ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – থ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – থ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আগস্টের ব্যার্থ অভ্যুত্থান:
বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে এটা নিঃসন্দেহে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে আমার এই নিয়ে কেন যেন লিখতে ইচ্ছা হতো না। একটা মিক্সড ফিলিং হয়! ১৯৯১ সালের ১৯শে আগস্টে ঘটে ঘটনাটি। অমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সময় আমি আনফরচুনেটলি অথবা ফরচুনেটলি মস্কোতে অবস্থান করছিলাম না। ছিলাম ঢাকায়। ইউনিভার্সিটির ভ্যাকেশনে ছুটি কাটাচ্ছিলাম। হঠাৎ করেই শুনতে পেলাম যে, মস্কোতে অভ্যুত্থান ঘটেছে! মিখাইল গর্বাচভ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। হুমড়ি খেয়ে পড়লাম টিভি সেটের সামনে। হ্যাঁ, ঘটনা সত্যি, গর্বাচভ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে নতুন সরকার! তারপরেও প্রশ্ন তৈরী হলো, কারা এই নতুন সরকার? একদলীয় শাসনতন্ত্রের সেই দেশে তো ভিন্ন কোন রাজনৈতিক পার্টি নেই? আবার সামরিক বাহিনী দেশের ক্ষমতা দখল করে ‘মার্শাল ল’ জারি করেছে, এমনটাও হবার নয়! তাহলে কি আমাদের বাংলাদেশের প্রথম অভ্যুত্থানটির মত, একদলীয় শাসনের উপদলীয় কোন্দলের জের ধরে অভ্যুত্থান?

গত কয়েকমাস যাবতই সোভিয়েত ইউনিয়নে, বিভিন্ন রিপাবলিকে চলছিলো জাতীয়তাবাদী দাঙ্গা বা রায়ট। সব রিপাবলিকেই রুশ জাতি বিরোধী রায়ট তো ছিলোই, তা ছাড়াও এক রিপাবলিকে অন্য রিপাবলিকের মানুষ থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও খন্ড খন্ড রায়ট হচ্ছিলো। যেমন আর্মেনিয়রা আজারবাইজানিদেরকে ও আজারবাইজানিরা আর্মেনিয়দের নিজ নিজ ভূমে টলারেটই করতে পারছিলো না! একইভাবে তাজিকিস্তানেও আর্মেনিয় বিরোধী রায়ট হয়। এরকম আরো অনেক উদাহরণ আছে। কম্যুনিস্টরা তাদের আন্তর্জাতিকতাবাদ-এর হাত ধরে বিভিন্ন রিপাবলিকে এই মিশ্রণ তৈরী করেছিলো; তার কিছু ছিলো আর্টিফিশিয়ালি নির্মিত, আর কিছু ছিলো ন্যাচারাল। আবার ঐ সমাজতন্ত্রের আলখাল্লায়ই লুক্কায়িত ছিলো রুশ জাতীয়তাবাদ ও অর্থোডক্স ক্রিস্চিয়ানিটির পৃষ্ঠপোষকতা! তাই প্রতিটি রিপাবলিককেই রুসিফাই করা হয়েছিলো। উদ্দেশ্য, ১৫টি রিপাবলিকের সবগুলোতেই রুশ জাতির ডোমিনেন্স তৈরী করা।

আর একটি বিষয় ছিলো যে গণতন্ত্রের বদৌলতে বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, ইত্যাদিরা নড়াচড়া করতে শুরু করেছিলো কম্যুনিস্ট মতাদর্শের বিরুদ্ধে, যেই মতাদর্শ তাদেরকে দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলো। মনে হচ্ছিলো যে, চলমান সরকার আর টিকবে না। উপরন্তু ফুঁসতে শুরু করছিলো কট্টরপন্থী মানে মৌলবাদী কম্যুনিস্টরা। এর আগে একটি নির্বাচনে মিখাইল গর্বাচেভ পুনরায় কম্যুনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে সব হার্ডলাইনার-রা গর্বাচেভ-এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরেও গর্বাচভ দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। এতে করেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বর্তমান কম্যুনিস্ট পার্টির বেশিরভাগ সদস্যই লিবারেল।

এইসব কিছুই অপছন্দ হতে শুরু করে কট্টরপন্থী/মৌলবাদী কম্যুনিস্টদের। তাই তারা ভিতরে ভিতরে ষড়যন্ত্র আটেন একটি ক্যু স্টেজড করার। তদানিন্তন কেজিবি প্রধান Vladimir Kryuchkov একটি “call for order” ডাকেন। তিনি KGB অফিসারদেরকে ‘state of emergency’ ডিক্লেয়ার করার আদেশ দেন। . তারপর তিনি সোভিয়েত প্রতিরক্ষামন্ত্রী Dmitry Yazov, Central Control Commission Chairman Boris Pugo (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী), প্রধানমন্ত্রী Valentin Pavlov, উপ-রাষ্ট্রপতি Gennady Yanayev, Soviet Defense Council deputy chief Oleg Baklanov, গর্বাচভ-এর দফতরের Valery Boldin, এবং CPSU কেন্দ্রীয় কমিটির Secretary Oleg Shenin -কে সাথে রাষ্ট্রীয় অভ্যুত্থান করেন।

আমি, এই অভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনার গভীরে যাবো না। এই গল্পের ক্ষুদ্র পরিসরে তা সম্ভবও না। সাধারণ মানুষ হিসাবে যেমন দেখেছি, ও যেসব প্রশ্ন তখন দেখা দিয়েছিলো তার ভিত্তিতে কিছু নেইভ আলোচনা করবো। প্রশ্ন ১: মিখাইল গর্বাচভ কি এমন অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা সম্পর্কে আগে থেকে কিছু আঁচ করতে পেরেছিলেন? উত্তর: খুব সম্ভবত হ্যাঁ। মস্কোর মেয়র Gavriil Popov কিছুদিন আগে U.S. Ambassador to the Soviet Union Jack F. Matlock Jr.-কে জানিয়েছিলেন যে গর্বাচভ-এর বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান-এর পরিকল্পনা হচ্ছে। জনাব Matlock চেষ্টা করলেন মিখাইল গর্বাচভকে বিষয়টি অবহিত করতে। তবে জনাব গর্বাচভ নাকি ম্যাটলক-এর কথাকে হেসে উড়িয়ে দেন।

প্রশ্ন ২: অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময় মিখাইল গর্বাচভ ক্রিমিয়ায় তার দাচা-তে ছুটি কাটাচ্ছিলেন কেন? উত্তর: (সম্ভাব্য) তিনি সবকিছু আঁচ করতে পেরেছিলেন বলেই মস্কো ছেড়ে ক্রিমিয়ার দাচা-তে চলে গিয়েছিলেন। তিনি মস্কোতে থাকলে সবকিছু সামাল দেয়া কঠিন হতো হয়তোবা। এ’ ধরনের পরিস্থিতিতে পপুলার রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি দুইটি, খোদ কমান্ডারের রাজধানীতেই অবস্থান করা, অথবা খোদ কমান্ডারের রাজধানী থেকে দূরে থাকা। খুব অল্পবয়স থেকেই রাজনীতি করা মিখাইল গর্বাচভ ছিলেন ঝানু পলিটিশিয়ান!

যাহোক, ঢাকায় থাকা আমি টেলিফোন করলাম আমার সহপাঠীকে। জানালাম, “শুনেছিস নাকি, মস্কোতে ক্যু হয়েছে, গর্বাচভ আর ক্ষমতায় নাই?” আমার কথা শুনে দেখি তার আত্মায় পানি নাই! তিনি একজন বাংলাদেশী কম্যুনিস্ট বুদ্ধিজীবির সন্তান। শুনেছি যে রাশিয়ার কম্যুনিস্ট কালচারের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে, তারা পুরো পরিবার একসাথে বসে শুরা পান করতেন। ভাবতেন, এটাই সঠিক কালচার, মুসলমানদের কালচার ভুল। যাহোক, তিনি বললেন, “এটা কেমন কথা হলো? আবার সেই কম্যুনিস্টরা!? এখন কি হবে? যেমনই হোক, একটা পরিবর্তন তো এসেছিলো ঐ দেশটাতে। আমরা বিদেশী ছাত্ররাও তো ভালো থাকছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডীন অফিসের সাথে ভালো সম্পর্ক হলো, ওদের ফেভার পাওয়া শুরু করলাম। আগে তো কথা বলতেই ভয় লাগতো! এখন কি আবার সব আগের মতন হয়ে যাবে?! ওরে বাপরে!” ওর কথা শুনে আমি হাসবো, না কাঁদবো বুঝতে পারলাম না। এদিকে আমার মনেও কিছুটা ভয় ঢুকলো। আমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ে ওপেনলি কম্যুনিজম-এর বিরুদ্ধে বলতাম, এখন যদো ওখানে ফেরার পর আমার উপর শোধ নেয়! যাহোক, ভাবলাম, দেখি মহান আল্লাহ্‌ কি করেন।

বিকালে ঘর থেকে বাইরে বের হলাম। চারপাশে পরিচিতজন যে দেখছে সেই আমাকে জিজ্ঞাসা করছে, “কি ভাই, মস্কোতে নাকি ক্যু হয়েছে? গর্বাচভ নাকি আর ক্ষমতায় নাই?” উনাদের কথার কি যে উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না। এক বন্ধু তো প্রশ্নই করে বসলো, “ছুটিতে দ্যাশে আসছো, আর কি ফিইরা যাইতে পারবা? গর্বাচভ তো ক্ষমতায় নাই?” ওর কথা শুনে আমি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম! কি কয়? বললাম, “আরে আমি লেখাপড়া করি ঐ দেশের স্কলারশীপে, এর সাথে গর্বাচভ-এর সম্পর্ক কি?” আবার মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা সত্যিই তো, নয়া সরকার যদি এমন কোন ডিসিশন নেয় যা আমাদের বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের বিপক্ষে যাবে, তাহেলে আমাদের অবস্থা হবে কি?

ঘরে ফিরে আবার টিভি সেটের সামনে বসলাম, টেলিভিশন জুড়ে বারবার শুধু এই একই সংবাদ। মস্কোর অভ্যুত্থানে জাপানে ভীষণ অস্থিরতা শুরু হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শেয়ারের দরপতন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যের উপর প্রভাব পরছে। আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো তাদের সসস্ত্রবাহিনী-দেরকে সতর্ক অবস্থায় রেখেছে, ইত্যাদি।

সংবাদে আরো জানালো যে, পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘জরুরী অবস্থা’ জারি করা হয়েছে। মস্কো শহরে সেনাবাহিনী ও ট্যাংক নেমেছে। টিভি পর্দায় দেখলাম, পরিচিত মস্কো শহরের চেনা চওড়া এ্যাভিনিউগুলোতে ভয়াল দর্শন ট্যাংক চলছে, ভয়াবহ একটা পরিস্থিতি! মন জানতে চাইলো, কোথায় আছেন প্রিয় নেতা মিখাইল গর্বাচভ? একটু পরে সংবাদে জানালো যে তিনি তার গ্রীস্মনিবাসেই আছেন, তবে তাঁকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে, এবং সেই বাড়ীতে পঁচিশজন কেজিবি কর্মকর্তা তাকে ঘিরে রেখেছেন। আমার মনে পড়লো বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের ৪ঠা থেকে ৭ই নভেম্বরের কথা!

মনে মনে ভাবছিলাম যে, মস্কোতে আপাততঃ ৪ঠা নভেম্বর চলছে, সেখানে কি ৭ই নভেম্বরের মতন সুসংবাদ তৈরী হবে? আমি মনেপ্রাণে সেইটাই চাইছিলাম। মন ভরে দোয়া করছিলাম, সোভিয়েত দেশের জনগণকে দাসত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা, আধুনিক গণতন্ত্রের প্রাণপুরুষ মিখাইল গর্বাচভ যেন বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে, আবারো রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করতে পারেন।

(চলবে)

গল্পের রচনাতারিখ: ৩রা সেপ্টেম্বর (শনিবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: সন্ধ্যা ০৭টা ৪৯মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.