কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৬

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৫

———————————————– রমিত আজাদ

দ্বৈততার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই মানবজাতি ইনট্রোডিউস করেছিলো ‘সায়েন্স’ বা ‘বিজ্ঞান’ নামক একটি জ্ঞানশাখার। কিন্তু সেই বিজ্ঞানেই যখন দ্বৈততা এসে হাজির হয়, তখন কি করণীয়? হ্যাঁ, আলোর দ্বৈততা দেখে বিজ্ঞানীরা একটা ক্রাইসিসের মধ্যেই পড়েছিলেন। এবং এখান থেকে উত্তরণের একটা পথ খুঁজছিলেন তারা। অবশেষে একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানী সেই উত্তরণ ঘটালেন। উনার নাম লুইস ডে ব্রগলী। তিনি দেখালেন যে ‘কণিকা’-দের তরঙ্গ ধর্ম থাকে। এই পর্যায়ে তিনি ইলেকট্রন নিয়ে ভাবছিলেন। তী ভাবছিলেন যে আলো যদি একইসাথে কণিকা ও তরঙ্গ ধর্ম প্রদর্শন করতে পারে, তাহলে ইলেকট্রন নামক কণিকাটিও কি তরঙ্গধর্মে প্রদর্শন করবে? একটি কণিকাকে ‘ভরবেগ’ দ্বারা ক্যারেকটারাইজ করা যায়, আবার তরঙ্গ-কে ক্যারেকটারাইজ করা হয় ‘ওয়েভলেংথ’ দ্বারা। লুইস ডে ব্রগলী ভাবলেন হয়তো মহাবিশ্বের সবকিছুই একইসাথে কণিকা ও তরঙ্গ ধর্ম প্রদর্শন করে। তিনি পরিশেষে, ‘ভরবেগ’ ও ‘ওয়েভলেংথ’ এর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্যুক্ত সমীকরণও নির্মান করেন। এইভাবে দেখা গেলো যে, ওয়েভ-পার্টিকেল ডুয়ালিটি ন্যাচারাল ও বৈজ্ঞানিকভাবেই ব্যাখ্যাযোগ্য। লুইস ডে ব্রইলী-র গাণিতিক তত্ত্বটি পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি নোবেল পুরষ্কার পান ১৯২৯ সালে। (প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই, বিজ্ঞানের যে কোন তত্ত্ব যতক্ষণ পর্যন্ত না ইমপিরিকালি মানে পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ তত্ত্বকে স্বীকৃতি দেয়া হয় না, এবং ঐ তত্ত্বের জনক-কে নোবেল পুরষ্কার-ও দেয়া হয় না ) তবে এখানে একটা সতর্কতার প্রয়োজন আছে, উনার ব্যাখ্যাটি যেন আবার সরাসরি ‘নিউটনীয় মেকানিক্সে’ এ্যাপ্লাই করে না বসি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটা পর্যায়ে ‘নিউটনীয় মেকানিক্স’-এর ফেইলিওর থেকেই কিন্তু দুটি নতুন মেকানিক্স – ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ ও ‘রিলেটিভিস্টিক মেকানিক্স’-এর জন্ম হয়েছিলো।

তবে ঐ প্রহেলিকাটা রয়েই গেলো; আলো কি কোন একটি দানাদার ‘কণিকা’? তাই যদি হয়, তাহলে ইলেকট্রন বা প্রোটনের মত তার কোন ‘ভর’ নাই কেন? প্রশ্নটির উত্তর আমার কাছে রয়েছে। তবে এই নিয়ে আলোচনা পরে করবো। আপাতত এইটুকু বলছি যে ভরসম্পন্ন ও ভরবিহীন দুই ধরনের কণিকা-ই রয়েছে। একইসাথে রয়েছে চার্জসম্পন্ন ও চার্জবিহীন কণিকা। ভরবিহীন কণিকাদের ন্যাচার কি, এবং কেন তারা ভরবিহীন এই আলোচনা পরে করবো।

রঙ:

খুব ছোটবেলায় আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো টানা কয়েকবছর দুইটি দালান নির্মান দেখার।  অত কাছ থেকে ঐ দালান নির্মান দেখে আমি বেশ কিছু জিনিস ঐ শিশু বয়সেই শিখেছিলাম; যেমন ‘পরিমাপন’। রাজমিস্ত্রী বা কাঠমিস্ত্রী অথবা রডমিস্ত্রীরা যখন মাপজোকের কাজ করতেন আমি কাছে দাঁড়িয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতাম। রডমিস্ত্রীদের দেখতাম খুব মনযোগ দিয়ে মেপে মেপে ছাদে রডবাধাইয়ের কাজটা করতেন। ঐ রডমিস্ত্রীদের আমার কাছে অন্যান্যদের চাইতে কামেল মনে হতো। আবার লক্ষ্য করতাম যে, ছাদ ঢালাইয়ের ঠিক আগে আগে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আসতেন। উনাকে দেখে একেবারে তটস্থ হয়ে যেত রডমিস্ত্রীরা। তিনিও মনযোগ দিয়ে পুরো কাজটা দেখতেন। একটু ভুল পেলেই ভীষণ ধমক দিতেন মিস্ত্রীদের। বুঝতাম, বাঘের উপর দিয়ে টাগও থাকে! ইলেকট্রিকমিস্ত্রীদের কাজও দেখতাম, উনাদের কাজটা অত বুঝতাম না। এখন আমার কাছে ‘কোয়ান্টাম মেকেনিক্স’ যেমন তেমনি তখন ইলেকট্রিকমিস্ত্রীদের কাজটা আমার কাছে মারেফতি টাইপ মনে হতো। কারণ কারেন্ট তো আর দেখা যায় না, উনারা কানেকশন-টানেকশন দেয়ার পর, সুইচ টিপলেই কেবল বাতিটা জ্বলতো, বা ফ্যানটা ঘুরতো; তারের মধ্যে দিয়ে অদৃশ্য ওটা কি যায় তা আমি ভাবতাম। তবে ঐ অদৃশ্য কিছু প্রবাহিত হওয়ার জন্য তার যে দুইটা লাগে এটা বেশ খেয়াল করেছি। মাঝে-সাঝে তিনটা তারের সমাহারও দেখতাম, তৃতীয় তারটির ব্যবহার আমার কাছে বাহুল্য মনে হতো; উনারা ওটাকে আর্থিং বলতেন। বাল্বের উপর বাহারী শেড দেখে বুঝতাম যে, ওটার সাথে কারেন্ট বিজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নাই; ওটা না থাকলেও বাল্ব জ্বলবে। তবে ঐ বাহারী শেড দেয়া হয় নান্দনিকতার জন্য। মানে বিজ্ঞান ও আর্ট পাশাপাশি চলে!

বাড়ী নির্মিত হওয়ার পর ফিনিশিং-এ দেখলাম নানা রকম রঙের ব্যবহার। বাহারী বিভিন্ন রঙে ভরে গিয়েছিলো বাড়ী।  আমি নিজেও রঙ কিনতে দুইএকবার রঙের দোকানে গিয়েছিলাম। সেখানে ফ্লোর থেকে সিলিং পর্যন্ত নানান ধরনের রঙ দেখতাম। দুনিয়াতে যে কত প্রকারের রঙ হয় ও ওদের যে আবার কত বাহারী নাম আছে তাও দেখতাম। এক নীলেরই বোধহয় কয়েক ধরনের রূপভিন্নতা দেখেছিলাম। সেগুলোর আবার পৃথক পৃথক নামও আছে (নেভী ব্লু, প্রুশিয়ান ব্লু, সাফিয়ার ব্লু, মিডনাইট ব্লু, ইত্যাদি)। ওগুলোকে ডিসটেম্পার বলা হতো। রঙ মিস্ত্রীরা ওখান থেকে নিয়ে নিয়ে দেয়ালে রঙ করতেন। সেই থেকে আমার ধারনা হয়েছিলো যে, রঙ হলো নানা প্রকার কেমিকাল। পরবর্তিতে একবার ‘দৈনিক বাংলা’ নামক দৈনিক পত্রিকায় ছোটদের পাতায় একটা সায়েন্স আর্টিকেলে পড়লাম যে, আলো আসলে কি। (তখন দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সায়েন্স আর্টিকেল খুব একটা ছাপা হতো না; আনফরচুনেটলি তখনকার সাংবাদিকতা বিজ্ঞানের চাইতে খেলার খবর ও সিনেমার খবরকে গুরুত্ব দিতো বেশি!) সেই আর্টিকেল পড়ে আমি প্রথমবারের মত জেনেছিলাম যে, রঙের সাথে আলোর একটা সম্পর্কে রয়েছে। সেখানে এমনটি লেখা ছিলো, ‘ আলোর সাতটি রঙ রয়েছে। কোন একটা বস্তুতে আলো পতিত হওয়ার পর, ঐ বস্তুটা আলোর সবগুলো রঙ শোষন করে নেয়, কেবল একটি রঙ ছাড়া; আর ঐ রঙটিই বস্তুটির উপর ফুটে থাকে, এবং বস্তুটির গায়ে আমরা ঐ রঙটিই দেখি। যেমন গাছের পাতা, সূর্যের আলোর সবগুলো রঙই শোষণ করে নেয়, শুধু সবুজ রঙটি ছাড়া। তাই সবুজ রঙটি গাছের পাতার উপর ফুটে থাকে এবং আমরা গাছের পাতার রঙ যথারীতি সবুজ দেখি। এইভাবে কোন বস্তু যদি আলোর কোন রঙই শোষণ না করে তবে সেই বস্তুর রঙ আমরা সাদা দেখি। আলোর সাতটি রঙ মিলালে তা সাদা হয়। আবার এমন বস্তু আছে, যা আলোর সবগুলো রঙই শোষণ করে নেয়; তখন ঐ বস্তুটির রঙ আমরা কালো দেখি। তাই কালো কোন রঙ নয়, বরং রঙের শূণ্যতা।’ এখন আমি জানি যে ঐ আর্টিকেলের কথাগুলো কাটায় কাটায় সঠিক নয়। তবে নয়-দশ বছরের একটা শিশুকে বোঝানোর জন্য, ঐভাবে ছাড়া আর কোন পথও নাই। প্রবন্ধটির লেখকের নাম আমার এখন আর মনে নাই, তবে তিনি শিশুদের উপযোগী একটা লেখাই লিখেছিলেন, ও রঙ ও আলোর সম্পর্ক সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা ঠিকই মাথায় গেঁথে দিতে পেরেছিলেন। লেখক-কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

এবার আমি আলো ও রঙের মধ্যেকার সম্পর্ক সম্বন্ধে আসল কথা বলছি। আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘই হলো রঙ। আবার একই রঙও নানা রকমের হতে পারে কারণ তরঙ্গদৈর্ঘ্য কেবল একটি নয় একটা রেঞ্জের মধ্যে থাকে। আরেকটু খুলে বলি। একটু আগে বুঝিয়েছি যে, আলো একপ্রকারের তরঙ্গ। তরঙ্গ হলে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যও থাকবে। আছেও তাই, তবে আলোর  তরঙ্গদৈর্ঘ্য একটি নয়। নানা রকমের  তরঙ্গদৈর্ঘ্য-এর আলো রয়েছে। কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আছে যা দেখাই যায় না, মানে মানুষের চোখ তাদেরকে দেখতে পায় না। আমাদের জন্য ওরা ইনভিজিবল লাইট। উদাহরণস্বরুপ বলতে পারি যে, মাইক্রোওয়েভ ওভেনে খাবার গরম করে যেই আলো, তা অদৃশ্য; অথবা মোবাইলে টেলিফোনে সিগনাল আদান-প্রদান করা হয় যে আলোর দ্বারা তারাও অদৃশ্য; যে আলো ব্যবহার করে হাসপাতালে এক্স-রে করা হয় তারাও অদৃশ্য। দৃশ্যমান আলোর বর্ণালীটি খুব কম। ঐ যে বৃষ্টি শেষে যে রংধনুটি আকাশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটায়, ঐ সাতটি আলো-ই দৃশ্যমান। তাদের মধ্যে যে আলোটির তরঙ্গদৈর্ঘ্য সব চাইতে কম তা হলো বেগুনী, আর যে আলোটির তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচাইতে বেশি তা হলো লাল। মাঝামাঝিটি সবুজ। তাহলে রঙ কি? ৩৮০ থেকে ৪৩৫ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোটি মানুষের চোখে প্রবেশ করলে মস্তিষ্কে যে অনুভূতির জন্ম হয় তার নাম বেগুণী রঙ। আবার ৬২৫ থেকে ৭৪০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোটি মানুষের চোখে প্রবেশ করলে মস্তিষ্কে যে অনুভূতির জন্ম হয় তার নাম লাল রঙ। মানে কি দাঁড়ালো? তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সৃষ্ট অনুভূতিই রঙ। আমরা বায়ো-রোবট! এবার আরেকটু ইন্টারেস্টিং তথ্য দেই। লালের মধ্যেও প্রকারভেদ রয়েছে। ঐ যে বললাম লাল রঙ কেবল একটি মাত্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য নয়, সেখানে রেঞ্জ রয়েছে – ৬২৫ থেকে ৭৪০ ন্যানোমিটার। অর্থাৎ  ৬২৫ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য চোখে প্রবেশ করলে যে ধরনের লাল দেখা যাবে,  ৭৪০ ন্যানোমিটারের তরঙ্গদৈর্ঘ্য চোখে প্রবেশ করলে ভিন্ন ধরনের লাল দেখা যাবে। কি বুঝলাম?

‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হয়ে উঠলো সবুজ,

চুনী উঠলো রাঙা হয়ে।’

(চলবে)

———————————————

রচনাতারিখ: ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ০৩টা ১৯ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.