কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৩

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৩
——————————————————- রমিত আজাদ

সময় প্রসারণ:

বডি না থাকলে কোন স্থান নাই, বডি থাকলেই কেবল স্থান আছে। একাধিক বডির মধ্যকার সম্পর্কটাই স্থান। বডিরাই স্থান তৈরী করে। তাহলে বডির প্রকৃতি বা ধর্মের উপর ভিত্তি করে স্থানের প্রকৃতি ও ধর্ম হবে এটাই তো যৌক্তিক। দার্শনিক-রা কিন্তু কথাগুলো কয়েক হাজার বছর আগেই বলেছিলেন। তবে মানব চর্চিত ও প্রতিষ্ঠিত সাবজেক্টগুলোর মধ্যে বিজ্ঞান যেহেতু নবীনতম তাই এই নিয়ে কাজ করার সুযোগ তার এসেছে অনেক পরে। অবশেষে বিজ্ঞান পদ্ধতিগতভাবেই আবিষ্কার করেছে যে, কোন একটি বডি তার চারপাশের স্থানটিকে বাকিয়েও দিতে পারে!

ইতিপূর্বে কয়েকবার লিখেছি যে স্থান (space) আর সময় (time) আলাদা কিছু নয়, তারা পরস্পর সম্পর্কিত। তাহলে ম্যাসিভ বডি বা তার মহাকর্ষ যদি স্থানকে বাঁকিয়ে দিতে পারে, সেইভাবে সময়ও প্রভাবিত হবে নিশ্চয়ই। হিসাবে করে দেখা গেলো যে, তাই-ই হয়। বাঁকানো স্থান সময়কে প্রসারিত (time dilation) করে। ঠিক যেমনটি দেখা গিয়েছিলো ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’-এর ক্ষেত্রে!

বিষয়টির ব্যাখ্যা মোটামুটি সহজেই দেয়া যায় যে, ম্যাসিভ বডি (অন্য কথায় তার মহাকর্ষ) যেহেতু তার চারপাশের স্থানটিকে বাঁকিয়ে ফেলে, অতএব আলোর সিগনাল-কে মানে আলোকরশ্মি-কে যেতে হবে বাঁকা পথ ধরে। আর দৈনন্দিন জীবন ও ইউক্লিডিও জ্যামিতি থেকে আমরা জানি যে, কোন কিছু সোজা পথ দিয়ে যেতে যত সময় নেয়, সে বাঁকা পথ ধরে গেলে তার চাইতে বেশি সময় নেবে। অতএব আলোকরশ্মি যখন কোন ম্যাসিভ বডির পাশ দিয়ে যাবে তখন ঐ পথ ভ্রমণ করতে সে সময় নেবে বেশি (মহাকর্ষ ক্ষেত্রের অনুপস্থিতিতে ভ্রমণের সময়টা লাগতো কম), এটাই time dilation। এই নিয়ে এখন আর কোন বিতর্ক নাই, বহু সংখ্যক পরীক্ষা করে তা প্রমাণিতও হয়েছে।

মহাকর্ষ তরঙ্গ:
এই নিয়ে আমি একটি বিষদ প্রবন্ধ তিনবছর আগে লিখেছিলাম তাই এখানে আর তার পুণরাবৃত্তি করতে চাই না। এই প্রবন্ধেও কিছু আগে তার উল্লেখ করেছি। আপাতত সংক্ষেপে বলবো, যে কোন ফিল্ডের ডিসটার্বেন্স হতেই পারে, ডিসটার্বেন্স হলেই তা তরঙ্গায়িত হয়। অনুরুপভাবে, মহাকর্ষ ক্ষেত্রের ডিসটার্বেন্স হলে যে তরঙ্গের জন্ম হবে তার নাম মহাকর্ষ তরঙ্গ (gravitational wave)। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময়ে, এই gravitational wave আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা, এই নিয়ে সন্দেহের কথাই বেশি বলা হতো। এমনকি ২০০৭ সালে আমার কথা হয়েছিলো বাংলাদেশী পদার্থবিজ্ঞানী ড. মফিজউদ্দিন-এর সাথে (মরহুম)। তিনি আমাকে এই নিয়ে তার গবেষণার কথা বলছিলেন, আমি উনাকে ইন্টারাপ্ট করে বলেছিলাম, “এটা তো থিওরেটিকাল কথাবার্তা! গাণিতিক এক্সপ্রেশন! কিন্তু, বাস্তবে এই জাতীয় তরঙ্গ খুঁজে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা কি আছে? বিজ্ঞানীরাই তো বলে যে, মহাকর্ষ একটা বল, নাকি জ্যামিতি বোঝা ভার!” আমি কথাগুলো এমন জোর দিয়ে বলেছিলাম যে, তিনি মন খারাপ করেছিলেন।

যাহোক, ২০১৬ সালে লিগো টীম গবেষণা করে মহাকর্ষ তরঙ্গ সনাক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন (On 11 February 2016, the LIGO teams announced the direct discovery of a gravitational wave matching the signal predicted from the collision of two black holes)। এইটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমি খুব এক্সাইটেড হয়েছিলাম, এবং আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী, বন্ধুবান্ধব পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপকদের সাথে এই নিয়ে আলাপ করেছিলাম। ঐ একই বছরের মার্চ, আমি সিলেট ক্যাডেট কলেজের মাননীয় অধ্যাক্ষ কমান্ডার সাইফুর রহমান কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়েছিলাম, উনার কলেজে (সেটা আমারও ‘আলমা মাতের’) বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তৃতা দেয়ার জন্য। আমার মনে পড়ে যে, সেই অনুষ্ঠানে একজন ক্যাডেট তখন আমাকে gravitational wave সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো। সদ্য আবিষ্কৃত এই ওয়েভটি সম্পর্কে আমি তখন তাদেরকে যতদূর পারি বুঝিয়েছিলাম।

তারপর ২০১৭ সালে ঐ লিগো টীম-কে ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ দেয়া হয়েছিলো। (The 2017 Nobel Prize in Physics has been awarded to three key players in the development and ultimate success of the Laser Interferometer Gravitational-wave Observatory (LIGO). One half of the prize was awarded jointly to Caltech’s Barry C. Barish, the Ronald and Maxine Linde Professor of Physics, Emeritus and Kip S.) এরপর আমি এই নিয়ে ‘এবারের নোবেল পুরষ্কার (পদার্থবিজ্ঞান ২০১৭)’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করি।

চলবে)


রচনাতারিখ: ২৮শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: বিকাল ০৫টা ০৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.