কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৯

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৯

——————————————————- রমিত আজাদ

শূণ্যস্থান আদৌ শূণ্য কি?

বাংলা ভাষায় ‘মহাশূণ্য’ শব্দটাই শুনে এসেছি ছোটবেলা থেকেই। ইংরেজীতে তাকে বলে ‘স্পেইস’। তারপর জানলাম রাশিয়ান-রা তাকে বলে ‘কসমস’। অবশ্য ‘কসমস’ শব্দটা অনেক ভাষায়ই প্রচলিত আছে।  ‘মহাশূণ্য’ শব্দটা এক ধরনের ভুল ধারনার সৃষ্টি করে। এটা শুনলে মনে হতে পারে যে মাথার উপরের ঐ জায়গাটিতে বিপুল শূণ্যতা, ওখানে কিছুই নেই। আসলে কিন্তু তা নয়। ওখানে অনেক কিছুই আছে। মাথার উপরে তাকালেই তো কত গ্রহ, নক্ষত্র, উল্কা, ধুমকেতু, ইত্যাদি দেখা যায়। এবার প্রশ্ন হতে পারে যে জ্যোতিষ্কগুলোর মধ্যবর্তি জায়গা কি শূণ্য নয়? উত্তর: না সেখানেও এ্যাবসোলুট শূণ্যতা নেই।

কি আছে তাহলে সেখানে? খেয়াল করুন যে, ঐ কোটি কোটি মাইল দূরের সূর্য থেকে আলো কিন্তু আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। নক্ষত্রগুলো থেকেও তো আলো আসে। তাহলে মধ্যবর্তি জায়গায় এ্যাটলিস্ট আলো আছে, মানে তরঙ্গ আছে, মানে ফোটন আছে, মানে এনার্জী আছে।

তাছাড়াও আছে, গ্যাস, ধুলা, চার্জিত কণিকা প্রবাহ, কসমিক রে, ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন, গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড, নিউট্রিনো। আরো আছে ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জী। তারপর যা নিয়ে আগে আলোচনা করেছি সেই হিগস ফিল্ড।

আরো ইন্টারেস্টিং যা আছে তা হলো, Vacuum energy (also called vacuum fluctuations or zero-point energy)। এটা হলো পার্টিকেল ও এন্টিপার্টিকেল-এর একটা সাগর। এই জোড়ায় জোড়ায় তাদের জন্ম হয়, আবার তারা মিলিয়ে যায়।

আমার সুপারভাইজার ড. পিঝ-কে প্রশ্ন করেছিলাম যে, “স্যার, মহাবিশ্ব আসলো কোথা থেকে?” তিনি উত্তরে বলেছিলেন  বলেছিলেন যে, “Vacuum থেকে”। আমি ভাবলাম যে, Vacuum মানে তো শূণ্যতা, তবে কি শূণ্যতা থেকে আসলো? আবারো বললাম, “শূণ্যতায় তো কিছু নাই। তা ওখানে থেকে আবার আসে কি করে?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “(Vacuum fluctuations থেকে”। আমি হতবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, “মানে কি? শূণ্যতা ফ্লাকচুয়েট করে কিভাবে?” তিনি বলেছিলেন, “যে কোন ভৌত রাশিই ফ্লাকচুয়েট করে।” সত্যি বলতে কি সেইদিন ঐ কথার আমি কিছু বুঝি নাই। যাহোক এখন যেটা বুঝি যে, এই   Vacuum সেই Vacuum না। ভৌত Vacuum-ও কিছু একটা, যা ফ্লাকচুয়েট করে।

 ভ্যাকুয়াম শক্তির খুব বাস্তব প্রভাব রয়েছে কারণ এটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রগুলিকে দুর্বল করে বা স্ক্রীন করে। ভ্যাকুয়াম ওঠানামা (Vacuum fluctuations) কিছু বহিরাগত, অরক্ষিত, তাত্ত্বিক নিদর্শন নয়। বরং ভ্যাকুয়াম ওঠানামা অনেক নিত্যদিনের ঘটনার জন্য মৌলিক। আপনার ডিভিডি মেশিনের মতো লেজারগুলিও ভ্যাকুয়াম ওঠানামার অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে। আপনি যখন কোনও উপাদান সঠিকভাবে সেট আপ করেন তখন একটি লেজার রশ্মি তৈরি করা হয় যাতে আপনি সুসংহত আলো নির্গমনগুলির একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া (chain reaction) পান। এই শৃঙ্খল বিক্রিয়া ভ্যাকুয়াম ওঠানামা দ্বারা শুরু করা হয়। তেমনি, তেজস্ক্রিয় ক্ষয় যেমন কার্বন -১ in-তে অভিজ্ঞ যা প্রত্নতাত্ত্বিকেরা উপকরণগুলির তারিখ নির্ণয় করতে ব্যবহার করেন, ভ্যাকুয়াম ওঠানামার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। ক্যাসিমির প্রভাবের মাধ্যমে ভ্যাকুয়াম শক্তি পরিমাপ করা যেতে পারে: দুটি অব্যাহত ধাতব গোলক একসাথে খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে এবং ভ্যাকুয়াম শক্তি তাদের আকর্ষণ করার কারণ করে। যখন তাদের ব্যবধান যথেষ্ট ছোট হয়, ভ্যাকুয়াম শক্তির কারণে আকর্ষণটি মহাকর্ষীয় এবং তড়িৎ চৌম্বকীয় প্রভাবগুলির উপর প্রাধান্য পায়। ভ্যাকুয়াম শক্তি হাইড্রোজেন শক্তির স্তরে Lamb shift স্থানান্তরকেও তৈরি করে। ভ্যাকুয়াম শক্তি মূলধারার পদার্থবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি।

এর পরে, হিগস ক্ষেত্র-ও সর্বত্র বিদ্যমান এবং এটিই অনেকগুলি কণাকে তাদের ভর দেয়। ভর-শক্তি সংরক্ষণের কারণে, ভর-শক্তি কোনও বন্ধ সিস্টেমে তৈরি বা ধ্বংস করা যায় না। ফলস্বরূপ, যখন হিগস ক্ষেত্র কোনও কণাকে ভর দেয়, সে তখন  vacuum থেকেই শক্তি নিয়ে এটি করে।

কৃষ্ণবিবর:

এবার আসি এবারের নোবেল প্রাইজ টপিকে। আমাদের গ্যালাক্সিটি একটা স্পাইরাল শেইপড গ্যালাক্সি। এটার শেইপ-টা কি কোন আকস্মিকতা? নাকি সঙ্গত কারণেই শেইপটি ওরকম হয়েছে? আমার বন্ধু রায়হান কিবরিয়া একদিন কথায় কথায় বললেন, “গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটা কৃষ্ণবিবর আছে।” আমি প্রশ্ন করলাম, “কি করে বোঝা গেলে?” রায়হান বললো, “তা নইলে শেইপটা স্পাইরাল হত না।” আমার মাথায় হঠাৎ স্ট্রাইক করলো। তাইতো, ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ বলে, যেকোন ম্যাসিভ বডি তার চারপাশের স্থানটাকে বাঁকিয়ে দেয়। তার মানে কোন সোলার সিস্টেম বা কোন গ্যালাক্সির শেইপ কিন্তু এম্নি এম্নিই সৃষ্ট নয়। তার মধ্যকার বডিগুলো-ই তার শেইপটা তৈরী করে। তাহলে এই যে আমাদের গ্যালাক্সির শেইপটা স্পাইরাল, এবং তার আবার একটি কেন্দ্রও রয়েছে, এটাও অব্যাখ্যায়িত বা আকস্মিক নয়। ঐ কেন্দ্রে এমন কিছু আছে, যা তাকে স্পাইরাল বানিয়েছে। এবং তা একটা ম্যাসিভ বডি হওয়ারই কথা। স্টিফেন হকিং তার পপুলার বুক ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’-এ লিখেছেন, “আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অনেক বড় একটা কৃষ্ণবিবরের  অস্তিত্ত্বের কিছু সাক্ষ্য আমাদের রয়েছে। সেই কৃষ্ণবিবরের ভর আমাদের সূর্যের ভরের চাইতে একলক্ষ গুণ বেশি।”  কি সেই সাক্ষ্য? কোন একটা কৃষ্ণবিবরে কোন তারকার পতন হলে, পড়তে পড়তে তারকাটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তখন সেখান থেকে বিকিরণ হয়। হকিং লিখেছেন, “আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অত্যন্ত ঘন সন্নিবিষ্ট বেতার তরঙ্গ ও  অবলোহিত রস্মির উৎসের ব্যাখ্যা এর ভিত্তিতে দেয়া যেতে পারে।”

আইনস্টাইন কি ব্ল্যাক হোল-এর কথা বলেছিলেন?

আলবার্ট আইনস্টাইন-এর সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মধ্যেই আছে কৃষ্ণবিবরের কথা। তবে তিনি নিজেও এটাকে মানতে পারেন নি। এই বিষয়ে বলা হয় যে, The concept that explains black holes was so radical, in fact, that Einstein, himself, had strong misgivings. He concluded in a 1939 paper in the Annals of Mathematics that the idea was “not convincing” and the phenomena did not exist “in the real world.”

বিজ্ঞানে আবিষ্কারগুলোর একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। যখনই বিজ্ঞান কোন জটিল সমস্যার মুখোমুখি হয় অথবা কোন সংকটে পড়ে তখনই দেখা যায় কোন না কোন বিজ্ঞানী আবির্ভূত হয়ে ঐ সমস্যাটার সমাধান করে দেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে একদিকে যেমন পদার্থবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ চলছিলো, অন্যদিকে আবার প্রাসঙ্গিক নিত্য নতুন সমস্যা বা প্রশ্নেরও উদ্ভব হচ্ছিলো। আলবার্ট আইনস্টাইন তত্ত্ব দিলে সেই তত্ত্বের আবার ইমপিরিকাল প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে, যা সম্পাদন করেছিলেন আর্থার এডিংটন। এদিকে অনেক বিজ্ঞানীই আবার এই তত্ত্বের ফার্দার স্টাডি-র দিকে ঝুঁকে পড়েন।

১৯১০ সালে লাহোরে জন্ম হয় এক তামিল শিশুর। পিতামাতা তার নাম রাখলেন সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর।

মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক পড়ার জন্য ভর্তি হন ১৯২৫ সালে। স্নাতক কোর্সের শেষ বছর ১৯২৯ সালে তিনি Arnold Sommerfeld-এর লেকচারে অনুপ্রাণিত হয়ে রচনা করেন জীবনের প্রথম গবেষণাপত্র ‘কম্পটন স্ক্যাটারিং অ্যান্ড নিউ স্ট্যাটিস্টিকস’। চন্দ্রশেখরের গবেষণাপত্রটি তার শিক্ষকদের মুগ্ধ করেছিল। তারপর চন্দ্রশেখর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পান।

ক্যামব্রিজে যাওয়ার পথে ভারত থেকে জাহাজে করে ব্রিটেন পর্যন্ত দীর্ঘ ভ্রমণে তিনি অলস সময় না কাটিয়ে এক বিস্ময়কর কাজ করে ফেলেন। তিনি জানতেন যে, ট্রিনিটি কলেজে তার সুপারভাইজার হবেন পদার্থবিজ্ঞানী রালফ ফাউলার। তাই জাহাজে বসে ফাউলারের বৈজ্ঞানিক কাজগুলো পড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ফাউলার এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের শ্বেত বামন তারকায় ডিজেনারেট ইলেকট্রন গ্যাস নিয়ে লেখাগুলো পড়তে গিয়ে একটি যুগান্তকারী বিষয় অনুধাবন করেন চন্দ্রশেখর। তিনি দেখলেন যে, সবাই এ ব্যাপারটিকে চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন। তিনি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করেন ডিজেনারেট ইলেকট্রন গ্যাস স্টাডি করতে। মাত্র ২০ বছর বয়সেই জাহাজে বসে তিনি জীবনের অন্যতম সেরা কাজটি করে ফেলেন, যার সূত্র ধরেই তিনি পরবর্তিতে নোবেল পুরস্কার  অর্জন করেছিলেন।

কাজটি কি ছিলো?

আগেও কয়েকবার লিখেছি যে, একটি তারকা সব বিক্রিয়া সম্পন্ন করে জ্বালানী শেষ করার পর তার কি হবে? তখন সেখানে থাকবে বিপূল পরিমানে হিলিয়াম এ্যাটম। তারা কি ঐ অবস্থায়ই থেকে যাবে? ঘটনা হলো যে তাদের ভরের বিশালত্ব তাদের মধ্যেই জন্ম দেবে বিপুল পরিমাণে মহাকর্ষ। তখন তারকাটি ক্রমাগত সঙ্কুচিত হতে থাকবে। কতদূর পর্যন্ত? সেটা নির্ভর করবে তারকাটির ভরের উপর। তারকার ভর যত বেশি হবে, কেন্দ্রমুখী মহাকর্ষ বল তত বেশি হবে এবং তারকাটি তত বেশি সঙ্কুচিত হবে।

সঙ্কুচিত হয়ে সে পরিণত হবে ‘শ্বেত বামন’-এ। এখানেই শেষ? এমনটা আগে মনে করা হলেও পরে বোঝা গেল যে, না এখানেই শেষ নয়। প্রচন্ড টানে এ্যাটমগুলোর নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রনগুলো ঢুকে মিশে যাবে প্রোটনের সাথে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের রুশ সহপাঠী মিশা-কে বলেছিলাম যে, ইলেকট্রনের ভর খুব কম, কিন্তু নিউট্রন ও প্রোটনের ভর সমান সমান। তখন সে খুব কনফিডেন্টলি আমাকে বলেছিলো যে, “না, তাদের ভর সমান সমান নয়। একটু পার্থক্য আছে, আর সেই পার্থক্যটা হলো একটা ইলেকট্রনের ভরের।”

আমি: মানে কি?

মিশা: মানে হলো একটা প্রোটনের ভর ও একটা ইলেকট্রনের ভর যোগ করলে, একটা নিউট্রনের ভর হয়।

আমি তড়াক করে উঠেছিলাম। এটা গুরুত্বপূর্ণ ইনফর্মেশন। তবে ওর কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, বই খুলে দেখলাম। দেখলাম, মিশা কথা ঠিকই বলেছে। সেখানে আরো পড়লাম যে, নিউট্রন আসলে ইলেকট্রন মিশ্রিত প্রোটন। এই যুক্তিটা আমার মনে ধরলো। দুইয়ে দুইয়ে চার মিললো। তাইতো, ইলেকট্রন ও প্রোটনের পরস্পর বিপরীত চার্জ আছে। আবার নিউট্রনের কোন চার্জ নাই বা চার্জ নিউট্রাল, কিন্তু যখন জানলাম যে নিউট্রন আসলে ইলেকট্রন মিশ্রিত প্রোটন, তখন বুঝলাম পজেটিভ ও নেগেটিভ মিলে তো নিউট্রাল হবেই।

তাহলে এইভাবে কোন শ্বেত বামন-এর ভর যদি ১.৪ সৌরভরের সমান বা তার চেয়ে কম হয় তাহলে তা শ্বেত বামন-ই রয়ে যাবে। কিন্তু তার বেশি হলে  পরিণতি হবে ভিন্ন। জ্বালানি নিঃশেষ হবার পর কোনো তারকার ভর ‘চন্দ্রশেখর সীমা’-র বেশি হলে এর পরিণতি দু’রকম হতে পারে।

১. তারকাটি একটি নিউট্রন তারকায় পরিণত হতে পারে, যার ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেশি হবে। সাধারণ নিউট্রন তারকার ঘনত্ব প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে ৫০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন হয়।

২. তারকাটি একটি কৃষ্ণবিবরে পরিণত হতে পারে। যার কেন্দ্রে থাকবে মহাকর্ষীয় সিঙ্গুলারিটি, এর ঘনত্ব হবে অসীম বা  অসীমের কাছাকাছি।

সিঙ্গুলারিটি হচ্ছে এমন একটি বিন্দু যার আয়তন শূন্য-এর কাছাকাছি, ভর এবং ঘনত্ব অসীমের কাছাকাছি! এই বিন্দুতে সময় এবং স্থান অসীমভাবে বেঁকে যায় এবং পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো সেখানে অচল। সাধারণত কোনো তারকার সমগ্র ভর প্রবল মহাকর্ষের টানে সঙ্কুচিত হয়ে আয়তন প্রায় শূন্য হয়ে গেলে সিঙ্গুলারিটির সৃষ্টি হয়। চন্দ্রশেখর যদিও তারকার পরিণতি হিসেবে ‘নিউট্রন তারা’ কিংবা কৃষ্ণবিবর, কোনোটির কথাই বলেননি। তথাপি তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, চন্দ্রশেখর সীমার অধিক ভর সম্পন্ন একটি ক্রমাগত ধ্বসে পড়তে থাকা তারকার সিঙ্গুলারিটি সৃষ্টি ঠেকানোর মতো কোনো বল তখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

চন্দ্রশেখরের এই বিস্ময়কর আবিষ্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সেসময়কার প্রতিষ্ঠিত সকল জ্যোতির্বিদ। তখনকার জ্যোতির্বিদদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী স্যার আর্থার এডিংটন তো সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন যে, সিঙ্গুলারিটি তথা অসীম ঘনত্বের কোনো বিন্দুর অস্তিত্ব অসম্ভব। তার বিশ্বাস ছিল, এমন কোনো অনাবিষ্কৃত বল বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে, যা আসলে সিঙ্গুলারিটির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মজার ব্যাপার হলো, চন্দ্রশেখরের গাণিতিক হিসাব নিকাশের সাথে কেউই অমত প্রকাশ করতে পারছিলেন না। কিন্তু শূন্য আয়তনে অসীম ভরের ব্যাপারটাই কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না।

ক্যামব্রিজে একসময় তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিলেন না। কিন্তু চন্দ্রশেখর বিশ্বাস করতেন, তিনি সঠিক। তাই ভগ্নহৃদয়ে ক্যামব্রিজ ছেড়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পরবর্তী জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। চন্দ্রশেখর সীমার পর আর কোনো বড় সাফল্য না পেলেও বামন তারকা বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তিনি প্রকাশ করেছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

ধীরে ধীরে দুয়ে দুয়ে চার মিলতে লাগলো এবং জ্যোতির্বিদরা অনুধাবন করতে লাগলেন যে, এডিংটন ভুল আর চন্দ্রশেখরই সঠিক। তবে প্রক্রিয়াটি এত শ্লথ ছিল যে এমন যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতি পেতে চন্দ্রশেখরকে অপেক্ষা করতে হয় ৩০টি বছর! ১৯৮৩ সালে উইলিয়াম ফাউলারের সাথে চন্দ্রশেখরকেও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

চন্দ্রশেখর সীমা হল স্থিতিশীল শীতল শ্বেত বামন তারকার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ভর। ভর এর চাইতে বেশি হলে তারকাটি চুপসে কৃষ্ণবিবরে পরিণত হবে। সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর দেখান যে, একটি শ্বেত বামন তারকার জন্য ভরের মান ১.৪১ সৌরভর এর সমান। এবং এই পর্যায়ে তারাটি ঘূর্ণায়মান হবে। তাঁর নামানুসারে এই সীমার নামকরণ করা হয়েছে ‘চন্দ্রশেখর সীমা’। তবে দ্রুত এবং বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন ঘূর্ণন হার বিশিষ্ট তারার জন্য ডুরিসেন(১৯৭৫) দেখান যে, এই ভরের মান ৩ সৌরভরের সমান হতে পারে। শ্বেত বামন তারার ভর বেশি হলে মহাকর্ষ একে সংকুচিত করে ফেলতে চায়। ফলে এর অন্তর্গত ইলেকট্রনগুলি উচ্চতর শক্তিদশায় পৌছে এবং এদের গতিবেগ বাড়ার সাথে সাথে চাপও বাড়তে থাকে। পদার্থের এধরনের পরিস্থিতিকে বলে অপজাত অবস্থা (Degenerate Matter)।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করে পারছি না।

চন্দ্রশেখরের এই বিস্ময়কর আবিষ্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সেসময়কার প্রতিষ্ঠিত সকল জ্যোতির্বিদ। তাদের মধ্যে একজন হলেন স্যার আর্থার এডিংটন। কথিত আছে যে, কেউ একজন এডিংটন-কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে আপেক্ষিকতত্ত্ব বোঝেন কেবল তিনজন”, এডিংটন বিস্মিত হয়ে ভাবছিলেন, “হু ইজ দ্যা থার্ড ম্যান?” আইনস্টাইন ও এডিংটন-এর পর চন্দ্রশেখরই ছিলেন সেই তৃতীয় ব্যাক্তি। তখনকার জ্যোতির্বিদদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী স্যার আর্থার এডিংটন তো সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন যে, সিঙ্গুলারিটি তথা অসীম ঘনত্বের কোনো বিন্দুর অস্তিত্ব অসম্ভব। উনার বিশ্বাস ছিল, এমন কোনো অনাবিষ্কৃত বল বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে, যা আসলে সিঙ্গুলারিটির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মজার ব্যাপার হলো, চন্দ্রশেখরের গাণিতিক হিসাব নিকাশের সাথে কেউই অমত প্রকাশ করতে পারছিলেন না। কিন্তু উনার কথাও আবার তারা মানতে পারছিলেন না। অবশ্য আইনস্টাইনের ক্ষেত্রেও কিন্তু সেটাই হয়েছিলো।

ক্যামব্রিজে সেইসময় উনারর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ না থাকলেও, চন্দ্রশেখর কিন্তু বিশ্বাস করতেন, তিনি সঠিক। তাই ভগ্নহৃদয়ে ক্যামব্রিজ ছেড়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পরবর্তী জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। চন্দ্রশেখর সীমার পর আর কোনো বড় সাফল্য না পেলেও বামন তারকা বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তিনি প্রকাশ করেছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে।

ধীরে ধীরে দুয়ে দুয়ে চার মিলতে লাগলো এবং জ্যোতির্বিদরা অনুধাবন করতে লাগলেন যে, এডিংটন ভুল আর চন্দ্রশেখরই সঠিক। তবে প্রক্রিয়াটি এত ধীর গতির ছিল যে এমন যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতি পেতে চন্দ্রশেখরকে অপেক্ষা করতে হয় বহু বছর! ১৯৮৩ সালে উইলিয়াম ফাউলারের সাথে চন্দ্রশেখরকেও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

(চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ১০ই নভেম্বর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ০২টা ৫৯মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:

https://www.bdeasy.com/

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.