Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৪

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৪

——————————————– রমিত আজাদ

‘ব্ল্যাক হোল’ সম্পর্কে প্রথম পড়েছিলাম স্কুল জীবনে ‘রহস্য পত্রিকা’-য়। তার কয়েকটি লাইন এখনও মনে আছে – ‘মনে করুন, এমন একটা অবজেক্ট যা প্রচন্ড রাক্ষুসে, চারপাশে যা আছে সব গিলে খাচ্ছে, কোন কিছুই তার পাশে থাকতে পারছে না। কোন কিছু তার কাছাকাছি আসলেই তা ঐ রাক্ষসের পেটে চলে যাচ্ছে। এমন এক ধরনের অবজেক্ট আছে এই মহাবিশ্বে, নাম তার ব্ল্যাক হোল।’ ভীষণ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম ঐ লেখা পড়ে। আবার ভয় ভয় করছিলো, যদি এমন কিছু আমাদের পৃথিবীর কাছে চলে আসে তাহলে তো আমাদেরকে সহ পুরো পৃথিবীটাই সে গিলে খেয়ে ফেলবে! এর কিছুকাল পরে ‘ব্ল্যাক হোল’ সম্পর্কে পড়েছিলাম শক্তিমান লেখক হুমায়ুন আহমেদ-এর লেখা একটা সায়েন্স ফিকশনে – একদল বিজ্ঞানী রকেটে চেপে যাচ্ছেন মহাকাশের কোন এক গন্তব্যে, অজানা সেই পথে হঠাৎ করে তারা পাল্লায় পড়লেন প্রবল মহাকর্ষ শক্তিসম্পন্ন একটি ‘ব্ল্যাক হোল’-এর। রকেটের নিজস্ব গতি হারিয়ে, যতই তারা ঐ ‘ব্ল্যাক হোল’-এর টানে তার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তত বেশি মৃত্যুভয় তাদেরকে ঘিরে ধরছিলো।’

একবাটি তুলা হাতে নিন। তেমন কোন ভর কি অনুভব করবেন? না। এবার এক বাটি পানি নিন, নিঃসন্দেহে ভর হবে আগের চাইতে বেশী। তারপর একবাটি পারদ নিন, হলপ করে বলতে পারি যে, এবার ভর অনুভুত হবে আগের চাইতে অনেক অনেক বেশি। একই আয়তনে ভিন্ন ভিন্ন ভর অনুভুত হওয়ার কারণ কি? কারণটা হলো পদার্থের ঘনত্ব। একইভাবে অল্প আয়তনে সংকুচিত হয়ে জমাট বেধে থাকা একটা ‘ব্ল্যাক হোল’-এর ভর হবে বিপূল!

ভর কি?

ঠিক কিভাবে উত্তরটা দেব জানি না।

ক্লাস সেভেনে পড়েছিলাম যে, যার ভর আছে সে ‘পদার্থ’ (substance)। আবার ক্লাস নাইনে পড়লাম, কোন বডির মধ্যে মোট পদার্থের পরিমান-কে ‘ভর'(mass) বলে। সেইদিনই খটকা লেগেছিলো। ‘ভর’ থাকলে ‘পদার্থ’, আর পদার্থের পরিমানই ‘ভর’। এটা কি ফাইজলামি? নাকি কনফিউশন? নাকি কনট্রাডিকশন? নাকি তারা নিজেরাই জানে না? যাহোক, ক্লাস নাইনেই আরো শিখেছিলাম, ‘বল’ (force) হলো কোন পদার্থের ভর ও ত্বরণের গুণফল। এই তিনটি ভৌত রাশির মধ্যে, ত্বরণটাই কেবল আমার বোধগম্য হলো; কারণ ওটা চোখে দেখা যায় ও মাপা যায়। কিন্তু ভর-এর সংজ্ঞা আমার কাছে ক্লিয়ার ছিলো না, বা কনফিউজিং ছিলো। তাহলে একইভাবে ‘বল’-ও তো কনফিউজিং! বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ‘ভর’-এর নতুন একটা সংজ্ঞা পেলাম – ‘ভর’ হলো ‘জড়তা’-র পরিমাপ। ‘জড়তা’ হলো স্থির বডির স্থির থাকার ও গতিশীল বডি-র গতিশীল থাকার প্রবণতা। স্থির বডি-র স্থির থাকার প্রবণতা তো চারপাশে সারাক্ষণই দেখতে পাচ্ছি। আর গতিশীল বডি-র গতিশীল থাকার প্রবণতা টের পাওয়া যায়, কোন একটি চলন্ত গাড়ীতে হঠাৎ ব্রেক কষলে। ব্রেক কষা হয়ে গেলো, তবে গাড়ী কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে থামছে না! সে আরো কিছুদূর এগিয়ে যাবেই যাবে। ঢাকার বিজ্ঞান যাদুঘরে একবার ডেমোনস্ট্রেটর আমাকে দেখিয়েছিলেন যে, ঐ রাস্তার ফ্রিকশন না থাকলে ঐ গাড়িটি কখনো-ই থামবে না। এভাবে একটি রকেটকে মহাকাশে পাঠিয়ে দিলে সেও আর থামবে না, অনন্ত পথে চলতেই থাকবে (যদিনা কারো দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়)। যাহোক, যা বলছিলাম, ‘ভর’ হলো ‘জড়তা’-র পরিমাপ; মানে কি এই কথার? মানে হলো কোন একটা বডি আমার সামনে রাখলাম তারপর তার উপর ‘ক’ পরিমাণ বল প্রয়োগ করলাম, বডি-টি ত্বরান্বিত হয়ে কিছুদূর গেল। এবার আরেকটি বডি নিলাম, এবং আগের মতই  ‘ক’ পরিমাণ বল প্রয়োগ করলাম; এবার বডিটি ত্বরান্বিত হয়ে  আগের চাইতে কম দূরত্ব  অতিক্রম করলো। তার মানে হলো যে, দ্বিতীয় বডিটির ‘জড়তা’ বেশি। তার মানে দ্বিতীয় বডিটির ‘ভর’ও বেশি। তাহলে এখন দাড়ালো যে, ‘ভর’-কে বল ও ত্বরণ দ্বারা বুঝতে হচ্ছে। সব কেমন তালগোল পাকানো! আরো বুঝলাম যে বডি সাইজে বড় হলেই যে তার ভর বেশি হবে তা নয়। ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে, ঈদের দিনে বন্ধুরা মিলে কোথাও বেড়াতে গিয়েছি। দেখলাম যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন মানুষের ভর মাপছে। কৌতুহল বশতঃ আমরা একে একে দাঁড়ালাম ঐ কাটাওয়ালা ক্ষুদে যন্ত্রের উপর। সবশেষে দাঁড়ালো আমাদের মধ্যে সাইজে যে তুলনামূলক ছোট, কিন্তু ওর ক্ষেত্রেই যন্ত্রের কাটা ঘুরলো সবচাইতে বেশি। মাপওয়ালা অবাক হয়ে বললো, “দেখতে ছোট হলেও ওর ভরই তো সবচাইতে বেশি!” এই পরীক্ষণেরই বা মানে কি?

এইখানে আসে ঘনত্বের বিষয়টি। আয়তন বড় ছোট ব্যাপার না! ভিতরে মাল-মশল্লা কি আছে সেটার উপরেই ভর নির্ভর করে। মাল-মশল্লা বেশী থাকলে ভর বেশি, আর মাল-মশল্লা কম থাকলে ভর কম। এবার প্রশ্ন হলো, কোন একটি পদার্থের (সোনা, রুপা, তামা, কার্বন যাইহোক না কেন) ভিতরের মাল-মশল্লা কি?

হ্যাঁ, এই প্রশ্নের উত্তরই তো খুঁজে ফিরছেন দার্শনিক আর বিজ্ঞানীরা এতকাল যাবৎ। যখন বিজ্ঞান ছিলো না, তখন দর্শন ছিলো। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে বৌদ্ধ দার্শনিক ঋষি ‘কণাদ’ বলেছিলেন যে কোন কিছুকে ভাঙতে ভাঙতে এমন এক অবস্থায় উপনিত হতে হবে যখন তাকে আর ভাঙা যাবে না, আর এটাই হলো এই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম গঠন একক। তিনি তার নাম দিলেন ‘অণু’।  তার দুইশত বছর পরে গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস একই কথার প্রতিধ্বনী করলেন। ডেমোক্রিটাস তার নাম দিলেন ‘এ্যাটম (অতম)’, মানে যাকে আর ভাঙা যায় না।

ক্ষ্যাপা যেভাবে পরশ-পাথর খুঁজে বেড়ায়, ঠিক সেইভাবেই হন্যে হয়ে  ‘অণু’ বা ‘অতম’ খুঁজে বেড়ালো মানবজাতি কয়েক হাজার বছর যাবৎ। অবশেষে জন ডাল্টন ১৮০৩ সালে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আবিষ্কার করলেন সেই এ্যাটম। অবশেষে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন বিজ্ঞানীকূল – মঞ্জিল মিল গায়া। কণাদ ও ডেমোক্রিটাসের প্রিডিকটেড সেই ক্ষুদ্রতম গঠ একক পাওয়া গিয়েছে। এখানে থেমে গেলেই বেশ হতো হয়তো। কিন্তু ঐ যে, ‘মানুষের জানার পরিধি যত বিস্তৃত হয়,  অজানার পরিসীমাও তত প্রসারিত হয়।’ ডাল্টন-এর এ্যাটম পেয়ে মানুষ ভুলেই গিয়েছিলো এরিস্টটলের উল্টা দর্শন-টি – ‘কোন কিছুকে ভাঙতে শুরু করলে, তা কোন ‘অতম’-তে গিয়ে থামবে না। এই ভাঙার কোন শেষ নেই।’ যাহোক, রোখ চেপেছিলো বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডের মাথায়, তিনি একটি পরীক্ষণের মাধ্যেমে টের পেলেন যে, ডাল্টনের এ্যাটম নিরেট বা অবিভাজ্য নয়! বরং তার মধ্যেও কিছু রয়েছে। আর তারা তিন রকমের। এখন অবশ্য আমরা জানি যে ঐ তিনরকমের কিছু হলো তিনটি মৌলিক কণিকা ‘ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন’। তিনটিরই পৃথক পৃথক ভর রয়েছে, তবে কম আর বেশি। এবং সোনা, রুপা, তামা, কার্বন, ইত্যাদি মৌলিক পদার্থের মধ্যে ‘ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন’ সমুহের সংখ্যার তারতম্য রয়েছে। একটা কার্বনের এ্যাটমের চাইতে, একটা সোনার এ্যাটম অনেক বেশি ভারী। কারণ একটা সোনার এ্যাটমে ‘ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন’-এর সংখ্যা কার্বনের এ্যাটমের চাইতে বেশি। তার মানে আপাতত দাঁড়ালো যে, যেই পদার্থের মধ্যে ‘ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন’ সমুহের সংখ্যা বেশি, সেই পদার্থ তত বেশি ভারী।

আরো রয়েছে মহাকর্ষ ভর (gravitational mass)। স্যার আইজাক নিউটনের সেই বিখ্যাত গ্রাভিটিশনাল থিওরী প্রকাশিত হওয়ার পরে জানা গেল মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কথা। তখনই বোঝা গেলো যে কোন বডির মহাকর্ষ ক্ষেত্রের আকর্ষণ ক্ষমতা কম, আবার কোন বডির  মহাকর্ষ ক্ষেত্রের আকর্ষণ ক্ষমতা বেশি। তার মানে কি? তার মানে হলো, যেই বডির আকর্ষণ ক্ষমতা বেশি তার ভর বেশি আর  যেই বডির আকর্ষণ ক্ষমতা কম, তার ভরও কম। গাণিতিকভাবে কেপলার মেথড ব্যবহার করে এই ‘ভর’ নির্ণয় করা যায়।

এছাড়াও রয়েছে ‘আপেক্ষিক ভর. মানে গতির উপর নির্ভর করে কোন বডির ভর কম বা বেশি মনে হতে পারে! তবে এই নিয়ে অন্য কোন লেখায় আলোচনা করা যাবে।

কৃষ্ণবিবর কি গতিশীল না স্থির?

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে বলি গতিশীল যে কোন বডিই কোন না কোন ধরনের তরঙ্গ উৎসার করে। তা সে বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ হোক, বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ হোক। তাহলে গতিশীল একটা কৃষ্ণবিবর তরঙ্গ উৎসার করবেই। তবে সেখান থেকে বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ সম্ভাবনা কম। ঐ যে আগেই বলেছি যে, কৃষ্ণবিবর আলোকে খেয়ে ফেলে। তাহলে অদৃশ্য ঐ কৃষ্ণবিবরের অস্তিত্ব কি কোনভাবেই টের পাবো না? না, তা হবে না। অস্তিত্ব রয়েছে এমন কোন কিছুর অস্তিত্ব টের পাওয়া যাবে না, তা বোধহয় এই জগতে হবার নয়। সব কিছুরই কোন না কোন ইফেক্ট থাকবেই। কৃষ্ণবিবর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ উৎসার করবেই।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ:

এক একটি কৃষ্ণবিবর এতটাই ম্যাসিভ যে তা গতিশীল অবস্থায় ভালো পরিমানেই মহাকর্ষ তরঙ্গ উৎসার করে। কিছুকাল আগে এরকম একজোড়া ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণবিবর থেকে উৎসারিত মহাকর্ষ তরঙ্গ ডিটেক্ট করা সম্ভব হয়েছে। যে বিজ্ঞানীরা তা সনাক্ত করেছিলেন তারা নোবেল পুরষ্কারও পেয়েছিলেন।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং এর প্রকৃতি ও উৎসার সম্পর্কে মোটামুটি বিস্তারিতভাবে আমি লিখেছিলাম ২০১৭ সালে লিখিত একটি প্রবন্ধে, যার নাম ছিলো ‘এবারের নোবেল পুরষ্কার (পদার্থবিজ্ঞান ২০১৭)’।

তরঙ্গ কি?

শান্ত একটা পুকুরে ঢিল ছুঁড়লে পানিতে যে ওঠানামা দেখা যায়, সেটা তরঙ্গ। নদীর পানিতে যে আন্দোলন দেখা যায়, সেটা তরঙ্গ। সমুদ্রের তরঙ্গের কথা আর নাই বা বললাম। অত বড় তরঙ্গ বোধহয় ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন লোকেও দেখবে। আবার দেখা যায় না এমন তরঙ্গও রয়েছে, যেমন বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, মহাকর্ষ তরঙ্গ, ইত্যাদি।

তরঙ্গ আসলে ‘ক্যারিয়ার অব এনার্জি’ তাই কোন উৎস যদি তরঙ্গ উৎপাদন করে বা নিঃসরণ করে তাহলে সেই উৎস কিছু পরিমানে শক্তি হারায়।, তা সেই তরঙ্গ বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ-ই হোক আর মহাকর্ষ তরঙ্গই হোক। যেমন আমাদের পৃথিবী ঘূর্ণনকালে মহাকর্ষ তরঙ্গ উৎসার করে। এইভাবে শক্তি ক্ষয় করতে করতে সে একসময় সূর্যের উপর পতিত হবে। তবে তা হতে বহু  বহুকাল সময় লাগবে। পৃথিবী ঘূর্ণনকালে যে পরিমাণ শক্তি হারায় তা খুবই কম, জাস্ট একটা ইলেকট্রিক হিটার জ্বালাতে যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন।

‘ইন্টারএ্যাকশন’

পদার্থবিজ্ঞানী হিসাবে ‘ইন্টারএ্যাকশন’ টার্মটির সাথে আমার বারবার সাক্ষাৎ হয়। তবে এই ‘ইন্টারএ্যাকশন’ বিষয়টার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিলো খুব ছোটবেলায়। আমাদের এলাকায় কেউ একজন দুটি চুম্বক নিয়ে এসেছিলো খেলার উঠানে। তার হাতে ধরা চুম্বক দুইটির মধ্যে দেখলাম এক আজব খেলা, তারা দূর থেকে কখনো পরস্পরকে ঝপ করে আকর্ষণ করছে, আবার কখনো একে অপরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আবার একটা সুতায় বাধা সুঁই কে চুম্বকের কাছাকাছি ধরলে সে থাকে শূণ্যে ঝুলিয়ে রাখছে। বাংলা চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান অভিনেতা জনাব গোলাম মোস্তফার একমাত্র ছেলে সুমিত মোস্তফার একটা খেলনা সেট ছিলো। সেখানে ছিলো দুইটা পুতুল। একটা ছেলে পুতুল, আরেকটা মেয়ে পুতুল। ছেলে পুতুলটা দাঁড়িয়ে ছিলো একর্ডিয়ান গলায়, আর মেয়ে পুতুলটা দাঁড়িয়ে ছিলো ব্যালে নাচের ভঙ্গিতে। সুমিত আমাকে একদিন দেখালো যে, পুতুল দুটাকে ফ্লোরের উপরে একটু দূরত্বে রেখে ছেলে পুতুলটাকে হাত দিয়ে সামনের দিকে নিলে, মেয়ে পুতুলটা ঘুরে ঘুরে নাচতে থাকে। ঐ খেলা ঐদিন আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছিলো। বুঝেছিলাম যে পুতুল দুইটার ভিতরে চুম্বক রয়েছে, যা দূর থেকেই একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। বুঝলাম এমন কিছু প্রতিভাস আছে যা কোন বডি কন্টাক্ট ছাড়াই দূর থেকে একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। তা সে আকর্ষণই হোক আর বিকর্ষণই হোক।  

ইন্টারেস্টিং হলো, যে ইন্টারএ্যাকশনটি-কে প্রতিদিনই বারংবার দেখছি, মানে পৃথিবীপৃষ্ঠে কোন কিছুকে বারবার টেনে আনা সেই মহাকর্ষ বিষয়ে কখনো-ই কোন বিস্ময়বোধ জাগেনি! ওটাকে ইন্টারএ্যাকশন বলেও মালুম হয় নাই, যতদিন না নবম শ্রেণীর ছাত্র হিসাবে গ্রাভিটেশন চাপ্টারটি পড়া শুরু করলাম। আসলে জন্ম থেকেই আশেপাশে যা দেখে আসছি, তাকে অতি স্বাভাবিক ও মামুলি মনে হয় বলে তার ব্যাপারে কোন বিস্ময় জাগে না। অথচ তার মধ্যেও কত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও বিস্ময় রয়ে গেছে!

কণিকা কি?

গৌতম বুদ্ধ অতি ক্ষুদ্রের হিসাবের গণিত জানতেন। কণিকা সম্পর্কে তিনি কিছু বলেছিলেন কিনা তা আমার জানা নাই। তবে বৌদ্ধ দার্শনিক কণাদ-ই যে প্রথম  ‘অণু’ নামক গঠন কণিকার ধারণা দিয়েছিলেন সেটা সুস্পষ্ট। সেটা ছিলো আজ থেকে ২৬০০ বছর আগের কথা। আরো অনেককাল পরে বৌদ্ধ ঋষি দিগনাগ ও ধর্মকীর্তি কণিকা সম্পর্কে বলেছিলেন। এমনকি এও বলেছিলেন যে শূণ্যস্থানে শূণ্যতা থেকেই সহসা কণিকার জন্ম ও মৃত্যু হতে পারে। (অবশ্য আধুনিক বিজ্ঞানও এখন এই কথাই বলে)। আলো যে এক ধরনের কণিকার স্রোত এই কথা বিজ্ঞানী আল হাইয়াম স্পষ্ট করেই বলেছিলেন। উনার লিখিত কালজয়ী গ্রন্থ ‘কিতাব আল মানাজির’-এ আলো সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা আছে, যা উনাকে আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের জনক হিসাবে পরিচিত করেছে।

তবে এই যুগে বৈজ্ঞানিকভাবে এ্যাটম বা পরমাণু প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন জন ডাল্টন (১৮০৮ সালে)। পরমাণু-কে প্রথমে নিরেট ভাবা হলেও বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, তা নিরেট নয়, বরং ওখানে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বডির অস্তিত্ব রয়েছে (১৯১৩ সালে)। এরপর জানা গিয়েছিলো যে, তার মধ্যে তিনটি মৌলিক কণিকা রয়েছে যাদের নাম, ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। তবে মজার ব্যাপার হলো এই যে, ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হয়েছিলো পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ মৌলিক কণিকা আবিষ্কার হওয়ার আগেই (1897 সালে)।

ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন সকলেরই নিজ নিজ ভর ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ না। পরবর্তিতে আরো জানা গেলো যে নিউট্রন-কে ভাঙলে পাওয়া যায় ইলেকট্রন ও প্রোটন। তার মানে নিউট্রন হলো ইলেকট্রন ও প্রোটন মিশ্রিত এক কণিকা। আবার প্রোটনকে ভাঙতে গিয়ে পাওয়া গেলো আরো বহু রকমের কণিকা। সাক্ষাৎ মিললো বিস্ময়কর এক জগতের সাথে যার নাম ‘কণিকা জগত’।

ব্ল্যাক হোল-এর মধ্যে কি ধরনের পদার্থ রয়েছে?

হু হু, দারুণ প্রশ্ন! একটি তারকার সব হাইড্রোজেন ফুয়েল শেষ হয়ে গিয়ে তা হয়ে যাবে ‘শ্বেত বামন’। তারপর বৈশিস্টের উপর নির্ভর করে, তা পরিনত হতে পারে নিউট্রন স্টারে। কেন? কারণ মহাকর্ষের প্রবল আকর্ষণে হিলিয়ামের ভিতরকার সব ইলেকট্রনগুলো প্রোটনগুলোর মধ্যে ঢুকে পুরো মৃত তারকাটা পরিণত হবে নিউট্রনের খনিতে। তাই তার নাম ‘নিউট্রন স্টার’। এরপর কি? মহাকর্ষ বল যদি আরো প্রবল হয়, তখন তা আরো চুপসে যাবে! চুপসাতে চুপসাতে তা পরিণত হবে কৃষ্ণবিবরে। এবং তার ভর মাত্রাতিরিক্ত! কি আছে ঐ কৃষ্ণবিবরে? তা জানতে হলে সেই পদার্থ বা বস্তু তো দেখতে হবে। কিন্তু প্রকৃতির কি এক খেয়াল! তা যাতে আমরা দেখতে না পারি সেই ব্যবস্থা করা আছে। ওখান থেকে তো আর কোন আলো আমাদের চোখে আসে না! তাই দেখা সম্ভবও না। আবার তা এমন একটা হরাইজোনের ওপাশে আছে যা আপেক্ষিক টাইম কনসেপ্টে দেখাও সম্ভব না!

(চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ২২শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ০৯টা ১০ মিনিট

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.