ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ন) (মুক্তির দূত গর্বাচেভ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ন)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মুক্তির দূত গর্বাচেভ:
১৯শে আগস্ট রাত বারোটা পেরিয়ে ২০শে আগস্ট হলো। তখন সারা সোভিয়েত ইউনিয়নের পথে পথে জনতার ঢল নেমেছে, মুক্তির দূত গর্বাচভ-কে ফিরে পাওয়ার জন্য। মানুষের অমূল্য যে সম্পদ স্বাধীনতা বা মুক্তি, তা কেড়ে নিয়েছিলো সোভিয়েত কম্যুনিস্টরা। গর্বাচেভ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জনগণের অধিকার-কে। সেই মিখাইল গর্বাচভ-কে অন্তরীন করা মানেই স্বাধীনতা ও মুক্তি-কে অন্তরীণ করা। তাই সোভিয়েত জনগণ আর কিছুতেই সেটা হতে দিতে চাইলো না, তারা চাইলো না শাসরূদ্ধকর সোভিয়েত জীবনে ফিরে যেতে। মুক্তি হারানো আর জীবন হারানো তো একই কথা। তাই সবাই জীবনের ভয় উপেক্ষা করে হুমকীর প্রতীক ভয়ালদর্শন ট্যাংকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে গেলো।

ঘটনা দ্রুত বিকশিত হতে শুরু করলো। লেনিনগ্রাদ শহরের মেয়র Anatoly Sobchak (বর্তমান রাষ্ট্রপতি পুতিন-এর নেতা/বস) অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করলেন। লেনিনগ্রাদের শহরে রাজপথে নেমে এলো লক্ষ লক্ষ প্রতিবাদী মানুষ। কাজাখিস্তানের রাষ্ট্রপতি নূর সুলতান নাজারভায়েভ অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেন এবং সোভিয়েত পলিটব্যুরোর কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। বরিস ইয়েলৎসিন রুশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ হাতে পান। রাতে ফার্ফিউ জারি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

(আমি তখন বাংলাদেশে ছুটিতে থাকলেও আমার ঘনিষ্ট বন্ধু আবু জাহিদ বাবু ছিলেন খোদ মস্কোতে। মস্কোর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মস্কো এনার্জী ইনস্টিটিউট-এ অধ্যায়ন করতেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, অভ্যুত্থানের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই ঘাবড়ে গেলেও, কিছুক্ষণ পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরির দেয়ালে হাতে লেখা রাজনৈতিক পোস্টার দেখা যায়, যেখানে অভ্যুত্থানবিরোধী সমাবেশে সকলকে অংশগ্রহন করতে আহবান জানানো হয়েছে। কিছুক্ষণ পর প্রস্তুতি নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা
ডরমিটরি থেকে বেরিয়ে পরে সমাবেশে যোগ দিতে।)

দেশের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবি, নামীদামী রাজনীতিবিদ, এমনকি আর্মীর জেনারেলরাও গর্বাচেভ-এর পক্ষ অবলম্বন করলে দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। সন্ধ্যা আটটার দিকে গেকেচেপে-এর সদস্য প্রধানমন্ত্রী Valentin Pavlov ঘোষণা দিলেন যে, তিনি অসুস্থ, তাই তিনি পদত্যাগ করছেন। একটু পরে গেকেচেপে-এর সদস্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী Dmitry Yazov ঘোষণা দিলেন যে, তিনিও অসুস্থ, তিনিও পদত্যাগ করলেন। এদিকে রাত এগারোটার দিকে সমাবেশে প্রতিবাদী জনতার সংখ্যা বেড়ে কয়েকগুন হলো। তারা রুশ পার্লামেন্টের সামনে দুইটি ট্যাংকে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। এই সুযোগে এস্তোনিয়া প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণা করলো।

প্রচন্ড টানাপোড়ন ও উত্তপ্ত কাটতে থাকলো রাতটি। জনতা জীবন দিয়ে রক্ষা করতে লাগলো রুশ পার্লামেন্ট। এভাবে রাত বারোটা পেরিয়ে হলো ২১শে আগস্ট। সামরিক ট্যাংকগুলো কিছুতেই সেই ব্যারিকেড ভাঙতে পারলো না। গেকেচেপে বরিস ইয়েলৎসিন-এর বিরুদ্ধে এ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারি করলো। কিন্তু কোন কাজ হলো না, বরং মোতায়েনকৃত ট্যাংকগুলোর একাংশ বরিস ইয়েলৎসিন-এর পক্ষ নিলো।

এদিকে প্রশ্ন দেখা দিলো যে, কেমন আছেন প্রিয় নেতা মিখাইল গর্বাচভ? জানা গেলো যে, ক্রিমিয়ার সামারহাউজে তিনি সুস্থ ও অক্ষত আছেন। সেখানে যেইসব কেজিবি ও সেনাকর্মকর্তারা তাকে অন্তরিন রেখেছিলো ও যারা মস্কো থেকে সেখানে গিয়ে গর্বাচভ-এর উপর চাপ প্রয়োগ করতে চাইছিলো, তাদের সাথে মিখাইল সাহসী মিখাইল গর্বাচভ-এর কি কথোপকথন হয়েছিলো, সেই নিয়ে আরেকদিন লিখবো। উল্লেখ্য যে, জনাব গর্বাচভ বন্দী হলে টেনশনে উনার প্রিয়তমা স্ত্রী রাইসা গর্বাচভার মাইল্ড স্ট্রোক হয়! জনাবা রাইসা অল্পবয়স থেকেই মিখাইল গর্বাচভ-এর সাথে ছিলেন, এবং উনার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের চিরসঙ্গিনী ছিলেন। অনেকের ধারনা যে, মিখাইল গর্বাচভ-এর এত এত সাফল্য ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ-এর পিছনে সবসময়ই ছিলেন রাইসা গর্বাচভা। ক্ষুরধার বুদ্ধিমতী জনাবা রাইসা-কে অনেকেই মনে করতেন জনতার মুক্তির রাজনৈতিক পদক্ষেপ নতুন রাজনৈতিক রিফর্মের জন্য পর্দার অন্তরালে নিরলস কাজ করে ও পারমর্শ দিয়ে গিয়েছেন রাইসা গর্বাচভা। রাইসা গর্বাচভা-কে নিয়ে আরেকদিন লিখবো।

অভ্যুত্থান নেতারা মিখাইল গর্বাচভ-কে মস্কো ফিরে আসতে আদেশ দিলে কঠোর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মিখাইল গর্বাচভ তা প্রত্যাখ্যান করেন। অপরদিকে তারা বরিস ইয়েলৎসিন-কে নির্দেশ দিয়েছিলো ক্রিমিয়া গিয়ে গর্বাচভ-কে ফিরিয়ে আনতে। জনাব ইয়েলৎসিন-ও ক্যু-নেতাদের আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান।

দুপুর একটার দিকে উজবেকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ‘ইসলাম করিম’ নয়া সোভিয়েত সরকার-কে অবৈধ ঘোষণা করেন। এবং গর্বাচভ-এর পক্ষ অবলম্বন করেন। এবার ক্যু-লীডার-রা মস্কো ত্যাগ করে। এই পর্যায়ে রুশ পার্লামেন্ট ইয়েলৎসিন-কে ক্ষমতা দেন, ক্যু-লীডার-দেরকে গ্রেফতার করার।

দুপুর দুইটার দিকে মিলিটারি ক্যাডার-রা মস্কো থেকে সকল সামরিক ট্রুপ তুলে নিতে রাজী হন। তখন এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন দুইজন সেনাপতি, জেনারেল পাভেল গ্রাচোভ ও জেনারেল আলেকজান্ডার লেবেদ। উনারা কেন, কি কারণে সরকারের আদেশ না মেনে প্রতিবাদী জনতা ও গর্বাচভ-এর পক্ষ নিয়েছিলেন, তা নিয়ে আরেকদিন লিখবো, তবে আপাতত শুধু এইটুকু বলি যে, সেই দেশের জেনারেলদের সমরবিদ্যার পাশাপাশি দর্শন ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আরো অনেক লেখাপড়া থাকে, যা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরী। একটি সুপার পাওয়ারের জন্য তো জরুরী অবশ্যই!

দুপুর তিনটার দিকে ক্যু-লীডার-রা মস্কো ছেড়ে ক্রিমিয়ায় পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় জানায় যে মস্কো থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিকাল চারটার দিকে কয়েকজন ক্যু-লীডারকে বিলোরাশিয়ার Sverdlovsk-এ গ্রেফতার করা হয়। তারপর প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় ঘোষণা দেয় যে, জরুরী অবস্থা তুলে নেয়া হয়েছে। গেকেচেপে-এর দুইজন সদস্য মানে ক্যু-লীডার কেজিবি প্রধান Kryuchkov এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াজোভ ক্রিমিয়া যান জনাব গর্বাচভ-এর সাথে আলোচনা করতে। তারপর বিকাল পাঁচটার দিকে সোভিয়েত পার্লামেন্ট ঘোষণা দেয় যে, জরুরী অবস্থা তুলে নেয়া হলো এবং মিখাইল গর্বাচভ-কে পুনরায় ক্ষমতায় বসানো হলো। তারপর সন্ধ্যা ছয়টায় সুপ্রীম সোভিয়েত ঘোষণা দিলো যে, পুনরায় সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হলেন মুক্তির দূত জনাব মিখাইল গর্বাচভ।

(চলবে)

গল্পের রচনাতারিখ: ০৭ই সেপ্টেম্বর (বুধবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: সন্ধ্যা ০৭টা ০৩মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.