কবিতা – মৃতের সমাধি (বাংলা অনুবাদ)

অনাবাদী জমি
টি. এস. এলিয়ট
The Waste Land
BY T. S. ELIOT

কবিতা – মৃতের সমাধি
মূল – টি. এস. এলিয়ট

বাংলা অনুবাদ – রমিত আজাদ

এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস!
মৃত ভূমিতে জন্ম দেয় লাইলাক ফুল,
স্মৃতি আর কামনায় মিশ্রিত করে,
বাসন্তী বর্ষণে মন্থিত করে নিষ্ফলা শিকড়।
শীতার্ত দিনগুলোই আমাদের উষ্ণতা দিয়েছিল,
বিপুলা ধরিত্রীকে বিস্তীর্ণ তুষারে আচ্ছাদিত করে,
একটি ক্ষুদ্র জীবনকে শুকনো কন্দ খাইয়ে।

গ্রীষ্ম বরং বিস্মিত করেছিল আমাদের,
স্টার্নবার্গাজের হ্রদে এক পশলা বৃষ্টিতে;
আমরা থমকে দাড়িয়েছিলাম বীথিকায়,
ঝলমলে রোদে হেঁটেছি হফগার্টেনে,
ধূমায়িত কফি পান করতে করতে, আলাপ করে পার করেছি ঘন্টা ।

‘মোটেই রাশিয়ান নই, লিথুনিয়ার বিশুদ্ধ জার্মান আমি।
শিশুকাল কাটিয়েছি আর্ক-ডিউকের প্রাসাদে,
কাজিন ভাইয়ের সাথে বেড়িয়েছি স্লেযে
আমি ভয় পেলে, সে বলেছে,
“ম্যারী, ম্যারী শক্ত করে ধরো।”
তারপর তর তর করে নেমেছি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে,
আহ! সেখানে কি যে মুক্তি!
রাত্রিকে ভোগ করেছি গভীর করে, আর শীতে সরে পড়েছি দক্ষিণে ।

কোন সে শিকড়মাটি আঁকড়ে আছে, কোন সে শাখা গজায়,
এই পাথরের আবর্জনা থেকে? মানবপুত্র,
আপনি বলতে বা অনুমান করতে পারবেন না, কারণ আপনি কেবল চেনেন
ভাঙা ছবিগুলির একটি স্তূপ, যেখানে সূর্য স্পন্দিত হয়,
এবং মৃত গাছ কোন আশ্রয়ই দেয় না, ঝিঁঝির সুরেও নেই কোন প্রশান্তি,
আর শুকনো পাথরেও নেই কোন জলের কল্লোল।
কেবল আছে আশ্রয় এই লোহিত পাথরের ছায়ায়।
(এসো এই লোহিত পাথরের ছায়াতলে)

এবং নিশ্চয়ই আমি তোমায় দেখাবো ভিন্ন কোন কিছু,
ভোরে যে ছায়াটি তোমার পিছু পিছু ধায়,
বা বিকেলে যে ছায়াটি তোমার আগে আগে ছুটে পালাতে চায়,
আমি এক মুঠো ধুলোয় তোমাকে সন্ত্রস্ত করবো।

সজীব হাওয়া বয়
স্বদেশের প্রান্তরে
আমার আইরিশ শিশু-হৃদয় জুড়ে
অপেক্ষারত কোন সে পথের ধারে?

‘এক বছর আগে আমায় দিয়েছিল জলজ ফুল হাইয়াসিন্থ’
ওরা আমায় বলতো হাইয়াসিন্থ মেয়ে,
তবুও যখন বিলম্বে হলেও ফিরেছি হাইয়াসিন্থ ফুলের বন থেকে,
তোমার হাত ছিলো ভরা, চুল ছিলো ভেজা,
আমি পারিনি কোন কথা বলতে, আমি পারিনি চোখ খুলে তাকাতে,
আমি না ছিলাম জীবিত, না ছিলাম মৃত,
ছিলাম বিমূঢ়, হৃদয়ের আলোকচ্ছটায়, ছিলাম অসাড় হায়!
‘সাগরও ছিলো শূন্য ও নিস্তেজ।

আমায় বলেছে,
বিখ্যাত জ্যোতিষী মাদাম সোসোস্ট্রিস,
সর্দিতে কাহিল একেবারে,
তবুও তিনি ইউরোপের সবচাইতে দক্ষ ভবিষ্যদর্শী
যার হাতে ধরা কিছু রহস্যময় তাস,
তিনি বললেন, “এই তো তোমার তাস, ডুবন্ত ফিনিশিয় নাবিক”,
(ওই মুক্তোগুলোই ছিল তার আঁখি, দেখো!)
আর এ’ হচ্ছে বেলাডোনা পাষাণ-রূপসী,
ক্ষণিকের সঙ্গিনী রঙ্গিনী।
এইতো, তিন গদাধারী লোকটি, এই তার চক্র,
এই দেখো, একচোখা বণিকটি; আর এ’ তাসটা
একদম সাদা, কিছুই নেই সেখানে; যা সে নিজ পিঠে বহন করে,
বোধ হয় এ’ তাসটি দেখা আমার নিষেধ।
ফাঁসি দেয়া মানুষটিকে আমি খুঁজে পাইনা।
সাবধান, ধেয়ে আসছে সলিল-সমাধি।

আমি দেখছি মানুষের ভিড়, যারা একটি বলয়ের চতুর্দিকে ঘুরছে।
ধন্যবাদ আপনাকে। যদি মিসেস ইকুইটোনের দেখা পান,
তাকে বলবেন, আমার কোষ্ঠীটি আমি নিজেই বহন করি:

দিনকাল ভালো না, সবারই সতর্ক থাকা উচিত!

( প্রথম আঠারো লাইন অনুবাদ: ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২ সাল। বাকীটা অনুবাদ: ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সাল। সময়: সন্ধ্যা ০৬টা ০৫ মিনিট)

(আখতার হোসেন খান স্যার গুণী ও জ্ঞানী ব্যাক্তি। তিনি আমার পরম শ্রদ্ধেয়। আমি স্যারের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি ও জেনেছি। স্যার জানালেন যে ওয়েস্টল্যান্ড-এর কিছু বাংলা অনুবাদ আছে।

আমি এই বিষয়ে ফেইসবুকে আগেই প্রশ্ন রেখেছিলাম যে, ওয়েস্টল্যান্ড-এর কোন বাংলা অনুবাদ আছে কিনা। তখন জানতে পারিনি।
কয়েকজন আমাকে অনুরোধ জানালেন, থাকলেও যেন নতুন করে অনুবাদ করি । আমি তাই এই উদ্যোগ নিলাম।
আমি সাহিত্যের ছাত্র নই, তাই আমার পক্ষে এরকম অনুবাদ করা কঠিন!
কিন্তু ফিলোসফি-তে আগ্রহ থাকার কারণে, আমি জানি যে দর্শনের দৃষ্টিকোন থেকে ‘দ্যা ওয়েস্টল্যান্ড’ একটি কালজয়ী কবিতা।
যেখানে পাশ্চাত্যের বর্তমান বস্তুনিষ্ঠ ও ভোগবাদী সমাজের অসাড়তা সম্পর্কে বলা হয়েছে।
আমি উৎকন্ঠার সাথে লক্ষ্য করেছি যে, আমাদের দেশের একটি মহল বর্তমান বাংলাদেশে পাশ্চাত্য ঢংয়ের অসাড় সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
তাই ভাবলাম যে, এই কবিতাটির বাংলা অনুবাদ করাটা এখন সময়োপযোগী হবে।
মানুষদেরকে সতর্ক ও সচেতন করা প্রয়োজন।)

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.