কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১০

কৃষ্ণবিবর ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কারপর্ব ১০

—————————————————– রমিত আজাদ

গত পর্বে কবি ও বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল-এর অবদান নিয়ে আলোচনা করা হয় নি। যাহোক খুব সংক্ষেপে বলবো যে, ১৮৬৫ সালে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড (যা পানির ফিল্ডের মতই)-কে যদি ডিস্টার্ব করা হয় (যেমন কোন শান্ত পুকুর-কে যদি একটা ঢিল ছুঁড়ে ডিস্টার্ব করা হয়) তবে সেই ডিস্টার্বেন্সটি ঐ ফিল্ডের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়বে এবং ক্রমশঃ সামনের দিকে অগ্রসর হবে (যেমনটি পানির ফিল্ডে ঢেউ তৈরী হয়ে ছড়িয়ে পড়ে); ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড-এ উদ্ভুত ঢেউ-এর নাম ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ। ম্যাক্সওয়েল এও দেখালেন যে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ একটি সুনির্দিষ্ট বেগে সঞ্চালিত হবে। আশ্চর্য্যজনকভাবে ঐ বেগ-এর মান, আলোকের বেগের মানের সাথে মিলে গিয়েছিলো।

প্রসঙ্গত বলে রাখি যে আপনাদের কারো বাড়ীতে যদি পুরাতন রঙিন টেলিভিশন থাকে, তার পর্দার কোন এক কোনায় একটি ম্যাগনেট ধরুন, দেখবেন যে আলোর রঙ কিভাবে পাল্টে যায়! এরকমই কাজ করা হয়েছিলো আলোর ক্ষেত্রে। একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে আলোক রশ্মিকে পাঠানো হয়েছিলো, এবং পর্যবেক্ষিত হয়েছিলো যে, সেই আলো এঁকেবেকে যায়। তার মানে হলো, আলোর বিদ্যুৎ-চুম্বক ধর্ম রয়েছে। পরবর্তিতে অবশ্য স্পষ্টই প্রমাণিত হয়েছিলো যে, আলো আর বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ একই। জাস্ট, ‘বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ’-এর দৃশ্যমান অংশটিই রঙিন বা সাদা আলো হিসাবে আমাদের চোখে ধরা দেয়।

স্যার আইজাক নিউটন ও আপেলের গল্পটি আর নতুন করে বলার কিছু নাই। তার মানে হলো পৃথিবী যে একটি বলে কোন কিছুকে তার দিকে টানে এই নিয়ে ভাবনা থেকেই স্যার নিউটনের বিজ্ঞান গবেষণা শুরু। যারা রিসার্চ মেথডোলজির কোর্স করেছেন তারা জানেন যে, ‘বৃন্ত থেকে বিচ্যুত একটি আপেল কেন দশ দিকের নয় দিকে না গিয়ে কেবল নিম্নাভিমুখী হয়?’ এইটি একটি স্ট্যান্ডার্ড ‘রিসার্চ কোশ্চেন’। এই আলোচনার মোদ্দাকথা হলো যে, স্যার নিউটন গ্রাভিটেশন নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেছিলেন। এবং কালজয়ী ‘ইউনিভার্সাল ল অব গ্রাভিটেশন’-টি উনারই নির্মিত (যদিও হুক-ও কাজটি করেছিলেন)

একাদশ শতকে মুসলিম বিজ্ঞানী আল বিরুনী স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে পৃথিবীর মত অন্যান্য জ্যোতিষ্কগুলোরও ভর ও মহাকর্ষ (gravity) আছে। তিনি এই পর্যায়ে দার্শনিক এরিস্টটলের সমালোচনা করেছিলেন এই কারণে যে, দার্শনিক এরিস্টটল মনে করতেন, অন্যান্য জ্যোতিষ্কগুলোর ভর ও মহাকর্ষ নাই।

দ্বাদশ শতকে আবুল বারাকাত আল বাগদাদী (Abu’l-Barakāt al-Baghdādī) ভূপৃষ্ঠে মুক্তভাবে পড়ন্ত বস্তুর ‘অভিকর্ষজ ত্বরণ’-এর ব্যাখ্যারও প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন, এইভাবে আল বাগদাদী  এরিস্টটল প্রস্তাবিত fundamental dynamic law (যার ভাষ্য হলো ধ্রুব বল প্রযুক্ত থাকলে সমগতিবেগ থাকবে)-কে বাতিল করেছিলেন। ষোড়শ শতকে আল বিরজান্দি (Al-Birjandi) পৃথিবীর ঘূর্ণনকে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

যাহোক, যা আলোচনা করছিলাম যে, স্যার নিউটনের ক্লাসিকাল গ্রাভিটেশন-এর সাথে আইনস্টাইনের নব-নির্মিত ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ একমত হতে পারছিলো না। কেননা, STR দেখিয়েই দিয়েছে যে, আলোকের গতিবেগের চাইতে বেশি কোন গতিবেগ হতে পারে না; এমনকি কোন মিথষ্ক্রিয়া বা বল-এর গতিবেগও নয়। সুতরাং STR অনুযায়ী মহাকর্ষ বলের গতিবেগও আলোকের গতিবেগের চাইতে বেশি হতে পারবে না। অথচ স্যার নিউটনের বর্ণিত গ্রাভিটেশনাল ফোর্স-এর গতিবেগ অসীম!

ব্যাস ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ নির্মিত হওয়ার পর প্রয়োজন দেখা দিলো ঐ একই আলোকে মানে আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর আলোকে ‘মহাকর্ষ তত্ত্ব’-কে ব্যাখ্যা করার। অতঃপর গুরুত্বপূর্ণ ঐ কাজটিতে হাত দিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে নির্মান করলেন ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)।

(চলবে)

—————————————————–

রচনাকাল: ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

রচনাসময়: বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.