Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১২

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১২
———————————————– রমিত আজাদ

গত পর্বে লিখেছিলাম যে, কোন ম্যাসিভ বডি (যেমন সূর্য) তার চারপাশের স্থানটিকেই বাঁকা করে ফেলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্রের গাণিতিক বর্ণনা করতে গিয়ে এমনটাই পেয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। এত বড় একটি কথা (বৈপ্লবিক কথাই হোক আর পাগোলের প্রলাপই হোক) হজম করা খুব কঠিন হচ্ছিলো, সাধারণ মানুষের কাছে তো বটেই এমনকি বিজ্ঞানীদের কাছেও। এটা পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব কেবল তখনই যখন সূর্যের ওপাশে দৃশ্যমান তারকাগুলিকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। সূর্যের দিকে তাকালে চোখ ঝলসে যায়, তা ওপাশের তারকা আর দেখবো কি করে?! কিন্তু ঐ যে লিখেছিলাম যে, সব রহস্য সমাধানেরই কোন একটা পথ উপরওয়ালা খোলা রাখেন। আমাদের এই পৃথিবীর একটি সার্বক্ষণিক সঙ্গী রয়েছে। অন্যান্য গ্রহের তুলনায় সঙ্গীর সংখ্যা কম, মাত্র একটিই; কিন্তু পৃথিবীর এই সঙ্গীটি আবার আকারে বড়! তাই সে সাগর-নদীতে জোয়ার-ভাটা সহ নানা কাজে পৃথিবীবাসীকে সাহায্য করে। সেই সঙ্গীটির নাম চাঁদ। চাঁদ নামক উপগ্রহটি আকারে এমন ও পৃথিবী থেকে এমন একটি দূরত্বে রয়েছে যে, মাঝে মাঝে সে একটি চাকতি রূপে সূর্যকে ঢেকে ফেলতে পারে। সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ সকলেই গতিশীল ও ঘূর্ণায়মান। ঘুরতে ঘুরতে তারা অনেক সময় এক সরলরেখায় উপস্থিত হয় এমনভাবে যে চাঁদটির অবস্থান হয় সূর্য ও পৃথিবীর ঠিক মাঝখানে। ঢেকে যায় সূর্য, পৃথিবীতে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার! এই প্রতিভাসের নাম সূর্যগ্রহণ। এই প্রাকৃতিক প্রতিভাস-কে প্রাচীনকালে অশুভ মনে করা হতো। যাহোক, আলবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর এই প্রতিভাসই বিজ্ঞান মহলে আশীর্বাদের মত মনে হলো। আইনস্টাইনের গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর পরবর্তি সূর্যগ্রহণে সুযোগ আসলো, উনার তত্ত্বকে পরীক্ষার দ্বারা (Empirically) প্রমাণ করার।

১৯৮০ সালে (সম্ভবত ফেব্রুয়ারী মাসে) বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিলো (কয়েক ঘন্টা দীর্ঘায়ীত হয়েছিলো)। আমার মনে পড়ে যে আমরা শিশুরা এক্স-রে রিপোর্ট চোখে দিয়ে সেই সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছিলাম। ঐ সূর্যগ্রহণ-এর সময় বেশ একটা উৎসব উৎসব ভাব হয়েছিলো সারা দেশে। সেইদিন পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হওয়ার পর পর অনেককেই দেখলাম দূরবীন চোখে দিয়ে ঐ দিকে তাকাচ্ছে! আমি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। আমার বড় ভাই কবীর আহমেদ বললেন, “এরকম সময়ে আকাশে তারা দেখা যায়।” কথাটা আমাকে স্ট্রাইক করেছিলো। তাইতো, আকাশ তো অন্ধকারই হয়ে এসেছে, এরকম সময়ে আকাশে তারা দেখা যেতেই পারে।

ঠিক এই জাতীয় সুযোগেরই সদ্বব্যবহার করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কথিত আছে যে, সেই আলবার্ট আইনস্টাইনের জটিল আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বুঝতে পেরেছিলেন শুধু আরেকজন, উনার নাম এডিংটন (Arthur Stanley Eddington)। তাই এই তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রমাণ নিয়ে উৎসাহ উনারই ছিলো সবচাইতে বেশি।

প্রসঙ্গত বলে রাখি যে কোন জ্যোতিষ্কের পাশ দিয়ে চলার পথে আলো বেঁকে যেতে পারে এই বিষয়ে আসলে প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলোনে বিজ্ঞানী সোল্ডনার (Soldner) ১৮০৪ সালে। তিনি আল হাইয়াম ও নিউটনের আলোক কণিকা তত্ত্বকে ভিত্তি করে দেখিয়েছিলেন যে কোন ম্যাসিভ জ্যোতিষ্কের মহাকর্ষের টানে আলোর কণিকা স্রোত ক্রমাগত আকৃষ্ট হয়ে আলোকপথ বেঁকে যাবে। তিনি ঐ ডিফ্লেকশন-এর হিসাবও করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন যে সূর্যের কাছাকাছি থাকা ফিক্সড স্টারগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলে বিচ্যুত আলো দেখা যাবে। যেহেতু অত আগে এই ধরনের গবেষণা-পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব ছিলো না, তাই উনার গবেষণা নিয়ে আলোচনা আর বেশিদূর আগায় নাই।

যাহোক আর্থার এডিংটন-এর এক্সপিডিশন নিয়ে কথা হচ্ছিলো। ১৯১৯ সালের ২৯শে মে দু’টি এক্সপিডিশনের আয়োজন করা হয়। একটি আটলান্টিক মহাসাগরের এপাশে পশ্চিম আফ্রিকার দ্বীপ Príncipe-এ, এবং অপরটি মহাসাগরের ওপাড়ে ব্রাজিলের সোব্রাল শহরে। এক্সপিডিশন দুইটির লক্ষ্য ছিলো, সূর্যের কাছাকাছি থাকা তারকাগুলো থেকে পৃথিবীতে আসা আলোক রশ্মির বিচ্যুতি পরিমাপ করা। অবশ্য এই ডিফ্লেকশনের মান তাত্ত্বিকভাবে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছিলো আলবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণাপত্রে ১৯১১ ও ১৯১৫ সালে।

Príncipe-এর এক্সপিডিশনের সদস্য ছিলেন দু’জন বিজ্ঞানী Eddington এবং Edwin Turner Cottingham। উনারা কেমব্রিজ অবজারভেটরি-র সদস্য ছিলেন। আর ব্রাজিল এক্সপিডিশনের সদস্য ছিলেন গ্রীনউইচ অবজারভেটরির Andrew Crommelin এবং Charles Rundle Davidson।

Principe এক্সপিডিশনের ফলাফলটি ছিলো চমকপ্রদ। বেশ ঝড়-ঝঞ্ঝার পর উনারা ছবি তুলতে সক্ষম হন। যদিও মেঘমালা কিছু সমস্যার সৃষ্টি করেছিলো, তারপরেও তোলা ছবিগুলোর মধ্যে শেষ কয়েকটি ছবি বেশ কাজের ছিলো। এর মধ্যে একটি প্লেটের ছবি থেকে প্রাপ্ত ফলাফল আইনস্টাইনের গবেষণার সাথে একমত হয়।

১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসে রয়াল সোসাইটির সভায় এই ফলাফল ঘোষিত হয়। Royal Astronomical Society কর্তৃক আয়োজিত একটি ভোজসভায় এডিংটন এই নিয়ে প্রাণ খুলে একটি রুবাই আবৃত্তি করেন, যা ছিলো কালজয়ী জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও কবি ওমার খৈয়াম-এর রুবাইয়ের অনুকরণে। রুবাইটি নিম্নরূপ:

Oh leave the Wise our measures to collate
One thing at least is certain, light has weight
One thing is certain and the rest debate
Light rays, when near the Sun, do not go straight.

— Arthur Stanley Eddington, RAS dinner

(প্রজ্ঞাময়-এর হাতে ছেড়ে দিলাম আমাদের পরিমাপগুলোর তুলনা-মানানা,
আলোর ওজন আছে, অন্ততপক্ষে এইটির দিতে পারি নিশ্চয়তা।
বাকীটা বিতর্ক হলেও একটি বিষয়ের আছে নিশ্চয়তা,
আলোক রশ্মি, যখন সূর্যের কাছাকাছি, তখন আর সে সোজা পথে চলেনা।)

  • আর্থার এডিংটন

চলবে)


রচনাতারিখ: ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১১টা ২৯ মিনিট

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.