কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৯

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৯

———————————————————– রমিত আজাদ

বিজ্ঞান আসলে পূর্ণাঙ্গ কিছু না। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিজ্ঞান নির্মিত হয় মানবজাতির অভিজ্ঞতার আলোকে। তাই অভিজ্ঞতার কমতি থাকলে বিজ্ঞানেও অপূর্ণতা থাকাটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞান চলমান। বিজ্ঞানের অন্যতম উদ্দেশ্যে, মানুষের অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা।

গত পর্বে ‘নিউটনীয় মেকানিক্স’ ও তার অনুসারী সনাতন তাপ গতিবিদ্যা-এর দুইটি ব্যার্থতার কথা আমি উল্লেখ করেছি। (আরো রয়েছে অবশ্য) ঐ দুইটি ব্যার্থতা থেকেই জন্ম নিয়েছিলো দুইটি নতুন বিজ্ঞানের – ১। আপেক্ষিক বলবিজ্ঞান (Relativistic Mechanics) ও ২। কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান (Quantum Mechanics)।

এটা বোঝাই গিয়েছিলো যে চিরায়ত বলবিজ্ঞান (Classical Mechanics) যেহেতু ঐসব প্রতিভাস ব্যাখ্যা করতে ব্যার্থই হচ্ছে, অতএব নতুন বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

আমার এই লেখায় আমি কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে আলোচনা খুব একটা করবো না। যেহেতু আমাদের আলোচনার মূল বিষয় ‘কৃষ্ণবিবর’ ও এবারের নোবেল পুরষ্কার; এর সাথে রিলেটিভিস্টিক মেকানিক্সের সম্পর্কই বেশী।

‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব (Special Theory of Relativity):

মাইকেলসন ও মোরলের পরীক্ষায় এটাই প্রমাণিত হলো যে আলোকের গতিবেগ, আলোর উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর মোটেও নির্ভরশীল নয়। মানে, গ্যালিলিও-নিউটনের আপেক্ষিক বেগের সংযোজন-বিয়োজন সূত্র আলো মেনে চলে না। বিজ্ঞানের কথা সুস্পষ্ট যে, পরীক্ষার দ্বারা যা প্রমাণিত হলো তাই মেনে নিতে হবে, ওটাই সত্য (যদি পরীক্ষায় ভুল না থাকে)। এর থেকে কি বোঝা গেলো? এর থেকে এই বোঝা গেলো যে, শূণ্য মাধ্যমে আলোকের বেগ ধ্রুব, আর যেহেতু উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর নির্ভর করে সে বৃদ্ধি পায় না, তাহলে ঐ বেগই সর্বচ্চো।

তবে এতকাল নিউটনীয় বলবিদ্যা যে সকল গতিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন সেগুলি কি? সেগুলি হলো স্বল্প গতি। সেই নিউটনের সময়ে পৃথিবীর দ্রুততম গতি সম্ভবত ছিলো চিতা (cheetah)-র গতি (১০৯ কিলোমিটার/ঘন্টা)। তখন তো ট্রেন বা বিমান কোনটাই ছিলো না। ঐ মাপের গতির ব্যাখ্যায় নিউটনীয় বলবিদ্যা সফল ছিলো, কিন্তু আলোকের গতিবেগ, যা ঐ তুলনায় বহু বহু গুণ বেশি তার ব্যাখ্যা নিয়ে নিউটন ভাবেননি। গ্যালিলিও অবশ্য একবার আলোকের গতিবেগ মাপতে গিয়ে ব্যার্থ হয়ে, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে আলোকের গতিবেগ অসীম। মোদ্দা কথা হলো যে স্বল্প গতির ব্যাখ্যায় নিউটনীয় মেকনিক্স সফল, অতিদ্রুত গতির ব্যাখ্যায় নিউটনীয় মেকনিক্স অকার্যকর।

কিন্তু আলোকের গতি মানে অতিদ্রুত গতি নিয়ে কাজ যেহেতু বিজ্ঞানীরা শুরুই করে দিয়েছেন তাহলে ঐ দায়িত্ব কোন বিজ্ঞান নেবে? অতঃপর প্রয়োজন দেখা দিলো নতুন বিজ্ঞান সৃষ্টির। এবং দায়িত্বটি নিলেন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। এই নতুন বিজ্ঞানের নাম তিনি দিলেন ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ (Special Theory of Relativity – সংক্ষেপে STR)। ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ টার্মটির আগে ‘বিশেষ’ কথাটা কেন জুড়ে দেয়া হলো? কারণ, কিছুকাল পরে তিনি আরো একটি  ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ ইনট্রোডিউস করেছিলেন যার নাম ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ (General Theory of Relativity), এই নিয়ে পরে আলোচনা করা হবে। আপাতত:  ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ বিশেষত্বটি কোথায় সেটা বলছি; এই তত্ত্ব কেবল এমন গতি নিয়ে আলোচনা করে যেখানে কোন বডির গতি সমবেগ (uniform); মানে বডিটির বেগ বাড়েও না, কমেও না, মানে কোন ত্বরণ নাই।

এই বিজ্ঞান অতীতের অনেক ধারনাই পাল্টে দিলো এবং বিশ্বজগৎ সম্পর্কে আমাদেরকে সম্পুর্ণ নতুন ধারনা দিলো। আমার এই আর্টিকেলের ক্ষুদ্র পরিসরে অত কথা বলা সম্ভব নয়, আপাতত STR-এর  সামান্য কয়েকটি অবদান উল্লেখ করছি। যেমন STR আমাদেরকে দিয়েছে সর্বকালের সেরা সমীকরণগুলোর অন্যতম E=mc^2। STR পাল্টে দিয়েছে স্থান ও কাল সম্পর্কিত সনাতনী চিন্তাভাবনা। বুঝিয়েছে যে স্থান ও কাল নিজে থেকে কিছু নয়, বরং বস্তু বা ম্যাটারেরই বৈশিস্ট্য। এমনকি স্থান ও কাল-কে সংযুক্ত করে দিয়েছে নতুন ধারনা – ‘স্থান-কাল’। আবার তারা উভয়েই যে গতির উপর নির্ভরশীল সেটাও আমাদেরকে গাণিতিকভাবে বুঝিয়েছে। এবং গতির উপর নির্ভর করে হতে পারে স্থানের ‘দৈর্ঘ্যের সংকোচন’ (length contraction), হতে পারে ‘সময়ের প্রসারণ (time dilation), কারো কাছে সময় খুব দীর্ঘ, কারো কাছে সময় খুব ছোট; কারো জীবনে পার হয়েছে দীর্ঘ দশ বছর, এদিকে গতির কারণে কারো জীবনে ঐ একই ইন্টারভালে পার হয়েছে মাত্র এক বৎসর! । শুধু তাই নয়, পদার্থের যেই ভর নিয়ে আমি প্রবন্ধের প্রথম পর্বে আলোচনা করেছিলাম, সেই ‘ভর’-কেও STR আপেক্ষিক বলছে। মানে বডির গতির উপর নির্ভর করে তার ‘ভর’ কম-বেশি হতে পারে। যে চুম্বক ক্ষেত্র বা বলকে এতকাল যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা যায়নি, তাকেও ব্যাখ্যা করেছে STR। গতি যে কতভাবে বডি, পর্যবেক্ষক, স্থান, কাল, ক্ষেত্র, ইত্যাদিকে প্রভাবিত করতে পারে তা STR না আসলে বোঝা বা জানা যেত না। আইনস্টাইন তার কালজয়ী কাজগুলো প্রথম প্রকাশ করেছিলেন ১৯০৫ সালে। এই সালটিকে ল্যাটিন ভাষায় ‘অ্যানাস মিরাবিলিস’ অর্থাৎ ‘অলৌকিক বছর’ বলা হয়।

(অনেকেই মনে করে থাকেন যে আলবার্ট আইনস্টাইনের এই গবেষণা বা কাজগুলো মূলত: তার প্রথম স্ত্রী মিলেভা ম্যারিক -এর কাজ, যা আলবার্ট আইনস্টাইনের নামেই প্রচারিত হয়েছে। যাহোক, এই প্রবন্ধের আওতায় আর আলোচনাটি টানবো না।)

ব্যাপক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity):

মুসলিম পলিম্যাথ আল বিরুনী সফলভাবে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করেছিলেন। কিভাবে? তিনি কি একটা ফিতা নিয়ে মাটির উপর থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত ঢুকেছিলেন? অবশ্যই না। সেটা সম্ভবও না। তবে কি তিনি গোলাকার পুরো পৃথিবীটা একবার ঘুরে এসেছিলেন, তারপর পরিধির মাপ থেকে ব্যাসার্ধ করেছিলেন? না তাও না। তিনি ভ্রমণ করেছিলেন সত্য, তবে পুরো পৃথিবী ঘুরে আসেননি। কাজটা প্রথম করেছিলো ম্যাগিলান, তা আল বিরুনীর মৃত্যুর কয়েকশত বছর পরে। তবে পলিম্যাথ আল বিরুনী কিভাবে তা করেছিলেন? বিজ্ঞানের জন্ম হয়েছে বেশি বছর হয় নি, কিন্তু জ্যামিতির জন্ম হয়েছে নগর সভ্যতার জন্ম হওয়ারও পূর্বে। একদিকে যথার্থ জ্যামিতি যেমন মানব মস্তিষ্ক ছাড়া আর কোথাও থাকতে পারে না, আরেকদিকে এই জ্যামিতি মহাবিশ্বে অধিকতর বাস্তব। মানবদেহের পড়ন থেকে শুরু করে নক্ষত্রের গড়ন ও ঘূর্ণন পর্যন্ত সবই জ্যামিতি। আল বিরুনী বুঝতে পেরেছিলেন যে জ্যামিতির যথাযথ ব্যবহারই পারবে সফলভাবে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ বের করতে। এর জন্য উনার প্রয়োজন ছিলো, একটি পর্বত চূড়া ও তার পাদদেশে লম্বা সমতলভূমি। ঐতিহাসিক কাজটি তিনি করেছিলেন এগারো শতকে আধুনিক পাকিস্তানের নন্দনা নামক জায়গায়।

আল বেরুনীর গণনা থেকে এই প্রতীয়মান হয় যে মহাবিশ্বের অনেক রহস্যই সফলভাবে সমাধান করা যায় জ্যামিতির প্রয়োগ করে। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনও মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার প্রধান হাতিয়ার হিসাবে জ্যামিতিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

কোন বডির সমবেগ ছাড়াও আরেকটি গতিবেগ রয়েছে, আর তা হলো ত্বরান্বিত গতিবেগ। বডির সমবেগ নিয়ে কাজ শেষ হওয়ার পর আলবার্ট আইনস্টাইন এই ত্বরান্বিত গতিবেগ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন।

‘ত্বরণ’ শব্দটির সাথে আমি প্রথম পরিচিত হই নবম শ্রেণীতে। বুঝলাম, গাড়ীতে এক্সিলারেটরে চাপ দিলে গতিবেগ বাড়ে কেন। আসলে কোন বডির গতিবেগ বৃদ্ধি পাওয়াটাই হলো ত্বরণ। এরপর শিখলাম ‘অভিকর্ষজ ত্বরণ’ (acceleration due to gravity), মানে পৃথিবীতে কোন বডি-কে উপর থেকে ছেড়ে দিলে, তার গতিবেগ ক্রমাগত বাড়তেই থাকে এবং যখন সে ভূপৃষ্ঠে আঘাত হানে তখন তার গতিবেগ সর্বচ্চো। এবার বুঝলাম যে, ফুটবল খেলার সময় বলটা যদি অল্প উপর থেকে মাথায় পড়ে তখন কোন ব্যাথা পাইনা, কিন্তু যখন অনেক উপর থেকে বলটি মাথায় পড়ে, তখন বেশ ব্যাথা অনুভূত হয়। অনুরূপভাবে বলা যায় যে, (উপরওয়ালার দয়া কামনা করি) যদি কেউ একতলার ছাদ থেকে পড়ে, তাহলে বড় জোর হাত পা ভাঙে; কিন্তু দশ তলার ছাদ থেকে পড়লে আর আর রক্ষা নাই!

উপরের আলোচনা থেকে এই বুঝলাম যে মহাকর্ষের সাথে ত্বরণের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও এটা ধরতে পেরেছিলেন, তাই তিনি মহাকর্ষের ব্যাখ্যা করার জন্য ত্বরণ-কে বিবেচনা করে একটা নতুন আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর জন্ম দেন, যার নাম ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)’। আর এই ব্যাখ্যায় তিনি গাণিতিক টুল হিসাবে জ্যামিতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন সবচাইতে বেশি।

পরবর্তি পর্বে ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)’ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

—————————————————–

রচনাকাল: ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

রচনাসময়: রাত ২টা ৫৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.