কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২০

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২০
——————————————————- রমিত আজাদ

ভ্যাকুয়াম শক্তি:
গত পর্বে ভ্যাকুয়াম শক্তির (vacuum energy) কথা বলেছিলাম। জানি এটা অনেকের কাছেই বোধগম্য নয় বা জটিল। যেমনটি আমার কাছে ছিলো অল্প বয়সে। তবে নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় আমি স্থিতিশক্তি (potential energy) সম্পর্কে জেনেছিলাম। সেই সাথে গতি শক্তি (kinetic energy) সম্পর্কেও জেনেছিলাম, যার ফর্মুলাটা ছিলো K.E. = 1/2 (mv2)। প্রসঙ্গত বলি যে, শক্তির যে সংজ্ঞা আমাকে নবম শ্রেণীতে পড়ানো হয়েছিলো, সেটা আমার পছন্দ হয়নি। ‘কাজ করার সামর্থ্যকে শক্তি বলে’ – কেমন যেন গোঁজামিল মনে হয়েছিলো! আবার স্থিতিশক্তি (potential energy)-কেও এ্যাবস্ট্রাক্ট মনে হয়েছিলো; তবে গতি শক্তি (kinetic energy)-কে রিয়েলিস্টিক মনে হয়েছিলো। তবে আমাদের কলেজের শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল কমান্ডার আবুল হোসেন মিঞা স্যার (ফিজিক্সের শিক্ষক) একবার আমাদের ক্লাস এইটে বলেছিলেন, “মনে রেখো ‘শক্তি’ হলো তা, যা কোন কিছুকে নাড়াতে পারে”। খুব সহজে ও এক কথায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঐ বয়সের উপযোগী করে। পরবর্তিতে শক্তির যে সংজ্ঞাটি আমার পছন্দ হয়েছিলো বা এখনো ভালো লাগে সেটা আমি শিখেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে ‘ফিলোসফি’ ক্লাসে। শক্তি হলো ‘গতির পরিমাপ’ (measurement of motion)। কোন একটা বডি কতটুকু গতিশীল তার পরিমাপ-টাই হলো শক্তি। এবার মনে প্রশ্ন জাগে, চোখের সামনেই তো একটা গতিশিল বডি-কে স্থির হয়ে যেতে দেখি; যেমন কোন কিছুকে হাত থেকে ছেড়ে দিলেই সে নিচে পড়ে গিয়ে স্থির হয়ে যায়। অথবা ফ্লোর থেকে কোন কিছুকে তুলে কোন একটা আলমারির তাকে রাখলে সে তখন স্থির হয়ে যায়। এবার প্রশ্ন জাগতে পারে যে, গতির জন্য বডিটার মধ্যে যে শক্তিটা ছিলো, স্থির হওয়ার পর সেই শক্তিটা গেলো কোথায়? শক্তিটা কি তার মধ্যে জমা হয়ে গেলো? কিন্তু সে তো তখন আর গতিশীল নেই? আবার ফ্লোরের উপরে থাকা বডিটার স্থিতিশক্তি ধরা হয় শূন্য, কিন্তু উচ্চতায় রাখা বডিটার স্থিতিশক্তি অশূন্য ধরা হয় এবং তার গাণিতিক মান নির্নয় করতে উচ্চতাকে ব্যবহার করা হয়; কেন? পরে অবশ্য বুঝেছিলাম যে বিষয়টা আপেক্ষিক, একটা ফিল্ডে কোন একটা বডি ঐ ফিল্ডের প্রভাবে তার অবস্থানের কারণে অন্য কোন একটা বডির সাপেক্ষে যে শক্তি ধারন করে তাকে স্থিতিশক্তি বলে। তবে তা পরিমাপ করার জন্য আসলে দুইটা পয়েন্ট দরকার; কোন একটা ক্ষেত্রে বডিটিকে এক পয়েন্ট থেকে আরেক পয়েন্টে নিতে যে শক্তি খরচ করতে হয় তাই হলো, ঐ দুইটা পয়েন্টের মধ্যে স্থিতিশক্তির পার্থক্য; এটা মোর রিয়েলিস্টিক। পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রে ভূপৃষ্ঠের উপর স্থিতিশক্তি শূন্য ধরা হয়, এবং উচ্চতায় তাকে mgh মানে বল ও উচ্চতার গুনন-এর মোট মান ধরা হয়। যা মূলত: ভূপৃষ্ঠের কোন বিন্দুতে স্থিতিশক্তি ও উচ্চতায় কোন বিন্দুতে স্থিতিশক্তি এই দুইয়ের স্থিতিশক্তি পার্থক্য।

এখান থেকে নিশ্চয়ই বোঝা গেলো যে স্থিতিশক্তি ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশিল ও ক্ষেত্রবিশেষে তার পরিমাপনের সূত্রও ভিন্ন ভিন্ন হবে। যেমন বিদ্যুত ক্ষেত্রে স্থিতিশক্তিকে আবার মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সূত্র দিয়ে পরিমাপন করা যাবে না। সেখানে তাকে ভিন্ন সূত্র দিয়ে পরিমাপন করতে হবে। চুম্বক ক্ষেত্রে আবার আরো ভিন্ন, ইত্যাদি।

এবার আসি ভ্যাকুয়াম শক্তি বিষয়ে। ভ্যাকুয়ামকেও ক্ষেত্র বলা যায়। স্থানের সকল বিন্দুতে সকল সম্ভাব্য স্পন্দক গুলির যোগফল একটি অসীম মানকে নির্দেশ করে। একে দূর করতে বলা যেতে পারে যে শক্তির পার্থক্য‌ই শুধুমাত্র ভৌত ভাবে পরিমাপযোগ্য, কয়েক শতাব্দী ধরে চিরায়ত বলবিদ্যায় স্থিতিশক্তির ধারনা করা হয়েছে। ভ্যাকুয়াম ফিল্ডে দুইটি বিন্দুর শক্তির পার্থক্য নির্নয় করা যাবে। ভ্যাকুয়াম শক্তিকে ভার্চুয়াল কণার সাহায্যেও ব্যাখ্যা করা যায় (ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশন বলা হয়) যেগুলি শূন্যস্থানে অনবরত উৎপন্ন ও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কয়েক শতাব্দী আগে বৌদ্ধ দার্শনিক Dignāga ও Dharmakīrti এই একই কথা বলেছিলেন যে, শূন্যতা থেকে ফট করে অণু তৈরী হয়, আবার তা শূন্যতায় মিলিয়েও যায়। এগুলি সাধারণত কণা-প্রতিকণা জোড়ায় উৎপন্ন হয় ও মুহূর্তের মধ্যেই পুর্নবিলয় ঘটে। তবুও এই কণাগুলি ধ্বংস হবার আগে আন্তঃক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে যা ফেইনম্যান চিত্র দিয়ে দেখানো যায়।

ভ্যাকুয়াম শক্তির বেশ কিছু তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ডাচ্ পদার্থবিদ হেনরিখ ক্যাসিমির ও ডির্ক পোল্ডার, কাছাকাছি থাকা দুটি ধাতব পাতের মধ্যে তাদের মধ্যকার স্থানের ভ্যাকুয়াম শক্তির অনুনাদের কারণে একটি দুর্বল আকর্ষণ বল থাকার কথা ভবিষ্যতবাণী করেন। একে ক্যাসিমির ক্রিয়া বলে ও এটি পরীক্ষামূলক ভাবে প্রমাণিত। একারণে মনে করা হয় যে ইলেকট্রন, চৌম্বক ক্ষেত্র ইত্যাদি পরিচিত ধারণা গুলির মতো ভ্যাকুয়াম শক্তিও বাস্তব।

ভ্যাকুয়াম শক্তিতে এর সাথে অবদান রাখে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসাম্য ভঙ্গন। তবে এই জটিল আলোচনা এই প্রবন্ধে করবো না।

ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশন সর্বদা কনা-প্রতিকনা জোড়ায় উৎপন্ন হয়। স্টিফেন হকিংয়ের মতানুসারে, কৃষ্ণগহ্বর এর ঘটনা দিগন্তের কাছে এই ভার্চুয়াল কনা-প্রতিকনা উৎপাদনের মাধ্যমে হকিং বিকিরণ সম্ভব হতে পারে। এই কণা জোড়ার একটি যদি কৃষ্ণ গহ্বরের ভিতরে আকৃষ্ট হয়, তবে অপরটি একটি ‘বাস্তব’ কণা রূপে তার ভর/শক্তি বাইরের মহাশূন্যে বিকিরিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষয়ের মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বরটির অবলুপ্তি হতে পারে। এই সময়কাল কৃষ্ণগহ্বরটির ভরের সমানুপাতিক তবুও বৃহৎ মাপের কৃষ্ণগহ্বর গুলির ক্ষেত্রে ১০ টু দা পাওয়ার ১০০ বছরের মতো হতে পারে।

যাইহোক, যেসব কণা বা ক্ষেত্র এমন ঘনত্ব যুক্ত ভ্যাকুয়াম শক্তির জন্ম দেয়, যে তা প্রসারমাণ মহাবিশ্বের তত্ত্বে প্রয়োজনীয়, তাদের সঠিক প্রকৃতি এখনও একটি রহস্য।

এডিংটন, আইনস্টাইন, ওপেনহাইমার ও কৃষ্ণবিবর:
চন্দ্রশেখরের গাণিতিক বর্ণনা ও উদ্ভাবনা অনুযায়ী বৃহৎ ভরের একটি তারকা চুপসাতে চুপসাতে প্রায় শূন্য আয়তনে পৌঁছে যাবে, এবং তার ঘনত্ব হবে প্রায় অসীম। এটা পড়ে এডিংটন রীতিমত shocked হন, এবং কিছুতেই তা মেনে নিতে পারছিলেন না। এদিকে আলবার্ট আইনস্টাইন-ও ১৯৩৯ সালে একটি গবেষণাপত্রে দাবী করেছিলেন যে তারকা চুপসে গিয়ে শূন্য আয়তনে পৌঁছাবে না। তিনি এটাকে বাস্তবসম্মত মনে করতে পারেননি।

তাহলে ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ অনুযায়ী চুপসে যেতে থাকা তারকাটির কি হবে? এই প্রশ্নের সমাধান করেছিলেন তরুণ মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার। কিন্তু ঐ গবেষণা বিজ্ঞান মহলে ঝড় তোলার আগেই পৃথিবীতে শুরু হয়ে গেলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝড়। এক জাতির উপর আরেক জাতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লাগলো সমগ্র বিশ্ব। আর এমন ডামাডোলে যা হবার তাই হলো, রাজনীতিবিদরা তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শুরু করলো বৈজ্ঞানিকদের। এমন বৃহৎ যুদ্ধে ব্যাপক বিধ্বংসী মারনাস্ত্র নির্মান করতে উঠে পড়ে লাগলো বিভিন্ন জাতি। জার্মানী, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র কেউই পিছিয়ে থাকলো না; সকলেই সমানতালে ‘ব্যাপক বিধ্বংসী মারনাস্ত্র নির্মান’-এর প্রতিযোগীতায় নেমে পড়লো। বিজ্ঞানী ওপেনহাইমারও জড়িয়ে পড়লেন মার্কিন ‘পরমাণু বোমা প্রকল্প’-এ। বলা হয় যে, প্রকল্পটি প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে আটকে পড়েছিলো একটি সমস্যায় যেটা সমাধান করা যাচ্ছিলো না। তরুণ বিজ্ঞানী ওপেনহাইমার-ই ওটা সমাধান করে প্রকল্পটি কমপ্লিট করেছিলেন।

অবশেষে দুর্ঘটনাটি ঘটলো, সমগ্র বিশ্ববাসী ন্যাক্কারজনকভাবে দেখলো মানব কর্তৃক মানব হত্যার অন্যতম বৃহৎ ঘটনা হিরোশিমা ও নাগাসাকি-তে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ইংরেজ রাজনীতিবিদ উইনস্টন চার্চিল সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে বাংলায় প্রাণ গিয়েছিলো চল্লিশ লক্ষ মানুষের। আর হিরোশিমা-নাগাসাকিতে অল্প সময়েই নিহত হয়েছিলো দুইলক্ষাধিক মানুষ। বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ শক্তি-কে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু হিরোশিমা-নাগাসাকি’র কুখ্যাত হত্যাকান্ড সারা পৃথিবীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ শক্তির বিপুলতাকে।

তাই যুদ্ধের পর বিজ্ঞানীরা ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলেন পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ বিষয়ের গবেষণায়। যেটাকে আমরা স্মল স্কেল রিসার্চ বলি। তাই ‘তারকার চুপসে যাওয়ার’ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা বিজ্ঞানীরা তখন ভুলেই গিয়েছিলেন। তবে ১৯৬০ সালের দিকে লার্জ স্কেল গবেষণা মানে মহাকাশ নিয়ে গবেষণায় উৎসাহ আবার বৃদ্ধি পেল। রবার্ট ওপেনহাইমারের গবেষণা তখন পুনরাবিষ্কৃত হয় ও বিস্তৃতি লাভ করে।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১১ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ২৭মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:
https://www.bdeasy.com/

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.