ইনবক্স-১ (বর্ধিত)

ইনবক্স-১ (অনুগল্প)

————————— রমিত আজাদ

তরুণী: কবি, আপনার লেখা কবিতাগুলো সবই কি একটি মেয়েকে নিয়েই লেখা???

ইনবক্সে, এই মেসেজটি পেলাম।

আমার খুব একটা সেনসেটিভ জায়গায় টোকা দিয়েছে তরুণীটি। আমি কবিতা লিখি, চাই যে সবাই ওগুলোকে কবিতা হিসাবেই পড়ুক। তার সাথে আমার ব্যাক্তিগত জীবন না মেলাক। কিন্তু কেন যেন জানিনা, অনেকেই এক একটা কবিতা পড়ে ভাবে যে, ‘নিশ্চয়ই এটা কবির জীবনের কোন একটা আবেগময় ঘটনার সাথে জড়িত!’ শোনা যায় যে ‘শবনম’ উপন্যাসটি পড়ে কেউই বিশ্বাস করতে চায় নি যে, এটা সৈয়দ মুজতবা আলী-র জীবনের বাস্তব ঘটনা নয়, কল্পনাপ্রসূত। আবার শোনা যায় যে, ‘দেবদাস’ উপন্যাসটি শরৎ বাবুর জীবনেরই ঘটনা অবলম্বনে লেখা! একবার চীনা এক লেখকের লেখা কিছু প্রেমের ছোটগল্প পড়েছিলাম, সবগুলো-ই সুখপাঠ্য ছিলো। তারপর বইয়ের ভূমিকাংশ পড়ে জানলাম যে, গল্পগুলো উনার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা।

ভাবছি, তরুণীটিকে কি উত্তর দেব? সত্যি বলবো, নাকি সত্যি-মিথ্যে মিলিয়ে বলবো?

আমি: কবিতা-কে কবিতা হিসাবেই পড়ুন না।

তরুণী: তাও জানতে মন চায়।

তারপর সত্যিটাই বললাম, “বেশিরভাগ কবিতাই একটি মেয়েকে নিয়ে লেখা। তবে  অন্যান্যদেরকে নিয়েও কিছু কিছু কবিতা লিখেছি।”

তরুণী: বোঝা গেল যে একজনকে আপনি ভালোবাসতেন। বাকিদেরকেও কি ভালোবাসতেন?

আমি: জানি না ঠিক কি উত্তর দিতে পারি! হ্যাঁ ঐ একজনকে মানে আমার প্রথমা-কে আমি ভীষণ ভালোবাসতাম। এখনো ভালোবাসি। আর বাকিদেরকে ভালোবাসি কিনা ঠিক বলতে পারবো না। হতে পারে যে প্রথমা-কে অনেক বেশী ভালোবাসি আর বাকিদেরকে কিছুটা ভালোবেসেছি।

তরুণী: আর তারা কি আপনাকে ভালোবেসেছিলো?

আমি: হু, হয়তো। আসলে তাদের ভালোবাসা নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তিত ছিলাম না কখনো!

তরুণী: তাহলে তাদেরকে নিয়ে কবিতা লিখলেন কেন? এটা কি আপনার কোন খেলা?

আমি: কবির কাজ কবিতা লেখা। ঐ বোধ থেকে হতে পারে। আবার তাদের প্রতি কিছুটা আবেগবশতঃও হতে পারে।

তরুণী: বাস্তবে প্রেম না করলে কি ভাব আসে না?

আমি: কল্পনাপ্রসূতও হয় মাঝেসাঝে। তবে বাস্তবটাই বেশী দোলা দেয়।

তরুণী: অন্যেরা আপনাকে ভালোবাসে কিনা এটা তাহলে আপনার জানা নেই?

আমি: এদের মধ্যে দু’একজন বোধহয় আমাকে ভালোবেসেছিলো। একজনার আবেগ খুবই বেশী ছিলো। ইন্টারেস্টিং হলো যে তাকে আমি সব সময় কিছুটা দূর থেকেই দেখেছি। কথাবার্তাও হয়েছে সামান্য!

তরুণী: তাকে নিয়ে কোন কবিতা লিখেছেন?

আমি: জ্বী, লিখেছি। তিন-চারটা কবিতা হবে।

তরুণী: কেন লিখলেন তাকে নিয়ে কবিতা?

আমি: যখন জানতে পারলাম যে সে আমাকে ভালোবাসে, তখন ওর জন্য আমার মায়া লেগেছিলো! কোন একটা দায়িত্ববোধ ও মায়া থেকেই লিখেছি।

তরুণী: কোথায় আছে মেয়েটি এখন?

আমি: কোথায় আছে আমি জানি। তবে সেটা বলা যাবে না। এনিওয়ে, সে ভালো ও সুখেই আছে বলে মনে হয়।

তরুণী: কি করে বুঝলেন?

আমি: এটা ইন্টারনেটের যুগ। সমাজের উঁচুতলার লোকগুলোর খোঁজ পাওয়া যায় সহজেই।

তরুণী: কিন্তু সে সুখে আছে কি করে বুঝলেন? ওটা একান্তই তার হৃদয়ের বিষয়। সে কি আপনাকে কখনো তার সুখের কথা বলেছে?

আমি: না বলেনি। আমি জিজ্ঞাসাও করিনি। ওর এখন ভিন্ন জগৎ, ঐ জগৎে আমার প্রবেশাধিকার নেই। ওটা গর্হিত কাজ হবে।

তরুণী: এমনও তো হতে পারে যে, সে তার জগতে সুখে নেই, শুধু বাইরের মানুষদেরকে নিজেকে সুখী দেখানোর চেষ্টা করছে।

আমি: তা হোক। তাও সে তার জগৎ নিয়েই থাক।

তরুণী: সে যদি, আবার আপনার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে?

আমি: কেন সে সেটা করবে? আমার সাথে তার তো কোনকালেই কিছু ছিলো না!

তরুণী: মনের অস্থিরতা থেকেও তো সে সেটা করতে পারে। শুধু আপনার সাথে একটু আলাপনের আশায়!

আমি: জানি না। এ বিষয়ে নীরবতাই ভালো।

তরুণী: আপনার লেখা কবিতাগুলো খুব সুন্দর! ওগুলো পড়ে, প্রেমে পড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

এবার কি উত্তর দেব? তরুণীটি কি আমার প্রেমে পড়েছে? ঘুরিয়ে কথা বলে, সেটাই কি এক্সপ্রেস করতে চাচ্ছে? নাকি নিছক মজা করছে? বোঝা মুশকিল! আমার এ’ জীবনে বত্রিশ রকম নারী/মেয়ে দেখেছি বত্রিশ রকম। কারো সাথে কারো মিল নেই! তাছাড়া তাদের বেশিরভাগের মুডটাই থাকে পূর্ব-বাংলার আগুনমুখা নদীর মত, ‘এই আছে ভাটায় আবার এই যে দেখি জোয়ারে!’ এই হয়তো তার প্রেম টলটলিয়ে পড়ছে, আবার পরক্ষণেই দেখা যায় জানথিপির রুদ্রমূর্তি! কিছুক্ষণ ভেবে লিখলাম,

আমি: থাক প্রেমে পড়ার দরকার নেই। প্রেমে না পড়াই ভালো।

তরুণী: কেন?

আবারো ভাবছি, কি উত্তর দেব? রূপসী এক তরুণী যদি নিজে থেকে প্রেম নিবেদন করে, তাহলে যে কোন স্বাভাবিক পুরুষের তাতে খুশী হওয়ারই কথা। একটু চালু পুরুষ হলে সেটার সুযোগই নিতে চায়। আর নেবে নাই বা কেন? মেয়ে তো রাজীই আছে। সো-কলড প্রগতিশীলতার যুগ বলে কথা!

ক্লিক করলাম তার প্রোফাইল পিকগুলাতে। দেখি তো কে এই তরুণী? হু রূপসীই বটে! যথেষ্ট রূপসী!

এক সময়ে মনে হলো, তাকে কোথাও হয়তো দেখেছি, কিন্তু এখন ঠিক মনে করতে পারছি না। শুনেছি, সেলিব্রেটিদের বেলায় এরকম মনে হয়। এই পর্দার নায়ক-নায়িকাদেরকে মুখোমুখি দেখে মনে হয় যে, কোথায় যেন তাদেরকে দেখেছি। আবার ইদানিং মনে হয় যেন, রূপসী সব তরুণী-ই একই রকম দেখতে। এটা কি তাদের সকলের একই ফ্যাশনের সাজ-গোজের কারণে মনে হয়??? জানি না।

ফিরে এলাম ইনবক্সে। কি লিখবো? পজেটিভ কিছু? কিন্তু না, সব সময় সব মুড থাকে না। লিখলাম,

আমি: এই বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা ভালো না। কিছুটা তিক্তই বলা যেতে পারে।

তরুণী: কেমন তিক্ত?

আবারো ভাবছি। আচ্ছা তরুণীটিকে তো আমি চিনিই না! এমনও তো হতে পারে যে, এটা একটা ফেইক আইডি। অন্য কারো ছবি ব্যবহার করছে। তাছাড়া এটা যদি কোন রকম চাল হয় তখন?

আমি: আজ একটু ব্যস্ত আছি। কাল চ্যাট করি?

তরুণী” ওকে। কাল কথা হবে তাহলে।

———————————————-

পরদিন আবারো ইনবক্সে মেসেজ এলো।

তরুণী: কেমন আছেন, কবি?

আমি: ভালো আছি। আপনি?

আমি সংক্ষেপে “আপনি?” লিখে বোঝাতে বা প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম যে, “আপনি কেমন আছেন?” আর তরুণী বুঝলো ভুল! লিখলো?

তরুণী: কেন, আমার মেসেজ পেয়ে বিরক্ত হয়েছেন? আমাকে ইনবক্সে এক্সপেক্ট করেন নাই, তাই না?

বুঝলাম না ঠিক কি বলবো? এই চ্যাটিং বা টেক্সট মেসেজের অন্যতম সমস্যা হলো যে, এখানে ভয়েস টোন বোঝা যায় না। তাই একটা কথার অন্য মানেও করা যায়। আমি হয়তো লিখলাম এক, আর যে পড়লো সে হয়তো বুঝলো ভুল! একারণেই বোধহয় জ্ঞানী সক্রেটিস কোন বই লেখেন নাই। তিনি বলেছিলেন যে, “ছাগচর্মে মানুষের আবেগকে খোদিত করা যায় না।” ভুল কিছু বলেন নাই। যে কোন লিখিত বই বা টেক্সটে বর্ণমালার পাশাপাশি কিছু ইমোশন বা টোন এক্সপ্রেসিং ‘ইমো’ থাকলে ভালো-ই হয়। ফেইসবুকে আছে অবশ্য। তবে তা বোধহয় এখনো পূর্ণতা পায় নাই। আবার অনেকে এটার বিরোধী, বলে, “সেই তো হায়রোগ্লিফে ফিরে এলাম। তাহলে আর এ্যালফাবিট ইনট্রোডিউস করার কি দরকার ছিলো?” আমার মনে হয় যে, বর্ণমালা আর এক্সপ্রেশন ‘ইমো’ মিলিয়ে নতুন এক ধরনের লেখ্যরূপ চালু করলে ভালো হয়, তাতে টেক্সট-এর পাশাপাশি এক্সপ্রেশন ও টোন বোঝা যাবে।

যাহোক। তরুণীটিকে বোঝার জন্য আমি লিখলাম,

আমি: আপনি একটু ভয়েস কলে আসুন। আমাকে একটা কল করুন।

তরুণী: কেন?

আমি: আপনার সাথে ভয়েস কম্যুনিকেশন করতে চাই।

তরুণী: ভয়েস কম্যুনিকেশন করতেই হবে কেন?

আমি: এভাবে টেক্সট লিখে লিখে কম্যুনিকেশন স্লো হয়। তাছাড়া ঠিকমত কথা বোঝাও যায় না। তাই ভয়েস কম্যুনিকেশন করতে চাই।

তরুণী: আজ থাক। অন্য কোনদিন। আমিই আপনাকে কল করবো।

ভয়েস কম্যুনিকেশন-এর কথা বলতেই অনাগ্রহ প্রকাশ করলো কেন? আসলেই কি এটা রহস্যময় কেউ? আবার এমনও হতে পারে যে, এই মুহূর্তে তার চারদিকে লোকজন আছে। জোরে কথা বলার অবস্থা/পরিবেশ নাই। দেখা যাক, অন্য কোনদিন সে ভয়েস কল করে কিনা???!!!

———————————————————————————————————

রচনাতারিখ: ০৬ই অক্টোবর, ২০২১ সাল

রচনাসময়: রাত ০৮টা ৫৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.