কিছু গল্প লেখা যায় না – ১ (ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – খ)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
———————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – খ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ইন্না-কে আড়াল করে তানিয়াকে নিয়ে আমি গল্প লিখতে আমি আসলে চাইনি। আমার এই গল্প ইন্নাকে নিয়েই; তবে কি, তানিয়াকে বাদ দিয়ে ইন্নাকে নিয়ে আলাপ করা সম্ভবও না। হ্যাঁ, বিষয়টা অনেকটা ঐরকমই। উপরন্তু, তানিয়া ও ইন্নার পাশাপাশি আরো একজন তরুণী এই গল্পে আসবে।

আমার রুমে তানিয়া ও আরো দুইজনার আনাগোনা চলতে থাকে মাস তিনেক। ওরা তিনজনই ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী ছিলো। এদেশে লেখাপড়া টাইমলি হয় ও স্কুলে এগারো ক্লাস পর্যন্ত পড়তে হয়, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র-ছাত্রীদের বয়স খুবই কম থাকে এভারেজে ১৭ বৎসরের মত। এভাবে ওদের সবার বয়সই সতেরো-আঠারোর মতন ছিলো। তারা কখনো আসতো দল বেধে; কখনো ইন্ডিভিজুয়ালী একা একা আসতো। সাধারণত: দল বেধে আসতো ঐ মেক্সিকান টিভি সিরিয়াল-টি দেখের জন্য। তারা মেয়ে বিধায় খুব আগ্রহ নিয়ে রোমান্টিক-পারিবারিক সিরিয়ালটি দেখতো। আমি ঐ কাহিনীতে তেমন ইন্টারেস্ট না পেলেও, ওদের পাল্লায় পড়ে দেখতে হতো। কাহিনী মেক্সিকান হলেও, তা অকপটে আমাদের বাংলা-ইন্ডিয়ান কাহিনীর সাথে মিলে যায়। আমি মনে মনে ভেবে অবাক হতাম, মহাসাগরের ওপারে থাকা মহাদেশটির সমাজ ও জীবনযাত্রার সাথে আমাদের কি এতটাই মিল?!

তানিয়া চলাফেরায় বেশ ফ্রী ছিলো। তাই ও হুটহাট যখন-তখন চলে আসতো আমার রুমে। সেটা কখনো দিনের যেকোন সময়ে (ক্লাস টাইম বাদে) আবার কখনো বা রাত এগারোটা-বারোটায়ও। অন্যান্যরা সেরকম না। যেমন স্ভেতা আসতো হিসেব কষে। ও আসতো বিকেলে অথবা সন্ধ্যায়। সাধারণত রাত দশটার পর স্ভেতা আসতো না। আর তানিয়া রাত বারোটা হলেও বাইরে থেকে যদি দেখতো যে আমার রুমে আলো জ্বলছে, ঝপ করে ঢুকে পড়তো রুমে (দরজা খোলা থাকলে), তা নইলে দরজা নক করতো।

তানিয়া কথাবার্তায় খুব একটা পলিশড ছিলো না। অনেকটা গ্রাম্য মেয়েদের মত। তবে তানিয়া মানুষটা ভালো ছিলো, আর অদ্ভুত একটা সরলতা ছিলো ওর মধ্যে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে, তানিয়া যদি রূপসী হতো, তাহলে অনেক পুরুষই ঝাপিয়ে পড়তো ওর উপরে। কিন্তু রূপসী না হওয়ার কারণে, দীর্ঘকায় ও কিছুটা পুরুষালী গড়নের তানিয়ার পুরুষ সমাজে কোন জনপ্রিয়তা ছিলো না। আমার এক ছেলে ক্লাসমেইট একবার আমাকে বলছিলো, “ইদানিং খুব প্রেম করতে ইচ্ছে করছে।” আমি মুচকী হেসে বললাম, “তানিয়া আছে না? নিউ কামার। ওর সাথে প্রেম করতে পারো।” আমার কথা শুনে ও হো হো করে হেসে উপহাস করে বললো, ” হ্যাঁ, হ্যাঁ, দারুণ রূপসী মেয়ে! প্রেম করার জন্য খুবই উপযুক্ত!” আমি আর কথা বাড়াই নাই।

তানিয়ার জন্ম ও বেড়ে ওঠা একটি ওয়ার্কারস ফ্যামিলিতে। হতে পারে এই কারণেই ও তেমন একটা স্টাইলিশ ছিলো না, গুছিয়ে বা সুন্দর করে কথাও বলতে পারতো না। মেকআপ-এরও কোন বালাই থাকতো না ওর। ফ্যাশন করতেও ওকে খুব একটা দেখিনি।

তানিয়া যখনই আসতো আমি ওকে চা বা কফি বানিয়ে খাওয়াতাম। বসে গল্প করতাম ওর সাথে। তানিয়া আমাকে ওর শহরের গল্প বলতো। ইউক্রেণের একটা ছোট শহরে ওর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ওরা এক ভাই ও এক বোন। সেখানকার স্কুল শেষ করে এই বড় শহরের নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে তানিয়া।

একদিন হাসতে হাসতে কৌতুক করে ওকে প্রশ্ন করলাম, “তোমার কি কোন বয়ফ্রেন্ড আছে?” তানিয়া ” একটু থেমে একটু মন ভার করে বললো, “ছিলো একজন। হয়তো এখনো আছে।” আমি ওর এই হেয়ালী বুঝতে পারলাম না। আবার প্রশ্ন করলাম, “ছিলো, আবার এখনও আছে, এই কথার মানে কি? উত্তরে তানিয়া যা বললো, তা শুনে তো আমার চক্ষু চড়ক গাছ! তানিয়া বললো, নিজের শহরে ওর একজন বয়ফ্রেন্ড ছিলো। তবে সে বিবাহিত। আমি বললাম, “তুমি কি বিবাহিত লোকের সাথে প্রেম করেছিলে?”

তানিয়া: হ্যাঁ। তাই করেছিলাম।
আমি: কি বলো? তাই বলে বিবাহিত লোকের সাথে! ওর তো বৌ আছে!
তানিয়া: থাকুক গে। ওর বৌ আছে এটা আমার জন্য কোন সমস্যা না।
আমি: মানে কি?
তানিয়া: বৌ থাকুক, বা না থাকুক। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি ওকে ভালোবাসি সেটাই বড় কথা।
আমি: তুমি কি ওর সাথে এখনো সম্পর্ক ধরে রেখেছ?
তানিয়া: সেরকমভাবে না। তবে আমরা একই শহরের যেহেতু, চাইলেই আমি ওর সাথে অভিসার করতে পারি। ও কোন আপত্তি করবে না।

আমি বিষয়টির নৈতিকতা ও অনৈতিকতা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। ইউক্রেণীয়-রাশিয়ানদের মধ্যে এই একটা প্যারাডক্স আছে। মুসলমান সমাজে বহু বিবাহের রীতি আছে, এই নিয়ে তারা বেশ হাসাহাসি করে! এদিকে ইন রিয়েলিটি বিবাহিত পুরুষের সাথে প্রেম ও দৈহিক সম্পর্ক; বিবাহ বহির্ভুত একাধিক রিলেশন ওদের মধ্যে আকসারই হচ্ছে!

————————-————————–———————————————————-

শীতের দেশগুলোতে চারটি ঋতু খুব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বরের ফল সীজন পেরিয়ে ঝপ করে শীত নেমে গেলো ডিসেম্বরে। ডিসেম্বর মানেই দুইটা মজা। একটা হলো থার্টিফার্স্ট নাইট মানে নিউ ইয়ার-এর মজা! আর একটা হলো শীতকালীন সেমিস্টার পরীক্ষার সেশন (এই মজাটা হলো হাড়ে হাড়ে টের পাওয়ানো মজা।! দিন বিশেক বই থেকে চোখই তোলা যায় না!) তাই থার্টিফার্স্ট নাইট মানে নিউ ইয়ার যতই এগিয়ে আসতে শুরু করলো, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার স্পীড-ঘনত্ব সবই বাড়তে লাগলো।

এদিকে অনেকেই হৈচৈ করছে, প্লান-প্রোগ্রাম করছে যে, থার্টিফার্স্ট নাইটে কি কি করবে। আমিও ক্লাসমেটদের সাথে এটাওটা আলোচনা করছিলাম। তবে একজন বিদেশী হিসাবে আমার অত একটা উৎসাহ ছিলো না। আমি পরীক্ষা নিয়েই বেশী চিন্তিত ছিলাম।

তারিখটা পঁচিশ বা ছাব্বিশে ডিসেম্বর হতে পারে। মানে নিউ ইয়ারের প্রাক্কালে। কোন এক সন্ধ্যায় আমি ডরমিটরিতে আমার রুমেই বসে ছিলাম। হঠাৎ দরজায় নক করার শব্দ শুনতে পেলাম। রুমের দরজা আটকানো থাকলেও লক করা ছিলো না। তাই আমি ভিতর থেকে বললাম, “কাম ইন।” দরজা ঠেলে যে ভিতরে ঢুকলো সে তানিয়া। তবে, সে একা ছিলো না। তার সাথে ছিলো আমার কাছে একেবারেই অজানা-অচেনা একটি মেয়ে। এমন ফুটফুটে একটা মেয়ে কমই দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া ওর গাত্রবর্ণ, মুখশ্রী ও দৈহিক গড়ন ঠিক আর দশজন ইউক্রেণীয় মেয়েদের মত ছিলো না। কোথায় যেন একটা মিসম্যাচ আছে! ঐ যে বলেছিলাম, বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি। ‘আনার কলি’-র মত একটি ধ্রুপদী মুখশ্রীর অধিকারী ছিলো মেয়েটি।

আমার জিজ্ঞাসু মুখের দিকে তাকিয়ে, তানিয়া বলেছিলো, “আমার বান্ধবী। তোমার সাথে পরিচয় করাতে নিয়ে এলাম। “ও হলো ইন্না” অপূর্ব সুন্দর একটি মিষ্টি হাসি মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো ইন্না।
বললাম, “আমি নয়ন।” এরপর ইন্না একটি আনইউজুয়াল কাজ করলো। যেটা সাধারণত ইউক্রেণীয় বা রাশিয়ান মেয়েরা করে না। ইন্না আমার দিকে ওর আনার রঙের পেলব ডান হাতটি বাড়িয়ে দিলো, হ্যান্ডশেইক করার উদ্দেশ্যে। কেউ হাত বাড়িয়ে দিলে (সে ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেন) হাত না দেয়াটা অভদ্রতা। আমি ইতস্তত করে আমার হাতটা বাড়িয়ে ওর সাথে হ্যান্ডশেইক করলাম। ওর পেলব, ছোট্ট, মিস্টি ও টীন-এইজড হাতটির ছোঁয়ায় আমি কিছুটা হলেও শিহরণ অনুভব করলাম!

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৪শে জুলাই (রবিবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৫টা ১০ মিনিট

Some Stories Caannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

(Inna from Ukraine – b)

আগের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.