কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৫

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৫
——————————————————- রমিত আজাদ

খুব ছোটবেলায় আমার বড় বোন আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “বল তো, আমরা পৃথিবীর কোথায় থাকি?” তখন তিনি ঢাকার হলিক্রস কলেজের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। আমি উনাকে উত্তর দিয়েছিলাম যে, “আমরা পৃথিবীর ভিতরে থাকি।” তিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন যে, “না, আমরা পৃথিবীর উপরে থাকি।” আমি হতবাক হয়ে, উনার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম! তারপর তিনি একটা গ্লোব হাতে নিয়ে পৃথিবী, ভূপৃষ্ঠ ও তার উপরে আমাদের থাকা ও চলাফেরা বিষয়টি বুঝিয়েছিলেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন যে পৃথিবীর বাইরেটা শূণ্যতা, এই কারণেই তো আমরা মাথার উপরে আকাশ দেখি। তারপর আমি বিষয়টি বুঝেছিলাম, কিন্তু সেই সাথে আরেকটি প্রশ্ন আমাকে চেপে ধরেছিলো, ‘তাহলে আমরা ঐ শূণ্যতায় বা আকাশে পড়ে যাইনা কেন?’

আপনি একটা ফুটবল হাতে নিন। তারপর তার উপর কিছু একটা স্থির রাখুন। এরপর ফুটবলটিকে ঘোরান। কি হবে? ঐ বডি-টি ফুটবলের উপর থেকে ছিটকে পড়ে যাবে। তাহলে ঘূর্ণায়মান পৃথিবী থেকে আমরা বা অন্য কিছু ছিটকে মহাশূণ্যে চলে যাই না কেন?

এমন প্রশ্নই সেই পঞ্চম শতকে করেছিলেন দক্ষিণ এশীয় গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট। ঘূর্ণায়মান পৃথিবী থেকে কোন কিছু ছিটকে মহাশূণ্যে চলে না যাওয়ার কারণ হিসাবে তিনি একটি ‘বল’-কে সনাক্ত করেছিলেন, যা আমাদেরকে টেনে পৃথিবীপৃষ্ঠে ধরে রাখে। পরবর্তিতে গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিদ ব্রহ্মগুপ্ত ষষ্ঠ শতকে ঐ বল-এর নাম দিয়েছিলেন ‘গুরুত্‌ভাকর্ষণ।

আমার গত পর্বের লেখা পড়ে একজন সুহৃদ পাঠক জানতে চেয়েছিলেন যে মহাকর্ষ কি ‘বল’ না ‘জ্যামিতি’? ঐ প্রশ্নটা আমিই এক সময়ে নিজেকে করতাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একরকম ধরেই নিয়েছিলাম যে ওটা জ্যামিতিই, তাই মহাকর্ষ বলকে অন্য বলগুলোর সাথে একীভূত করা যাচ্ছে না। কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গ বাস্তবে ডিটেক্ট হওয়ার পর তো অন্য সন্দেহ দানা বাঁধছে! যাহোক, এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা করা যাবে, তবে তার আগে চার্জ ও ‘ভর’ নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করা যাক।

চার্জ ও ভর:
কৌতুক প্রচলিত আছে যে কোন ছাত্রকে অধ্যাপক প্রশ্ন করেছিলেন, “চার্জ কাহাকে বলে?” ছাত্র মাথা চুলকে সংকোচ করে বলেছিলো, “আমি তো স্যার জানতাম। তা এখন ভুলে গিয়েছি।” এবার অধ্যাপক আফসোস করে বললেন, “হায়রে! পৃথিবীতে একমাত্র তুমিই জানতে যে চার্জ কি, আর তুমিই তা ভুলে গেলে!” আসলে চার্জ যে কি তা আমরা কেউই জানি না। শুধু এইটুকুই জানি যে ইলেকট্রন ও প্রোটনের গায়ে কিছু একটা থাকে যা অন্য ইলেকট্রন বা প্রোটনকে প্রভাবিত করতে পারে, ওটাই চার্জ (ইলেকট্রিক চার্জ)। আপাতত এটাকে fundamental property of a matter বলা হচ্ছে। ইন্টারেস্টিং হলো যে একটা প্রোটনের গায়ে যতটুকু চার্জ থাকে, তার চাইতে প্রায় দুই হাজার গুণ ছোট পুঁচকে একটা ইলেকট্রনের ভিতর ততটুকুই চার্জ থাকে! শুধু সাইনটা বিপরীত, একটা প্লাস ও আরেকটা মাইনাস। আরেকটি বিষয় হলো, যে কোন কারণেই হোক, কোন একটি কণিকা-য় চার্জ-এর পরিমান ধ্রুব।

আর ‘ভর’? গ্রীক এ্যাটোমিজমের জনক ডেমোক্রিটাস বলেছিলেন যে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম গঠন একক হলো ‘এ্যাটম’। সেই তিনিই আবার বলেছিলেন, ‘ভর’-এর উপর নির্ভর করে নানান রকমের ‘এ্যাটম’ হয়। কি বোঝা গেল? সেলফ কনট্রাডিকশন! এ্যাটম যদি ক্ষুদ্রতম গঠন একক হয়, তাহলে তার তো আর কারো উপর নির্ভর করার কথা না! আবার ‘ভর’-এর উপরই যদি এ্যাটম নির্ভরশীল হয় তাহলে ঐ ‘ভর’-ই তো ক্ষুদ্রতম গঠন একক। যাহোক, কয়েক বছর আগে ‘হিগস বোজন’ (অপর নাম ‘ইশ্বর কণা’) নিয়ে বেশ হৈ চৈ হয়েছে। সেই কণিকা ডিটেক্টেড-ও হয়েছে এবং ২০১৩ সালে Peter W. Higgs নোবেল পুরষ্কার বিজয়ীও হয়েছেন।

হিগস বোজন সংক্রান্ত আলোচনা জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এই প্রবন্ধে সেই বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। তবে একটা উপমা টেনে সামান্য বোঝানো যাবে। প্রথমত এখানে ‘ভর’-কে ‘হিগস ফিল্ড’ ও গতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। হ্যাঁ ঘুরে ফিরে পদার্থবিজ্ঞানের সব আলোচনায় ঐ গতিই আসছে। গতিই আসলে চরম সত্য! তা ভর-কে ব্যাখ্যা করা হয়, গতির প্রতি রেসিটেন্স দিয়ে। মানে, যে বডি গতিশীল হতে গিয়ে যত বেশী রেজিটেন্স পায়, সেই বডিটি ভরে তত বেশি ভারী! এবার মনে করুন যে, একটি হলঘরে এক ঝাঁক তরুণ রয়েছে। তারা প্রত্যেকে এক একটা ‘হিগস বোজন’ কণা। এবং তাদের উপস্থিতিতে ঘরটি একটি ‘হিগস ফিল্ড’। হঠাৎ সেখানে এক জনপ্রিয় রূপসী তরুণী নায়িকা-র আগমণ হলো (সেও একটি ‘হিগস বোজন’ কণিকা)। নায়িকাটি যখন তরুণদের দিকে এগিয়ে গেলো, সে অদৃশ্যভাবেই তাদেরকে আকর্ষণ করছে। ধীরে ধীরে তার চারদিকে তরুণদের ঘনত্ব বেড়ে গেলো, কেউ আসে অটোগ্রাফ নিতে, কেউ আসে তার সাথে কথা বলে ধন্য হতে! এভাবে তরুণীটির চারদিকে তরুণদের ঘনত্ব বেড়ে গেলে, তরুণীটির চলাচলে সমস্যা হবে, মানে সে চলতে গিয়ে বেশি বাধাপ্রাপ্ত হব. এইভাবে তরুণীটির ভর হবে বেশি। এবার মনে করেন, ঐ একই ঘরে অপর একজন তরুণী নায়িকার আগমণ হলো, যে ততটা রূপসী ও জনপ্রিয় নয়। এবার কি তার চারদিকে অত বেশী তরুণের সমাগম হবে? অবশ্যই নয়। তাহলে দ্বিতীয় তরুণীটির চলাচলে বাধা বেশি হবে না, অতএব ঐ ফিল্ডে তার ‘ভর’ কম।

‘ভর’ বনাম ‘চার্জ’-এ আরেকটি ইন্টারেস্টি বিষয় হলো, ‘ভর’ না থাকলে ‘চার্জ’ থাকতে পারবে না (‘চার্জ’ ভরের উপরে ভর করে!); কিন্তু চার্জ না থাকলেও ‘ভর’ ঠিকই থাকতে পারবে।

এছাড়া চার্জ দুইরকম তাই সেখানে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ দুইটা ঘটনাই আছে। কিন্তু ভর কেবল একরকম, তাই সেখানে কেবল আকর্ষণ বলই আছে। এই আকর্ষণ বল থাকার কারণেই একটি মৃত নক্ষত্র চুপসে যায়; এবং চুপসাতে চুপসাতে কোন কোন নক্ষত্র পরিণত হয় কৃষ্ণবিবরে।

(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১১টা ৪৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.