ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – প) (ফিরে এলেন মুক্তির দূত)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – প)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ফিরে এলেন মুক্তির দূত গর্বাচভ:
অভ্যুত্থান মানেই ভয়-ভীতি। আমি নিজে এমন একটি দেশের, এমন এক সময়ের মানুষ, যে একাধিক অভ্যুত্থান দেখেছি। ১৯৭৫ সালে ক্যূ এবং পাল্টা ক্যূ দেখেছি, ১৯৭৭ সালের ব্যার্থ ক্যু দেখেছি, ১৯৮১ সালের ট্রাজেডি দেখেছি (এই ক্যু-ও দিন তিনেক স্থায়ী হয়েছিলো), ১৯৮২ সালের রক্তপাতহীন ক্যু দেখেছি, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান-এর সময় আমি বাংলাদেশে ছিলাম না, তবে দেশের মানুষের মুখ থেকে তার কাহিনী শুনেছি। ইন্টারেস্টিং বিষয়টা হলো যে, আমাদের দেশের এক একটা অভ্যুত্থান ঘটেছে এক একটা ভিন্ন ভিন্ন ফর্মুলায়। একই ফর্মুলায় দুইটি অভ্যুত্থান আমি আমাদের দেশে দেখিনি। কখন কারা যে এইসব পরিকল্পনার পিছনে মূল হোতা, তা আমি জানি না। তবে এটা যদি বিশ্বমোড়লদের চাল হয়ে থাকে, তবে সেই চাল খুব সুক্ষ্ম! তারা পূর্ববর্তি কোন ফর্মুলায় পরবর্তি কোন ঘটনা ঘটায় না! মানে তারা জানে যে, পূর্ববর্তি ফর্মুলাগুলোর বিষয়ে পূর্বপ্রস্তুতি নেয়া থাকে, তাই ঐ পথে আর যাওয়া যাবে না, যেতে হবে ভিন্ন ও নব্য পথে, যাতে প্রতিপক্ষ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার আগেই সব ঘটে যায়।

বাইরের দেশগুলোর ক্ষেত্রেও মোটামুটি তাই, তবে মিশরের ‘ফ্রী অফিসার্স ক্যু’, ও ‘ইরাকের ফ্রী অফিসার্স ক্যু’ একই রকম ছিলো। আবার ফিলিপাইনের মার্কোসের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের এরশাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান-এর মধ্যে মিল রয়েছে।

১৯৯১ সালে মস্কোর অভ্যুত্থান দেখে আমি ভয় পাইনি। সেটা হয়তো অনেকগুলো ক্যু দেখা মানুষ আমি তাই বলেই হবে। তবে গভীরভাবে অপেক্ষা করছিলাম এর শেষ দেখার জন্য। এবং সাপোর্ট ও দোয়া করেছিলাম গর্বাচভ-এর বিজয়ের জন্য।

যা বলছিলাম, অভ্যুত্থান মানেই ভয়-ভীতি; আবার অভ্যুত্থান মানেই সাহস; অভ্যুত্থান মানেই গুলি-বারুদ-ট্যাংক-যুদ্ধবিমান, সসস্ত্র সেনাটহল বনাম নিরস্ত্র মানুষের সাহসে বুক পেতে দেয়া; আবার কখনো কখনো হয় সেনাসদস্যদেরই দুই পক্ষের মুখোমুখি হওয়া; অভ্যুত্থান মানেই মৃত্যু; অভ্যুত্থান মানেই জয়-পরাজয়। যে কোন অভ্যুত্থানেই পক্ষ-বিপক্ষ থাকে। তারপর জয়-পরাজয়ের হিসাব শেষ হওয়ার পরে, একপক্ষ লাভবান হয়, আরেক পক্ষ হয় লুজার। আবার অনেক সময় দেখা যায় অভ্যুত্থানে মুখোমুখি হওয়া দুই পক্ষই লুজার হয়, আর সেই সুযোগ নেয় তৃতীয় কোন পক্ষ।

মস্কোতে ১৯৯১ সালের আগস্টের অভ্যুত্থান ছিলো কম্যুনিস্ট হার্ডলাইনার বনাম উদারপন্থী কম্যুনিস্ট। তাদের টানাপোড়ন-টা অনেকদিন যাবতই চলছিলো। নতুন নতুন টিউবওয়েল আসার পর যেমন অনেক প্রাচীনপন্থীরা টিউবওয়েলের পানি না খেয়ে পূর্বের মত পুকুরের পানিই খেয়ে যেত, তেমনি হার্ডলাইনার কম্যুনিস্ট-রা মিখাইল গর্বাচভ-এর যুগান্তকারী সব রিফর্ম হজম করতে পারছিলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে জনৈক পলিটোলজির অধ্যাপক আমাকে বলেছিলেন, “জানেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনেকেই রিফর্ম বা পরিবর্তন চায় না।” সেই আমলে পলিটোলজি পড়া বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিলো। আরেকজন পলিটোলজি-র ইয়াং শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন যে, “আমাদের সোভিয়েত দেশ হচ্ছে এমন একটি দেশ যে বিশ্ববাসীকে দেখায়, কোন পথে হাটা যাবে না।” উনার সেই কথাটা সেদিন আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিলো। সোভিয়েতের বাইরেও অনেক কম্যুনিস্ট নেতা রিফর্ম-এর বিরোধিতা করেছিলো। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রুমানিয়ার কম্যুনিস্ট ডিক্টেটর ‘নিকোলাই চসেস্কু’। তবে তার এই বেঁকে বসার মূল্য তাকে দিতে হয়েছিলো, মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে, ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদন্ড পেয়েছিলেন। আমাদের পাশের দেশের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশেও সেই সময়ে বেশ জেঁকে বসেছিলো কম্যুনিস্টরা। তবে তাঁদের মতিগতিতে খুব একটা ক্লিয়ার ছিলো না যে, তারা কতটুকু ‘কম্যুনিস্ট’ আর কতটুকু ‘ব্রহ্মণ্যবাদী’। সেই ধুম্রজাল এখনো আছে। যাই হোক, তা সেখানকার অনেক নেতাও তখন বলেই বসেছিলেন যে, জনাব গর্বাচভ-এর অনেক কার্যকলাপ তারা হজম করতে পারছেন না!

মস্কোর তিনদিনের অভ্যুত্থানে টানাপোড়নটা ছিলো বিশাল। সারা বিশ্বের নজর ছিলো সেইদিকে। ছিলো টানটান উত্তেজনা। তবে এই কথাটা স্বীকার করে নিতেই হবে যে, সেই প্রাচীনকাল থেকেই ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’। হার্ডলাইনার ইয়ানয়েভ, ইয়াজভ-রা প্রথমে ‘জেনারেল গ্রাচোভ’ ও ‘জেনারেল লেবেদ’-কে ডেকে আনতে পারলেও, শেষ পর্যন্ত আর জেনারেলদ্বয়কে নিজেদের পক্ষে রাখতে পারেননি। জেনারেলদ্বয় যখন নিজ দেশের প্রতিবাদি জনতার বুকে গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান, এবং হার্ডলাইনারদের পক্ষ ত্যাগ করেন, তখনই তারা বুঝে গেলেন যে, তাদের পরাজয় আসন্ন। অনেক সময় পাবলিক সাপোর্ট না থাকলেও ‘মিলিটারি সাপোর্ট’ দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়। কিন্তু হার্ডলাইনার কম্যুনিস্টদের না আছে পাবলিক সাপোর্ট, না আছে মিলিটারি সাপোর্ট, সুতরাং তারা পরাজিত।

অবশেষে না পারতে কেজিবি প্রধান ক্রুচকোভ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াজোভ ক্যু-লীডাররা মিখাইল গর্বাচভ-এর সাথে আলোচনা করতে ক্রিমিয়া গেলেও গর্বাচভ তাদের সাথে দেখা করেননি। ঐদিন বিকালে রাশিয়ার ভাইস-প্রেসিডেন্ট Alexander Rutskoy এবং Soviet Security Council-এর সদস্য Yevgeny Primakov (পরবর্তিকালে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী) এবং আরো কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মিখাইল গর্বাচভ-কে মস্কো ফিরিয়ে আনতে ক্রিমিয়া যান। তাদের সাথে নিরাপত্তার জন্য যান ৩৬ জন সামরিক কর্মকর্তা, যাদের সাথে ছিলো গুলিভর্তি মেশিনগান। উনাদের কমান্ডার ছিলেন রাশিয়ার উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Andrei Dunaev।

জনাব রুৎসকোই এবং জনাব প্রিমাকোভ-এর ডেলিগেশন গর্বাচভ-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি তাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

তারপর ২১শে আগস্ট পার হয়ে মধ্যরাত পেরিয়ে, মানে ইতিমধ্যে ২২শে আগস্ট-এ তিনি মস্কোর উদ্দেশ্যে ক্রিমিয়া ত্যাগ করেন। গেকেচেপে সদস্যদের অন্য বিমানে মস্কো পাঠানো হয়। তবে যেই বিমানে গর্বাচভ ও তার পরিবার ছিলো সেই একই বিমানে ক্যু-লীডার Kryuchkov-কেও বসানো হয়, কড়া পুলিশ প্রহরায়। জনাব রুৎসকোই (প্রাক্তন জেনারেল) জানান যে, এটা কৌশলগত কারণে করা হয়েছিলো, যেন গর্বাচভ-এর বিমানে কম্যুনিস্ট হার্ডলাইনার-রা গুলি না চালাতে না পারে।

২২শে আগস্ট রাত দুইটায়, মিখাইল গর্বাচভ ও তার পরিবারকে বহন করা বিমান ল্যান্ড করে মস্কোর ভ্নুকোভা এয়ারপোর্টে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল এই ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করে। যেখানে সারা বিশ্বের উল্লসিত মানুষ দেখতে পান যে, বিমানের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছেন হাস্যজ্জ্বল মিখাইল গর্বাচভ, উনার পড়নে ছিলো নিটেড সোয়েটার। ইনার সাথে ছিলেন জনাবা রাইসা গর্বাচভা ও পরিবারের সদস্যরা, খুব সম্ভবত উনার নাতনিরা।

মুক্তির দূতের এই ফিরে আসায় উনারই মতন বিজয়ের হাসি হাসেন সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ।

(পাঠকগণ একটি গল্পের ভিতর প্রসঙ্গক্রমে বলতে হলো মিখাইল গর্বাচভকে নিয়ে কিছু ঘটনা, গত ৩০শে আগস্ট তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন, এমন সময়ে উনাকে নিয়ে লেখা আমার কর্তব্য ছিলো। ঘটনা পরম্পরা বা সিলসিলা এখানেই শেষ হতে পারে। তবে ১৯৯১ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়টা কম ঘটনাবহুল নয়! কারণ গর্বাচভ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি এখানেই ঘটেনি। কম্যুনিস্ট হার্ডলাইনার-রা উনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েও পারেনি। কিন্তু ডিসেম্বর মাসে তিনি নিজ থেকেই পদত্যাগ করেছিলেন ও সেইসাথে সমাপ্তি ঘটেছিলো সোভিয়েত সাম্রাজ্যের। কি? কেন? কোথায়? কিভাবে? ইত্যাদির উপরে আমি কিছু লিখতে পারি অবশ্যই। শেয়ার করতে পারি আমার নিজের ক্ষমতার অতিদূর থেকে দেখা, কিন্তু ঐ দেশের অভ্যন্তরে থেকেই দেখা অভিজ্ঞতা। তবে পাঠকদের আগ্রহ থাকলেই কেবল লিখবো। নতুবা এই গল্পে আর এই বিষয়ে লিখবো না। আপনাদের মূল্যবান মতামত আশা করছি।)

(চলবে)

গল্পের রচনাতারিখ: ০৮ই সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৫টা ০৯মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.