Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৭

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৭

———————————————– রমিত আজাদ

গত পর্বে রঙ সম্পর্কে লিখেছিলাম। সেখানে আলোর ভিজিবল স্পেকট্রাম ও ‘বেনীআসহকলা’ বা চেনা রঙ-এর সাথে আলো ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সম্পর্ক বিষয়ে আলোকপাত করেছিলাম। আরো লিখেছিলাম যে, এমন আলোও আছে যা মানব নয়ন দেখতে পায়না।

আমাদের কলেজে আমার ইমিডিয়েট সিনিয়র ব্যাচের জাকির ভাইয়ের মুখ থেকে ‘ইনফ্রারেড’ কথাটা প্রথম শুনেছিলাম। বিকালের আকাশ লাল দেখায় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি ইনফ্রারেড টার্মটি বলেছিলেন। ওটা আমার মনে গেথেছিলো। বুঝতে পেরেছিলাম যে, আকাশের রঙ বদলানোর সাথে আলোকতরঙ্গের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। এরপর জেনেছিলাম যে, রাতের আকাশ কালো রঙের হয় কেন?  যাহোক ইনফ্রারেড মানে ‘অবলোহিত’, মানে লাল-এর চাইতে কম। কি কম? কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি কম, মানে কিছু আলো আছে যাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল রঙের আলোর চাইতে বেশি, তারা হলো অবলোহিত, মাইক্রোওয়েভ, রাডার ও বেতার তরঙ্গ। এদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য রঙিন আলোর চাইতে বেশি হলেও মানব নয়ন তা দেখতে পায়না। অন্যদিকে রয়েছে  অতিবেগুনী রশ্মি (ultraviolet rays) যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য রঙিন আলোর চাইতে ছোট, আরো ছোট তরঙ্গরা হলো এক্স-রে ও গামা রে। এবারেও ঐ একই কথা, মানব নয়ন তাদের দেখতে পায়না।

মানব নয়ন দেখতে পাক বা না পাক, তারা কিন্তু আছে। যদিওবা বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ করার জন্য মানব দেহযন্ত্রে কেবল পাঁচটি চ্যানেল (পঞ্চইন্দ্রিয়) আছে, কিন্তু এর বাইরেও মানুষের রয়েছে অতিব শক্তিশালী একটা  অস্ত্র, তার নাম মানব-মস্তিষ্ক। খুব সম্ভবত মহাবিশ্বে এটাই সবচাইতে জটিল অবজেক্ট! এই  অস্ত্র নানাভাবে ব্যবহার করে মানুষ তার পঞ্চইন্দ্রিয় দেখতে পায়না, এমন সবকিছুর অস্তিত্বও টের পায়। তারকারা যে দৃশ্যমান আলো নির্গত করে তা তো বোধগম্যই। কিন্তু মহাবিশ্বে এমন সব অবজেক্ট আছে যারা অদৃশ্য আলোর উৎসার ঘটায়, আর মানব-মস্তিষ্ক নানা কৌশলে ঐ অদৃশ্য আলোর উপস্থিতি টের পায় ও ঐসব অবজেক্টগুলোর অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারে।

মাইক্রোওয়েভ ওভেনে খাবার গরম হয় কেন? হু হু, সুইচ অন করার পর ওভেনের ভিতরে খাবার বাটি ঘুরতে থাকে, আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা খাবার গরম করে ফেলে! কোথা থেকে এলো এই তাপ? উত্তর দিচ্ছি। তাপ মানে কি? তাপ মানে শক্তি। তাহলে ঐ ওভেনে অদৃশ্য কোন শক্তি তৈরী হচ্ছে, যা খাবারকে গরম করে। আবার নাম তার মাইক্রোওয়েভ, মানে সেই অদৃশ্য আলোক তরঙ্গ। তাহলে কি দাঁড়ালো? আলোক তরঙ্গ এক প্রকার শক্তি? আমি আরেকটু সঠিক করে বলি, আলোক তরঙ্গ (যে কোন তরঙ্গই) শক্তি বহন করে।

এবার আসুন আলোক কণিকা ‘ফোটন’-এর আলোচনায়। ‘ফোটন’ শব্দটি অবশ্য প্রথম শুনেছিলাম বায়োলজি-তে। সেখানে সালোক-সংশ্লেষণ পদ্ধতি আলোচনার সময় লিখেছিলো যে গাছ সূর্যালোক থেকে ‘ফোটন’ নামক কণিকা সংগ্রহ করে। তখন আমার মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিলো, সূর্যালোকের মধ্যে  ‘ফোটন’ নামক কণিকা আছে? যাহোক, কিছুদিনের মধ্যেই জেনেছিলাম যে, আলোক কণিকার নামই ‘ফোটন’। ফোটনের যে কোন ভর নাই, আমাদের সেকথা জোর দিয়ে বলেছিলেন আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের জনপ্রিয় শিক্ষক জনাব সারোয়ার হোসেন স্যার। এবার আমার খটকা, ‘কণিকা’ আছে কিন্তু তার ‘ভর’ নাই মানে কি? কণিকা কি মোটর দানার মত কিছু একটা নয়? উত্তর, না নয়। আলোর কণিকাটি আদৌ মোটর দানার মত কিছু নয়। ওটা একটা প্যাকেট। কিসের প্যাকেট? এনার্জি মানে শক্তির প্যাকেট। প্যাকেট বলেই তাকে কণিকা-বৎ মনে হয়, কিন্তু সে যে শক্তি এটাই সত্য।

সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি:

এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই। সেটা হলো কেন্দ্রীয় প্রবণতা (central tendency)। খুব ছোটবেলায় কোন একটি বইয়ে গ্যালিলিও সম্পর্কে পড়েছিলাম যে, তিনি নাকি বলেছিলেন যে ‘সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে নয়, বরং পৃথিবীই সূর্যের চারিদিকে ঘোরে’। এই কথা বলার পর নাকি খ্রীষ্টান গীর্জার পাদ্রীরা উনাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলো। তবে  গ্যালিলিও ক্ষমা চাইলে উনাকে মাফ করে দেয়া হয়। আমি বড় কাউকে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিলাম যে, গ্যালিলিও যদি টেলিস্কোপ দিয়ে ওটা দেখেই থাকে, তাহলে তো তাই সত্য; তাহলে আবার তিনি মাফ চাইতে গেলেন কেন? সেই বড়ভাই বলেছিলেন, “মাফ চেয়েছিলেন বেঁচে থাকার জন্য, জান বাঁচানো ফরজ।” উনার কথা শুনে একদিকে হাসি পেয়েছিলো, আরেকদিকে, খটকাও লেগেছিলো, গ্যালিলিও কি কাপুরুষ ছিলেন?  (তখন জর্ডানো ব্রুনো সম্পর্কে কিছু জানতাম না)

সপ্তম শ্রেণীতে থাকতে সৌরজগতের মানচিত্র আঁকা শিখতে বাধ্য করেছিলেন পিতৃতুল্য হাসান স্যার। তিনি ভূগোলের শিক্ষক ছিলেন। ঐ ম্যাপ আঁকতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম যে, এত বড় সৌরজগতের কেন্দ্রে রয়েছে বিশালাকার সূর্য, আর তাকে ঘিরে ঘুরছে তার ছেলেপুলে সব গ্রহগুলো। আবার নাতি-নাতনির মত আছে উপগ্রহগুলো। এই উপগ্রহগুলো ঘুরছে তাদের নিজ নিজ গ্রহের চারিদিকে, আর গ্রহগুলো তাদেরকে সাথে নিয়েই সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে। ইন্টারেস্টিং বিষয়টি হলো যে, সবগুলো গ্রহই প্রায় একই সমতলে ঘুরছে, উল্টা দিক থেকে কোন গ্রহের ঘূর্ণন নাই। কেন? তার সম্ভাব্য কারণ আমাদেরকে বুঝিয়েছিলেন ভূগোলের অপর শিক্ষক মাসউদ হাসান স্যার। এই মানচিত্র থেকে একটা জিনিস একেবারেই মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো তা হলো ‘সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি’। কোন একটা কিছুকে কেন্দ্র করে অন্যদের ঘোরা।

এরপর পরমাণু বা এ্যাটমের গঠন স্টাডি করতে গিয়ে জেনেছিলাম যে, ঐ ক্ষুদ্র জগতেও রয়েছে  ‘সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি’। একটি পরমাণুর কেন্দ্রে রয়েছে নিউক্লিয়াস, আর তাকে ঘিরেই ঘুরছে সব ইলেকট্রনগুলো। আরো পড়লাম যে, জীবদেহ কোষেও নিউক্লিয়াস নামক একটা সেন্টার রয়েছে। যেকোন প্রাণীর ডিমই হলো একটি বড় কোষ। ডিমের কুসুমটাই হলো সেই কেন্দ্র। মহাবিশ্বে ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে বৃহৎ পর্যন্ত, নির্জীব থেকে শুরু করে জীবন্ত পর্যন্ত সবকিছুর মধ্যে এত মিল কেন? এই প্রশ্নও ঐ বয়সে আমাকে ভাবিয়েছিলো!

বিমান রায় স্যার আমাদের পরিসংখ্যানের শিক্ষক হয়ে এলেন একাদশ শ্রেণীতে। মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় সমাপ্ত করা সুদর্শন ও বিনয়ী একজন তরুণ শিক্ষক। শুরু থেকেই তিনি ছাত্রদেরকে খুব আপন করে নিয়েছিলেন। স্ট্যাটিসটিকস পড়াতে গিয়ে স্যার আমাদের বললেন এই দুনিয়ায় বহু জায়গাতেই রয়েছে ‘সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি’; তেমনি স্ট্যাটিসটিকস-এর ডাটাগুলোরও  ‘সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি’ রয়েছে। আমি আরো একবার বিস্মিত হয়েছিলাম!

একবার এক  সায়েন্স ফিকশনে পড়েছি, সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি সম্পর্কে। সৌরজগতের সেন্টারে সূর্য। গ্যালাক্সির সেন্টারে কিছু একটা, এভাবে মহাবিশ্বের সেন্টারেও কিছু একটা আছে। তারপর ভাবলাম বইয়ে তো পড়েছি সৌরজগতের যেমন কেন্দ্র আছে যার চারদিকে গ্রহগুলি ঘোরে এ্যাটমেরও তেমনি কেন্দ্র আছে যার চারদিকে ইলেকট্রনগুলো ঘোরে।  অতি বিশালের জগতের সাথে  অতি ক্ষুদ্রের জগতের এই মিলটাকে একদিকে যেমন ভীষণ ছন্দময় মনে হয়েছিলো, আরেকদিকে তেমনি বিপুল রহস্যময় মনে হলো। মিল আছে কেন? আলবার্ট আইনস্টাইনের সেই কালজয়ী বাণিটি মনে পড়লো, “দ্যা মোস্ট ইনকমপ্রেহেনসিভ থিং ইন দিস ওয়ার্লড ইজ ইট ইজ কমপ্রিহেনসিভ।’ হ্যাঁ, তাইতো, সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে কেন? নাও তো করা যেত! মহাবিশ্বের সবকিছুই অতি সুশৃঙ্খল তাই? মহাবিশ্বের সবকিছু কঠিন গণিত মেনে চলে কেন? বাংলার সন্তান জ্ঞানী কপিল তো সংখ্যা বলতে যুক্তিকেই বুঝিয়েছেন। তারপর গ্রীক পিথাগোরাস বলেছিলেন, “ঈশ্বর একজন ভালো গণিতবিদ”।

(চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ০৯টা ০২ মিনিট

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.