কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৬

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৬
——————————————————————————- রমিত আজাদ

আমি বা আমরা কেন ফোটন বা আলোর মত প্রবাহিত হই না। আলোক তরঙ্গ বা ফোটন যাই বলি না কেন, তার কোন ‘ভর’ নাই। তাই সে অবিরাম প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের রয়েছে ভর। তাই আমাদের ঐভাবে প্রবাহিত হওয়া সম্ভব না। আমাদের গায়ের মধ্যে রয়েছে অগণিত এ্যাটম, এ্যাটমগুলোর মধ্যে রয়েছে মৌলিক কণিকাত্রয়ী ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। এই সাব-এ্যাটমিক কণিকা-গুলোর ভর-হীন হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু তারা ভরহীন নয়। কেন? এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করার জন্য একটা থিওরী-র দরকার ছিলো। বিজ্ঞানী হিগস সেই থিওরীটিই দিয়েছেন। সব পার্টিকেলের ভর নাই, যাদের ভর নাই, তারা ‘হিগস পার্টিকেল’-এর সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে না; যেমন হয়তো ‘নিউট্রিনো (neutrino)। তবে যাদের ভর আছে যেমন, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন; তারা ‘হিগস পার্টিকেল’-এর সাথে ইন্টারএ্যাকশন থেকেই ভর-টা পায়। এইভাবে বলা যায় যে ‘হিগস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস ফিল্ড’ রয়েছে সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে। তাই ভরসম্পন্ন পার্টিকেলগুলো গতিশীল অবস্থায় ‘হিগস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস ফিল্ড’-এর সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে ‘ভর’ পায়।

গত পর্বে যেমনটা ব্যাখ্যা করেছিলাম যে একটা ভীড়ের মধ্যে দিয়ে চলার সময় আপনি বাধাপ্রাপ্ত হবেন বেশি, আর অল্পকিছু মানুষের মধ্য দিয়ে চলার সময় আপনি বাধা পাবেন কম। এভাবে প্রথম ক্ষেত্রে আপনার ‘ভর’ বেশি, ও দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আপনার ‘ভর’ কম।

পরবর্তি প্রশ্ন, ‘এই ‘হিগস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস ফিল্ড’ এলো কোথা থেকে?’ এর উত্তর এখনো জানা নাই। হয়তো বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ-এর মুহূর্তে এই ফিল্ডটি তৈরী হয়েছে। হতে পারে যে ‘হিগস ফিল্ড’ মহাবিশ্বের ইনফ্লেশন প্রসেস-এর একটা অংশ। হিগস ফিল্ড একটি না একাধিক সেটাও আমরা জানি না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘হিগস বোজন আবিষ্কারের সাথে সাথে কি পার্টিকেল ফিজিক্স কমপ্লিট হয়েছে?’ উত্তর, “না, হয় নি। যেমন একটা বিস্ময় হলো নিউট্রিনো। তাদের ভর আছে, কিন্তু আপাত:দৃষ্টিতে তারা হিগস পার্টিকেল-এর সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে কোন ‘ভর’ পায় না। এই সমস্যাটি এখনও অসমাধিত।”

তৃতীয় প্রশ্ন, ‘হিগস বোজন এত হালকা কেন?’ উত্তর, “হতে পারে যে আরো কয়েক রকমের হিগস পার্টিকেল আছে। আপাতত কেবল এক ধরনের হিগস পার্টিকেল আবিস্কৃত হয়েছে।”

হিগস পার্টিকেল আবিষ্কারের সাথে সাথে ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’-এর জট খুলেছে; কিন্তু ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ আবার ‘কসমিক পাজেল’-এর চূড়ান্ত অধ্যয় নয়। মডেলটি আসলে শুধু দৃশ্যমান matter-কেই বর্ণনা করে। কিন্তু এই বিশাল মহাবিশ্বে দৃশ্যমান matter হলো, মাত্র এক-পঞ্চমাংশ; আর বাকীটা সবই dark matter।

(Immediately following the announcement, Professor Olga Botner, Member of the Nobel Committee for Physics, was interviewed by freelance journalist Joanna Rose regarding the 2013 Nobel Prize in Physics.)

কি বুঝলাম? ক্রাইম-এর উৎস যেমন করাপশন, ভরের উৎস তেমনি ‘হিগস বোজন’।

দার্শনিক ডেমোক্রিটাস তাহলে স্ববিরোধী কথা বলেন নাই। কারণ ‘হিগস ফিল্ড’ কনসেপ্টে ভর ঐ কণিকা-র ভিতরে থাকে না, ভর-এর কারণ কণিকার বাইরে। আবারতো সেই-ই দাঁড়ালো যে, গতিই ভরের মূল কারণ। তবে হ্যাঁ, কোন পার্টিকেলের উপর গতির প্রভাবটা এককভাবে হচ্ছেনা, সেখানে ‘হিগস বোজন’-ও অংশ নিচ্ছে।

‘বোজন (boson) নামক কণিকা টাইপটির সাথে একজন বাঙালী বিজ্ঞানীর নাম জড়িত; তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানিন্তন অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু। কি করে তিনি বোজন কণিকা আবিষ্কার করেছিলেন, কি করে উনার নাম বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাথে জড়িত হয়েছিলো, সেই কথা আরেকদিন বলবো।

মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম ফিজিক্স:

নিউটনীয় পাদার্থবিজ্ঞান বা ক্লাসিকাল পদার্থবিজ্ঞান-এর দুর্বলতা থেকে জন্ম নিয়েছিলো দুইটা নতুন বিজ্ঞান – ১। আপেক্ষিক পদার্থবিজ্ঞান, ২। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান। দুইটার আওতা আবার দুই রকম। আপেক্ষিক পদার্থবিজ্ঞান-এর জনক আলবার্ট আইনস্টাইন কাজ করেছিলেন লার্জ স্কেল নিয়ে। আর কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান যার মূল জনক ম্যাক্স প্লাঙ্ক তিনি কাজ করেছিলেন অতি ক্ষুদ্রের জগত নিয়ে।

লার্জ স্কেল বা অতি বৃহৎ নিয়ে কাজ করতে করতে আইনস্টাইনের গিয়ে ঠেকলেন মহাকর্ষে! মহাকর্ষ ও তার জ্যামিতি এবং অন্যান্য বিষয় বলতে বলতে একসময় তিনি predict করলেন gravitational wave-এর। খুব সম্ভবত তিনি মহাকর্ষের কোয়ান্টাম কারেকশন-এর কথাও বলেছিলেন। এটা ছিলো ১৯১৬ সাল। এবার প্রশ্ন আসে, যেহেতু প্রতিটি মৌলিক বলই কোন না কোন কণিকার আদান-প্রদান, সেই সূত্রে বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ অন্যকথায় ‘বিদ্যুৎ-চুম্বক বল’ যদি হয় ‘ফোটন’ নামক কণিকার এক্সচেঞ্জ; তাহলে ‘মহাকর্ষ তরঙ্গ’ মানে ‘মহাকর্ষ বল’ কোন কণিকার এক্সচেঞ্জ? ১৯২৭ সালে Oskar Klein বলেছিলেন quantum theory of gravity-এর কথা। এরপর ত্রিশের দশকের শুরুর দিকে L´eon Rosenfeld মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর টেকনিকাল গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। আর ‘গ্রাভিটন’ নামক কণিকাটির কথা প্রথম বলেছিলেন সোভিয়েত বিজ্ঞানীদ্বয় Dmitrii Ivanovich Blokhintsev এবং FM Gal’perin। এই গ্রাভিটন (graviton) হলো মহাকর্ষ বলের আদান-প্রদানের কণিকা। কি বুঝলাম? আগের মতই অতি বৃহতের আলোচনা গিয়ে নামলো অতি ক্ষুদ্রের আলোচনায়! তবে কি এই মহাবিশ্বে ক্ষুদ্রকে বুঝলেই বৃহৎ-কে বোঝা যাবে? (আপাতত কোভিড-১৯ নামক এক ক্ষুদ্র তো আমাদের জীবন ঝালাপালা করে দিচ্ছে!) যাহোক আপাতত complete theory of quantum gravity নির্মিত হয় নাই। অথবা যেমন রিলেটিভিস্টিক ফিজিক্স, তেমনি কোয়ান্টাম ফিজিক্স দুইটাই অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে; তাই এদের দুজনার সন্মিলন এখনো সম্ভব হচ্ছে না।

(চলবে)


রচনাতারিখ: ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ০৪ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.