Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কার্ফ্যু অভিজ্ঞতা

কার্ফ্যু অভিজ্ঞতা:

কার্ফ্যু ভালো কিছু না!
এরশাদ আমলে একবার বাধ্য হয়ে কার্ফ্যুর মধ্যে পড়ছিলাম। মাত্র তেরো বৎসর বয়স ছিলো আমার/আমাদের! ভয়াবহ অভিজ্ঞতা!

যতদূর মনে পড়ে ১৯৮৩ সাল, প্রতাপশালী জাঁদরেল এরশাদ ক্ষমতায়। উনার বিরুদ্ধে কিছু বলা যায় না। প্রতিবাদ মিছিল করলেই দাঙ্গা পুলিশ পাঠিয়ে দিতেন। আর পরিস্থিতি বেশী খারাপ হলে কার্ফ্যু!
আমি তখন পড়তাম সিলেট ক্যাডেট কলেজে। ঐদিন আমাদের কলেজ ছুটি হয়ে ভ্যাকেশন শুরু হয়। ক্যাডেট কলেজের ট্রেডিশন অনুযায়ী, সকালে নাস্তার পর কলেজ বাসে করে আমাদের নিয়ে আসা হতো সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে। সেখান থেকে সকালের ঢাকাগামী ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীতে আমরা চড়তাম। তারপর সারাদিন রেলভ্রমণ করে বিকালে অথবা সন্ধ্যায় ঢাকা পৌঁছতাম। বেশিরভাগ সময়ই আমাকে নিতে কেউ স্টেশনে আসতেন না। আমি নিজেই একটা রিকশা নিয়ে কমলাপুর থেকে মধুবাগ পৌঁছে যেতাম। সেদিন কলেজ বাসে চড়ে আমরা সিলেট রেলস্টেশনে পৌছালাম। তখনো আন্তনগর ট্রেন চালু হয়নি, এক্সপ্রেস ট্রেন চলতো। বাংলাদেশের ট্রেন এম্নিতেই লেট করতো, আসতেও লেট, পৌঁছাতোও লেট! একটা কথা বেশ প্রচলিত ছিলো, “নয়টার গাড়ী কয়টায় ছাড়ে?!” যাইহোক, সেইদিন একটু বেশী লেট করছে মনে হলো! আমরা উসখুস করতে লাগলাম। তারপর হঠাৎ গা কাটা দেয়া সংবাদ পেলাম, ‘কোথাও ট্রেন এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে! তাই লাইন ক্লিয়ার না থাকায় এই ট্রেনটা যেতে পারবে না!” আমরা জানতে চাইলাম, কখন তাহলে ট্রেন আসতে পারে? উত্তর ছিলো, ‘আশা করি দুপুর বারোটার মধ্যে এসে যাবে’। আমরা তখন খুব ছোট, খিদে সহ্য হয়না এমন বয়স! তবে আমাদের সাথে ছিলো প্যাকেট লাঞ্চ। ভাবলাম, দুপুরে স্টেশনে বসেই প্যাকেট লাঞ্চটা খেয়ে নেবো, তারপর ট্রেনে উঠলে হয়তো রাত আট-টা নয়টা নাগাদ ঢাকায় পৌঁছে যাবো, এরপর চিন্তা নাই! কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন ছিলো না। ট্রেন আসলো অনেক দেরীতে, বিকালের দিকে। ততক্ষণে পেটের প্যাকেট লাঞ্চও হজম হয়ে গেছে! যাহোক শেষমেশ তো উঠলাম ট্রেনে। বিশাল জার্নি শেষে ক্ষুধার্ত পেটে যখন ঢাকায় পৌঁছালাম, তখন গভীর রাত। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনের বাইরে এরশাদী কার্ফ্যু। তারমানে ভোরের আলো না ফোটার আগে আমাদের নিস্তার নাই!!! হায়রে, এম্নিতেই ক্ষুধার্ত, তারউপর ঘুমার্ত! এখন কি মশার কামড় সহ্য করে স্টেশনে কাটাতে হবে বাকি রাতটা?!
আমার কপাল ভালো ছিলো। আমাদের ক্লাসের রবিউল-দের বাসা ছিলো কাছেই, কলোনীতে। ওর বাবা ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ! তিনি ছেলেকে নিতে ঐ রাতেই স্টেশনে এসেছিলেন। তারপর তিনি শুধু ছেলেকে না, ছেলের ক্লাসমেটদেরকে মানে আমাদেরকেও সাথে নিয়ে গেলেন। ঐ রাতে রবিউলদের বাসায়ই ঘুমালাম। ভোর হলে বাইরে বেরিয়ে, একটা রিকশা নিয়ে আমি বাসায় চলে গেলাম। রবিউল-এর আব্বার কল্যাণে ঐ রাতে আমার একটা আশ্রয় হয়েছিলো, কিন্তু বেশীরভাগ শিশু-কিশোর-ই ঐ রাত স্টেশনেই কাটিয়েছিলো!

কার্ফ্যু নামক এই ভয়াবহ জিনিসটির অভিজ্ঞতা আমি কোনদিনও ভুলবো না!!!

তারপর এরশাদ শাসনামলে আরো অনেকবারই কার্ফ্যু হয়েছিলো, ক্যাডেট কলেজে থাকার কারণে সেগুলো আমি টের পাইনি। কিন্তু আত্মীয়-স্বজন যারা টের পেয়েছে তারা ভয়াবহতা বর্ণনা করেছিলো। কিছু ব্যাক্তির কার্ফ্যু পাশ থাকতো, কিন্তু সে সীমিত। অন্যরা বিপাকেই পড়তো! বেশী সমস্যা হতো ইয়াং ছেলেদের। রাস্তায় তাদের দেখতে পেলেই পিটুনি শুরু করতো কোন কথাবার্তা ছাড়াই। অথচ মানুষের কত রকম ইমার্জেন্সি থাকে!

দিনকালও পাল্টেছে।
২০০৮ সালে ভুতুরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা মনে পড়ে। তারা একটা পরিস্থিতিতে কার্ফ্যু দিয়েছিলো।
কেউ মানে নাই। অসহায় বাহিনী সদস্যরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোনরকম আইডি চেক করছিলো!

সময় ও যুগের সাথে তাল মিলিয়েই অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

ফেইসবুকে এই লেখাটি প্রকাশ করার পর, দুইজন বড় ভাই তাদের মন্তব্য লিখেছিলেন নিম্নরূপ

১। Azizul Hakim: সম্ভবত ১৯৬৮ হবে। গ্রীন এ্যরো নামক একমাত্র এক্সপ্রেস ট্রেনে বাবার সাথে ঢাকা যাচ্ছি।
বুফে কারে দুই দলের বিরাট ঝগড়া। খবরের কাগজে ছবি সহ গরম খবর বেরিয়েছে, চাঁদে নাকি মানুষ নেমেছে। প্রগতিশীল গ্রুপের সাথে হুজুরদের প্রায় মারামারি। নাআউজুবিল্লাহ! এটা কি সম্ভব? খোদ খোদার সাথেই খোদকারী!
যাহোক ঢাকা পৌছে আরেক বিরম্বনা আইউবের কারফিউ।
কি জিনিস জানি না। তবে কমলাপুর নতুন রেলস্টেশনে আমরা সহ শতে শতে মানুষ আটকা। টিকিট কাটার জায়গা, প্ল্যাটফর্ম, মেইন হলরুমে গিজগিজ করা মানুষ, কিন্তু এক সিড়ি নেমে কার পার্কিং এ পা রাখলেই আর্মি বেতের তীব্র বাড়ি।
শুধু মাত্র ওই একটা সিড়ি নামার কারণে একটা বদ্ধ পাগলকে যে কি মার মারা হলো, সে দৃশ্য আমার কচি মন কখনোই ভুলবে না।
আউুবের মার্শাল ল, ভুলবো না।

২। Humayun Kabir (একজন মুক্তিযোদ্ধা): এরশাদ সাহেবের প্রথম দিনের কার্ফিউ রাতেই গ্রেফতার হয়েছিলাম কার্ফিউ ভংগের অপরাধে।
আমরা কয়েক বন্ধু মৌলি রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিয়ে রাত এগারোটা নাগাদ বেড়িয়ে হলে ফিরে যাচ্ছিলাম…. নিচে নেমে দেখি রাস্তাটা আর্মি..

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.