ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – দ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – দ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

অভ্যুত্থানের একটা রীতি আছে। সেটা হলো, শুরুতেই কমান্ডার-কে ক্যাপচার করে ফেলতে হয়, নয়তো মেরে ফেলতে হয়। তা নইলে অভ্যুত্থান সাধারণত: সফল হয়না। হত্যা অথবা বন্দী এই দুইয়ের মধ্য দিয়েই ক্ষমতা দখল হয়। অন্ততপক্ষে পৃথিবীর ইতিহাস তো তাই বলে। সম্রাট আওরঙ্গজেব ভালো মানুষ ছিলেন, তাই দুঃশাসক শাহজাহান-কে হত্যা না করে কেবই বন্দী করেছিলেন। এদিকে শাহজাহান-ও আর বন্দী দশা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি, কারণ এমন দুঃশাসক-এর প্রতি কেউ লয়াল ছিলো না। এই লয়ালিটি বিষয়টা ভীষণ ইমপর্টেন্ট। অনুগত লোকজন ছাড়া রাষ্ট্র/সাম্রাজ্য পরিচালনা করা অসম্ভব। শাসক যদি দুঃশাসক হয় তাহলে অভ্যুত্থানকারীরা সহজেই তাকে অপসারণ করতে পারে, এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যাক্তিত্বদের সমর্থন পাওয়া যায় স্বচ্ছন্দে। কিন্তু শাসক যদি সুশাসক হয়ে থাকেন তখন আর কিছুতেই রাষ্ট্রীয় ব্যাক্তিত্বদের সমর্থন পাওয়া যায় না। আর তখনই শুরু হয় যত ডামাডোল (turmoil); যেমনটা ঘটেছিলো জুলিয়াস সিজার-এর ক্ষেত্রে। এই ধরনের ক্ষেত্রে অভ্যুত্থানকারীরা বা ষড়যন্ত্রকারীরা কিছুটা ভয়ে ভয়েই থাকে। আবার অভ্যুত্থান হলো, কিন্তু কমান্ডার বেঁচে আছেন,যেই কমান্ডার সুশাসক ও জনপ্রিয়; সেই ক্ষেত্রে অভ্যুত্থানকারীরা অনেক বড় ঝুঁকিতেই থাকে।

যাহোক আগস্টের ব্যার্থ অভ্যুত্থান নিয়ে কথা বলছিলাম। ঘটনা বিকশিত হতে শুরু করলো। আমার বন্ধুটি আবার টেলিফোন করলো। বললো, “বন্ধু, আমি মস্কোর টিভি চ্যানেল দেখেছি।”
আমি: কিভাবে? আদৌ সম্ভব কি?
তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়া বলতে সারা বাংলাদেশে একটাই টিভি চ্যানেল বিটিভি। ব্যাস। তা বন্ধুটি মস্কোর টিভি চ্যানেল দেখলো কি করে তাই ভাবছিলাম!
বন্ধু: ঢাকার সিদ্ধেশরীতে সোভিয়েত ট্রেড হাউজ আছে না?
আমি: তার কাছাকাছিই তো আমার বাসা।
বন্ধু: ঐ ট্রেড হাউজের পাশেই আমার আত্মীয় বাড়ী। সোভিয়েত ট্রেড হাউজ-এ যেই রাশিয়ানরা থাকে, তারা তো স্পেশাল বিশাল এ্যান্টেনা দিয়ে মষ্কোর টিভি দেখতে পায়। ওদের জন্য সেই ব্যবস্থা করা আছে। তা আমি ঐ আত্মীয় বাড়ীতে গিয়ে টেলিভিশন টিউন করে মস্কোর চ্যানেল কোনরকমে ধরতে পেরেছি।
মনে মনে ভাবলাম, লে হালুয়া! আমার বন্ধুটি দেখি আরেক কেজিবি!
আমি: তা কি দেখাচ্ছে সেখানে?
বন্ধু: কিচ্ছু না। কোন নিউজই নাই। এক বৃদ্ধা মহিলা শুধু ঘ ঘ করে উঁচু গলায় গান গাইছে। অবিকল সেই কম্যুনিস্ট আমলের মত!
কি যে হবে?!
ওর কন্ঠস্বরে ভীতি ঝরে পড়লো!

টেলিভিশন মারফত জানতে পারলাম যে, রাত ১টায় গেনাদি ইয়ানায়েভ নিজেকে, পাভলভ, ক্রুচকভ, ইয়াজভ, পুগো, বাকলানভ, টিজ্যাকভ এবং স্টারোডুবতসেভকে নিয়ে জরুরি অবস্থার জন্য একটি স্টেট কমিটি (গেকেচেপে GKChP) গঠনের নথিতে স্বাক্ষর করেন। নথিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল “সোভিয়েত জনগণের কাছে আবেদন”।

উপস্থিত GKChP সদস্যরা GKChP রেজোলিউশন নং ১ স্বাক্ষর করেছেন, যা নিম্নলিখিতগুলি বিষয়গুলো জারি করেছে: “ইউএসএসআর-এর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায়” জরুরি অবস্থা জারি করা হলো ১৯শে আগস্ট মস্কো সময় সকাল চারটা থেকে আগামী ছয় মাস পর্যন্ত; যার আওতায় সকল ধরনের সমাবেশ, বিক্ষোভ এবং ধর্মঘট নিষিদ্ধ; রাজনৈতিক দল, জনসংগঠন এবং গণআন্দোলনের কার্যক্রম স্থগিত করা হলো। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়!

ভোর ৪টায়, কেজিবি সীমান্ত সেনাদের সেভাস্তোপল রেজিমেন্ট ফোরোসে রাষ্ট্রপতি গর্বাচেভের গ্রীস্মনিবাসকে ঘিরে ফেলে। সোভিয়েত এয়ার ডিফেন্স চিফ অফ স্টাফ কর্নেল-জেনারেল ইগর মালতসেভের আদেশে, দুটি ট্রাক্টর এয়ারপোর্টের রানওয়েতে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রপতির বিমান একটি Tu-134 জেট এবং Mi-8 হেলিকপ্টার মোতায়েন ছিলো, যাতে গর্বাচেভের বিমান উড্ডয়ন না করতে পারে। উপরন্তু, গর্বাচেভের গ্রীস্মনিবাসের কাছাকাছি স্থানে একটি যুদ্ধজাহাজও মোতায়েন করা হয়।

এই সব সংবাদ জানার পর আমি মনে মনে মিখাইল গর্বাচভ-এর অবদানের কথা ভাবছিলাম। কিছুনা শুধু গেকেচেপে যা যা করছে তার উল্টাটা বললেই হবে। ১। একটি মিলিটারি-পুলিশ রাষ্ট্রের রেজিম তুলে গর্বাচভ দেশের জনগণের মনে স্বস্তি এনে দিয়েছিলেন। এই দেশে সবচাইতে ক্ষমতাশালী ছিলোই মিলিটারি ও পুলিশ; এবং নিঃসন্দেহে কম্যুনিস্ট নেতারা। এদেরকে দেখলে সাধারণ মানুষের আত্মা কেঁপে উঠতো; ২। কম্যুনিস্ট নেতাদের ক্ষমতা ও দৌরাত্ম তিনি কমিয়ে এনেছিলেন; ৩। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তিনি অনেক কমিয়ে এনেছিলেন; ৪। প্রেসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন, যেখানে আগে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সাথে কথা বলার আগে ভাবতো! পিতামাতারা সন্তানদেরকে সাবধান করে দিতো যে, খবরদার স্কুলে গিয়ে আমাদের আলোচনার কথা কাউকে বলবি না কিন্তু! ৫। মানুষকে কথা বলার ও মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা তিনি দিয়েছিলেন; ৬। পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নের চারদিক থেকে নিষেধের লৌহপর্দা তিনি তুলে নিয়েছিলেন; ৬। বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিলেন; ৭। সোভিয়েত জনগণের বাইরের দেশে যাওয়ার ও যোগাযোগের বিষয়ে যে তীব্র বন্ধন ছিলো, তা তিনি শিথিল করে তিনি তাদেরকে কূপমুন্ডুকতার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন; ৮। ঘরে হার্ড কারেন্সি রাখার যে নিষেধাজ্ঞা ছিলো তাও তিনি শিথিল করেন; ৯। সভা, সমাবেশ ও মিছিলের অধিকার দিয়েছিলেন; ১০। বাইরের দেশের মিডিয়ার সংবাদ শোনা বা পড়ার নিষেধাজ্ঞা তিনি তুলে নিয়েছিলেন; ১১। ইয়াং জেনারেশনকে আধুনিক ফ্যাশনের অনুমতি দিয়েছিলেন; ১২। বহির্বিশ্বের নানাবিধ পণ্য (কোকাকোলা থেকে শুরু করে জিন্‌স কাপড় পর্যন্ত) সোভিয়েতে বিক্রির অনুমতি দিয়েছিলেন; ১৩। চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে পেইন্টিং পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন; ১৪। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবাধ নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন; ১৫। আফগানিস্তান থেকে সৈন্য ফিরিয়ে এনে সোভিয়েত মায়েদের বুক খালি করা বন্ধ করেছিলেন; ১৬। নিউক্লিয়ার অস্ত্র কমিয়ে এনে পরিবেশ দূষণ ও ঝুঁকি কমিয়েছিলেন; ১২। কম্যুনিস্ট স্বৈরশাসনে পুরো দেশটি পরিণত হয়েছিলো একটি টর্চার সেলে, তিনি সেই জাহান্নামের হাত থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

আমি শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে জনাব গর্বাচভ-এর অবদান-এর কথা লিখলাম। দেশের বাইরে উনার অবদানতো আরো বেশি।

(গত কয়েকদিন যাবৎ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মিখাইল গর্বাচভ সম্পর্কে নানা সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। সেখানে পজিটিভ-নেগেটিভ দুই ধরনের মতামতই আসছে। বলা হচ্ছে যে, বাইরের বিশ্বে গর্বাচেভ জনপ্রিয় হলেও, রাশিয়ানদের কাছে তিনি অজনপ্রিয়। তবে রাশিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী (২০০০ – ২০০৪) মিখাইল কাসিয়ানোভ জনাব গর্বাচভ-এর অবদানের কথা স্মরণ করে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।)

(গতকাল ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২২-এ পূর্ণ মর্যাদায় দাফন করা হয় মিখাইল গর্বাচভ-এর মরদেহকে। তবে সেখানে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি তেমন ছিলো না। যেটা আমার ভালো লাগেনি। ভার্চুয়ালী হলেও তাদের উপস্থিত থাকা উচিৎ ছিলো। আশা করি মিখাইল গর্বাচভ-এর স্মরণে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ একটি ভার্চুয়াল শোকসভা করবেন।)

(চলবে)

গল্পের রচনাতারিখ: ০৪ঠা সেপ্টেম্বর (রবিবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: সন্ধ্যা ০৬টা ৩৪মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.