কিছু গল্প লেখা যায় না – ১ (ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব -গ))

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
———————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব -গ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ইন্না ‘টীন-এইজড’ কথাটা শুনে হয়তো পাঠকরা অনেকেই ভাবছেন! হ্যাঁ, ইন্না টীন-এইজডই ছিলো। ওর বয়স ছিলো উনিশ বছর, মানে ‘নাইনটীন’। ওর চাউনির মধ্যে অদ্ভুত কিছু একটা ছিলো। আমার দিকে সে এমন এক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েছিলো, যেন আমি তার অনেক দিনের চেনা! ও যখন হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলো আমার কেন যেন মনে হয়েছিলো যে, ইন্না সেটা ইচ্ছা করেই করেছে। ও চাইছিলো আমার হাতের পরশ পেতে। কিন্তু প্রথম পরিচয়েই একজনার সাথে হাত মেলাতে চাইবে কেন? হাতের পরশ চাইবে কেন? ছেলেরা তা চাইতেই পারে, কিন্তু মেয়েরা তো সংকুচিত থাকে! অবশ্য পরে এর কারণ সে আমাকে ব্যাখ্যা করেছিলো। বেশ স্লিম ইন্না ছিলো ছোটখাট গড়নের। রুশীরা সাধারণত এত ছোটখাট গড়নের হয়না। আর ওর মুখশ্রী ছিলো অপরূপা। ইদানিংকার এক জনপ্রিয় বিদেশী নায়িকার সাথে ওর মুখশ্রীর মিল আছে। সেইদিন ওর পড়নে ঠিক কি কাপড় ছিলো তা আর আমার মনে নাই, তবে ও যে বেশ ফ্যাশনেবল তা ওর পোশাক দেখেই বুঝেছিলাম।

আমি বললাম, “বসো তোমরা।” তানিয়া ও ইন্না সোফায় বসলো। প্রশ্ন করলাম, “কি খাবে? চা নাকি কফি?” তানিয়া চা খেতে চাইলো। ইন্না জোর দিয়ে বললো যে, সে কফি খেতে চায়। আমি চা, কফি বানিয়ে সাথে কিছু স্ন্যাকস দিয়ে ওদেরকে পরিবেশন করলাম। সোফার সামনে আমার ফোল্ডিং টি-টেবল-টা খুলে বসালাম। সেখানে সবকিছু রাখলাম। চলন্ত টেলিভিশন সেটের সাউন্ড-টা কমিয়ে ওদের সাথে গল্প করা শুরু করলাম।

আমি: তুমি তানিয়ার কেমন বান্ধবী?
ইন্না: খুব ক্লোজ।
তানিয়া: আমরা একই শহরে থাকি। প্রতিবেশী।
ইন্না: খুব ছোটবেলা থেকেই আমরা বন্ধু।
আমি: ও আচ্ছা। তুমি তাহলে খারকোভে থাকোনা?
তানিয়া: না, আমার শহরে থাকে। এখানে আমার কাছে বেড়াতে এসেছে।
আমি: ও আচ্ছা। ক’দিন থাকবে?
ইন্না: জানিনা, ক’দিন থাকবো।
তানিয়া: নিউ-ইয়ার-টা এখানেই করবে। তারপর ফিরে যাবে।
আমি: নিউ-ইয়ার হতে তো আরো চার-পাঁচদিন বাকি।
তানিয়া: থাকবে আরো চার-পাঁচদিন।
আমি: ভালো কথা। তা ইন্না তুমি কি রুশী না ইউক্রেণীয়?
তানিয়া: কোনটাই পুরোপুরি না।
আমি: তার মানে?
তানিয়া: সোভিয়েত যুগে তো জানোই আমাদের একটা বহুজাতিক রাষ্ট্র ছিলো। তাই অনেক ইন্টারম্যারেজ হয়েছে। ইন্না ‘খখ’ ককেশিয়ান একটা দেশের নাম বললো তানিয়া।
আমি এবার মনযোগ দিয়ে ইন্নার দিকে তাকালাম।
ইন্না মুচকি হাসলো, তারপর বললো, “তাও পুরোপুরি না।”
আমি: মানে কি?
ইন্না: আমার বাবা জাতিগতভাবে ককেশিয়ান দেশটির। আর মা রাশিয়ান মেয়ে। আর আমরা বহুবছর যাবৎই ইউক্রেণে থাকি।

এবার আমি হিসাব কষতে থাকলাম। মেয়ের বাবা দক্ষিণের দেশের, মা রাশিয়ান, ওরা আজীবন থাকে ইউক্রেণে। তাহলে মেয়েটির জাতীয়তা কি? অত অল্পবয়সী একটা মেয়ের ন্যাশনালিটি, এথনিসিটি, রেইস, সিটিজেনশীপ এইগুলা নিয়ে ভাবার কথা না। তারপরেও ইন্নাকে আমি প্রশ্ন করলাম, “তুমি কোন জাতির মেয়ে?”
ইন্না: জানিনা। মিক্সড একটা কিছু।
আমি: তুমি কি তোমার বাবার দেশের ভাষায় কথা বলতে পারো?
ইন্না: পারতাম একসময়। খুব ছোটবেলায়। এখন ভুলে গিয়েছি।
আমি: ভুলে গেলে কেন?
আমার প্রশ্নের কোন জবাব ইন্না দিলো না। শুধু মাথা নিচু করে রইলো। পরে অবশ্য জেনেছিলাম, এই প্রশ্নের উত্তর। আমার অমন কোন প্রশ্ন ওকে না করাই উচিৎ ছিলো; তবে ছোটবেলা থেকেই আমি রাজনীতি বিষয়ে আগ্রহী বিধায় আমি ঐ প্রশ্নটি ওকে করেছিলাম। জাতীয়তাবাদ-কে আমি একসময় খুবই সঠিক মনে করতাম। বাংলাদেশের জন্মের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এর একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু একটি বহুজাতিক রাষ্ট্রে এসে এই নিয়ে আমি প্রাকটিকালী একটা পাজল্‌ড অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলাম। বিশেষত যেই রাষ্ট্র একসময় ‘কম্যুনিজম’ নামক একটি আন্তর্জাতিকতাবাদী আইডিওলজি-কে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিলো এবং অপেক্ষা করছিলো যে অন্যেরাও তাদেরকে অনুসরণ করবে; হঠাৎ করে সেই তাদেরই পরাজয় ঘটলো ‘জাতীয়তাবাদ’-এর কাছে। যেই সোভিয়েত ইউনিয়নকে আমরা ভাবতাম যে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে; সেই সোভিয়েত-ই তাসের ঘরের মতন ভেঙে পড়লো। আর সেস্থলে জন্ম নিলো, পনেরোটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র!

আমি ভাবলাম, এই ইন্নার মতন অনেকেই তো আছে প্রতিটি সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে। যাদের বাবা এক জাতির ও মা আরেক জাতির, আবার তারা বসবাস করছে ভিন্ন একটি রাষ্ট্রে। এই এদের প্রতি কেমন আচরণ হবে রাস্ট্রগুলির? যদি কোন রাষ্ট্র বলে যে, ‘যার বাবা অথবা মা এইদেশের না তারা বেরিয়ে যাও, তখন কি করবে তারা? হেলসিংকির একটা কনভেনশন আছে ১৯৭৫ সালের। যতদূর জানি যে, ঐ কনভেনশন অনুযায়ী স্বামী ও স্ত্রী দুইজন যদি দুই রাস্ট্রের হয়, তাহলে তাদের অধিকার থাকবে যে, ঐ দুইটি রাস্ট্রের যেকোন একটিতে বসবাস করা।

এবার লক্ষ্য করি ইন্নার কেইস-টা, যেটা আরো জটিল। ওর বাবা এক রাস্ট্রের এবং মা আরেক রাস্ট্রের; আবার তাদের পরিবার দীর্ঘকাল বসবাস করছে তৃতীয় একটি রাস্ট্রে। তাহলে জাতিগতভাবে ইন্নাকে কোন জাতির বলবো? আর তৃতীয় রাস্ট্রটি যদি কোন রাজনৈতিক কারণে তাদেরকে বলে যে, ‘তোমরা এই দেশের কেউ না; ছাড়ো এই দেশ।’ তখন তারা কোথায় যাবে? নিঠুর এই পৃথিবীতে কে ঠাঁই দেবে তাদেরকে???

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৫শে জুলাই (সোমবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৫টা ৫৪ মিনিট

Some Stories Caannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.