কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১
——————————————- রমিত আজাদ

কসমোলজি বা সৃষ্টিতত্ত্ব আমার ছেলেবেলায় এমনকি যৌবনেও বাংলাদেশে খুব একটা পপুলার ছিলো না। আসলে সেই সময়ে বাংলাদেশে বিজ্ঞান বিষয়ে গ্রাজুয়েশন করেছেন এমন মুরুব্বী যেমন ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন, তেমনি স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করছে এমন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও ছিলো কম। আমি ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স অধ্যায়নকালীন সময়ে প্রথম ‘কসমোলজি’-র নাম শুনি। যদিও স্কুলে থাকতেই আমি আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতত্ত্বের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম উনার জীবনী পাঠের বদৌলতে। এছাড়া আমাদের স্কুল-কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অমিতাভ বিশ্বাস স্যার আমাদেরকে নবম শ্রেণীর ক্লাসরুমেই আপেক্ষিকতত্ত্বের প্রাথমিক পাঠ দিয়েছিলেন। ভালোভাবে বিষয়টা না বুঝলেও এইটুকু অন্ততপক্ষে বুঝেছিলাম যে গতি মাত্রেই আপেক্ষিক। আর পরবর্তি জীবনে জেনেছিলাম যে স্থান () বলি আর সময় () বলি উভয়েই গতির উপরই নির্ভরশীল। তাহলে স্থান এবং সময়-ও আপেক্ষিক হবে এটাই যৌক্তিক। স্কুল-কলেজ জীবনে আমরা একটা ইসলাম ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়মিত পালন করতাম, সেটি হলো পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ। যেখানে সুস্পষ্টভাবেই স্থানের ভিতর দিয়ে অত্যাধিক দ্রুতগতিতে ভ্রমণ ও সময়ের আপেক্ষিকতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। শ্রদ্ধেয় অমিতাভ বিশ্বাস স্যার ধর্মবিশ্বাসে অমুসলিম হলেও ছাত্রদের কর্তৃক শব-ই-মিরাজ-এর অনুষ্ঠানে পঠিত ‘সময়ের আপেক্ষিকতা’ বিষয়ক প্রবন্ধটি লিখতে সাহায্য করতেন। একবার আমি ল্যাব ক্লাসে অমিতাভ স্যারকে ধরে বসলাম, “স্যার আপেক্ষিকতা আমাকে বোঝাতেই হব.” স্যার আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন, তাই কোন আপত্তি জানালেন না। যদিও জানতেন আমি অত কঠিন তত্ত্বকথা ঐ বয়সে বুঝবো না। তারপরেও সংক্ষেপে আমাকে বিষয়টা বোঝালেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেন যে, “আলোকের বেগ ধ্রুব, তার কোন পরিবর্তন হয় না।” এবার আমি ধরে বসলাম, “না স্যার, পাটিগণিতে আমরা যাদবের অংক সমাধান করেছি। সারারাত মাথা ধরিয়ে অবশেষে বুঝেছি যে দুইটা ট্রেন মুখোমুখি হলে, তাদের আপেক্ষিক বেগ বাড়ে বা যোগ হয়; আর দুইটা ট্রেন পাশাপাশি চললে তাদের আপেক্ষিক বেগ কমে মানে বিয়োগ হয়।” এরপর আমি রহস্যময় হাসি হেসে বলেছিলাম, “স্যার ট্রেনে চেপে কলেজ থেকে যখন বাড়ীতে যাই তখন এটা এক্সপেরিয়েন্সডও করেছি। মুখোমুখী চলমান দুটি ট্রেন সাঁইসাঁই করে চলে যায়, ওপাশের ট্রেনের কারো চেহারাটাও দেখা যায় না। আর পাশাপাশি চলমান দুটি ট্রেনের যাত্রিরা নিজেদের মধ্যে কথাও বলতে পারে। তাহলে স্যার খুব দ্রুত গতিতে আমাদের দিকে আসা কোন একটা বাহনের উপরে যদি একটা মোমবাতি জ্বালানো থাকে তার থেকে আসা আলোর বেগ কি স্থির অবস্থার চাইতে বেশী হবে না?” এবার স্যারও রহস্য করে হেসে বলেছিলেন, “না, হবে না।” আমি স্যারের দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। স্যার আমার মনের কথা বুঝতে পেরে শান্তভাবে বললেন, “ট্রেনের উদাহরণ-টা নিয়ে ভাবছো তো? তা সব অবজেক্টের ক্ষেত্রেই গতিবেগের ঐ যোজন-বিয়োজন সূত্রটা খাটবে, কিন্তু একমাত্র ব্যাতিক্রম হলো ঐ আলো। আলোর ক্ষেত্রে ঐ সূত্র অচল!” আমিও নাছোড়বান্দা, বললাম, “স্যার, কিছু একটা তো হবে? গতির প্রভাব একেবারে এ্যাফেক্টলেস হয় কি করে?” স্যার এবার বললেন, “হুম এ্যাফেক্টলেস হয় না, আলোর বেগ না বাড়লেও, আলোর ইনটেনসিটি বেড়ে যায়।” সেদিনের আলোচনাটা খুবই ফ্রুটফুল ছিলো। অনেককিছুর সাথে প্রথমবারের মত জেনেছিলাম যে জগতবিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটনের ফিজিক্সের আইন গুলো সবক্ষেত্রে কাজ করে না।

সূর্য নিয়ে আলোচনা করছিলাম আমার মেধাবী ও পড়ুয়া রুমমেট আসিফের সাথে।
আমি: আচ্ছা সূর্যটা আলো ছড়াতে ছড়াতে একদিন কি প্রদীপের মত নিভে যাবে?
আসিফ: তাই তো বইয়ে পড়েছি। নিভে গিয়ে এক সময়ে সূর্যটা ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ হয়ে যাবে।
আমি: মানে কি?
আসিফ: সূর্যটা আর আলো বিকিরণ করবে না। কিন্তু ও থাকবে। তখন তার যা অবস্থা হবে তার নাম ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ ।
‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ বা ‘শ্বেত বামন’ নামটা ঐদিন প্রথম জেনেছিলাম।

হিরোশিমা ও নাগসাকি-র ট্রাজেডির কথা জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই জেনে এসেছি। একটা ছোট্ট বোমা কেমন বিপূল শক্তি ছড়িয়ে গোটা একটা শহরকে ধ্বংস করে দিলো, তা শুধু বিস্ময়করই না, রূপকথাকেও হার মানায়! কি ছিলো ঐ বোমার মধ্যে? কেমন করে এমন হলো তাই ভাবতাম।
আশির দশকে শব-ই-বরাতের রাত্রীতে ছোট ছোট বোমা ফাটায়নি, মুরুব্বীদের উত্যক্ত করেনি এমন বালক বোধহয় ঢাকা শহরে পাওয়া যাবে না। এই করে কিযে মজা পেতাম সেই বয়সে! ঢাকা শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে অলিতে গলিতে বিক্রি হতো পাঁচ পয়শা, দশ পয়শা দামের ঐসব আতশ-বাজি। ডিনামাইটের আকৃতির বোমাটার মূল্য ছিলো চার আনা। মাঝে ঐসব বোমা কিনে না ফাটিয়ে খুলে খুলে দেখতাম, ওর ভিতরে আছেটা কি? কেন ও ফেটে এত আওয়াজ করে? আগুন জ্বলে ওঠে কেন? এরপর ভাবতাম, তাহলে অত ক্ষুদ্র একটা এ্যাটম বোমা এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ করলো কি করে?

রসায়ন ক্লাসে শ্রদ্ধেয় কানন কুমার পুরোকায়স্থ স্যার শেখালেন, এ্যাটম বোমার সূত্র। কিভাবে ফিশন বা বিভাজন হয়ে এ্যাটমের নিউক্লিয়াস ভেঙে বিপুল শক্তি বেরিয়ে যায়। এদিকে ততদিনে বিশ্বব্যাপি হৈচৈ শুরু হয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগানের ব্যাপকবিধ্বংসী মারণাস্ত্র ‘নিউট্রন বোমা’ নিয়ে। শুনলাম তার আগে আমেরিকা ও রাশিয়া দুই দেশই তৈরী করেছে ‘হাইড্রোজেন বোমা’। আর ‘হাইড্রোজেন বোমা’ নাকি হিরোসিমা-নাগাসাকি ধ্বংসকারী এ্যাটম বোমার চাইতেও শক্তিশালী! কানন কুমার স্যারকে ধরে বসলাম, “হাইড্রোজেন বোমার বিক্রিয়া সূত্র শেখান স্যার।” স্যার শেখালেন যে, দুইটি হাইড্রোজেন এ্যাটম মিলিত হয়ে একটি হিলিয়াম এ্যাটম তৈরী হয়, আর তাতে বিপুল শক্তি লিবারেটেড হয়। দুইটি হাইড্রোজেন এ্যাটম মিলিত হয়ে একটি হিলিয়াম এ্যাটম তৈরী হওয়ার অতি সহজ গণিতটা বুঝলাম। কিন্তু তাতে বিপুল শক্তি লিবারেটেড হওয়ার কারণটা বুঝলাম না। ফিশনে শক্তি বের হওয়ার বিষয়টা জলবত তরলং মনে হয়েছিলো, কারণ আতশ-বাজি ফুটিয়ে নিজেই তো দেখেছি যে ভাঙলে বা ফাটলে আওয়াজ হয়, আগুন হয়, তাপ হয়। কিন্তু দুইটি অবজেক্ট যুক্ত হলে তাপ বা শক্তি উৎপাদিত হবে কেন তা আর বুঝলাম না।

আমার এক ব্যাচ সিনিয়র মুরতবা ভাই ছিলেন যেমন মেধাবী তেমনি দিল দরিয়া মানুষ । বিনা পয়সায় আমাকে পড়াতেন। একদিন তিনি কথায় কথায় আমাকে বললেন, “হাইড্রোজেন বোম সম্পর্কে জানো?” আমি বললাম, “বিক্রিয়াটা জানি, কানন স্যার বুঝিয়েছেন।” মুরতাবা ভাই হেসে বললেন, “আর মাথার উপর সূর্যটা দেখোনা?” আমি বললাম, “দেখি তো!” তিনি বললেন, “ঐ সূর্যটা হলো একটা হাইড্রোজেন বোমা।”
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! বললাম, “কি বলেন ভাই? ঐটা একটা হাইড্রোজেন বোমা?” মুরতাবা ভাই বললেন, “জ্বি, দুইটি হাইড্রোজেন এ্যাটম মিলিত হয়ে একটি হিলিয়াম এ্যাটম তৈরী হয় ওখানে। অবিরাম চলছে ঐ প্রোসেস।” আমি বললাম, “এভাবে চলতে থাকলে একদিন সূর্যের সব হাইড্রোজেন শেষ হয়ে হিলিয়াম হয়ে যাবে না?”
মুরতাবা ভাই: তা তো হবেই।
আমি: তারপর সূর্যটা নিভে যাবে? আর আলো দেবে না?
মুরতাবা ভাই: নাহ। আর আলো দেবে কি করে? ফুয়েল তো শেষ!

এবার আমি বুঝলাম, সূর্যটা কেন একদিন নিভে গিয়ে ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ হবে। ভাবলাম আকাশে তো লক্ষ তারার মেলা, তারাও সকলে কি একদিন নিভে গিয়ে ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ হবে?

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১২ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১০টা ৩৯ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.