কিছু গল্প লেখা যায় না – ১ (ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব -ঘ))

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
———————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব -ঘ)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

পরের সন্ধ্যায় রুমের দরজায় নক শুনে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, কে হতে পারে এটা। ছাশা? নাহ্‌, আমার ঘনিষ্ট এই বন্ধুটির নকের শব্দ আমি চিনি। তাহলে স্ভেতা? হতে পারে? আবার তানিয়া ও ইন্নাও হতে পারে। দরজা লক করা ছিলো না। আমি বললাম, “কাম ইন”।

দরজা ঠেলে যে ঢুকলো, তাকে দেখে আমি কিছুটা অবাক হলাম। ভিতরে প্রবেশ করেছে ইন্না। তবে তানিয়ার সাথে নয়, সে একাই এসেছে!
ইন্না: আসতে পারি?
আমি: (মৃদু হেসে বললাম) অবশ্যই। বসো।
আমি সোফাটি ছেড়ে দিয়ে নিজে চেয়ারে বসলাম। ইন্না বসলো সোফায়।
ইন্না: কেমন আছো?
আমি: ভালো। তুমি কেমন আছো?
ইন্না: আছি ভালোই।
আমি: একা কেন? তানিয়া কোথায়?
ইন্না: তানিয়া কোথায় আমি জানি না। আমি একা এলে তোমার আপত্তি আছে?
আমি: নাহ্‌! কি আপত্তি!
ইন্না: কি করছো?
আমি: তেমন কিছু না। পড়ালেখা করার চেষ্টা করছিলাম।
ইন্না: তুমি কি খুব বেশী পড়ালেখা করো?
আমি: না। বেশী পড়ালেখা আমি করিনা। পড়ালেখা করতে ভালো লাগে না আমার।
ইন্না: তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছো কেন?
আমি: জীবনে উচ্চশিক্ষার দরকার আছে তাই।
ইন্না: তাহলে সহজ একটা সাবজেক্ট নিয়ে পড়লেই পারতে। এত কঠিন সাবজেক্ট বেছে নিলে কেন?
আমি: স্কুল জীবনে ভালো লেগেছিলো এই সাবজেক্ট। মহাবিশ্ব, বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য, রিলেটিভিটি, আইনস্টাইন, ইত্যাদিতে একটা ফ্যাসিনেশন ছিলো। তাই এই সাবজেক্ট-টা বেছে নিয়েছিলাম।
ইন্না: এখন কি আর ভালো লাগছে না?
আমি: ভালো লাগছে আবার লাগছে না, এই দুয়ের মাঝামাঝি।
ইন্না: সে কেমন?
আমি: খুব কঠিন সাবজেক্ট। অনেক লেখাপড়া করতে হয়। ঝুড়ি ঝুড়ি অংক করতে হয়। এত পরিশ্রম ভালো লাগে না।
ইন্না: আমার মনে হয় যে, এই সাবজেক্ট যারা পড়ে তারা খুব কাটখোট্টা টাইপের হয়, এদের মনে কোন রসকষ থাকে না।
আমি: আমি কিন্তু সেরকম নই।
ইন্না: আমারও তাই মনে হয়। আর কোন সাবজেক্টে কি আগ্রহ আছে তোমার?
আমি: আছে। যেমন ফিলোসফি, যেমন সাহিত্য।
ইন্না: সাহিত্য? তোমরা সাহিত্য ভালোবাসো?
আমি: আমরা কিনা জানি না। তবে আমি সাহিত্য ভালোবাসি।
ইন্না: তাই? কি সাহিত্য পড়ো তুমি?
আমি: সব ধরণের সাহিত্য। তোমাদের রুশ সাহিত্যের সিংহভাগ লেখকের সাহিত্যা আমার পড়া হয়ে গিয়েছে। লেভ তলস্তয় থেকে শুরু করে আলেকজান্ডার পুশকিন পর্যন্ত সবই আমার পড়া।
ইন্না: পুশকিন-এর লেখা কবিতা পড়েছ?
আমি: হ্যাঁ। খুব ভালো লাগে উনার কবিতা। তাছাড়া আমি নিজেও কবিতা লিখি।
ইন্না: ওরে বাব্বা! বলো কি? তুমি কবিতা লিখতে পারো?
আমি: পারি তো।
ইন্না: আমাকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারবে?
আমি: লেখার চেষ্টা করতে পারি।
ইন্না: লিখো তাহলে একটা।
আমি: ওক্কে। আচ্ছা, আমাকে নিয়েই তো কেবল কথা হচ্ছে। তোমার কথা বলো।
এবার হাশিখুশী ইন্নাকে বিমর্ষ হয়ে যেতে দেখলাম।
ইন্না: আমাকে নিয়ে আর কিই বা বলার আছে?!
আমি: তুমি কোথায় পড়ো?
ইন্না: আপাততঃ কোথাও পড়ছি না। আমি টেকনিকাল স্কুল সমাপ্ত করেছি।
আমি: এখন কোথাও পড়ছো না?
ইন্না: না। সামনের বৎসর কোথাও ভর্তি হবো, আশা করি। আমার কিছু ডিফিকাল্টিজ আছে তো!
আমি: তোমার বয়স কত ইন্না?
ইন্না: উনিশ বৎসর। বেশী বয়স হয়ে গেলো তাই না?
আমি: বেশী হবে কেন? নর্মাল।
ইন্না: নাহ্‌, মানে ছেলেরা তো কম বয়সের মেয়েদের পছন্দ করে। এই ধরো সুইট সিক্সটীন থেকে এইটীন পর্যন্ত। উনিশ বৎসর তো সেই তুলনায় বেশীই।
আমি: কি জানি। আমাদের দেশে তো উনিশ বৎসর কম বয়সই ধরা হয়।
ইন্না: আর আমাদের দেশে, এটা অনেক বয়স। আমাকে অনেকেই কথা শোনায় যে, এত বয়স হয়ে গেছে, এখনো বিয়েই হলো না! দেখতো, কত মন খারাপ করা কথা বলে!

ওর কথা শুনে আমার একটু মন খারাপ হলো। এ বিষয়টা আমিও লক্ষ্য করেছি। এদেশের বেশীরভাগ ছেলেই মেয়েদের-কে ভালোবাসার না, বরং ফুর্তির এলিমেন্ট বলে মনে করে। আর ফুর্তি করার জন্য কম বয়সী মেয়েদেরকেই প্রেফার করে। একবার আমাকে একজন রুশ ছেলে কোন এক মেয়ে সম্বন্ধে বলেছিলো যে, “আহ্‌, ঐ মেয়ের দিকে কে তাকাবে? ওর কি আর এখন কোন বয়স আছে? একুশ বৎসর বয়স হয়ে গেলো! ও তো এখন একটা বুড়ি!” আমি তখন অবাক হয়ে ভাবছিলাম যে, মাত্র একুশ বৎসর বয়সের একটা মেয়েকে বুড়ি বলে!

আসলে বিষয়টা ওদের মেজরিটির মেন্টালিটিতে। ওরা চায় মেয়ে নিয়ে ফুর্তিফার্তি করতে। অল্পবয়সী কোন একটা মেয়েকে দেখলে ওদের জিভে জল এসে যায়! তারপর চায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে মেয়েটিকে বিছানায় নিতে। আর অল্প বয়সী একটা মেয়েকে সহজেই মাথা ঘুরানো যায়। কিছু মিস্টি মিস্টি কথা বললেই মেয়েটা ভজে যায়! আমি আরো লক্ষ্য করেছি যে, এদেশে নারীর সম্মান কম, তাই মেয়েরা বেশ সহজলভ্য! অবশ্য কিছু কালচারড ও বনেদি পরিবার আছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। ঐ সব পরিবারের মেয়েদের পার্সোনালিটি থাকে। তারা নিজেদের সম্মান রক্ষা করতে জানে ও পারে। তবে ওদেরকে বাদ দিলে অন্যান্যরা ও ওয়ার্কিং ক্লাসের মেয়েরা সহজেই নিজেদেরকে সমর্পন করে।

আমি প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বললাম।
আমি: ইন্না তুমি টেকনিকাল স্কুলে কি বিষয়ে পড়েছ?
ইন্না: ক্লাস এইট শেষ করে টেকনিকাল স্কুলে ভর্তি হতে হয়। আমি তাই করেছি। তারপর তিন বৎসর সেখানে লেখাপড়া করেছি।
আমি: বুঝলাম। তোমার সাবজেক্ট-টা কি ছিলো?
ইন্না: ইন্টেরিয়র ডিজাইন।
আমি: ভালো তো। তা তুমি কি ইন্টেরিয়র ডিজাইন করতে পারো?
ইন্না: হু। খুব ভালো পারি।
আমি উঠে গিয়ে কফি বানানো শুরু করলাম।
ইন্না: রুমে কোন গেস্ট আসলেই তুমি চা-কফি খাওয়ানোর জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়ো তাই না?
আমি: এটাই তো স্বাভাবিক ভদ্রতা।
ইন্না: হুম!
আমি: ইন্না, তোমরা কয় ভাই বোন? নাকি তুমি একাই?
(এদেশে বেশিরভাগ পরিবারেরই ঘরে একটা মাত্র সন্তান থাকে। কিছু পরিবারে থাকে দুইটি সন্তান। তবে তিনটা সন্তান পরিবারে থাকা খুবই রেয়ার!
ইন্না: আমার একটা ছোট ভাই আছে।
আমি: তাই? ভালো তো। কতটুকু?
ইন্না: দশ বৎসর বয়স।
আমি: তাহলে তো তোমার চাইতে অনেক ছোট! বেশ বড় গ্যাপ তোমাদের মধ্যে!
ইন্না: হ্যাঁ। আসলে ও আমার আপন ভাই না, তাই।
আমি: মানে?
ইন্না: ও আমার সৎ ভাই। মানে আমার মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর সন্তান ও।
আমি: তুমি কি তাহলে প্রথম স্বামীর সন্তান?
ইন্না: হ্যাঁ।
আমার মনটা আবার খারাপ হয়ে গেলো। এরকম পরিবার এই দেশে অনেক।
আমি: তোমার আসল বাবা এখন কোথায় আছে? তোমার সাথে কোন যোগাযোগ আছে?
ইন্না: তিনি বেঁচে নাই এখন আর।
আমি: ও, সরি!
ইন্না: না। সরি বলার কিছু নাই।
আমি: তোমার মা বিধবা হওয়ার পরে, পুনরায় বিবাহ করেছিলেন?
ইন্না: তাও না। আমার বাবা ও মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আমি যখন খুব ছোট, হতে পারে আমার বয়স তখন চার-পাঁচ ছিলো। তখন থেকেই আমার মা ইউক্রেণে চলে এসে আমাকে নিয়ে আলাদা বসবাস করতে শুরু করেন।
আমি: বাবা মারা যান পরে।
ইন্না: হ্যাঁ। কয়েক বৎসর পরে আমার বাবা মারা যান।
আমি: তারপর তোমার মা, পুনরায় বিবাহ করেন?
ইন্না: হ্যাঁ। বেশ কয়েক বৎসর পরে আবার বিয়ে করেন মা। কিন্তু আমার মায়ের কপালটা খারাপ! এবারও ঐ একই ঘটনা ঘটে।
আমি: কি রকম?
ইন্না: নতুন স্বামীর সাথে বনিবনা হয় না। শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ হয়ে যায়! লোকটা ভালো ছিলো না।
ইন্নার কথা শুনে আমার মন খারাপ হতে শুরু করলো। তাও প্রশ্ন করলাম,
আমি: কি সমস্যা ছিলো?
ইন্না: শয়তান লোক! মাকে রেখে অন্যান্য মেয়েদের সাথে ঘোরাঘুরি করতো। আমাদের দেশের পুরুষদের এই-ই স্বভাব; ঘরের বৌয়ের জন্য ভর্ৎসনা, আর ইগনোরেন্স; আর বাইরের প্রেমিকার জন্য সব উজাড় করে দেয়!
আমি: এখন ঘরে থাকো তোমরা তিনজন?
ইন্না: হ্যাঁ। আমার মা, আমি আর আমার ছোটভাই। ছোটভাই-টাকে দেখলে এত মায়া লাগে জানো? ছোট্ট মানুষ! কিছু কি বোঝে?
আমি: তোমার ভাইয়ের দুঃখ তো তোমার মতই। ছোটবেলা থেকেই বাবা কাছে নেই!
ইন্না: এজন্যেই আমি আপাতত: ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারছি না। আমার ছোটভাইটাকে বড় করতে হবে না?
আমি: তুমি কি কোথাও চাকরী করছো?
ইন্না: নাহ্‌। চাকরী করে আর কয়টাকা আয় হয়। আমরা বিজনেস করি।
আমি: বিজনেস?
ইন্না: হ্যাঁ। শহরের বাজারে আমাদের ছোট্ট একটা দোকান আছে। আমি আর আমার মা দুইজনে মিলে দোকান-টা চালাই।

আমার মনটা আরো খারাপ হলো! কারো মতে উনিশ বছর অনেক বয়স; আর আমার চোখে উনিশ বছর অনেক ছোট! এই ছোট্ট মেয়েটিকে এই বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হচ্ছে। নিজের জীবন একপ্রকার আত্ম-উৎসর্গ করছে সৎ ছোটভাইটার জন্য। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ উপন্যাস-টার কথা মনে পড়লো!

ইন্না: আমি খারকোভ শহরে কেন এসেছি জানো?
আমি: তোমার বান্ধবী তানিয়ার কাছে বেড়াতে এসেছো।
ইন্না: না।
আমি: নতুন একটা শহর দেখতে এসেছ।
ইন্না: না। সেটাও না।
আমি: তাহলে কেন?
ইন্না: আমি আসলে তোমাকে দেখতে এসেছি।
আমি: মানে!!!!!!!!!!!
ইন্না: হ্যাঁ। আমি এই শহরে এসেছি তোমাকে দেখতে। তোমার সাথে পরিচিত হতে।
আমি: কি বলো? আমাকে তো তুমি চিনতে না। আমার সম্পর্কে কিছু জানতেও না!
ইন্না: (একটু মুচকি হেসে বললো) কে বলে জানতাম না? তোমার কত গল্প শুনেছি।
আমি: কার কাছে?
ইন্না: তানিয়ার কাছে।
আমি: তানিয়ার কাছে?
ইন্না: হুম। তানিয়া ছুটিতে বাড়ী গিয়ে, আমাকে তোমার কথা বলেছে। তোমার অনেক গল্প বলেছে।
আমি: কি বলেছে তানিয়া।
ইন্না: বলেছে, ঐ শহরে খুব ভালো একটা ছেলে আছে। খুবই কার্টিয়াস! অনেক সুন্দর করে কথা বলে, কেউ তার রুমে গেলে চা-কফি খাইয়ে অতিথিসেবা করার জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। মেয়েদের মনে দুঃখ দিয়ে কোন কথা বলে না।

ইন্নার কথা শুনে আমার চোখ তো কপালে। এ যেন, ‘তারে আমি চোখে দেখিনি, তার অনেক গল্প শুনেছি, গল্প শুনে তারে আমি দেখতে চেয়েছি’ -টাইপ।

মন ভালো করার জন্য আমি বললাম,
আমি: ইন্না গান শুনবে?
ইন্না: কি গান?
আমি: আমাদের বাংলাদেশের জাতীয় কবির লেখা গান। খুব রোমান্টিক ছিলেন তিনি।
ইন্না: রোমান্টিক গান শোনাতে চাও?
আমি: হ্যাঁ।
ইন্না: শোনাও। তবে পরে গানটা অনুবাদ করে দেবে কিন্তু।

আমি ক্যাসেট প্লেয়ার চালু করলাম। বেজে উঠলো নজরুল গীতি।

“বৈশাখী ঝড়ে রাতে চমকিয়া উঠি জেগে,
বুঝি অশান্ত মম আসিলে ঝড়ের বেগে।
ঝড় চলে যায় কেঁদে ঢালিয়া শ্রাবণধারা।
সে কি তুমি? সে কি তুমি?”

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৬শে জুলাই (সোমবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৪টা ৫২ মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.