কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৩

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৩
———————————————— রমিত আজাদ

“The most incomprehensible thing about the universe is that it is comprehensible” – এই বিশ্বজগতের সবচাইতে অব্যাখ্যায়িত বিষয়টি হলো যে, জগতটাকে ব্যাখ্যা করা যায়। ১৯৩৬ সালে বিশ্বখ্যাত ফিজিসিস্ট আলবার্ট আইনস্টাইন এই মহান ও গুরুত্বপূর্ণ বাণীটি বলেছিলেন। এই বাণীটি শোনার পর থেকে সকলেই গভীর ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলো; সত্যিই তো, উল্টাটাও তো হতে পারতো, জগত-সংসারের কোন কিছুই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, সবকিছু হচ্ছে র‍্যান্ডম, আজ এটা হয় তো কাল ওটা, আবার কিছুকাল পরে সব ওলোট-পালোট হয়ে যায়। কিন্তু এমন তো ঘটে না! সূর্য
যথানিয়ম মেনে বরাবর পূবেই ওঠে ও পশ্চিমেই অস্ত যায়। ষোল কলা পূর্ণ করেই শশধর তার পূর্ণিমা ও অমাবশ্যা দেখায়। সাগরের জোয়ার-ভাটায় ব্যাতিক্রম হয়না বিন্দুমাত্রও। বিদ্যুৎ মেনে চলে ওহম’স ল, মহাকর্ষ মেনে চলে নিউটন’স ল। তারা এইসব আইন মেনে চলছে ওহম বা নিউটন কর্তৃক আবিষ্কৃত হওয়ার কোটি কোটি বছর আগে থেকেই। সাহিত্যিক রবি ঠাকুর উনার শেষ বয়সের লেখা ‘শেষের কবিতা’-য় লিখেছিলেন, “দেবতাদের হাতে সময় অসীম; তাই ঠিক সময়টিতে সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়।” বিষয়টা কি তাই? গীত এর মাধ্যমে অঞ্জলী দেয়া ‘গীতাঞ্জলী’ খ্যাত রবি ঠাকুরের বহুদেবদেবী কনসেপ্টে তো উল্টাটাই হওয়ার কথা! প্যাগান মিথোলজিকাল কনসেপ্টে বিশ্বজগতে আইনের কোন বালাই নেই দেবতাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেই সব হয়। তাদের দেবদেবীদের রোষ ও অন্ত:কলহের বলি হয় মানবসন্তানেরা, তাদের র‍্যান্ডম স্বেচ্ছাচারিতায় ওলটপালট হয় বিশ্বজগত! আর ঐসব মিথোলজিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিজ্ঞান চোখে আঙুল দিয়ে দেখালো যে, পুরো মহাবিশ্বই এক ঝাঁক আইনের অধীন। প্রকৃতির আইনগুলো আবার পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত হয়ে এমনই একইসূত্রে গাঁথা যে তারা কেবলই একজনার পরিকল্পনা না হয়ে পারে না!

পাঠকদিগের মধ্যে যারা বিজ্ঞানের ছাত্র নন, তাদের বলবো যে আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে অতিক্ষুদ্র যে এ্যাটম, তার ভিতরকার আইনগুলি যদি অমন না হয়ে অন্যরকম হতো তাহলে এই বিশ্বজগতে কোন প্রাণই থাকতো না, এমনকি বিশ্বজগতটাই টিকে থাকতে পারতো না! কোন এক মহাজ্ঞানীর বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তায় সবকিছু ডিজাইনড! কোন এক নিপূণ শিল্পীর তুলিতে জগতের সব সৌন্দর্য আঁকা!

গত পর্বে বিজ্ঞান বিষয়ক কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলাম; এবং নক্ষত্রের ভবিষ্য নিয়ে কিছু কথা বলেছিলাম। এ পর্বে তা কন্টিনিউ করবো। আপাতত আলোচনা করতে চাই মহাকাশের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক নক্ষত্রগুলোকে নিয়ে। জানিনা, আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করবেন কিনা, কিতাবে পড়ার আগেই আমি রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কালপুরুষ ও ক্যাসিওপিয়াকে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। আরও পর্যবেক্ষণ করেছিলাম দূরবর্তি নক্ষত্রের ঝাঁক, পরে জেনেছি যে ওগুলো ভিন্ন গ্যালাক্সি। আমার ধারণা আমার মতন এমন অনেকেই আছেন। এর মানে আমি এই বলতে চাই যে, নক্ষত্র নিয়ে আগ্রহ নেই এমন মানুষ মেলা ভার। মুরতাবা ভাইয়ের কাছ থেকে যেদিন জেনেছিলাম যে সূর্য মূলতঃ একটা হাইড্রোজেন বোমা, সেদিন বিস্মিত হওয়ার পাশাপাশি ভীত ও রাগান্বিতও হয়েছিলাম। আমেরিকা, রাশিয়া হাইড্রোজেন বোমা বানিয়েছে। তার মানে হলো বিজ্ঞানীদের মেধায় এই পৃথিবীতেই ছোটখাট সূর্য নির্মিত হয়েছে। রাশিয়ান সাখারোভ ও মার্কিন টেলরের মতন বিজ্ঞানীদের মেধার প্রশংসা না করে পারা যায় না। আবার ভয় ও রাগের বিষয় হলো এই যে, বৃহৎ শক্তিগুলো ব্যাপকবিধ্বংসী মারণাস্ত্র নিয়ে যেইভাবে ইতরামি-ফাতরামি করছে, তাতে কোন্‌দিন যে কি অঘটন ঘটে যায়, তার আর কোন অজুহাত থাকবে না। যাহোক, নক্ষত্রের আলোচনায় আসি। রাতের মহাকাশে তাকালে দেখা যায় শুধু কালো আর কালো। তার মাঝে জ্বোনাকী পোকার মত মিটমিট করা কিছু আলোর বিন্দু, ওগুলোর বেশীরভাগই নক্ষত্র। এক একটা নক্ষত্র বিশাল বড় বড়। তাহলে মহাকাশটা কত বড়? তারপরে প্রশ্ন জাগে যে, এত বিশাল ও শূণ্যস্থানে নক্ষত্রগুলোর জন্ম হয় কি করে? শূণ্যতা থেকে কি কিছু আসতে পারে? প্রাচীন গ্রীক দর্শনে বলা হয়েছে, Ex Nihilo Nihil Fit – মানে শূণ্যতা থেকে কোন কিছুই আসতে পারে না। দর্শনটি বাইবেলেও সংক্রমিত হয়েছে। অন্যদিকে ‘পবিত্র কোরআন’-এ লিখিত আছে যে, মহান সৃষ্টিকর্তা শূণ্যতা থেকেই আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু মহাবিশ্বের জন্মের আগের অবস্থা আমাদের জানা নেই। তাই মহাবিশ্বের জন্মের পরের অবস্থাটি নিয়ে কাজ বা স্টাডি করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। অতঃপর মহাবিশ্ব স্টাডি করে আপাতত পাওয়া যায় যে, মহাবিশ্বের ভিতরে বস্তু (পদার্থ, শক্তি, কণিকা, ক্ষেত্র, ইত্যাদি) রয়েছে। আরো রয়েছে গতি। এই বস্তু আর গতির টানাপোড়নেই নানান অবজেক্টের সৃষ্টি। ভরের নিত্যতার যে আইন-টি আধুনিক স্কুল-কলেজগুলোতে পড়ানো হয় তার আদিরূপটির আবিষ্কারক ছিলেন একাদশ শতকের মুসলিম বিজ্ঞানী আল-বিরুণী। বল ও ত্বরণের মধ্যকার সম্পর্কটিও উনারই আবিষ্কার। পাঠকরা বিষয় তিনটি মনে রাখবেন, আমার পরবর্তি আলোচনায় এই তিনটি বিষয়ই আসবে।

শুরু করি মহাকাশের শূণ্যতা নিয়ে। গ্রীক ‘কসমস’-এর বাংলা অনুবাদ একসময় পড়েছিলাম ‘মহাশূণ্য’, আমার মতে অনুবাদটি মিসলিডিং। কারণ মহাকাশ নিরেট শূণ্যতা নয়। সেখানে অনেক কিছুই আছে। তাদের মধ্যে একটি হলো হাইড্রোজেন এ্যাটম। খুবই অল্প ঘনত্বের হাইড্রোজেন এ্যাটম মহাকাশে ঘুরে বা ভেসে বেড়ায়। প্রসঙ্গত বলছি যে, বালক ‘ক’-কে নিয়ে গিয়েছিলাম গ্রামে। গ্রীস্মের দাবদাহে রোদ-তাপ থেকে বাঁচতে একটা বাঁশঝাড়ের ছায়ায় বসলাম। সেখানে একটু পরপর ঝিরঝির বাতাস বইছিলো। বালক ‘ক’ আমাকে প্রশ্ন করে বসলো, “বাতাস আসে কোথা থেকে?” ওর প্রশ্ন শুনে আমার মনে পড়লো বহুকাল আগে এমনই প্রশ্ন আমরা করেছিলাম, আমাদের স্কুল-কলেজের শ্রদ্ধেয় উপাধ্যক্ষ মাসুদ হাসান স্যারকে। ভূগোলের জ্ঞানী শিক্ষক মাসুদ হাসান স্যার পুরো বিষয়টা আমাদেরকে খুব সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছিলেন। সমতা থাকলে কোন প্রবাহ হয় না। প্রবাহের পিছনে আছে অসমতা। মন্ডলে বায়ু তো আছেই, কিন্তু তার ঘনত্ব কোথাও বেশী কোথাও কম। কোন এলাকায় বায়ু উত্তপ্ত হয়ে গেলে, তার ঘনত্ব যায় কমে; তখন বেশী ঘনত্ব এলাকা থেকে বায়ুরা কম ঘনত্ব এলাকার দিকে ধাবিত হয়। সংক্ষেপে বললে এটাই ‘বায়ু প্রবাহ’। এখন আসুন মেঘ সংক্রান্ত আলোচনায়, আকাশের দিকে যদি তাকাই, কত চমৎকার সাদা সাদা মেঘ আকাশে ভেসে বেড়ায়; ওরা উড়তে উড়তে একসময় কালো হয়ে ওঠে; আর তার কিছুক্ষণ পর নামে ঘোর দেয়া। মেঘেরা সাদা, কারণ সেখানে জলীয় বাষ্পের ঘনত্ব কম, আর জমাট বাধতে বাধতে তা একসময় কালো ও ঘন হয়ে ওঠে। নক্ষত্রের জন্ম বিষয়টাও ঐ রকমই। মহাকাশে ভেসে বেড়ানো হাইড্রোজেন এ্যাটমগুলো উড়তে উড়তে একসময় কোন এক জায়গায় মেঘের মতই জমাট বাধতে শুরু করে। একবার কিছু সংখ্যক এ্যাটম জমাট বাধলেই হলো, ওগুলোর টানে আরও হাইড্রোজেন এ্যাটম ঐদিকে ধাবিত হয়। বাড়তে থাকে এ্যাটমের ঝাঁক, সেইসাথে ক্রমাগত বাড়তে থাকে তাদের সমষ্টিগত মহাকর্ষ বল। মহাকর্ষ বল এমনিতে দুর্বল হলেও, সমষ্টিগতভাবে সেটা সবলই হয়ে ওঠে। তাছাড়া মহাকর্ষ বলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার কেবল আকর্ষণ বলই রয়েছে, চুম্বক বা বিদ্যুতের মত তার কোন বিকর্ষণ বল নাই। তাই বিশাল আকৃতিতে পুঞ্জিভূত হাইড্রোজেন এ্যাটমগুলো সমষ্টিগত মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নিজেদের মধ্যেই ছুটোছুটি করতে থাকে। আর এই ছুটাছুটি শুধুই টেনিস বলের কলিশনের মত ধাক্কাধাক্কি পর্যায়ে থাকে না, বরং প্রবল সংঘর্ষে দুই পরমাণু হাইড্রোজেন একীভূত হয়ে একটি হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হয়। যা মূলত: একটি তাপ-উৎপন্নকারী রাসায়নিক বিক্রিয়া। পুঞ্জিভূত হাইড্রোজেন এ্যাটমগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়া করে রুপান্তরিত হচ্ছে হিলিয়ামে, সেখান থেকে উৎসারিত হচ্ছে বিপুল পরিমানে তাপ ও আলো। ব্যাস শুরু হয়ে গেল একটি নক্ষত্রের জীবন। কোটি কোটি অথবা শত শত আলোকবর্ষ দূর থেকে আমরা তা পর্যবেক্ষণ করি, চোখ নামক একজোড়া অদ্ভুত প্রাকৃতিক ক্যামেরা দিয়ে।

এবার পাঠকদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে যে, নক্ষত্র থেকে উৎসারিত তাপ কি? নক্ষত্র থেকে উৎসারিত আলো কি? নক্ষত্র থেকে আর কি কি উৎসারিত হয়? কেন নক্ষত্রের প্রবল মহাকর্ষ ক্ষেত্র ওদের ধরে রাখতে পারে না?

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১৪ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০৮টা ৫০ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.