Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৮

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৮

———————————————– রমিত আজাদ

আধুনিক বিজ্ঞানের জনক আল হাইয়াম (Al Hazen)। উনার লেখা কালজয়ী গ্রন্থের নাম ‘কিতাব আল মানাজির’ (Kitāb al-Manāẓir; Latin: De Aspectibus or Perspectiva)। যার বাংলা অর্থ হবে ‘আলোকবিজ্ঞান গ্রন্থ’। বেসিকালি তখনই ফিজিক্স বা পদার্থবিজ্ঞানের জন্ম হয়ে গিয়েছিলো। তারপর ইবনে সাহিল, আল বিরুণী, ওমার খৈয়াম, প্রমুখদের নাম তো আসেই। তার কয়েক শতাব্দী পরে অন্ধকার যুগ অতিক্রম করে ইউরোপ যখন রেনেসাঁয় পা রাখলো, তখনকার প্রথম বিজ্ঞানী গ্যালিলিও-কে বলা যেতে পারে, আর ঠিক তার পরপরই এলেন স্যার আইজাক নিউটন। যদিও তিনি তার কালজয়ী বইটির নামে ‘সায়েন্স’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘ফিলোসফি’ শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন। উনার বইয়ের নাম Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica। এই বইটিতে লিপিবদ্ধ বিজ্ঞানটিকে এখন আমরা বলি, ‘নিউটনিয়ান মেকানিক্স’ বা ‘ক্লাসিকাল মেকানিক্স’। কেন? হ্যাঁ, এই বইটি পুরো পৃথিবী জুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছিলো সুদীর্ঘ তিনশত বছর। মানবের অজানা অনেক কিছু, বিশেষত বডিগুলোর গতি সংক্রান্ত সব প্রশ্নেরই নিখুঁত উত্তর দেয়া যাচ্ছিলো, এই বিজ্ঞানের সাহায্য। রেলগাড়ী থেকে বিমান পর্যন্ত, চাঁদ থেকে শুরু করে নক্ষত্র পর্যন্ত সবকিছুর গতিরই সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়া যাচ্ছিলো অকপটে।

হঠাৎ করেই উনবিংশ শতকের শেষদিকে ও বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হলেন বিজ্ঞানীরা। এমন কিছু সমস্যা যার কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হচ্ছিলো না নিউটনের বিজ্ঞান ব্যবহার করে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তাকে সাংঘর্ষিকই মনে হচ্ছিলো!

ম্যাক্স প্লাংক খুব প্রতিভাবান ছাত্র ছিলেন, তাই তার শিক্ষক তাকে ফিজিক্স পড়তে নিষেধ করেছিলেন। কারণ ঐ শিক্ষকের ধারনা ছিলো যে ফিজিক্স নামক বিজ্ঞানটি কমপ্লিট হয়ে গিয়েছে, সেখানে আর নতুন কিছুই দেয়ার বা আবিষ্কার করার নাই। আসলে কিন্তু তা ছিলো না; ঠিক ঐ সময়ে দুইটি বড় সমস্যা বিজ্ঞানীদের বিশাল মাথাব্যাথা ছিলো – একটি হলো ‘কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ’-এর কোন সঠিক ব্যাখ্যা দিতে না পারা, আর দ্বিতীয়টি হলো ‘আলোকের গতিবেগ আপেক্ষিক গতিতে বেগের যোজন-বিয়োজন সূত্র মেনে চলে না।

ইথার সমস্যা:

একসময় আমাদের চেনা তরঙ্গগুলো ছিলো শব্দতরঙ্গ, পানিতরঙ্গ ইত্যাদি। তাদের সঞ্চালনের জন্য যে গ্যাসীয়, তরল বা কঠিন মাধ্যমের প্রয়োজন হয় তা আমরা স্বচক্ষেই দেখেছিলাম। সেখান থেকেই এই ধারণা জন্মেছিলো যে আলো নামক নব্য আবিষ্কৃত বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ-ও নিশ্চয়ই কোন না কোন মাধ্যমের মধ্য দিয়ে সঞ্চালিত হয়। হাইপোথিটিকালী তার নাম দেয়া হয়েছিলো ‘ইথার’। তবে ঐ যে বিজ্ঞানে সবকিছুই পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে। তাই মাইকেলসন ও মোরলে নামক দুইজন বিজ্ঞানী নেমে গেলেন তা প্রমাণ করতে। কিন্তু ফল হলো উল্টা। নানাভাবে পরীক্ষা করে যে ফল পাওয়া গেল তা রীতিমত বিস্ময়কর! মহাবিশ্বে ‘ইথার’-এর কোনো অস্তিত্ব নাই! তার মানে কি? তার মানে হলো আলোক নামক বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ সঞ্চালিত হওয়ার জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না। মানে, ঐ যে দূরের সূর্যটা ওখান থেকে যে আলো আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌছায় তা আদৌ কোন মাধ্যমের মধ্য দিয়েই সঞ্চালিত হয় না। দূরের লক্ষ লক্ষ তারকাদের শরীর থেকে যে আলো আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌছায়, তারাও কোন মাধ্যম ছাড়াই এতদূর পথ অতিক্রম করে। ঠিক এখান থেকেই আরো একটা সিদ্ধান্তে আসা হলো তা হলো আলোকের গতিবেগ উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর মোটেও নির্ভরশীল নয়। এই বিষয়ে এই আর্টিকেলের প্রথম পর্বেই বলেছিলাম।

কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ সমস্যা:

কৃষ্ণবস্তু বা কালো বডি নিয়ে ইতিপূর্বে দুইএকবার বলেছি। এও বলেছি যে কালো মানেই হলো রঙের শূণ্যতা। মানে যে বডির রঙ কালো, বুঝতে হবে যে ঐ বডির উপর কোন আলো পড়লে সে নিজগুণে সব আলো শোষণ করে নেয়, কোন প্রকার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রঙিন আলোই সে বিকিরণ করে না। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে কৃষ্ণবস্তু আদর্শ তাপ বিকিরণকারী বস্তুতে পরিণত হয়। অর্থাৎ রঙিন আলো বিকিরণ না করলেও অদৃশ্য আলো সে বিকিরণ করবে। অর্থাৎ তারা যে বিদ্যুৎচুম্বক বিকিরণ নিঃসরণ করে তার বর্ণালি সরাসরি তাদের তাপমাত্রার সাথে সম্পর্কিত। ৭০০ কেলভিন (৪৩০° সেলসিয়াস) বা আরও কম তাপমাত্রার কৃষ্ণবস্তুগুলো রঙিন দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে খুবই  অল্প পরিমাণে বিকিরণ করে। সেই কারণেই এদেরকে কালো দেখায়। অবশ্য এই তাপমাত্রার উপরে কৃষ্ণবস্তু থেকে দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিকিরণ হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই বিকিরণ লাল রং থেকে শুরু হয়ে কমলা, হলুদ এবং সাদা রংয়ের তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ঘটে এবং শেষ হয় গিয়ে নীল রংয়ে। এর নাম আলট্রাভায়োলেট ক্যাটাসট্রোফ। এটাই গবেষণাগারে প্রাপ্ত পরীক্ষণের ফলাফল। এবার ঝামেলা যা তা হলো, নিউটনীয় মেকানিক্স-এর থিওরী অনুযায়ী এমনটা হওয়ার নয়। পরীক্ষার ফলাফল থিওরীকে সরাসরি বিরোধিতা করে! কেন?

কি বলবো? আমাদের চোখের সামনে যা দেখছি তা ভুল? নাকি নিউটন-এর ব্যাখ্যা ভুল। Stoic দর্শনে আট-টি মূল নীতি রয়েছে; তাদের মধ্যে দুইটি হলো ১। প্রকৃতি জগতে যা কিছু ঘটে সবই র‍্যাশনাল মানে যৌক্তিক, ২। পুরো মহাবিশ্বই নিয়ন্ত্রিত হয় Law of reason দ্বারা। তাহলে অর্থ কি দাঁড়ালো? না চারপাশে আমরা যা দেখছি বা অনুভব করছি, তা ভুল দেখছি না বা অনুভব করছি না। এবার তবে বলতে হবে, স্যার আইজাক নিউটনের বিজ্ঞান তা ব্যাখ্যা করতে ব্যার্থ হচ্ছে।

এই ব্যর্থতার কি ব্যাখ্যা হতে পারে? আর আমাদেরই বা করণীয় কি থাকতে পারে? এই পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা গভীর ভাবনায় পড়ে গেলেন!

চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ১১টা ৩৬ মিনিট

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.