কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২
————————————————– রমিত আজাদ

‘কসমস’ শব্দটির অর্থ সুন্দর। সম্ভবত রাতের আকাশের সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে মানুষ তার নাম দিয়েছে ‘কসমস’। শীতের দেশগুলিতে তারকাশোভিত সৌন্দর্য্যমন্ডিত রাতের আকাশ দেখা যায় কম। বছরের সামান্য কয়েকটি মাস তা দৃশ্যমান। বাকি সময় আকাশ থাকে ঘন কালো মেঘে ঢাকা। অপরদিকে আমাদের মত দেশগুলিতে বারোমাসই সেই সৌন্দর্যের ডালি আমরা উপভোগ করতে পারি। তাই হয়তোবা প্রাচ্যে এ্যাস্ট্রোনমি নিয়ে কাজ হয়েছে অনেক বেশী। আর্যভট্ট থেকে শুরু করে ওমার খৈয়াম পর্যন্ত বিজ্ঞানী অথবা দার্শনিকেরা এ্যাস্ট্রোনমি নিয়ে কাজ না করে পারেননি।

দিনের প্রচন্ড আলোতে মহাকাশে নীল রঙ ছাড়া আর তেমন কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু রাতের আকাশে কত কিছুই যে হাতছানি দেয়! কি আছে ঐ মহাকাশে। এই নিয়ে গবেষণা করতে করতে মানবজাতি সন্ধান পেলেন নানা ধরনের অবজেক্টের যাদের নাম উল্কা, ধুমকেতু, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ইত্যাদি। যাদের সাধারণ নাম জ্যোতিষ্ক। জ্যোতিষ্ক মানে যে জ্যোতি দেয় বা আলো দেয়। তাই বলে তাদের সকলেই কি আলো দেয়? ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে বোঝা গেল যে, না, মহাকাশে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী চাঁদের যেমন নিজস্ব কোন আলো নেই (চাঁদের নিজস্ব আলো থাকলে আর অমাবশ্যার রাতে ভুতের ভয় থাকতো না!) তেমনি অনেক অবজেক্টই মহাকাশে রয়েছে যাদের নিজস্ব কোন আলো নেই, তারা অন্যের আলোয় আলোকিত হয়। তার মধ্যে রয়েছে ধুমকেতু, গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহানু, ইত্যাদি। তারপরে স্বভাবতঃই আরো প্রশ্ন জাগে যে এমন কিছু অবজেক্ট কি থাকতে পারে, যারা আলো দেয় না, আবার অন্যের আলোকেও আলোকিত হয় না, যারা রঙে কালো তাই রাতের কালো আকাশে তারা ক্যামোফ্লেজড হয়ে যায় এবং মানবের নয়নে ধরা আর দেয় না?

এবার খেয়াল করুন এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হয়ে আসছে আলো (সেইসাথে আমাদের চোখও অবশ্যই)। কোন উৎস থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়লেই কেবল আমরা তাকে দেখতে পাবো তা নইলে নয়। তা সে জ্বলজ্যান্ত একটা শরীর নিয়ে আমাদের নয়ন সমুখে যতই বিদ্যমান থাকুক না কেন।

আলোচনার এই পর্যায়ে একটু থেমে, গত পর্বের শেষ প্রশ্নটিতে ফিরে যাই। একটি তারকা তাপ বা শক্তি বিকিরণ করে করে হাইড্রোজেন নামক ফুয়েলটি শেষ হওয়ার পর তার অবস্থাটা ঠিক কি হবে? সকল তারকাই কি আমাদের প্রিয় ও অতি আপন তারকা সূর্যটির মত শ্বেত বামনে রুপান্তরিত হবে? হ্যাঁ, এমন প্রশ্নই করেছিলেন বিজ্ঞানী জন মিচেল (John Michell)। তিনি তার লেখা একটি চিঠিতে ১৭৮৩ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির সদস্য এবং বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিসকে (Henry Cavendish) এই জাতীয় কিছু লিখেছিলেন। বিপুল পরিমাণ ভর বিশিষ্ট কোন অবজেক্ট, যার মহাকর্ষ বল এতই প্রবল যে আলোকেও টেনে ধরে রাখে, সেই বিপুল মহাকর্ষের প্রভাবে আলোক তরঙ্গ পর্যন্ত পালাতে পারে না, তাকে তো আর মানব নয়নে দেখা যাবে না! আর ঐ পর্যায়ে একটা অবজেক্ট পরিনত হবে কি করে? ১৭৯৬ সালে ফরাসী গণিতবিদ পিয়েরে সিমন ল্যাপলেস একই মতবাদ প্রদান করেন তার Exposition du système du Monde বইয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে। কিন্তু পরবর্তী সংস্করণগুলোতে এ সম্পর্কিত ধারণা তিনি আর রাখেন নি। কেন রাখেননি সেটা পরে আলোচনা করবো।

মার্কসিজমের অনুসারী হাবিব ভাই-এর হাতে আমার দর্শনের হাতেখড়ি। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। যদিও সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটল সম্পর্কে আমাদেরকে স্কুল জীবনেই জ্ঞান দিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় দেলোয়ার হোসেন স্যার। তবে দর্শন বা ফিলোসফি শব্দটি স্যার আলাদাভাবে উল্লেখ করেননি। তিনি নিজে ছিলেন রাষ্ট্রবিদ্যা-র গ্রাজুয়েট, তাই রাষ্ট্রবিদ্যার পার্ট হিসাবেই তিনি আমাদেরকে সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটল পড়িয়েছিলেন। আর হাবিব ভাই আমাকে ‘ফিলোসফি’ শব্দটি পৃথকভাবে উল্লেখ করে ঐ সাবজেক্ট-এর গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন। উনার সাথে আলোচনার সূত্র ধরেই আমি নিজ উদ্যোগে দর্শন পড়তে শুরু করি। যা পরবর্তি বৎসরেই আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এ্যাকাডেমিকালি কাজে লেগেছিলো (যেহেতু, সেকেন্ড ইয়ারে ফিলোসফি সাবজেক্ট-টি আমাদের বাধ্যতামূলক ছিলো), আর পুরো জীবনেই দর্শন কাজে লাগছে নানা বিষয় উপলদ্ধি করতে। এখন আমি জানি যে, যেকোন বিষয় বোঝা বা পড়া শুরুই করতে হয় ‘দর্শন’ দিয়ে।

‘ডুয়ালিটি ইন ন্যাচার’ সম্পর্কেও হাবিব ভাই-ই আমাকে প্রথম বলেছিলেন। তারপর সেকেন্ড ইয়ারে আলোকের কণা-তরঙ্গ ডুয়ালিটি পড়তে গিয়ে বিষয়টা ভালোই উপলদ্ধি করেছিলাম। হাবিব ভাইকে একদিন আমি কথায় কথায় বলেছিলাম যে, “ভালো যে আমরা সূর্য থেকে অনেক দূরে আছি। সেই কারণে অতি তাপে পুড়ে মরছি না, আবার সূর্যের যে প্রবল আকর্ষণ বল সেটাও আমাদের টেনে তার ভিতরে নিয়ে যেতে পারছে না।” হাবিব ভাই হেসে বলেছিলেন, ” ঐ শক্তিশালী সূর্যেরও লিমিটেশন আছে।” আমি বলেছিলাম, “কি লিমিটেশন আছে? তার মহাকর্ষ বল তো প্রবল।” হাবিব ভাই বলেছিলেন, “ভালো করে খেয়াল করে দেখেন, সূর্য কিন্তু সবকিছুকেই টেনে ধরে রাখতে পারে না।”
আমি: যেমন?
হাবিব ভাই: যেমন আলো। আলোকে সূর্য টেনে ধরে রাখতে তো পারেই না, বরং আলোই নিজগুনে সূর্য থেকে বাইরে বেরিয়ে বহু দূরে চলে আসে।

উনার ঐ অকাট্য যুক্তির সেদিন আর কোন জবাব দিতে পারি নাই। কারণ বিষয়টা আমাকেও ভাবিয়েছিলো। তাই তো, মহাশক্তিমান সূর্যও তাহলে অতটা শক্তিমান নয়? আকর্ষণ-এর পাশাপাশি সেখানে বিকর্ষণও রয়েছে! এরপর মনে আরো প্রশ্ন জেগেছিলো, “আলো আসলে কি?” যদিও স্কুলজীবনে পড়েছিলাম যে, আলো ‘ফোটন’ নামক এক ধরণের কণিকা। আবার অমিতাভ বিশ্বাস স্যার বলেছিলেন যে, আলোক কণিকার কোন ভর নাই। বিষয়টা আমাকে নাড়া দিয়েছিলো, কণিকাই যদি হবে তাহলে ভর থাকবে না কেন? কণিকা বলতে তখন আমি মোটরদানা জাতীয় কিছু বুঝতাম।

আবার একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতেই তো পড়েছিলাম যে আলোর তরঙ্গ ধর্ম রয়েছে। আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরন ইত্যাদি আছে। সেই নিয়ে কত রকম অংকও তো কষলাম! আলো একটি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ সেটাও পড়েছিলাম, অবশ্য ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ যে কি সেটা তখন বুঝিনাই বা জানতে পারিনাই। তবে বাঙালী বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু অদৃশ্য তরঙ্গকে বিনা তারে প্রেরণ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সেটাও পড়েছিলাম, কিন্তু তখনও বুঝি নাই যে ঐ অদৃশ্য তরঙ্গটি আসলে কি ছিলো? কেনই বা সে অদৃশ্য? রেডিও স্টেশন থেকে কি পাঠানো হয়, যা আমাদের ঘরের রেডিওকে বাজায়? টেলিভিশন স্টেশন থেকে কি পাঠানো হয়, যা আমাদের ঘরের টিভি সেটে ছবি তৈরী করে? ঢাকার রামপুরা টেলিভিশন ভবনে গেলে আমার কাছে চটকদার স্টুডিওর চাইতে বেশী আকর্ষণীয় মনে হতো তার সুউচ্চ টাওয়ারটি। ওর নীচে দাঁড়িয়ে আমি বহুবার তার উপরে তাকিয়ে বোঝার বা দেখার চেষ্টা করেছি, ঐ টাওয়ার থেকে কি বের হয়?

হাবিব ভাইয়ের সাথে আলোচনা থেকে বুঝলাম যে মহাকর্ষ বল আলোকে প্রভাবিত করতে পারে না। তা নইলে সূর্যের মত অত ম্যাসিভ একটা বডি আলোকে টেনে রাখতে পারে না কেন? আবার আলো কণিকা না তরঙ্গ, তরঙ্গ না কণিকা এই খটকাও দূর হলো না।

আরেকটি বিষয় আমাকে স্কুল জীবনে বলেছিলেন আমাদের চৌকষ শিক্ষক শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দোজা স্যার (রসায়নের শিক্ষক) – কোন মেটালের উপর আলো পড়লে তাতে ইলেকট্রিসিটি উৎপন্ন হয়। জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ – ‘সোলার ক্যালকুলেটর’। সেই আশির দশকে সোলার এনার্জীর এর চাইতে বেশী কোন ব্যবহার আর ছিলো না। ঐ বিষয়টাও আমাকে ভাবিয়েছিলো, আলো কি করে ইলেকট্রিসিটি হয়ে গেলো? আলো আর বিদ্যুতের মধ্যে তাহলে কি কোন সম্পর্ক রয়েছে? বদরুদ্দোজা স্যারই আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে, ‘ইলেকট্রিসিটি ইজ দা ফ্লো অব ইলেকট্রন’। আরো তালগোল পাকিয়েছিলো আমার মাথায়! ইলেকট্রন এক ধরনের কণিকা, মেটালে আলো পড়লে ইলেকট্রনরা চলতে শুরু করে কেন?

যাদুবিদ্যার প্রতি আমার খুব ঝোঁক ছিলো। আমার চাচাতো ভাই অণুর কল্যানে জুয়েল আইচ বা পিসি সরকারের প্রায় সবগুলি যাদুই শিখে নিয়েছিলাম বারো-তের বছরের মাথায়ই। আর ঐ শিখতে গিয়ে বুঝেছিলাম যে, যাদু আর কিছুই নয়, জাস্ট ইউজ অব সায়েন্স ফর এ্যামিউজমেন্ট। মানে হলো, যারা সায়েন্স বোঝে না, সায়েন্স জানা তুমি তাদেরকে ঐ দিয়ে ধোঁকা দাও। তখন থেকেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করেছিলো যে, ‘জগতে কোন কিছুই অব্যখ্যায়িত নয়।’

উপরের বিষয়গুলো নিয়ে পরে কথা হবে। আপাতত যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাই তা হলো নক্ষত্রের ভাগ্য। ক্রমাগত তাপ বিকিরণ করে নিঃশেষ হওয়া একটা নক্ষত্রের ভাগ্যে শেষমেশ কি লেখা আছে? কিছুক্ষণ আগে চট করে ‘ভর’ কথাটি উল্লেখ করে ফেলেছি। রাইট, নক্ষত্রের ভর এখানে একটা বড় ভূমিকা রাখে। মহাকাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোটি কোটি নক্ষত্র ভর ও আয়তনের দিক থেকে নানান রকম। আমাদের সূর্য একটি মাঝারি সাইজের তারকা। সূর্যের ভরের তারকাগুলো প্রাথমিকভাবে শ্বেত বামনেই পরিণত হবে। সূর্যের চাইতে দেড় দুইগুন বেশী ভরের তারকাগুলো পরিণত হবে ‘নিউট্রন স্টারে। কি এই ‘নিউট্রন তারকা’ তা পরে আলোচনা করবো। আর আরও বেশী ভরের তারকাগুলো পরিণত হয় এক মহাশক্তিশালী মহাকর্ষ বলের আধারে, এখানে মহাকর্ষ বল এতটাই শক্তিশালী যে তা সবকিছুকেই টেনে ধরে, এমনকি আলোকেও। সেখান থেকে কোন আলো বাইরে বেরুতে পারে না, আবার বাইরের কোন উৎস থেকে সেখানে আলো পড়লে সেই আলোও এমনভাবে শোষিত হয় যে, আর তা প্রতিফলিত হয় না। সেই যে রূপকথায় পড়া কোন এক অজানা জগত বা গহ্বরের মত যেখানে একবার গেলে আর কেউ ফিরে আসে না! যে অবজেক্ট থেকে আলো বের হবে না তার রঙ কি দেখবো? তার কোন রঙই দেখা যাবে না। তাই সে কালো। আর সে কারণেই অমন অবজেক্টকে বলা হয় ‘কৃষ্ণবিবর’।

ভর দুপুরে প্রসস্ত জায়গায় দূর থেকে কোন একটা বাড়ীর খোলা জানালার দিকে তাকালে মনে হবে যেন রুমটির ভিতরে ঘোর অন্ধকার। এবার ভাবুন তো রুমটার ভিতরে যিনি আছেন তিনিও কি কামড়ার ভিতরে সব অন্ধকার দেখছেন? মোটেও নয় কিন্তু; বরং উল্টা তিনি কামরার ভিতরটা ভীষণ আলোকজ্জ্বল দেখতে পাচ্ছেন। এবার তো প্রশ্ন জাগবে, তাহলে ‘ব্লাক হোল’-এর ভিতরটা কি আসলেই ব্লাক?

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১৪ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ২৮ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.