কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৮

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৮
——————————————————- রমিত আজাদ

ঘটনা দিগন্ত (Event Horizon):

ছাদে উঠুন বা পাহাড়ে উঠুন অথবা উঁচু কোন জায়গায় উঠে দাঁড়ান; আপনার চোখের দৃষ্টি প্রসারিত হতে হতে অনেক দূর যাবে, এই যাওয়ার কি কোন শেষ আছে? জ্বী, একটা শেষ আছে। অনেক অনেক দূরে যেখানে মাটি ও আকাশ মিলে একটা রেখা হয়েছে, তার নাম ‘দিগন্ত রেখা’, এর পরে কি আপনি আর কিছু দেখতে পান? না, দেখতে পান না। এর আগে যা যা আছে বা ঘটছে আপনি সবই দেখতে পাবেন, কিন্তু ঐ দিগন্ত রেখার ওপাশে যা আছে বা ঘটছে, তা আর আপনি দেখতে পাবেন না। এই রেখাকে ‘ঘটনা দিগন্ত’-ও বলতে পারি। মানে, এমন এক দিগন্ত আছে, যার এপাশের সব কিছু দেখা সম্ভব, কিন্তু ওপাশের কিছুই দেখা সম্ভব না। এভাবে ফিজিক্সেও Event Horizon আছে, যা ‘স্থান-কাল’-কে দুইটি এলাকায় ভাগ করে; একপাশে সব তথ্যই সর্বদিকে নিরন্তর প্রবাহোত হচ্ছে, আর অপরপাশের কোন তথ্যই বাইরে আসতে পারছে না। মহাবিশ্বের Event Horizon-এর উৎস বা কারণ হলো অতি উচ্চমাত্রার মহাকর্ষ। একটি কৃষ্ণবিবর তার চারপাশে এমন একটি ‘ঘটনা দিগন্ত’ তৈরী করে। যার কারণে কৃষ্ণবিবর-এর আভ্যন্তরিন কোন ঘটনাই আমরা দেখতে পাবো না। ( অনেকটা সমাজতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী বদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর মত, যাদের বাইরে থেকে ভিতরের কিছুই দেখা যায় না!)

‘স্থান-কাল’ সুস্থির, নাকি অস্থির?
আমি আমার জীবনে যখন প্রথমবার জানতে পেরেছিলাম যে ‘স্থান-কাল’ কোন চরম শূণ্যতা নয়, বরং সেও একটা কিছু, তখন ভীষণ অবাক হয়েছিলাম! আবার যখন পড়লাম ও জানলাম যে স্থান-কাল কোন একটা কাপড়, কাগজ বা ধাতুর মত বাঁকাওথয়ে যেতে পারে, তখন বিস্ময়ের আর সীমা ছিলো না! প্রথমটায় ভেবেছিলাম যে এটা হয়তো গণিতের কোন হেয়ালী! তারপর জানলাম আইনস্টাইন প্রথম যখন এই নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন, তখন অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীরাও আমার মতন ভেবেছিলেন। কিন্তু এডিংটন যখন পরীক্ষার দ্বারাই এর প্রমাণ পেলেন, এরপর কি আর কোন কথা থাকে?

এখন আসি আরো বিস্ময়কর কথায়। ছোটবেলায় একবার ঢাকা থেকে নদীপথে পটুয়াখালী গিয়েছিলাম। অমন ভ্রমণ আমি জীবনে বহুবারই করেছি, সেটা কথা নয়; আমার মনে যে নদীভ্রমণ-টা বেশি দাগ কেটেছে আমি সেটার কথা বলছি। ঐ নদীভ্রমণকালে বালক আমি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছিলাম যে, শান্ত পানির বুকের উপর একটা বড় জাহাজ দাঁড়ালে সে পানির ক্ষেত্রটিকে কেমন বাঁকিয়ে ফেলে! তারপর যখন জাহাজটি চলতে শুরু করে তখন সে পুরো পানির ক্ষেত্রটিকে (নদীটিকে) উত্তাল করে ফেলে। সেই উত্তালতার একটি অংশকে আমরা ঢেউ হিসাবে দেখতে পাই। আবার লক্ষ্য করেছিলাম যে, পানির সেই উত্তালতা আবার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বা চলমান ডিঙ্গিনৌকা বা ছোট ছোট নৌযানগুলোকেও দোলাতে বা নাড়াতে থাকে। আমাদের চারপাশের স্থান-কালের দশাও হয় তাই; সূর্য বা আরো বড় কোন বডি তার চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে, স্থান-কালের মধ্য দিয়ে চলমান বডিগুলো তার চারপাশের স্থান-কালকে উত্তাল করে ফেলে ও ঢেউয়ের সৃষ্টি করে (যেই ঢেউ-এর নাম মহাকর্ষ তরঙ্গ), এবং এই উত্তালিত স্থান-কাল আবার তার মধ্যে থাকা অন্যান্য বডিগুলোর অবস্থান ও চলাচলকে প্রভাবিত করে! তার মানে হলো যে, স্থান-কাল সুস্থির নয়, বরং অস্থির!

এবার নিশ্চয়ই বোঝা গেলো যে, স্থান-কাল যেমন ঘটনাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তেমনি ঘটনাগুলোও স্থান-কাল দ্বারা প্রভাবিত হয়। অতএব মহাজাগতিক ঘটনাগুলো বোঝা বা ব্যাখ্যা-বর্ণনা করা সম্ভব নয়, যদি স্থান-কাল সম্পর্কে ধারনা না থাকে।

অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন যে, ‘মহাবিশ্বের বাইরে কি আছে বা কি ঘটছে?’ আপাতত বলবো যে, মহাবিশ্বের বাইরে যেহেতু স্থান-কাল নাই, তাই সেখানে কি আছে বা কি ঘটছে এই বিষয়ে কথা বলাটা একরকম অর্থহীন!

তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে মহাবিশ্ব অনাদি ও অনন্ত নয়, যেমনটি বলেছিলেন দার্শনিক এরিষ্টটল। আপাতত বোঝা যাচ্ছে যে, ইমাম গাজ্জ্বালীই সঠিক বলেছিলেন, উনার রচিত গ্রন্থ ‘তাহাফুত আল ফালাসিফা’-তে যে, মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে, বর্তমানে তা সতত পরিবর্তনশীল, এবং মহাবিশ্বের একটি শেষও আছে।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ০৯ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ৪৫মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:
https://www.bdeasy.com/

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.