ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ত)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১

——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – )

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আমি নয়নের রুমটা ছিলো অনেকটা ক্লাবের মতন। এখানে প্রতিদিনই আড্ডা জমতো! কখনো সেই আড্ডায় থাকতো রুশী-ইউক্রেণীয়-সোভিয়েত মেয়েরা; কখনো থাকতো রুশী-ইউক্রেণীয়-সোভিয়েত ছেলেরা, কখনো থাকতো বিদেশী স্টুডেন্টরা, কখনো থাকতো বাংলাদেশীরা, আবার কখনো হতো মিক্সড। তবে আড্ডা চলতোই। এবং তা প্রায় প্রতিদিনই। ইন্টারেস্টিং হলো দুইএকবার লোকাল মাফিয়ারাও এসেছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই দেশে মাফিয়া শব্দটার প্রচলন বেড়েছে! ছোট-বড় যেকোন অপরাধীর ক্ষেত্রেই ‘মাফিয়া’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। আসল ‘মাফিয়া’ তো বিশাল ব্যাপার দুনিয়া নাচায় তারা, নয়নের মত চুনোপুটি-কে দিয়ে তারা কি করবে? বেসিকালি যারা আমার রুমে এসেছিলো তারা ছিলো লোকাল মাস্তান। যাহোক সেই গল্প আরেকদিন হবে।

আপাতত, যা বলছিলাম, একবার বাঙালীদের আড্ডা বসেছে আমার রুমে।

করিম: বুঝলেন ভাইজান, ঐ গর্বাচভ-টা আসলে ছিলো সিআইএ-র এজেন্ট। তাই তো সোভিয়েত ইউনিয়ন-টারে ভাইঙ্গা-চুইরা শেষ কইরা দিলো!

আমি: কিসের উপর ভিত্তি করে বলছেন এটা?

করিম: হ। তাইতো। গর্বাচভ ছিলো সিআইএ-র এজেন্ট।

আমি: সেতো বললেন একবার। আমি জানতে চাচ্ছি, আপনার কথার ভিত্তিটা কি? কোন ফ্যাক্টস এ্যান্ড ফিগারস আছে আপনার কাছে?

এবার করিম ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।

করিম: না মানে, সবাই কয় যে!

বাংলাদেশীদের এই একটা বিষয়। বকবক করতেই থাকে। বাতাসে ভাসা যত কথা আছে সবই বলে। কিন্তু যেই না এ্যাকাডেমিক ডিসকাশন শুরু হয়, অমনি বেকুব বনে যায়! তখন আর মুখ থেকে কথা সরে না। কোন একজন আমাকে বলেছিলো যে, আমাদের আগের জেনারেশনের বেশিরভাগই তো গ্রামের পুকুর পাড়ে বসে কুটনামী করতো। তাই আমাদের আলোচনার লেভেল ওর চাইতে খুব একটা উপরে ওঠে নাই!

যাহোক, ঐ সিআইএ-র এজেন্ট হওয়ার বিষয়টা আমি প্রথম শুনেছিলাম ১৯৯১ সালের আগস্ট-এর ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময়। তখন আমি বাংলাদেশে। এই নিয়ে কয়েকদিন বেশ হৈ চৈ হলো সারা পৃথিবী জুড়ে, বাংলাদেশেও হলো। তখন আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে এলেন একজন সাংবাদিক। ইয়াং ম্যান, কিন্তু বেশ ইমপ্রেসিভ! কথাবার্তাও সুন্দর। বুঝলাম পুকুর পাড়ে কুটনামী আলোচনা করা লোক নন তিনি, জ্ঞান রাখেন।

আমার কাছ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে নানান আলোচনা করলেন। তা আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, “মিখাইল গর্বাচভ কি  সিআইএ-র এজেন্ট?” উনার প্রশ্নটা শুনে আমি একটু থতমত খেলাম! এরকম একটা অপবাদ হবে এত বড় একজন ব্যাক্তিত্বের নামে এতটা আশা করিনি! আমি বললাম, “কি বলেন এইসব?” এই নিয়ে আমাদের আলোচনা সেদিন খুব একটা গড়ায়নি। তবে বুঝলাম যে, বাংলাদেশী কম্যুনিস্ট-রা এই সস্তা অপবাদ-টা বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছে!

খারকোভের আলোচনায় করিম-কে বললাম,

আমি: ভাই সিআইএ-র একজন এজেন্ট একেবারে দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলো, এটা কি কো বাস্তবসম্মত কথা?

আসলে এমন একটা সস্তা  অপবাদের আলোচনা আমি করতে চাই নাই। মুর্খের সাথে কথা না বলে চুপ করে থাকাই শ্রেয় হতো। তারপরেও ভাবলাম যে, লোকটার ভুল ভাঙানো দরকার।

করিম: হইতে পারে না?

আমি: এত বড় কেজিবি-টা কি ঘাস খায়? সিআইএ-র একজন এজেন্ট-কে কি তারা ঐ পর্যন্ত উঠতে দিতো?

করিম: তাইলে সে আমেরিকায় কথায় চললো কেন?

আমি: তিনি কোন আমেরিকার কথায় চলেননি। তার আগে আপনি বলেন যে, সিআইএ-র এজেন্ট হওয়ার উনার প্রয়োজন-টা কি?

করিম: ট্যাকাটুকা পাইছে মনে হয়।

মনে মনে ভাবলাম, যে যেই লেভেলের তার চিন্তাভাবনাও ঐ লেভেলের। করিম অর্থাভাবে কামলার কাজ করতে ইউক্রেণে চলে আসছে। ট্যাকাটুকা পাইলে সে এজেন্ট হওয়া তো ভালো, আরো অনেক নিচেই নামতে পারবে।

আমি: মিখাইল গর্বাচভ ছিলেন বিশ্বের সবচাইতে শক্তিধর সাম্রাজ্যের সম্রাট। উনার কি টাকার অভাব পড়েছিলো যে, টাকার লোভে উনাকে কোন একটা দেশের গোয়েন্দা এজেন্সির এজেন্ট হতে হবে?

করিম: ট্যাকা লাগে না?

আমি: ভাইরে। টাকা দিয়া মানুষে কি করে?

করিম: ভাত খায়। কাপড় পড়ে, বৌয়ের জন্য শাড়ী গয়না কিনে, বাড়ী বানায়, ইত্যাদি।

আমি: তা এই বিশাল সাম্রাজ্যের সম্রাটের কি খাওয়ার অভাব ছিলো, বৌয়ের কাপড় ছিলো না? উনার থাকার বাড়ীর সাইজ জানেন? উনার অফিস ক্রেমলিন কি দেখেছেন কখনো? সাগর পারের শোচী শহরে উনার রেস্ট হাউজের কাছে ফাইভ-স্টার হোটেলও যে কিছু না, এটা কি জানেন?

করিম: না, এইগুলা তো জানি না।

আমি: আরো আসুন, টাকা দিয়ে মানুষ ক্ষমতা কেনে তাই না?

করিম: হ, তাইতো।

আমি: মিখাইল গর্বাচভ যিনি ইতিমধ্যেই পৃথিবীর সব চাইতে ক্ষমতাধর ব্যাক্তি, উনার কি আর কোন ক্ষমতা কেনার দরকার ছিলো?

করিম, আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। কি উত্তর দেবে ঠিক বুঝতে পারলো না!

এবার কথা বলে উঠলো পলাশ ভাই।

পলাশ ভাই: মানুষ তো সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চায় না।

আমি: রাইট। তাহলে মিখাইল গর্বাচভ এত ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন কেন?

সেলিম: কি কি ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি? ভাইয়া আমরা তো অত বুঝিনা, জানিওনা। একটু বুঝিয়ে বলেন। (এই ছেলেটা খুব ইন্টেলিজেন্ট ও বিনয়ী)

আমি: সোভিয়েত দেশের প্রধান-এর পদটার নাম সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির ‘সেক্রেটারি জেনারেল’। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারি এই ব্যাক্তিটি; সামন্তযুগের রাজা-বাদশাহদের মতই আজীবন তারা থাকেন এই পদে, তাও বিনা ভোটে।

সেলিম: বলেন কি?!

আমি: হ্যাঁ, যেমনটা ছিলেন, জোসেফ স্তালিন, নিকিতা খ্রুশ্চোভ, লিওনিদ ব্রেজনেভ, প্রমুখ। তা মিখাইল গর্বাচভ সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির ‘সেক্রেটারি জেনারেল’ হওয়ার পর এই ক্ষমতাই এনজয় করতে পারতেন আজীবন। কিন্তু গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতামনা ব্যাক্তিটি তা করেননি। তিনি নিজ ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে থাকেন। আন্দ্রেই গ্রোমিকো একসময় ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, উনাকে গর্বাচভ সুপ্রিম সোভিয়েত-এর প্রেসিডেন্ট বানান। তার উপর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন রিপাবলিকে সাধারণ নির্বাচন দিয়ে জনতার ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেন। যার ফলে রাশিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বরিস ইয়েলৎসিন, ইউক্রেইণে লিওনিদ ক্রাভচুক, প্রমুখ। এছাড়া সংসদ সদস্যরাও নির্বাচিত হওয়াতে তারাও পূর্বের চাইতে বেশি ক্ষমতা ও অধিকার ভোগ করতে থাকেন।

এই এত এত ক্ষমতা যিনি স্বেচছায় ছেড়ে দিলেন, তাকে আপনারা ভীন দেশের এজেন্ট বলতে চান???

মিখাইল গর্বাচেভ নিঃসন্দেহে গত শতাব্দীর সবচাইতে সুন্দর রাজনৈতিক কাজটি করেছেন: প্রায় বিনা রক্তপাতে   অনেকগুলো দেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জন্মদান করেছেন। যেই তালিকায় আছে প্রাক্তন সোভিয়েতের ১৫টি রিপাবলিক, ইউক্রেইন, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান,  কাজাখস্তান, কিরগিজস্থান, মালদোভা, তাজিকিস্তান, জর্জিয়া, উজবেকিস্তান, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, এস্তোনিয়া, ইত্যাদি। এটা নিঃসন্দেহে একটি বিরল ঘটনা। বিশ্বে এমন কোন দেশ নাই যারা বিনা রক্তপাতে স্বাধীন হয়েছে। আমাদের উপমহাদেশের স্বাধীনতার পেছনে অজস্র মূল্যবান প্রাণ ঝরেছে। স্বাধীনতার জন্যে প্রাণ ঝরেছে আফ্রিকায় ও এশিয়ায়। তাই প্রাক্তন সোভিয়েত  দেশগুলোর মিখাইল গর্বাচেভের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

(আমার পূর্ববর্তি লেখাগুলোয় গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন সর্বজনাব,খান দিনার, আবু জাহিদ বাবু, বীর মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন ভাই, নাসিরুল ইসলাম খান, প্রমুখ। সবাইকে অজস্র ধন্যবাদ।)

(আজ মিখাইল গর্বাচভের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। আমি অতি ক্ষুদ্র একজন মানব, আমার কন্ঠস্বরও ক্ষীণ। তারপরেও বলি, আমি মনে করি যে, বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উচিৎ মিখাইল গর্বাচেভ-এর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ছুটে যাওয়া। যে সকল দেশকে তিনি বিনা রক্তপাতে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, তাদের সকলের চিরকৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ গর্বাচেভ-এর কাছে। সারা পৃথিবীর গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষরা চিরকাল মনে রাখবে ইতিহাসের এই মহানায়ককে।)

(চলবে)

————————————————————————–

গল্পের রচনাতারিখ: ৩রা সেপ্টেম্বর (শনিবার), ২০২২ সাল

রচনাসময়: রাত ০২টা ১১মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1

————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.