ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ফ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ফ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

গত পর্বে লিখেছিলাম যে, সদ্য প্রয়াত মিখাইল গর্বাচভ ও উনার শাসনামল নিয়ে কারো কোন প্রশ্ন থাকলে পরবর্তি পর্বে তার উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো। তবে ফরচুনেটলি/আনফরচুনেটলি তেমন কোন প্রশ্ন আমি পাইনি। এর সম্ভাব্য কারণ এই হতে পারে যে, বর্তমান প্রজন্মের জন্মই হয়েছে, মিখাইল গর্বাচেভ-এর শাসনামল শেষ হওয়ার পর। তার মানে একটি পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে তাদের জন্ম, তাই তারা হয়তো ভাবছে যে, দুনিয়া এমনই ছিলো চিরকাল! কিন্তু এই ধনাত্মক পরিবর্তনের পিছনে কে বা কারা অবদান রেখেছেন, এটা বোধহয় নতুন প্রজন্ম জানে না।

এনিওয়ে, মিখাইল গর্বাচভ-এর রিফর্মের কিছু পজেটিভ দিক আমি আগের পর্বগুলোতে উল্লেখ করিনাই, সেটা এখানে উল্লেখ করছি। ১. ‘ডিগনিটি অফ এ ম্যান’ এই বিষয়টার বড় অভাব আমি দেখেছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়নে। মিখাইল গর্বাচভ-এর শাসনামলে এটা কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। ২. ‘ব্যাক্তিমালিকানা’ ও ‘ব্যাক্তিপুঁজির ব্যবসা’ বলে কিছুই ছিলো না ঐ দেশে। ‘ব্যাক্তিমালিকানা’-য় বলতে গেলে নিজের পড়নের কাপড়-চোপড়, ঘরের আসবাবপত্র, আর খুব বেশি হলে নিজের গাড়ীটা ছিলো। থাকার বসতভিটা, এ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে জমিজমা পর্যন্ত সবই ছিলো সরকারের। একটা ছোট দোকান খোলার অধিকারও কারো ছিলো না। কম্যুনিস্ট রা ব্যবসাকে বলতো স্পেকুলেশন, মানে ফটকাবাজি। মিখাইল গর্বাচভ-এর শাসনামলে ‘ব্যাক্তিমালিকানা’ প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং ও ‘ব্যাক্তিপুঁজির ব্যবসা’ -কে উৎসাহিত করা। ৩. ধর্মীয়-স্বাধীনতা দেয়া হয় মিখাইল গর্বাচভ-এর শাসনামলে। গর্বাচভ-এর আমলেই মস্কোতে প্রথম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ৪. সোভিয়েত ইউনিয়নে সামান্য প্রেমের স্বাধীনতাও ছিলো না। কোন সোভিয়েত নারী যদি কোন বিদেশীর প্রেমে পড়তো, আর সেটা যদি বিয়ে পর্যন্ত গড়াতো, তাহলেই শুরু হতো ঝামেলা। কোন দেশে থাকবে এই দম্পতি? একসময় সোভিয়েত এই মিক্সড ম্যারেজের দম্পতিকে ঐ দেশে থাকতে এ্যালাউ করতো না। তারপর তারা একসময় হেলসিংকির চুক্তি মেনে নেয়। মানে সেই দেশে থাকার অনুমতি দেয়। কিন্তু একটা দেশে কেবল থাকলেই তো হবে না, খেতেও তো হবে। তা সেই বিদেশীকে সোভিয়েত কোন চাকরি-বাকরী দিতো না। তাই শেষ পর্যন্ত সে বাধ্য হতো, বৌ-সহ সোভিয়েত ছাড়তে। মানে হলো, সোভিয়েত নারী কোন বিদেশীকে বিয়ে করলে, তাকে অলিখিতভাবে বলা হতো যে, তোআর জামাইয়ের সাথে সাথে তুইও সোভিয়েত ছাড়! তবে গর্বাচভ-এর শাসনামলে মিক্সড-কাপলদের সোভিয়েতে থাকার অনেক শিথিলতা আসে । ৫. কোন বিদেশীকে নাগরিকত্ব দেয়ার কোন বিধানই ছিলো না সোভিয়েত রাষ্ট্রে। তা সেই বিদেশী সেই দেশে এক দশক থাকুক আর দশ দশক থাকুক (এমনকি এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে হলেও তাকে ভিসা নিতে হতো লোকাল অথরিটির কাছ থেকে)। তবে গর্বাচভ-এর শাসনামলে বিদেশীদেরকে নাগরিকত্ব দেয়া শুরু হয় ও ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকুরী-বাকুরি করার অনুমতিও দেয়া হয়। আর এই সুযোগ গ্রহন করে অনেকেই ঐ দেশে থিতু হয়েছে। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো যে, যারা ঐ সুযোগ গ্রহন করেছে, তাদেরও কেউ কেউ গর্বাচভকে খারাপ বলে! আশ্চর্য্য! ৬. সোভিয়েতে ছিলো না কোন মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা! কম্যুনিস্টরা বাধ্য করতো সকলকে তাদের মত করেই ভাবতে। গর্বাচভ-এর শাসনামলে মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা দেয়া হয়। ৬. বেশ হাস্যকর বিষয় হলো যে, রক-এন-রোল মিউজিকও নিষিদ্ধ ছিলো সোভিয়েত দেশে। তাই সেটা ছিলো আন্ডারগ্রাউন্ডে। কিন্তু মিখাইল গর্বাচভ-এর উদার নীতিতে রক-এন-রোল মিউজিককে অনুমোদন দেয়া হয়; এবং ভিক্তর সৈ নামক একজন রক-এন-রোল গায়ক বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, তরুণ মহলে।

পররাস্ট্রনীতিতে পরিবর্তন:
পররাস্ট্রনীতিতে যে বিপুল পরিবর্তন আসে সোভিয়েত দেশে তা বলে শেষ করা যাবে না, এই লেখার ক্ষুদ্র পরিসরে।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশের পররাস্ট্রমন্ত্রী জনাব মুস্তাফিজুর রহমান মস্কো সফর করেন। অনেকগুলো বছর পর এমন একটি শক্তিশালী সফর হয়। সোভিয়েতের উপ-রাষ্ট্রপতি গেনাদি ইয়ানয়েভ তার সাথে সাক্ষাৎ দেন। এর মানে হলো যে, মিখাইল গর্বাচভ-এর শাসনামলে পররাস্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে।

মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগ্যান মস্কো সফর করেন। জনাব গর্বাচভ-ও ওয়াশিংটন যান। যা ছিলো সেই সময়ের হিসাবে রেভ্যুলুশনারী চেইঞ্জ।

সোভিয়েত বলয়ে থাকা বিভিন্ন দেশে তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দিতে থাকেন। কিছু কিছু দেশে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। যেমন, রুমানীয়ার কয়েক যুগের ত্রাস ডিক্টেটর নিকোলাই চসেস্কু উৎক্ষাত হয়, ও মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হয়। অনেক ডিক্টেটর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।

ভেঙে ফেলা হয়, সমাজতন্ত্রের সিম্বল ভয়াল দেয়াল ‘বার্লিন প্রাচীর’। বলা হয় যে, বার্লিন প্রাচীর-এর ভাঙনের সাথে সাথেই শাসরুদ্ধকর সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছিলো। কারো কারো মতে এটা ছিলো ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’। এইসাথে পুণএকত্রিত হয় পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানী।

বিভিন্ন দেশে মিলিটান্ট কম্যুনিস্ট সন্ত্রাসীরা শান্ত হতে শুরু করে।

আফগানিস্তান চলা এক দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করা হয় ও সেখান থেকে সোভিয়েত সৈন্য ফিরিয়ে আনা হয়।

নাস্তিক কম্যুনিস্টরা বাইরের দেশের ধর্মীয় নেতাদের সাথে কোন সম্পর্ক রক্ষা করতো না। কিন্তু মিখাইল গর্বাচভ-এর উদার নীতির ফলে ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনী জনাব গর্বাচভ-কে একটি চিঠির মাধ্যমে ইসলাম-এর দাওয়াত দিয়েছিলেন। মিখাইল গর্বাচভ সেই দাওয়াত গ্রহন না করলেও, জনাব খোমেনী-র চিঠি সম্মানের সাথে গ্রহন করেছিলেন।

ধাপে ধাপে নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে বিপুল পরিমানে ‘নিউক্লিয়ার উইপন’ কমিয়ে আনা হয়।

চীনের সাথে সোভিয়েতের ভাঙা সম্পর্কেরও উন্নয়ন ঘটে মিখাইল গর্বাচভ-এর শাসনামলে।

১৯৯০ সালে ইরাকের ডিক্টেটর সাদ্দাম হোসেন আগ্রাসন চালিয়ে কুয়েত দখল করে নিলে, পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইরাকের যুদ্ধ বেধে যায়। এই যুদ্ধে মিখাইল গর্বাচভ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন; এবং এই আগ্রাসন-কে দোষারোপ করেন। কুয়েত দখলমুক্ত হোক এটাই তিনি চেয়েছিলেন। গর্বাচভ-এর এই পদক্ষেপ-কে অনেকেই সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, কারণ তারা আশা করেছিলেন যে গর্বাচভ ‘সাদ্দাম হোসেন’-এর পক্ষ নেবে। কিন্তু জনাব গর্বাচভ আগ্রাসন-কে আগ্রাসন হিসাবেই দেখেছিলেন এবং কুয়েত দখলমুক্ত হোক এটাই তিনি চেয়েছিলেন। এই যুদ্ধে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হ ম এরশাদ পশ্চিমাদের পক্ষ হয়ে বাংলাদেশী সৈন্যদের কুয়েত মুক্ত করতে পাঠিয়েছিলেন। তবে পশ্চিমা ও তাদের এলাইন্সদের অপারেশনে কুয়েত মুক্ত হওয়ার পর, তারা গ্রাউন্ড অপারেশন চালিয়ে ইরাকের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে চাইলে, মিখাইল গর্বাচভ তাতে বাধা দেন। যার ফলে ইরাক সেযাত্রা ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলো।

সর্বপরি বিশ্বব্যাপী চেপে থাকা টেনশন ‘কোল্ড ওয়ার’ বা ‘ঠান্ডা লড়াই’-এর চূড়ান্ত অবসান ঘটান মিখাইল গর্বাচভ।

আগস্ট অভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট হার্ডলাইনাররা:
১৯৯১ সালের আগস্টে মস্কোতে কম্যুনিস্ট হার্ডলাইনারদের কর্তৃক সংঘটিত গর্বাচভবিরোধী অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে, হতাশায় মুষড়ে পরে বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট হার্ডলাইনাররা। তার কয়েকদিন পরে, ১৯৯১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার রাজপথে সমাজতন্ত্রের সমর্থকরা “সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম চলছে চলবে” লেখা ব্যানার নিয়ে ‘সমাজতেন্ত্রের মিছিল’ সংঘঠিত করে। ঢাকার কেন্দ্রে সংঘটিত এই মিছিলটি, আমি অনতিদূরে দাঁড়িয়ে নিজ চোখে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। এবং মনে মনে ভাবছিলাম, এই বাংলাদেশী কম্যুনিস্ট হার্ডলাইনাররা, যাদের বেশিরভাগই জীবনেও সোভিয়েত ইউনিয়নে যায় নাই, দেখে নাই; এবং যারা গিয়েছিলো তারাও কয়েকদিন বা কয়েকসপ্তাহের বেশি থাকে নাই। যতটুকু থেকেছিলো তাতে তাদেরকে সুকৌশলে দেখানো হয়েছিলো একটি কৃত্রিম সাজানো বাগান। এই হার্ডলাইনাররা কি জানে যে, তাদেরকে দেখানো বাগানটি কৃত্রিম ও প্রতারণামূলক, ইন রিয়েলিটি পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নটি ছিলো একটি বিশাল টর্চার চেম্বার?

(চলবে)

গল্পের রচনাতারিখ: ১৪ই সেপ্টেম্বর (বুধবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৫টা ৪৭মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

May be an image of 1 person and brick wall

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.