম। আমরা তো এতকাল ভেবে এসেছি যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি শোষণমুক্ত রাষ্ট্র। ওখানে সকলের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়ে গেছে, কেউ দুমুঠো ভাতের জন্য কাঁদেনা। কাপড়ের অভাবে কেউ মাছ ধরার জাল পড়ে থাকে না। ঐ দেশে কোন দুর্নীতি নেই, ওখানে কোন কম্বল চোরা নাই! ঐদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী ভালো তারা ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে নামা মিছিলে গুলি চালায় না। ইত্যাদি, ইত্যাদি। তাহলে সিস্টেমটিকে পুনর্গঠন করতে হবে কেন? পারফেক্ট একটা সিস্টেমকে তো পুনর্গঠন করতে হয় না!

ওদিকে ‘গ্লাস্তনস্ত’ বা উন্মুক্ততা-ই বা কি? লোকে কথা বলতে চায়? কেন তারা কথা বলতে পারে না? যে দেশে কোন শোষণ নাই, যে দেশে কোন মৌলিক চাহিদার অভাব নাই, যে দেশে আইন-শৃঙ্খলা ক্যাডেট কলেজের মত সুন্দর, সেই দেশে কি আর কথা বলার কোন দরকার পড়ে? কি কথা বলতে চায় তারা?

আবার মনে পড়লো ছেলেবেলার সেই গৃহশিক্ষকের কথা, “বুঝলে মন্তব্য নিস্প্রোয়জন’ কথাটি হলো কম্যুনিস্টদের কথা। কম্যুনিস্ট শাসকরা বলে, ‘হে জনগণ তোমাদের এত কথা বলার দরকারটা কি হে? আমরাই তো ভালো বুঝি যে, কি করতে হবে। তোমরা শুধু দেখে যাবে, কিছু বলতে পারবে না।'”

আরো মনে প্রশ্ন জাগলো আফগান যুদ্ধ নিয়ে। সোভিয়েতরা আফগানিস্তান আক্রমণ করলো কেন? কি চায় তারা সেখানে? আর একটি বিষয় বুঝতাম না, তা হলো বার্লিন প্রাচীর। কি এই বার্লিন প্রাচীর? কেন এটা নির্মান করা হয়েছিলো? কেন পূর্ব জার্মানীর মানুষেরা মাটির নিচ দিয়ে সুরঙ্গ খুঁড়ে, বার্লিন প্রাচীর পেরিয়ে পশ্চিম জার্মানীতে চলে আসতে চায়? পূর্ব জার্মানীর মানুষেরা কি সুখে নেই?

আমার হাতে একটা বই পড়েছিলো নাম তার PERESTROIKA: New Thinking for Our Country and the World, লিখেছেন মিখাইল গর্বাচভ। বইটা আমার হাতে পড়েছিলো ১৯৮৮ সালে। সম্ভবত ঐ বছরই তিনি বইটি লেখেন। ততদিনে ভয়াবহ ক্ষত আফগান যুদ্ধ পরিসমাপ্তি-র পথে। বার্লিন প্রাচীর এই ভাঙলো বলে! আর মিখাইল গর্বাচভ তখন একদিকে পৃথিবীর সর্বাধিক ক্ষমতাবান ব্যাক্তি (সবচাইতে শক্তিধর সাম্রাজ্যের সম্রাট), আরেকদিকে তিনি নিজ দেশে ও দেশের বাইরে সব চাইতে জনপ্রিয় ব্যক্তি।

ইতিপূর্বে আমরা যে সকল সোভিয়েত কম্যুনিস্ট নেতাদের মিডিয়া পর্দায় দেখেছিলাম, তারা কেউ হাসতে জানতেন না! বিশাল সিরিয়াস ছিলো এক একজনার মুখের অভিব্যাক্তি! কিন্তু মিখাইল সের্গেইভিচ হাসতেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে হাসতেন তাঁর রূপসী স্ত্রী ‘রাইসা’। রাইসাকে দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলো বাংলাদেশের মানুষেরা যে, অনেকেই তখন নিজেদের কন্যাদের নাম ‘রাইসা’ রাখতে শুরু করেন।

আমি মিখাইল গর্বাচেভ-এর লেখা বইটা পড়তে শুরু করলাম। মাত্র আঠারো বৎসর বয়সের আমার কাছে ঐ বই বেশ দুর্বোধ্য মনে হতে লাগলো, নিজ জ্ঞানের অভাবের কারণে। তাও পড়লাম। যতই পড়ি, ততই মনে খটকা লাগতে শুরু করে। এতকাল বড় ভাই-ব্রাদার, চাচা-আঙ্কেল অনেককেই পেয়েছিলাম যারা লাল পতাকা আর পোস্টার হাতে নিয়ে ‘লাল সালাম’, ‘লাল সালাম’ শ্লোগান দিয়ে ছুটতেন। আর শুধু বলতেন “‘সমাজতন্ত্র’ ভালো আমাদের দেশে এটা কায়েম করতে হবে।” এবার যখন আমার মনে অনেক খটকা ও প্রশ্ন জড়ো হলো, তখন আর তা ব্যাখ্যা করার জন্য কাউকে পেলাম না। দুই-একজন বললেন, “যা হচ্ছে তা প্রথমবারের মতন হচ্ছে/ আমরা নিজেরাও মাথা-মুন্ডু কিছু বুঝতে পারছি না!”

পরবর্তিকালে অবশ্য বুঝতে পেরেছিলাম যে, উনারা যা জানতেন তা সবই ছিলো একতরফা বক্তব্য আর কিছু গাল ভরা সামাজিক ( অবৈজ্ঞানিক) থিওরী। ঐ তরফের কোন বক্তব্য, আর্গুমেন্ট, যুক্তি কিছুই উনাদের জানা ছিলো না। জানা ছিলো না, অনেক নির্মম সত্য।

আমি যা কিছু জানলাম, তা জানলাম সোভিয়েতের মাটিতে পা রাখার পর। ততদিনে সোভিয়েতের মানুষ কথা বলার অধিকার পেয়েছে। গর্বাচভ তাদেরকে সেই অধিকার দিয়েছেন। এই গর্বাচভ-ই সেই গর্বাচভ যিনি সোভিয়েত পলিটব্যুরোর সদস্য থাকা সত্বেও ‘আফগান যুদ্ধ’-এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ও আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন যেন সৈন্য না পাঠায় ঐ রেজুলুশনে নির্ভিক স্বাক্ষর করেছিলেন। গর্বাচভ -এর দেয়া বাক-স্বাধীনতা পেয়ে, জনগণ শুধু বলতেই থাকলো, তাদের বলা যেন আর থামেনা, এতকালের পুঞ্জিভুত ক্ষোভ আর কথাগুলো তারা ইথারে ছড়িয়ে দিতে থাকলেন। নির্বাসন থেকে মুক্তি পেলেন নোবেল বিজয়ী কালজয়ী বিজ্ঞানী ও মানবাধিকার নেতা ‘আন্দ্রেই সাখারোভ’। ভেবে দেখুন তো একজন নোবেল লাউরিয়েট জ্ঞানী ব্যাক্তিকেও কথা বলতে দিতে চায়নি কম্যুনিস্ট-রা! ২০২২ সালের সাথে কোন স্থানের মিল খুঁজে পান? যাহোক, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ‘আন্দ্রেই সাখারোভ’, খোদ সংসদে দাঁড়িয়ে, খোদ মিখাইল গর্বাচভ-এর সাথে তর্ক করতেন তিনি। উদারপন্থী গর্বাচভ শুনতেন, সম্মান করতেন, জবাবে খুব একটা কিছু বলতেন না।

কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতারাও বলতে শুরু করলেন। এতকাল বাধ্যতামূলক একপেশে লিখতে লিখতে, বলতে, বলতে উনারা ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এবার মন খুলে বলতে ও লিখতে শুরু করলেন। চলচ্চিত্র নির্মাতারা বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মান করলেন কম্যুনিস্ট শাসনামলের অসহনীয়তা নিয়ে। এরমধ্যে যে কয়েকটি চলচ্চিত্র আমার মনে দাগ কেটেছিলো, তার মধ্যে একটি হলো ‘ইন্তের জেবুচকা’। বদ্ধ একটি ঘর বা দ্বীপ সোভিয়েত ইউনিয়ন, যার বাইরে বের হওয়া বারণ; সেখানকার তরুণী-রা কেন সোভিয়েতে আসা বিদেশীদের কাছে সহজেই ধরা দেয়, ডলার, পোশাক, উপহার, ইত্যাদির লোভে নিজেদের শরীর বিক্রি করে। কেন তারা অতি সহজেই পতিতায় পরিণত হয়। এইসব উপাদান নিয়ে সিনেমাটির কাহিনী। রাজনৈতিক বদ্ধতার কারণে, মতাদর্শগত দেউলিয়াত্বের কারণে, বাক-স্বাধীনতার অভাবে, একটি সমাজ যে কতটা দূষিত হয়ে যেতে পারে, তার প্রকৃষ্ট চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই ছবিটিতে।

যে শান্তিময় পরিবর্তন ও শান্তির সুবাতাস মিখাইল গর্বাচভ নিয়ে আসতে শুরু করলেন অর্ধেক পৃথিবী, এমনকি পুরো পৃথিবী জুড়েই, তার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯০ সালে তিনি ভূষিত হন নোবেল শান্তি পুরষ্কারে। এই নিয়ে আমাদের এক বড় ভাই মন্তব্য করেছিলেন, “এবারের নোবেল শান্তি পুরষ্কারটি সুযোগ্য ব্যাক্তিকেই দেয়া হয়েছে।”

১৯৯১ সালের মার্চ মাসে হলো একটি রেফেরেন্ডাম (গণভোট)।সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পক্ষে-বিপক্ষে। এটাই ছিলো সোভিয়েতের ইতিহাসে প্রথম রেফেরেন্ডাম। জনতার বেশিরভাগই তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পক্ষে-বিপক্ষেই ভোট দিয়েছিলো। প্রথমত জনতার বেশিরভাগেরই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ছিলো ঐ সাম্রাজ্যে; এবং তারা এক ধরনের অভ্যস্তও হয়ে গিয়েছিলেন, ভিন্ন দেশ ভিন্ন জীবন তো তারা আর দেখেননি!

কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টে গেলো সেই একই বৎসর ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে। সোভিয়েতে সংঘটিত হলো অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা, যা ‘আগস্ট অভ্যুত্থান’ নামেও পরিচিত। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির কট্টরপন্থীদের দ্বারা মিখাইল গর্বাচেভের কাছ থেকে জোরপূর্বক দেশের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়ার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছিল সেটি। আমি নয়ন তখন বাংলাদেশে ভ্যাকেশন ছুটি কাটাচ্ছিলাম। কম্যুনিস্ট কট্টরপন্থীদের অভ্যুত্থান শুনে গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো! মনে মনে ভাবলাম, ‘আবার কি ঐসব ভয়াল দিন ফিরে আসছে?’ একমনে দোয়া-দরুদ, প্রার্থনা করতে শুরু করলাম; কট্টরপন্থীদের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা যেন ব্যার্থ হয়। (কি ঘটেছিলো ঐ সময়ে, ভিতরে ও বাইরে? আমরা সাধারণ মানুষেরা কোন পক্ষ নিয়েছিলাম? কি ছিলো আমাদের অংশগ্রহন? এই নিয়ে পরবর্তি কোন একটা পর্বে, অথবা অন্য কোন ল্পে লিখবো। এই ক্ষুদ্র পরিসরে তা সম্ভব না।)

আগস্টের এই অভ্যুত্থান ব্যার্থ হয়। অভ্যুত্থান মানেই দুই পক্ষ, হার-জিত, বাঁচা-মরা। যাহোক সেযাত্রা জনগণের ও একদল অকুতোভয় বুদ্ধিজীবিদের বদৌলতে ও তাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে কট্টরপন্থীরা পরাজিত হয়। জয় হয় উদারপন্থীদের, জয় হয় গণতন্ত্রের, জয় হয় জনতার ইচ্ছার। বেঁচে যান বিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্রের প্রাণপুরুষ মিখাইল গর্বাচভ।

তবে এই অভ্যুত্থান-এর পরপর সোভিয়েত সাম্রাজ্যের দৃশ্যপট-ও দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। নদী ভাঙনের মত, ভাঙনের শব্দ শোনা যেতে থাকে চতুর্পাশ্বে! একসময় তাই-ই হলো। ১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর, খ্রীস্টান ক্রিসমাসের রাতে ভেঙে গেলো সোভিয়েত ইউনিয়ন (Union of Soviet Socialist Republics)। লক্ষ লক্ষ সৈন্য, হাজার হাজার ট্যাংক, শত শত নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড, কোন কিছুই রক্ষা করতে পারলো না সোভিয়েত-কে। সেই রাতে মিখাইল গর্বাচভ টেলিভিশন ব্রডকাস্টিং মারফত একটি বক্তৃতা দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং উনার নিজের রাষ্ট্রপতি জীবনের পরিসমাপ্তি ঘোষনা করলেন। আমরা পুরো সময় জুড়ে নীরবে শুনালাম উনার অপূর্ব ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভাষন। (সময় পেলে আমি ভাষণটি বাংলায় অনুবাদ করবো)। ইতিহাসে এত বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ব্যাপক রক্তপাত ছাড়া হয়না। অতীতে হয়নি। কিন্তু মিখাইল গর্বাচেভ-এর মত জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যাক্তি ক্ষমতায় থাকার কারণে তা হয়েছিলো খুব অল্প রক্তপাতে!

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পিছনে উনাকে দায়ী করে মৌলবাদী কম্যুনিস্ট-রা। এমনও কন্সপিরেসির কথা বলে বাংলাদেশী কম্যুনিস্টরা যে, তিনি নাকি সিআইএর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার টার্গেট নিয়েছিলেন। আরে সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর ভাঙন তো নিহিত ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর গঠনেই! কতভাবেই তো তার ব্যাখ্যা করা যায়, আপাতত একটি বলছি: একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠি যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন তা হয় হয় কোন সামরিক শক্তির প্রয়োগে অথবা কোন একটি আবেগে। ঐটাকে বলে আবেগগত ঐক্য। ঐ আবেগ তিরোহিত হলে ঐক্য-ও তিরোহিত হয়!
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন একত্রিত হওয়ার পিছনে আবেগটি ছিলো ‘কম্যুনিজম’; বিংশ শতাব্দীর শেষে আবেগটি তিরোহিত হয়, তাই ঐক্যটাও আর থাকেনি।

সোভিয়েত কম্যুনিস্টরা ছিলো নাস্তিক, সৃষ্টিকর্তায় কোন বিশ্বাস তাদের ছিলো না। লেনিন-এর মৃতদেহের পূজা করতো এক অর্থে। নাস্তিকদের এই বিশাল সামরিক শক্তি নিয়ে অনেকেই একসময় গর্ব করতো ও প্রশ্ন তুলতো, “কই? দেখুনতো কত শক্তিশালী ঐ নাস্তিকরা!” উত্তরে পবিত্র কোরআন-এর একটি আয়াত তুলে ধরবো,

“পৃথিবীতে অবিশ্বাসীদের ক্ষমতা দেখে বেকুব বনে যেও না। তা ক্ষণস্থায়ী, বেশিদিন টিকে না।” (সূরা আলে ইমরান: ১৯৬-১৯৭)

হ্যাঁ, তাই-ই। বিশাল সামরিক শক্তি জোর করেই ধরে রেখেছিলো ঐ সাম্রাজ্যকে; কিন্তু ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত সামরিক নেতারা সোভিয়েত-কে ধরে রাখার সব আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছিলেন। অবিশ্বাসীদের ক্ষমতা তাদের সাম্রাজ্যকে এক শতাব্দীও টিকিয়ে রাখতে পারেনি!

সমাজতন্ত্র নিজেই ছিলো একটি ভ্রান্ত নীতি। তাই সোভিয়েত-এর প্রতিষ্ঠায়ই নিহিত ছিলো তার পতনের বীজ।
রবিঠাকুর তো শুরুতেই এই কথা বলেছিলেন। উনার লেখা ‘রাশিয়ার চিঠি’-তে সব স্পষ্টভাবে বলা আছে। মস্কো ভ্রমণকালে রবিঠাকুর ‘ইজভেস্তিয়া’ পত্রিকাকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানেও তিনি সমাজতন্ত্রের ভ্রান্তির কথা বলেছিলেন, যেই সাক্ষাৎকার কম্যুনিস্টরা তখন ছাপায়নি। তারপর গর্বাচভ-এর শাসনামলে বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা হলে,সত্তর বছর পর তা ছাপানো হয়!

গর্বাচভ-এর পদত্যাগ-এর পরদিন এক বৃদ্ধ আমাকে বলেছিলেন যে, গর্বাচভ প্রতারণার হাত থেকে আমাদের জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। গর্বাচভ সবার চোখ খুলে দিয়েছেন। গর্বাচভ-এর মনুমেন্ট মূর্তি তৈরী করা প্রয়োজন। তিনি এটা ডিজার্ভ করেন।

কিছুদিন পরে টেলিভিশনে একজন সাংবাদিক উপস্থাপক বলেছিলেন যে,” জনাব গর্বাচভ, জীবিত মানুষদের মনুমেন্ট মূর্তি তৈরী করার রীতি নাই। যদি সেই রীতি থাকতো তাহলে আমি আপনার মনুমেন্ট মূর্তি তৈরী করার প্রস্তাব দিতাম।”

পরবর্তিকালের এক সাক্ষাৎকারে একজন বলেন, “যখন সে আমাকে বলে: তারা চিৎকার করে বলে যে আমি সব দিয়েছি। পোল্যান্ডকে দিলাম, হাঙ্গেরিকে দিলাম! তুমি এটা কাকে দিলে? পোল্যান্ড দিলাম পোলিশদেরকে, হাঙ্গেরি থেকে হাঙ্গেরিয়ানদেরকে। গর্বাচেভের দুটি গুণাবলী, যা আজ বিশেষ করে মূল্যবান। ইউএসএসআর স্বল্প রক্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে – দেখুন আজ তারা কত বড় রক্তে এটা আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে! আর মাত্র ৬ বছর শাসন করার পর তিনি ক্ষমতা ছাড়লেন, ৬০ বছর বয়সে। শুধু পথ দিলেন নতুন সময়টাকে যে বাঁচার ডাক দিয়ে।
তিনি কি একজন মানুষ ছিলেন। সাধারণ ধরনের মানুষ। তার প্রিয় স্ত্রীর সাথে, আমাদেরকে কিছু দেওয়ার ইচ্ছা নিয়ে, সৃষ্টির শক্তি নিয়ে। এবং তিনি দিয়েছেন: আমরা সরকারকে ভয় পাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি, এমনকি আমরা প্রকাশ্যে সমালোচনাও করতে পারি, এবং এর জন্য আমাদের কিছুই হতো না। এবং জঘন্য দেয়াল ভেঙ্গে ফেলেছি! তিনি একজন দারুণ বন্ধু ছিলেন! ভালোবাসার স্মৃতিতে।

গত শতাব্দীর হিরো ছিলেন মিখাইল সের্গেইভিচ গর্ভাচেভ । তিনি কম্যুনিজম বা সমাজতন্ত্রের শঠতা ও প্রতারণার মুখোশ উন্মোচিত করে ঐ ভয়াবহ রাজনীতির কদর্য রূপটি সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। পুঁজিবাদের শোষণ থেকে মুক্তির গাল ভরা বুলি শোনালেও আসলে কম্যুনিস্টরা পুরো দেশজুড়ে গড়ে তুলেছিলো একটি বন্দি শিবির। মিখাইল গর্বাচভ ভেঙে দিয়েছিলেন পৃথিবীর সব চাইতে বড় ‘আয়নাঘর’। সাবাশ মিখাইল গর্বাচভ, স্যালুট মিখাইল গর্বাচভ।

(চলবে)

গল্পের রচনাতারিখ: ২রা সেপ্টেম্বর (শুক্রবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: রাত ০১টা ৫৪মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:
https://www.facebook.com/ramit.azad/posts/pfbid05hNqoAvAxMHsRyAAXm2NzPewguugcSrDvVV7h3dPRAb1dioT66Npp9VcBErPjHSWl

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.