কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৪

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৪
——————————————————- রমিত আজাদ

আলোচনার এই পর্যায়ে মনে হবে যে সবকিছুর মূলে ঐ আলো (দৃশ্যমান হোক, আর অদৃশ্য হোক)!
আলোর গতিবেগ যে কোনভাবেই সসীম ও ধ্রুব। আর আলোকের গতিবেগ ধ্রুব রাখতে গিয়ে সে ‘পথের দৈর্ঘ্য’ এমনকি সময়কেও পাল্টে ফেলছে। এর ফলে স্থান-কাল আর স্থির থাকছে না (যেমনটি মনে করতেন দার্শনিক এরিস্টটল ও বিজ্ঞানী গ্যালিলিও এবং নিউটন)! স্থান-কালও আর সবকিছুর মতই ডাইনামিক বা গতিশীল হয়ে যাচ্ছে!

১৬৮৯ সালে স্যার আইজাক নিউটন বলেছিলেন, “I will not define time, space, place and motion, as being well known to all.” আর ১৯৭৩ সালে জন হুইলার (John Archibald Wheeler) বললেন, “Space tells matter how to move. Matter tells space how to curve.” কি বুঝলাম? ‘স্থান-কাল’-এর মত বিজ্ঞানও ধ্রুব নয়, বরং চলমান!

ভর-শক্তি বনাম স্থান-কাল বক্রতা:

নবম শ্রেণীতে একটা প্রাকৃতিক আইন পড়েছিলাম, যার নাম হুক-এর আইন (Hooke’s law)। কোন একটা স্প্রিং-কে টানতেও বল প্রয়োগ করতে হয়, সংকুচিত করতেও বল প্রয়োগ করতে হয়। বল প্রয়োগ যত বেশি এই সংকোচন প্রসারণও তত বেশি। আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদেরকে শেখালো ‘ভর-শক্তি’ স্থান-কাল-কে বাঁকা করে ফেলে। এই ভর-শক্তি যত বেশি, বক্রতাও তত বেশি। Mass-energy curves space-time — a new version of Hooke’s law.

এই প্রবন্ধের আওতায় এত সময় যাবৎ সম্ভবত শুধু ‘ভর’-এর কথাই লিখেছি শক্তির কথা তেমন লিখি নাই। যাহোক, আপাতত লিখছি যে, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমন গতির ব্যাখ্যা-বর্ণনা করতে গিয়ে স্থান ও কাল-কে একীভূত করে ‘স্থান-কাল’ (space-time) বানিয়ে ফেলেছে; তেমনি এই আপেক্ষিক তত্ত্ব ‘ভর’ ও ‘শক্তি’-কেও একীভূত করে ‘ভর-শক্তি’ (mass-energy) বানিয়ে ফেলেছে। আধুনিক বিশ্বে যিনি বিজ্ঞান জানেন না তিনিও জামার বুকে E = mc2 লেখা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। আলবার্ট আইনস্টাইন দেখিয়েছিলেন যে, কোন বডির জড় ভর (inertial mass) তার অন্তর্গত শক্তির পরিমানের সমানুপাতিক। এইভাবে যে কোন ভরকেই শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়। এটা যে সম্ভব তা আর ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখানোর দরকার নাই। গুণধর মার্কিন রাজনীতিবিদরা বিজ্ঞানীদের হাজারো নিষেধ সত্ত্বেও, ভর-কে শক্তিতে রূপান্তরিত করে জাপানের সাজানো-গোছানো দুইটি শহরকে গোটা অধিবাসী সমেত বিধ্বংস করেছিলো! এইভাবে একটা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে হতবাক বিশ্ব মানবতা দেখেছিলো ও জেনেছিলো ভর-শক্তির রূপান্তর সম্ভব। বিজ্ঞানীরা মেধা খাটিয়ে প্রযুক্তি তৈরী করেন আর রাজনীতিবিদরা প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে তার অপব্যবহার করে, এটা একেবারেই নতুন কিছু নয়!

বিশেষ ও সার্বিক আপেক্ষিকতত্ত্বের গুরুত্ব:
১। এই তত্ত্ব ফিজিক্সে বৈপ্লবিক নবযুগের সূচনা করেছে।
২। এই নতুন পদার্থবিজ্ঞান আমাদের মহাবিশ্বকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
৩। আধুনিক প্রযুক্তি বিশেষত স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে ব্যাপক অবদান রেখেছে।
৪। মহাকর্ষ তরঙ্গ-কে শেষতক আবিষ্কার করেই ছেড়েছে।
৫। মহাকর্ষ তরঙ্গ ও আলোক তরঙ্গ (বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ) এক নয়, তবে তাদের উভয়ের চরম গতিবেগটা একই, মানে 186,000 miles per second।
৬। আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো তরঙ্গের ব্যবহার। একসময় শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে অনেক কিছুই করা হয়েছে। তারপর এলো অদৃশ্য আলোক তরঙ্গ। তা ব্যবহার করে এখন আমরা যোগাযোগ প্রযুক্তিতে কি না করছি? এমনকি ওভেনে খাবারও গরম করছি। সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন রাখা যায় যে, মহাকর্ষ তরঙ্গ ব্যবহার করে কি কি করা যেতে পারে? উত্তরে বলবো, মহাকর্ষ তরঙ্গ তো মাত্র আবিষ্কৃত হলো, তাই কিছুটা সময় সবুর করতে হবে। কালক্রমে তার বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চয়ই হবে। আপাতত যা বলতে পারি তা হলো, মহাকর্ষ তরঙ্গ আবিষ্কৃত হওয়ার পর আমরা মহাবিশ্বকে স্টাডি করার একটা নতুন পথ খুঁজে পেলাম। এখন আমরা এমন অনেক মহাজাগতিক ঘটনা সনাক্ত করতে পারছি যা দৃশ্যমান আলোর দ্বারা করা সম্ভব ছিলো না, যেমন কৃষ্ণবিবরের সংঘর্ষ!

আলোর gravitational bending-কে পরীক্ষার দ্বারা নিশ্চিত করেছিলেন Arthur Eddington। এইভাবে সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব নিউটনের universal gravitation-কে প্রতিস্থাপিত করে। Newton ও Eddington দুজনই ছিলেন ইংরেজ। পক্ষান্তরে আইনস্টাইন ছিলেন জার্মান। ১৯১৯ সাল ছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ঠিক পরের বৎসর। ইংল্যান্ডে তখন এন্টি-জার্মান সেন্টিমেন্ট তুঙ্গে! এমন সময়েও এডিংটন কর্তৃক আইনস্টাইনের তত্ত্ব প্রমাণ করার ঘটনা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিয়ে উদার কন্ঠে পারশিক মুসলিম কবি ও বিজ্ঞানী ওমার খৈয়ামের সুরে রুবাই পাঠ করা এই বোঝায় যে ‘বিজ্ঞান ঐ নোংরা রাজনীতির উর্ধ্বে!’

তারপরেও কথা থাকে। অনেকের ধারনা যে বিজ্ঞানীরা দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে কোন মহামানব। তাই কি? উনারা জ্ঞানে ও মেধায় অসাধারণ হতে পারেন তবে, আদিকালের পৌরাণিক দেব-দেবীদের মতন উনারাও ঈর্ষা ও প্রতিহিংসাপরায়ন, এমনকি সংকীর্ণমনাও হয়ে থাকেন! পরবর্তি পর্বের আলোচনায় আমি তার কিছু কিছু উল্লেখ করবো!

(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১২টা ০৭ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.