Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১১

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১১
————————————————————– রমিত আজাদ

‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity):
গত পর্বে লিখেছিলাম যে, ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব নির্মান শেষ হওয়ার পর আইনস্টাইন লক্ষ্য করেছিলেন যে স্যার নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব, নবনির্মিত বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। অতএব প্রয়োজন দেখা দিলো একটি সঙ্গতিপূর্ণ আপেক্ষিক মহাকর্ষতত্ত্ব নির্মান করার। এরপর তিনি নির্মান করলেন সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব। কি আছে এই সার্বিক তত্ত্বে?

একটি চুম্বকের চারদিকে একটি এলাকা জুড়ে তার প্রভাব আমরা দেখতে পাই। যেই প্রভাবে চুম্বক অপর একটি চুম্বককে অথবা কোন চৌম্বক-পদার্থকে আকর্ষণ-বিকর্ষণ করে। এই প্রভাবটিরই নাম দেয়া হয়েছে ক্ষেত্র (field)। চুম্বকের চারদিকের ক্ষেত্রকে বলি চুম্বক ক্ষেত্র। মানবের চোখে ক্ষেত্রটি অদৃশ্য। একইভাবে একটি চার্জের চারদিকেও একটি ক্ষেত্র থাকে যা অন্য কোন চার্জকে প্রভাবিত করে। এই ক্ষেত্রের নাম বিদ্যুৎ ক্ষেত্র (electric field)। এবার লক্ষ্য করুন যে, পৃথিবীর চারদিকেও কিছু একটা আছে, যার প্রভাবে ভরসম্পন্ন যেকোন কিছু পৃথিবীর দিকে চলে আসে। এটাও একটা ক্ষেত্র, যার নাম দেয়া হলো মহাকর্ষ ক্ষেত্র (gravitational field)।

১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন কিছু ক্ষেত্র সমীকরণ উপস্থাপন করেছিলেন (Einstein field equations)। এই সমীকরণগুলো এই বোঝালো যে বস্তু (matter) ও বিকিরণ (radiation) দ্বারা স্থান ও কাল কিভাবে প্রভাবিত হয়। হ্যাঁ স্থান-এর আলোচনা বা গণিত আসলে জ্যামিতি না এসে পারেই না। অপরদিকে পূর্বেই আলোচনা করেছি যে STR আসার পর স্পষ্টই বোঝা গেলো যে স্থান ও কাল পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সুতরাং স্থান ও কাল উভয়ের আলোচনাতেই জ্যামিতি আসবে। কোন জ্যামিতি? কয়েক হাজার বছর ধরে পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। পৃথিবীর সব গুলো সভ্যতাতেই জ্যামিতির অবদান রয়েছে, সব দেশেই জ্যামিতিবিদরা ছিলেন। তাই কোন দেশে প্রথম জ্যামিতির উদ্ভব হয়েছে এটা সুনিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে গ্রীসে জ্যামিতির উপর কালজয়ী গ্রন্থ লিখেছিলেন ইউক্লিড, তাই ঐ জ্যামিতি ইউরোপে ‘ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’ নামে পরিচিত হয়। এই জ্যামিতিতে যা কিছু আলোচিত হয়েছে, সব আলোচিত হয়েছে সমতল পৃষ্ঠে। সমতল পৃষ্ঠ ছাড়াও যে অন্যরকম পৃষ্ঠ হতে পারে তা হয়তো তখন ভাবাই হয় নাই! ‘ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’-তে বেশ কয়েকটি পস্টুলেট আছে, যা কোন প্রমাণ ছাড়াই মেনে নেয়া হয়েছিলো। এদের মধ্যে পঞ্চম পস্টুলেট-টি (যার অপর নাম সমান্তরাল পস্টুলেট) প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন অনেকেই (আল হাইয়াম, ওমার খৈয়াম, আল দ্বীন তুসি, প্রমুখ), কিন্তু তা প্রমাণ করা সম্ভব হয় নাই। হঠাৎ করে বক্রপৃষ্ঠ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেলো যে ঐ পস্টুলেট-টি সঠিক নয়। কালক্রমে উনিশ শতকের দিকে নির্মিত হয় ‘নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’। এখানে অনেক গণিতবিদেরই অবদান রয়েছে। আমি আপাতত জার্মান গণিতবিদ রিমান (Bernhard Riemann)-এর নামই উল্লেখ করবো।

আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর মূল আলচ্য ছিলো মহাকর্ষ ক্ষেত্র। ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা আসলে, স্থান ও কাল নিয়ে আলোচনা আসবেই। স্থান-কাল নিয়ে আলোচনায় আসবে জ্যামিতি। আর যথাযথ জ্যামিতি বাছাই করতে গিয়ে আইনস্টাইন দেখলেন যে রিমানীয় জ্যামিতিই (Riemannian Geometry) এই ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি প্রযোজ্য। উনাকে আইডিয়াটি দিয়েছিলেন উনার বন্ধু মার্সেল গ্রসমান (Marcel Grossmann)। ফলে বোঝা গিয়েছিলো যে মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সাথে স্থান-কালের বক্রতার সম্পর্ক রয়েছে। গাণিতিকভাবে দেখা গেলো যে, শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কাছে আসলে আলোর চলার পথ বেঁকে যায়। কিন্তু আমরা তো জানি যে, আলো সরলপথে চলে। তাহলে কি কোন মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কাছে ঐ চলার পথটাই বাঁকা? হ্যাঁ, আইনস্টাইনের ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব ওটাই বলেছিলো যে, সূর্য বা ওরকম ম্যাসিভ কোন বডি তার চারপাশের স্থানটিকেই বাঁকিয়ে ফেলে, এটাকেই বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয় স্থান-কাল বক্রতা (space-time curvature)।

‘স্থান’ যা কিনা সাদা চোখে একটা শূণ্যতা ছাড়া আর কিছুই না, তা আবার বেঁকেও যেতে পারে! আইনস্টাইনের এই বৈপ্লবিক কথাটিকে তখন অনেকের কাছেই পাগোলের প্রলাপ বলে মনে হয়েছিলো!

ইতিপূর্বে কয়েকবার বলেছি যে তাত্ত্বিক বিজ্ঞান যাই বলুক না কেন, পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কখনোই মেনে নেয়া হয় না। তাই যে সকল বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের গাণিতিক উপস্থাপনায় চমৎকৃত হয়েছিলেন, তারা চাইলেন এর পরীক্ষালদ্ধ প্রমাণ। কি করে সম্ভব? সূর্যের ওপাশে অনেক তারকা আছে, যাদের আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। তাহলে ঐ আলো সূর্যের পাশ দিয়ে আসার সময় সূর্য কর্তৃক বাঁকানো পথটি ধরে আসবে (কবি জসীমউদ্দীনের সেই ‘রাখাল ছেলে’-র মত)। কিন্তু সমস্যা হলো যে, দিবালোকে তারকা দেখা সম্ভব না, তাও আবার সূর্যের ওপাশের তারকা। কিন্তু পথ তো একটি থাকতেই হবে! সৃস্টিকর্তা রহস্য যেমন রেখেছেন, আবার সেই রহস্য সমাধানের পথও রেখেছেন। কি সেই পথ?

(চলবে)

রচনাকাল: ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০১টা ৫৮ মিনিট

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.