কিছু গল্প লেখা যায় না – ১ (ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ক)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ক)

ইন্না-কে প্রথম দেখি আমার রুমেই। ইউনিভার্সিটি ডরমিটরির রুম। বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি। ‘আনার কলি’-র কাহিনী পড়েছিলাম কলেজ জীবনে। ট্রয় ভাঙা হেলেনের মতই মোগল সাম্রাজ্যের হেরেমের এক ‘হেলেন’ ছিলো এই ‘আনার কলি’। শুনেছিলাম যে, তার গায়ের রঙ ছিলো পাকা আনারের দানার মতন। তাই তার নাম দেয়া হয়েছিলো ‘আনার কলি’। ইন্নার গায়ের রঙও ছিলো ঠিক আনারের মতন। টসটসে বেদানা আভা গোলাপী রঙের চিবুক ও কপোলে-র ঐজ্জ্বল্যের মুখশ্রী ছিলো অপূর্ব। অমন ধ্রুপদী মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে অল্পবয়সী এক তরুণের চোখ না ফেরাতে পারার-ই কথা।

“ও হলো ইন্না” এই বলে আমার সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো, তানিয়া। তানিয়াও আমাদের ডরমিটরিতেই থাকতো, তবে বিশালদেহী তানিয়া রূপসী ছিলোনা, বিধায় তার দিকে প্রেমাসক্ত দৃষ্টি নিয়ে কেউ খুব একটা তাকাতো না। শুধু ইয়েমেনের আলী লোভাতুর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতো। আমাকে আলী একবার ফিসফাস করে বলেছিলো, “তানিয়ার পুরুষ্টু বুক দুটা দেখেছ! ওখানে হাত রাখার বড় সাধ হয়!” আলী বয়সে আমার চাইতে বছর দশেকের বড় ছিলো। বহু নারীতে আসক্ত ও অভ্যস্ত বয়স্ক অভিজ্ঞ আলীর কথাকে আমার তখন পছন্দ হয়নি; এবং অশালীন মনে হয়েছিলো। যাহোক, আলী ছাড়া আর কেউ ওর দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলো বলে শুনিনি, বা আমার জানা নেই।

তানিয়া, মাঝে মাঝে আসতো আমার রুমে। প্রথমবারের ঘটনাটা ছিলো খুব চমকপ্রদ। গ্রীস্মঋতু চলছিলো তখন। শীতের দেশে গ্রীস্মকাল ভীষণ এনজয়িং। তখন ছিলো পড়ন্ত বিকেল। হতে পারে বিকাল আট-টা। আমাদের দেশে এই সময়ে আকাশ আঁধার থাকলেও, ইউক্রেণে সামারের এই সময়ে আকাশে থাকে কড়া আলো। বাংলাদেশের বিকাল পাঁচটার মতন থাকে আকাশের রঙ। ইউক্রেণের বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অনুযায়ী, রুমের তিনদিক কঠিন দেয়ালে ঢাকা, আর একদিকে বিশাল কাঁচের জানালা, প্রায় পুরোটা দেয়াল জুড়েই এই জানালার ব্যাপ্তি। সেই ঢাউস জানালা গলে আসছিলো ইউক্রেণীয় বিকেলের সোনা আলো। আমি একাই থাকতাম ঐ বারো স্কয়ার মিটারের টু সিটেড রুমটিতে। হঠাৎ করেই বিনা অনুমতি এমনকি নক না করেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লো একটি অজানা মেয়ে। আমি হতবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম। তারপর সে খুব ভদ্রভাবে বললো, “আমি আপনার রুমে অতিথি হয়ে এলাম। এ্যালাউ করবেন কি?” এমন মিষ্ট ভাষণে আর না বলা যায় না। আমি বললাম, “ইটস ওকে। তবে আপনাকে তো…..।”
মেয়েটি: চিনতে পারছেন না, এই তো?
আমি: জ্বী।
মেয়েটি: আমার নাম তানিয়া।
আমি: ওচিন প্রিয়াত্‌না (কারো সাথে প্রথম পরিচয় হলে এই কথাটি বলা ঐ দেশের কালচার। কথার মানে হলো ‘খুবই প্রীতিকর!’)
তানিয়া: আমাকে চিনতে পারছেন না, কারণ আমি মাত্র ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছি। কয়েকদিন হলো, এই ডরমিটরিতে থাকি।
আমি: ও আচ্ছা। আমি তাহলে আপনার অনেক সিনিয়র। আমার নাম নয়ন।
তানিয়া: আপনার পাশের রুমে তিনটি নতুন ছেলে থাকে, ওরাও ফার্স্ট ইয়ারে-র ছাত্র। জানেন নিশ্চয়ই।
আমি: জ্বী, জানি। এটাই আমার সমস্যা। প্রতি বছরই ঐ রুমে নতুন নতুন বসবাসকারী আসে। এবং প্রতি বছরই তারা ফার্স্ট ইয়ারের।
তানিয়া: খারাপ কি? আপনি প্রতি বছরই নতুন নতুন প্রতিবেশী পান।
আমি: হতে পারে। সব কিছুরই ভালো-মন্দ রয়েছে। যেমন, প্রতি বছরই আমার নতুন প্রতিবেশী হয়, আর প্রতি বছরই আমাকে নতুন করে প্রতিবেশীদেরকে জানতে হয়। বাই দ্যা ওয়ে, আমার এবারের প্রতিবেশী তিনজনই খুব ভালো।
তানিয়া: ভালো না ছাই!
আমি: কেন? আমি ঐ রুমের নতুন তিনটি ছেলের সাথেই কথা বলেছি। তারা সবাইই খুব ভদ্র!
তানিয়া: ঐ ভদ্র ছেলেগুলা আমাকে ওদের রুম থেকে বের করে দিয়েছে। তাই তো আপনার রুমে এলাম।
আমি: ( অবাক হয়ে) মানে?
তানিয়া: মানে কিছু না। ওরা তো আমারই ক্লাসমেইট। তা এই বিকেলে ওদের রুমে গেলাম বেড়াতে। মিনিট দশেক গল্প করার পর ওরা আমাকে বলে যে, “নাহ্‌, তোমাকে আমাদের খুবই বোরিং লাগছে! তুমি এখন যাও। ভাবেন তো! কেমন অপমান!
আমি: (হেসে ফেললাম) তা বন্ধুরা বন্ধুরা তো দুষ্টামী করে কত কথাই বলে! এতে মন খারাপ করার কিছু নাই।
তানিয়া: না, আমি মন খারাপ করি নাই। তবে ওদের এক হাত দেখাতে চাই।
আমি: (আবারো হাসলাম) কি রকম?
তানিয়া: এই যেমন হুট করে আপনার রুমে ঢুকে পড়লাম। আমি ওদেরকে দেখাতে চাই যে, ‘দেখ, তোরা ছাড়াও আরো মানুষ আছে আমি যার রুমে বেড়াতে যেতে পারি।

তানিয়ার কথা শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারলাম না। তবে বেশ কৌতুক অনুভব করলাম। বেশ খামখেয়ালী মেয়ে তো! বললাম, “বসো। বেড়াতে যখন এসেছো তখন বসো।” তানিয়াকে ইশারায় সোফাটি দেখিয়ে দিলাম। তানিয়া সেখানে বসলো। আমি একটি চেয়ারে বসলাম। তানিয়া চোখ ঘুরিয়ে আমার সাজানো-গোছানো রুমটি দেখতে লাগলো। বললো, “বেশ সুন্দর গোছানো রুমতো আপনার!”
আমি: কফি খাবে?
তানিয়া: উইথ গ্রেইট প্লেজার।
আমি তানিয়ার জন্য কফি বানালাম। নিজেও এককাপ নিলাম।

এরপর তানিয়া ঘনঘনই আমার রুমে আসতো। ও এলেই আমি ওকে কফি বা চা পরিবেশন করতাম। গল্প করতাম গুছিয়ে। মাঝে মাঝে টিভি দেখতেও আসতো সে। তখন টিভি চ্যানেলে একটা খুব পপুলার সিরিয়াল চলছিলো। অল্পবয়সী সব মেয়েই খুব পছন্দ করতো ঐ মেক্সিকান সিরিয়ালটি।

তবে সেই সময়ে তানিয়াই যে একমাত্র তরুণী আমার রুমে আসতো তা নয়।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৩শে জুলাই (শনিবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৫টা ৫০ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.